যে বয়সে মায়ের কোলে মাথা রেখে ঘুমানোর কথা, সেই বয়সেই মাত্র দুই বছরের এক শিশুকে সড়কের পাশে একা ফেলে যাওয়ার অভিযোগ উঠেছে তার মায়ের বিরুদ্ধে। পরে দাদির কাছেও আশ্রয় না পেয়ে শিশুটির ঠাঁই হয় স্থানীয় মানুষের কাছে। সেখান থেকে তাকে নিয়ে যাওয়া হয় উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার (ইউএনও) বাসভবনে। শিশুটিকে নিজের কোলে তুলে নিয়ে পোশাক ও খাবারের ব্যবস্থা করে মানবিকতার দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন মোরেলগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. হাবিবুল্লাহ।
শুক্রবার (২১ আগস্ট) সন্ধ্যা ৬টার দিকে বাগেরহাটের মোরেলগঞ্জ উপজেলার ১৪ নম্বর বারইখালী ইউনিয়নের ২ নম্বর ওয়ার্ডের জেলে পাড়ার একটি ইটভাটার সামনে এ ঘটনা ঘটে।
স্থানীয়রা জানান, সন্ধ্যার দিকে সড়কের পাশে একা একটি শিশুকে কাঁদতে দেখেন কয়েকজন। কাছে গিয়ে তারা দেখতে পান, শিশুটির আশপাশে কোনো অভিভাবক নেই। দীর্ঘ সময় ধরে শিশুটি কাঁদতে থাকায় স্থানীয়দের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়।
পরে স্থানীয়রা শিশুটিকে উদ্ধার করে তার দাদির কাছে নিয়ে যান। তবে অভিযোগ রয়েছে, দাদিও শিশুটির দায়িত্ব নিতে অস্বীকৃতি জানান। ফলে শিশুটিকে নিয়ে স্থানীয়রা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার বাসভবনে যান।
তিন মাস আগে বাবা-মায়ের বিচ্ছেদ
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, শিশুটির বাবা মো. পলাশ এবং মা মোসা. মিতু আক্তার বারইখালী ইউনিয়নের ২ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দা। স্থানীয়দের দাবি, প্রায় তিন মাস আগে তাদের মধ্যে বিবাহবিচ্ছেদ হয়।
বিবাহবিচ্ছেদের পর শিশুটির দায়িত্ব কার কাছে থাকবে, তা নিয়ে পারিবারিক জটিলতা তৈরি হয় বলে স্থানীয়দের ধারণা।
স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, শুক্রবার শিশুটির মা মিতু আক্তার তাকে ইটভাটার সামনের সড়কের পাশে রেখে ঢাকার উদ্দেশ্যে চলে যান। পরে শিশুটিকে একা কাঁদতে দেখে স্থানীয়রা তাকে উদ্ধার করেন।
শিশুটিকে কোলে তুলে নিলেন ইউএনও
স্থানীয়রা শিশুটিকে ইউএনও মো. হাবিবুল্লাহর বাসভবনে নিয়ে গেলে তিনি পুরো বিষয়টি জানতে পারেন। পরে শিশুটির বাবা মো. পলাশের সঙ্গে যোগাযোগ করেন ইউএনও।
এ সময় পলাশ জানান, তিনি বর্তমানে মোরেলগঞ্জের বাইরে অবস্থান করছেন। আইনগত প্রক্রিয়া অনুসরণ করে আগামী তিন দিনের মধ্যে ইউএনওর সঙ্গে সাক্ষাৎ করে সন্তানকে নিজের দায়িত্বে নেওয়ার কথা জানান তিনি।
তবে তার আগ পর্যন্ত শিশুটির নিরাপত্তা ও প্রয়োজনীয় যত্নের বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখেন ইউএনও।
শিশুটির পরনে প্রয়োজনীয় পোশাক না থাকায় নিজের বাসা থেকে জামা-কাপড় এনে তাকে পরিয়ে দেন তিনি। এরপর শিশুটির জন্য খাবারেরও ব্যবস্থা করেন। পাশাপাশি শিশুটিকে নিজের কোলে তুলে নেন ইউএনও।
ঘটনাটি উপস্থিত স্থানীয়দেরও আবেগাপ্লুত করে।
সাময়িক আশ্রয়ের ব্যবস্থা
শিশুটির নিরাপত্তা ও দেখভালের জন্য সাময়িকভাবে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করেন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা।
সবার উপস্থিতিতে শিশুটির ফুফু রেসমা খাতুনের কাছে তিন দিনের ভরণ-পোষণের জন্য আর্থিক সহায়তা দিয়ে শিশুটিকে সাময়িকভাবে হস্তান্তর করা হয়।
তবে শিশুটির স্থায়ী অভিভাবকত্ব, নিরাপত্তা ও ভবিষ্যৎ নিয়ে এখনো সিদ্ধান্ত নেওয়া বাকি রয়েছে।
সোমবার বাবাকে তলব
ঘটনার পর শিশুটির বাবা মো. পলাশকে আগামী সোমবার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কার্যালয়ে উপস্থিত হতে বলা হয়েছে।
শিশুটির ভবিষ্যৎ অভিভাবকত্ব, নিরাপত্তা এবং সংশ্লিষ্ট আইনগত বিষয়গুলো বিবেচনা করে পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানা গেছে।
মাত্র দুই বছরের একটি শিশুর এমন অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়ার ঘটনায় স্থানীয়দের মধ্যে ক্ষোভ ও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। তাদের প্রত্যাশা, শিশুটির সর্বোচ্চ স্বার্থ বিবেচনায় নিয়ে প্রশাসন প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবে।
একটি শিশুর বাবা-মায়ের সম্পর্কের টানাপোড়েন বা বিচ্ছেদের কোনো দায় নেই। তার প্রাপ্য নিরাপদ আশ্রয়, স্নেহ, যত্ন ও সুরক্ষা। মোরেলগঞ্জের এই ঘটনায় স্থানীয়দের মানবিক উদ্যোগের পাশাপাশি ইউএনও মো. হাবিবুল্লাহর তাৎক্ষণিক ভূমিকা প্রশংসিত হয়েছে।