দীর্ঘদিন ধরে ইউরোপের বিভিন্ন দেশে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বিএনপির পূর্ণাঙ্গ কমিটি না থাকায় সাংগঠনিক কার্যক্রমে দেখা দিয়েছে স্থবিরতা। কোথাও পুরোনো কমিটি পুনর্গঠন করা হয়নি, আবার কোথাও নতুন কমিটি গঠনের উদ্যোগও দৃশ্যমান নয়। এর ফলে নেতাকর্মী ও সমর্থকদের মধ্যে তৈরি হয়েছে বিভাজন, হতাশা এবং নেতৃত্বের প্রতি ক্ষোভ।
অভিযোগ রয়েছে, ইউরোপের বিভিন্ন দেশে বিএনপি কার্যত একাধিক গ্রুপে বিভক্ত হয়ে পড়েছে। অনেক দেশে পাঁচ-ছয়টি পর্যন্ত পৃথক বলয় সক্রিয় রয়েছে বলে নেতাকর্মীদের দাবি। পরিস্থিতি আরও জটিল হয়েছে যুবদল ও কোনো কোনো দেশে ছাত্রদলের সাংগঠনিক অবস্থাকে ঘিরে। কমিটি না থাকার কারণে অভ্যন্তরীণ বিরোধ অনেক ক্ষেত্রেই হাতাহাতি, মারামারি এমনকি মামলা-মোকদ্দমা পর্যন্ত গড়িয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন নেতাকর্মীর অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে দায়িত্বে থাকা কিছু সিনিয়র নেতা নতুন কমিটি গঠনে আগ্রহী নন। বিশেষ করে ফ্রান্সের কয়েকজন নেতার বিরুদ্ধে এমন অভিযোগ রয়েছে যে, নতুন কমিটি হলে তাদের বর্তমান প্রভাব ও সামাজিক মর্যাদা কমে যেতে পারে—এমন আশঙ্কা থেকেই তারা কমিটি গঠনের বিষয়টি দীর্ঘায়িত করছেন।
এ ছাড়া কিছু নেতার বিরুদ্ধে কমিটি গঠনের সঙ্গে আর্থিক লেনদেনের অভিযোগও রয়েছে। কেউ কেউ আবার অভিযোগ করছেন, বিমান টিকিট, হোটেলসহ বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা পাওয়ার স্বার্থে কমিটি গঠনের বিষয়টি ঝুলিয়ে রাখা হয়।
প্রশ্ন উঠছে, এত বড় একটি রাজনৈতিক দলের ইউরোপের মতো গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চলে সাংগঠনিক কাঠামো কেন দীর্ঘদিন ধরে অনিশ্চিত থাকবে? বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান দীর্ঘ সময় লন্ডনে অবস্থান করলেও ইউরোপের অনেক দেশে স্থায়ী ও কার্যকর কমিটি গঠনের সংকটের সমাধান হয়নি—এমন অভিযোগ রয়েছে নেতাকর্মীদের।
বর্তমানে বাংলাদেশে বিএনপি রাষ্ট্রক্ষমতায় থাকলেও ইউরোপের অনেক দেশের নেতাকর্মীরা এখনও সাংগঠনিক স্বীকৃতি ও নেতৃত্বের অপেক্ষায় রয়েছেন বলে অভিযোগ। হাজার হাজার প্রবাসী নেতাকর্মী বিএনপির আদর্শে বিশ্বাসী হয়েও কার্যত কমিটিবিহীন অবস্থায় সাংগঠনিক কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছেন।
এর একটি দৃশ্যমান উদাহরণ হিসেবে গত ১ সেপ্টেম্বর বিএনপির প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী পালনের বিষয়টি সামনে আনছেন অনেক নেতাকর্মী। তাদের দাবি, আয়ারল্যান্ড ছাড়া ইউরোপের অধিকাংশ দেশেই বিএনপির প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী যথাযথভাবে পালনের দৃশ্য দেখা যায়নি। দলের মতো একটি বৃহৎ রাজনৈতিক সংগঠনের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীও যদি ইউরোপে সাংগঠনিকভাবে দৃশ্যমান না হয়, তাহলে সেখানকার দলীয় কাঠামোর দুর্বলতা কতটা গভীর—তা নিয়ে প্রশ্ন উঠতেই পারে।
প্রবাসী নেতাকর্মীদের অনেকেই বলছেন, তারা দীর্ঘদিন ধরেই রাজনৈতিকভাবে বঞ্চিত। শুধু দলীয় রাজনীতিতে নয়, সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় ক্ষেত্রেও প্রবাসীদের অবদান যথাযথভাবে মূল্যায়িত হয় না বলে তাদের অভিযোগ।
ক্যামেরার আড়ালে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক নেতাকর্মীর বক্তব্য, “আমরা প্রবাসীরা সবসময়ই বঞ্চিত—রাজনীতিতে বঞ্চিত, সমাজনীতিতে বঞ্চিত, সরকারেও বঞ্চিত। সব জায়গাতেই যেন আমাদের বঞ্চনা। আমাদের আসলে কিছু করার নেই।”
ইউরোপে বিএনপির এই সাংগঠনিক সংকট দীর্ঘায়িত হলে এর প্রভাব শুধু দলীয় কার্যক্রমেই সীমাবদ্ধ থাকবে না; বরং তৃণমূলের নেতাকর্মীদের মধ্যে হতাশা আরও বাড়তে পারে। তাই দ্রুত স্বচ্ছ, গণতান্ত্রিক ও গ্রহণযোগ্য প্রক্রিয়ায় কমিটি গঠন এবং অভ্যন্তরীণ বিরোধ নিরসন এখন ইউরোপের বিএনপির জন্য অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।