একসময় কেক বানানো ছিল নিছক শখ। পরিবারের সদস্যদের জন্মদিন কিংবা বিশেষ কোনো আয়োজনে নিজের হাতে কেক তৈরি করেই আনন্দ পেতেন শারমিন জাহান চৌধুরী ইতি। সেই শখই একসময় রূপ নেয় স্বপ্নে। আর স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দিতে ঘরের পরিসরেই শুরু করেন কেক তৈরির উদ্যোগ।
এখন নিজের হাতে তৈরি কেকের মাধ্যমে স্বাবলম্বী হওয়ার পথে এগিয়ে চলেছেন চট্টগ্রামের লোহাগাড়া উপজেলার আমিরাবাদ ইউনিয়নের দর্জি পাড়ার এই নারী উদ্যোক্তা।
তাঁর উদ্যোগের নাম ‘ইতি’স কেক ক্রিয়েশন’। ফেসবুক পেইজে ছোট পরিসরে শুরু হলেও উদ্যোগটিকে ঘিরে ইতির স্বপ্ন অনেক বড়। সৃজনশীলতা, পরিশ্রম ও ভালোবাসাকে পুঁজি করে ঘরোয়া পরিবেশে তৈরি করছেন বিভিন্ন স্বাদের ও নকশার হোমমেড কেক। প্রতিটি কেকের সঙ্গে যেন জড়িয়ে আছে নিজের পরিচয়ে দাঁড়ানোর প্রত্যয়।
শখ থেকেই উদ্যোক্তা
কেক তৈরির প্রতি ছোটবেলা থেকেই আগ্রহ ছিল ইতির। পরিবারের বিভিন্ন অনুষ্ঠানকে কেন্দ্র করে নিজের হাতে কেক বানাতে বানাতেই অভিজ্ঞতা বাড়তে থাকে। পাশাপাশি নতুন নতুন ফ্লেভার, ডিজাইন ও কেক তৈরির কৌশল রপ্ত করেন তিনি।
একপর্যায়ে নিজের তৈরি কেকের ছবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশ করতে শুরু করেন। পরিচিতজনদের প্রশংসার পাশাপাশি আসতে থাকে অর্ডার। কেউ জন্মদিনের জন্য, কেউ বিবাহবার্ষিকী কিংবা অন্য কোনো বিশেষ আয়োজনের জন্য তাঁর কাছে কেকের অর্ডার দিতে থাকেন। এভাবেই ধীরে ধীরে শখের কাজটি পরিণত হয় ছোট্ট ব্যবসায়। নাম দেওয়া হয় ‘ইতি’স কেক ক্রিয়েশন’।
প্রতিটি কেকে যত্ন ও ভালোবাসা
ইতির তৈরি কেকের বিশেষত্ব শুধু স্বাদে নয়, এর সঙ্গে রয়েছে ব্যক্তিগত যত্ন ও নান্দনিক উপস্থাপনা। গ্রাহকের পছন্দ ও চাহিদা অনুযায়ী কেকের ডিজাইন, রং ও সাজসজ্জায় বৈচিত্র্য আনার চেষ্টা করেন তিনি।
অর্ডার পাওয়ার পর গ্রাহকের চাহিদা বুঝে প্রয়োজনীয় উপকরণ সংগ্রহ থেকে শুরু করে ব্যাটার তৈরি, বেকিং, ক্রিম তৈরি, ডিজাইন ও সাজসজ্জা—প্রতিটি ধাপই নিজের হাতে সম্পন্ন করেন ইতি। ফলে প্রতিটি কেক হয়ে ওঠে আলাদা ও বিশেষ। ইতির কাছে কেক শুধু একটি খাবার নয়; বরং প্রিয়জনের বিশেষ মুহূর্তকে আরও আনন্দময় করে তোলার একটি মাধ্যম।
ঘর থেকেই স্বপ্নের ভিত
ঘরে বসে কাজ করার সুযোগ থাকায় পারিবারিক দায়িত্বের পাশাপাশি নিজের দক্ষতাকেও কাজে লাগাতে পারছেন ইতি। তাঁর বিশ্বাস, একজন নারী চাইলে নিজের প্রতিভা, আগ্রহ ও পরিশ্রমকে কাজে লাগিয়ে ঘরে বসেই একটি উদ্যোগ গড়ে তুলতে পারেন।
শারমিন জাহান চৌধুরী ইতি বলেন, শুরুতে কেক বানানোটা ছিল আমার শখ। পরিবারের মানুষ ও পরিচিতদের জন্য কেক তৈরি করতাম। তখন ভাবিনি, একদিন এটাকেই নিজের উদ্যোগ হিসেবে এগিয়ে নিতে পারব। পরে যখন মানুষের কাছ থেকে ভালো সাড়া পেতে শুরু করি, তখন সাহস বাড়ে।
তিনি বলেন, প্রতিটি অর্ডার আমার কাছে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ একটি কেক শুধু একজন ক্রেতার অর্ডার নয়, এর সঙ্গে আমার শ্রম, সময় ও ভালোবাসা জড়িয়ে থাকে। কেকটি সুন্দরভাবে তৈরি হয়ে যখন গ্রাহকের হাতে পৌঁছায় এবং তারা সন্তুষ্ট হন, তখন অনেক ভালো লাগে।
স্বামীর উৎসাহেই এগিয়ে চলা
ইতির স্বামী আমিনুল হক মামুন বলেন, শুরু থেকেই ইতির স্বপ্ন ছিল নিজের হাতে তৈরি কেক নিয়ে কিছু একটা করার। প্রথম দিকে কাজটা ছিল একেবারেই ছোট পরিসরে। কিন্তু তার আগ্রহ, পরিশ্রম ও ধৈর্য দেখে আমরা তাকে উৎসাহ দিয়েছি।
তিনি আরও বলেন, এখন সে নিজের দক্ষতা দিয়ে ধীরে ধীরে এগিয়ে যাচ্ছে। একজন স্বামী হিসেবে আমি চাই, ইতি তার স্বপ্ন পূরণে আরও অনেক দূর এগিয়ে যাক। তার এই পথচলায় পরিবারের পাশাপাশি ক্রেতাদের ভালোবাসা ও সহযোগিতাই সবচেয়ে বড় অনুপ্রেরণা।”
স্বপ্ন এখন আরও বড়
বর্তমানে ঘরোয়া পরিসরে কাজ করলেও ভবিষ্যতে ‘ইতি’স কেক ক্রিয়েশন’-কে আরও বড় পরিসরে নিয়ে যেতে চান ইতি। উন্নতমানের উপকরণ ব্যবহার, নতুন নতুন ডিজাইন ও আধুনিক কেক তৈরির কৌশল আয়ত্ত করে নিজের উদ্যোগকে একটি পরিচিত ব্র্যান্ড হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার স্বপ্ন দেখছেন তিনি।
ইতি বলেন, আমি চাই আমার উদ্যোগটা একদিন লোহাগাড়ার বাইরেও পরিচিত হোক। ভবিষ্যতে আরও ভালোভাবে কাজ করতে চাই। নিজের একটি জায়গা থাকবে, যেখানে বিভিন্ন ধরনের কেক তৈরি করা হবে—এটাই আমার স্বপ্ন।
নারীদের জন্য অনুপ্রেরণার গল্প
ইতির উদ্যোগ শুধু তাঁর নিজের স্বপ্ন পূরণের গল্প নয়; ঘরে বসে কিছু করতে চান—এমন অনেক নারীর জন্যও এটি হতে পারে অনুপ্রেরণার উদাহরণ।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও অনলাইনভিত্তিক ব্যবসার সুযোগ কাজে লাগিয়ে এখন অনেকেই ঘরে বসে নিজেদের তৈরি পণ্য মানুষের কাছে পৌঁছে দিচ্ছেন। ইতি সেই সম্ভাবনাকে কাজে লাগিয়ে নিজের সৃজনশীলতাকে আয়ের উৎসে পরিণত করার চেষ্টা করছেন।
তাঁর মতে, উদ্যোগ শুরু করতে সবসময় বড় পুঁজির প্রয়োজন হয় না। নিজের ভালো লাগার কাজটি মন দিয়ে শেখা, মান ধরে রাখা এবং ধৈর্য নিয়ে এগিয়ে যাওয়াই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। ছোট পরিসরে শুরু করা কাজও একদিন বড় উদ্যোগে পরিণত হতে পারে।
একটি কেক, একটি স্বপ্ন
আমিরাবাদের দর্জি পাড়ার ঘরোয়া পরিবেশে তৈরি হওয়া প্রতিটি কেক যেন ইতির স্বপ্নের একেকটি প্রতিচ্ছবি। কোথাও জন্মদিনের আনন্দ, কোথাও প্রিয়জনকে চমকে দেওয়ার আয়োজন—আর সেই আনন্দের অংশ হয়ে উঠছে তাঁর হাতে তৈরি কেক।
একটি কেক হয়তো ক্রেতার কাছে কয়েক ঘণ্টার আনন্দের খাবার। কিন্তু সেই কেক তৈরির পেছনে একজন উদ্যোক্তার কাছে থাকে দীর্ঘ সময়ের শ্রম, শেখার আগ্রহ, ব্যর্থতা থেকে ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা এবং ভবিষ্যৎ গড়ার স্বপ্ন।
‘ইতি’স কেক ক্রিয়েশন’ তাই শুধু কেক তৈরির একটি উদ্যোগ নয়—এটি শখকে শক্তিতে, সৃজনশীলতাকে কাজে এবং স্বপ্নকে বাস্তবতায় রূপ দেওয়ার এক নারীর গল্প।
ইতির পথচলা হয়তো এখনও ছোট পরিসরে। তবে তাঁর স্বপ্নের পরিধি বড়। আর সেই স্বপ্নের স্বাদই তিনি ছড়িয়ে দিতে চান নিজের হাতে তৈরি প্রতিটি কেকের মাধ্যমে।