শনিবার ● ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ● ১১ আশ্বিন ১৪৩৩
 
শিরোনাম:


জাতিসংঘে প্রধানমন্ত্রী: সংঘাতের সমাধান হতে হবে আলোচনা ও কূটনীতিতে
প্রকাশ: শুক্রবার, ২৫ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ১২:৪৯ পিএম  (ভিজিট : ১৬)
বিশ্বের যেকোনো সংঘাতের সমাধান আলোচনা, কূটনৈতিক প্রক্রিয়া ও পারস্পরিক সহযোগিতার মাধ্যমেই হওয়া উচিত বলে মন্তব্য করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তিনি বলেছেন, বিবদমান রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে সমতা, ন্যায্যতা, পারস্পরিক স্বার্থরক্ষা এবং সম্মান ও মর্যাদা রক্ষাকে দ্বিপাক্ষিক ও বহুপাক্ষিক সম্পর্কের ভিত্তি হতে হবে।

বৃহস্পতিবার (২৪ সেপ্টেম্বর) নিউইয়র্কে জাতিসংঘ সদর দপ্তরে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের সাধারণ বিতর্কে দেওয়া ভাষণে তিনি এসব কথা বলেন। তাঁর ভাষণে বিশ্ব সংঘাত, রোহিঙ্গা সংকট, জলবায়ু পরিবর্তন, অর্থনীতি, নারী ও যুবসমাজ, শিক্ষা, প্রযুক্তি এবং বাংলাদেশের উন্নয়ন পরিকল্পনার বিভিন্ন দিক উঠে আসে। তাঁর ভাষণের বিষয়বস্তুর সঙ্গে প্রকাশিত সংবাদ প্রতিবেদনগুলোরও মিল রয়েছে।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, মানবসৃষ্ট সংঘাতের কারণে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে অশান্ত পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে এবং বিপুলসংখ্যক মানুষ বাস্তুচ্যুত হচ্ছে। যুদ্ধ ও সংঘাতের প্রভাবে বিশ্ব অর্থনীতিও চাপের মুখে পড়েছে। জ্বালানি নিরাপত্তা সংকট, বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থায় বিঘ্ন এবং ক্রমবর্ধমান মুদ্রাস্ফীতির কারণে অর্থনৈতিক পরিস্থিতির অবনতি হচ্ছে বলে উল্লেখ করেন তিনি।

তিনি বলেন, বাংলাদেশ এমন একটি শান্তিপূর্ণ বিশ্বব্যবস্থা চায়, যেখানে মারণাস্ত্রের পরিবর্তে যুক্তি, কূটনীতি, শিক্ষা ও মানবতা পরিবর্তনের হাতিয়ার হবে। একই সঙ্গে একে অপরের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের প্রতি শ্রদ্ধাশীল একটি সমঝোতামূলক বিশ্ব সমাজ প্রতিষ্ঠায় জাতিসংঘকে কেন্দ্রীয় ভূমিকা পালনের আহ্বান জানান তিনি।

ফিলিস্তিন প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার এবং একটি স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার অধিকারসহ ফিলিস্তিনি জনগণের ন্যায্য দাবির প্রতি বাংলাদেশের সমর্থন অব্যাহত থাকবে। পাশাপাশি পূর্ণাঙ্গ ও সাধারণ নিরস্ত্রীকরণ, পারমাণবিক অস্ত্রের বিস্তার রোধ এবং অস্ত্র নিয়ন্ত্রণের প্রতিও বাংলাদেশের অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেন তিনি।

রোহিঙ্গা সংকট

রোহিঙ্গা সংকটকে বাংলাদেশের জন্য দীর্ঘমেয়াদি চাপ হিসেবে তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশ নয় বছরেরও বেশি সময় ধরে মিয়ানমার থেকে জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুত ১২ লাখের বেশি রোহিঙ্গাকে আশ্রয় দিয়ে আসছে। এতে বাংলাদেশের সম্পদ, পরিবেশ, নিরাপত্তা এবং স্থানীয় জনগোষ্ঠীর ওপর ব্যাপক চাপ সৃষ্টি হয়েছে।

তিনি বলেন, রোহিঙ্গা সংকটের উৎস ও উৎপত্তি মিয়ানমারে। তাই এর সমাধানও সেখানেই নিহিত। নিরাপদে রোহিঙ্গাদের মাতৃভূমি মিয়ানমারে ফিরিয়ে নেওয়াকেই এই সংকটের একমাত্র সমাধান হিসেবে উল্লেখ করে জাতিসংঘ ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কার্যকর সহযোগিতা কামনা করেন তিনি।

জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় বাংলাদেশের উদ্যোগ

জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব মোকাবিলায় বাংলাদেশ সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর অন্যতম বলে উল্লেখ করেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি জলবায়ু ন্যায়বিচার, জলবায়ু অর্থায়ন এবং অভিযোজন সহায়তার ক্ষেত্রে আরও জোরালো বৈশ্বিক পদক্ষেপের আহ্বান জানান।

তিনি জানান, পরিবেশ সুরক্ষায় আগামী পাঁচ বছরে সারাদেশে ২৫ কোটি গাছ লাগানোর কর্মসূচি নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি ক্লিন ও সৌরশক্তির ব্যবহার বাড়ানো এবং বন্যা-খরা মোকাবিলায় সারাদেশে ২০ হাজার কিলোমিটার খাল খননের কর্মসূচি শুরু হয়েছে। সুন্দরবনে মিঠা পানির প্রবাহ বৃদ্ধি ও পানি সংরক্ষণের জন্য তিস্তা মহাপরিকল্পনা এবং পদ্মা ব্যারেজ প্রকল্প বাস্তবায়নের কথাও তুলে ধরেন তিনি।

‘৩-আর’ কৌশলে বাংলাদেশ পুনর্গঠনের কথা

বাংলাদেশের বর্তমান সরকারের পুনর্গঠন পরিকল্পনা তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘রিকভারি, রেস্টোরেশন অ্যান্ড রিকনস্ট্রাকশন’—অর্থাৎ ৩-আর কৌশল অনুসরণ করে দেশকে পুনর্গঠনের কাজ চলছে। পাশাপাশি কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীকে দক্ষ মানবসম্পদে রূপান্তর, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং বাংলাদেশকে ‘ম্যানুফ্যাকচারিং হাব’ হিসেবে গড়ে তোলার উদ্যোগের কথা জানান তিনি।

তরুণ উদ্যোক্তা, গবেষক ও উদ্ভাবকদের জন্য চলতি অর্থবছরে স্টার্টআপ উদ্যোগে ৫০ মিলিয়ন ডলার বরাদ্দ রাখার কথাও ভাষণে উল্লেখ করেন প্রধানমন্ত্রী।

নারী, পরিবার ও শিক্ষা

নারীর শিক্ষা, কর্মসংস্থান ও উদ্যোক্তা তৈরিকে সরকারের অগ্রাধিকার হিসেবে তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রী। নারী উদ্যোক্তাদের জন্য বিশেষ করে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প খাতে নগদ অর্থায়নের সুযোগ সম্প্রসারণ এবং স্নাতক পর্যায় পর্যন্ত নারীদের বিনাবেতনে শিক্ষার সুযোগের কথা জানান তিনি।

অর্থনৈতিকভাবে পিছিয়ে পড়া মানুষের সহায়তায় ফ্যামিলি কার্ড, ফার্মার্স কার্ড, স্পোর্টস কার্ড ও ই-হেলথ কার্ড চালুর কথাও ভাষণে তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রী। প্রতিটি পরিবারের নারী প্রধানের নামে দেওয়া ফ্যামিলি কার্ডকে নারীর অর্থনৈতিক ক্ষমতায়নের প্রতীক হিসেবে উল্লেখ করেন তিনি।

শিক্ষাক্ষেত্রে সরকারের পরিকল্পনা তুলে ধরে তিনি বলেন, দেশের ইতিহাসে এবার শিক্ষাখাতে সর্বোচ্চ বাজেট বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। আগামী পাঁচ বছরের মধ্যে শিক্ষাখাতে জিডিপির ৫ শতাংশ বরাদ্দে উন্নীত করার পরিকল্পনার কথাও জানান তিনি।

প্রযুক্তিতে সমান সুযোগের আহ্বান

বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিকে ভবিষ্যৎ বিশ্বের চালিকাশক্তি হিসেবে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, বায়োটেকনোলজি ও বিজ্ঞানের নতুন যুগে প্রবেশ করছে। তবে প্রযুক্তির সুযোগ যেন কেবল কিছু মানুষের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থাকে, সেদিকে নজর দেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।

তিনি বলেন, বর্তমানের ডিজিটাল বিভাজন যেন ভবিষ্যতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার বিভাজনে পরিণত না হয়। উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য প্রযুক্তি হস্তান্তর, দক্ষতা বৃদ্ধি এবং আধুনিক প্রযুক্তিতে সাশ্রয়ী প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্বারোপ করেন প্রধানমন্ত্রী।

নিরাপদ ও শান্তিপূর্ণ বাংলাদেশ গড়ার প্রত্যয়

ভাষণের শেষ দিকে প্রধানমন্ত্রী বলেন, নাগরিকদের ক্ষমতাহীন রেখে কোনো রাষ্ট্র শক্তিশালী হতে পারে না। রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ক্ষমতায়নের মাধ্যমে এমন একটি কল্যাণমূলক গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার লক্ষ্য তুলে ধরেন তিনি, যেখানে দল-মত, ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সবাই সমান অধিকার, সম্মান ও মর্যাদা নিয়ে বসবাস করতে পারে।

তিনি বলেন, এমন একটি বাংলাদেশ গড়ে তুলতে চান যেখানে তরুণরা নিজেদের স্বপ্ন বাস্তবায়নের সুযোগ পাবে, নারীরা আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে জীবন পরিচালনা করতে পারবে এবং প্রতিটি শিশু তার সম্ভাবনা বিকাশের সুযোগ পাবে। জনগণের জন্য নিরাপদ ও শান্তিপূর্ণ জীবনের নিশ্চয়তার কথা তুলে ধরে **‘সবার আগে বাংলাদেশ : সবার জন্য বাংলাদেশ’** প্রত্যয় ব্যক্ত করে ভাষণ শেষ করেন প্রধানমন্ত্রী।

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের এই ভাষণটি জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের সাধারণ বিতর্কে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে দেওয়া হয়।








আরও খবর


Loading...
Loading...
প্রকাশক: এম এন এইচ বুলু
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : মাহফুজুর রহমান রিমন  |   উপদেষ্টা সম্পাদক : রাজু আলীম  
বিএনএস সংবাদ প্রতিদিন লি. এর পক্ষে প্রকাশক এম এন এইচ বুলু কর্তৃক ৪০ কামাল আতাতুর্ক এভিনিউ, বুলু ওশেন টাওয়ার, (২১ তলা), বনানী, ঢাকা ১২১৩ থেকে প্রকাশিত ও শরীয়তপুর প্রিন্টিং প্রেস, ২৩৪ ফকিরাপুল, ঢাকা থেকে মুদ্রিত।
ফোন:০২৯৮২০০১৯-২০ ফ্যাক্স: ০২-৯৮২০০১৬ ই-মেইল: [email protected]