কৃষিনির্ভর জেলা কুড়িগ্রামে পুনঃখনন করা একটি খাল এখন স্থানীয় কৃষকদের জন্য আশার প্রতীক হয়ে উঠেছে। সেচ সুবিধা বৃদ্ধি, অতিরিক্ত বৃষ্টির পানি দ্রুত নিষ্কাশন এবং খালকে ঘিরে নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হওয়ায় স্থানীয়দের মধ্যে দেখা দিয়েছে স্বস্তি। একই সঙ্গে খালের দুই পাড়ে গাছ লাগানো ও পরিবেশ উন্নয়নের ফলে এলাকাটি এখন একটি দৃষ্টিনন্দন স্থানে পরিণত হয়েছে।
গত ১০ মে রবিবার দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণমন্ত্রী আসাদুল হাবিব দুলু কুড়িগ্রাম সদর উপজেলার হলোখানা ইউনিয়নের আরাজী পলাশবাড়ি এলাকায় খাল খনন কর্মসূচির আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন। উদ্বোধনের পর একই দিন প্রকল্পের কাজ শুরু হয় এবং নির্ধারিত সময় অনুযায়ী গত ৩০ জুন কাজ সম্পন্ন হয়।
দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে এবং উপজেলা দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা বিভাগের বাস্তবায়নে কুড়িগ্রাম সদর উপজেলার হলোখানা ইউনিয়নের আরাজী পলাশবাড়ী মৌজার দাসেরহাট ছড়া থেকে এসিল্যান্ড সংযোগ খাল পর্যন্ত প্রায় দুই কিলোমিটার খাল পুনঃখনন করা হয়েছে। প্রকল্পটির ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ৫১ লাখ ৫৪ হাজার টাকা।
প্রকল্পের আওতায় প্রায় ১৮ হাজার ৯৮৯ ঘনমিটার মাটি কাটা, তিনটি বক্স কালভার্ট নির্মাণ, ২৫০টি বৃক্ষরোপণ, লেভেলিং ড্রেসিংসহ বিভিন্ন উন্নয়নমূলক কাজ সম্পন্ন করা হয়েছে। অতিদরিদ্রদের জন্য কর্মসংস্থান কর্মসূচির আওতায় ১১৯ জন শ্রমিক এই প্রকল্পে কাজ করেছেন।
স্থানীয় কৃষক আব্দুল বাতেন বলেন, আগে শুকনো মৌসুমে জমিতে সেচ দিতে অনেক কষ্ট হতো। এখন খালে পানি থাকায় প্রয়োজনের সময় সহজেই জমিতে পানি দেওয়া যাবে। এতে কৃষি উৎপাদন বাড়বে এবং চাষাবাদের খরচও কমবে।
স্থানীয়দের মতে, বর্ষা মৌসুমে অতিরিক্ত পানি দ্রুত নিষ্কাশনের সুযোগ সৃষ্টি হওয়ায় জলাবদ্ধতার ঝুঁকিও কমবে। ফলে কৃষিজমি দীর্ঘ সময় পানির নিচে থাকার আশঙ্কা কমে যাবে।
খাল পুনঃখননের পর এলাকাটির সৌন্দর্যও বেড়েছে। খালের দুই পাড়ে ২৫০টি গাছ রোপণ করা হয়েছে, যা ভবিষ্যতে পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষার পাশাপাশি বজ্রপাতের ঝুঁকি কমাতেও ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে বলে আশা করছেন স্থানীয়রা।
এখন প্রতিদিনই খালপাড়ে ঘুরতে আসছেন বিভিন্ন এলাকার মানুষ। বিকেল হলেই সেখানে দর্শনার্থীদের ভিড় বাড়ছে। এতে হলোখানা রাস্তার দু'পাশে ছোট ছোট চায়ের দোকানসহ বিভিন্ন অস্থায়ী ব্যবসা গড়ে উঠেছে। ফলে স্থানীয়ভাবে নতুন কর্মসংস্থানেরও সৃষ্টি হয়েছে।
দর্শনার্থী সজিব মিয়া বলেন, আগে জায়গাটি অবহেলিত ছিল। এখন খাল পুনঃখননের পর পুরো এলাকা অনেক সুন্দর হয়েছে। পরিবার নিয়ে ঘুরতে আসার মতো একটি মনোরম পরিবেশ তৈরি হয়েছে।
দোকানদার সাহের আলী বলেন, আগে এখানে তেমন মানুষ আসত না। এখন প্রতিদিন অনেক মানুষ ঘুরতে আসেন। এতে আমাদের ব্যবসাও ভালো হচ্ছে এবং সংসারের আয় বেড়েছে।
প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটির সভাপতি ও হলোখানা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মো. রেজাউল করিম বলেন, এই প্রকল্পের মূল উদ্দেশ্য ছিল কৃষকদের সেচ সুবিধা নিশ্চিত করা, অতিরিক্ত পানি দ্রুত নিষ্কাশনের ব্যবস্থা করা এবং স্থানীয় মানুষের জীবনমান উন্নয়ন করা। পাশাপাশি পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় গাছ লাগানো হয়েছে। ভবিষ্যতে এই খাল এলাকার কৃষি ও অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।
কুড়িগ্রাম সদর উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা (পিআইও) মো. জসিম উদ্দিন বলেন, এই খাল পুনঃখনন প্রকল্পের মাধ্যমে কৃষকদের সেচ সুবিধা নিশ্চিত করা, অতিরিক্ত বৃষ্টির পানি দ্রুত নিষ্কাশনের ব্যবস্থা করা এবং এলাকার জলাবদ্ধতা নিরসনই ছিল মূল লক্ষ্য। প্রকল্পের আওতায় পরিকল্পনা অনুযায়ী মাটি কাটা, বক্স কালভার্ট নির্মাণ, বৃক্ষরোপণসহ প্রয়োজনীয় কাজ সম্পন্ন করা হয়েছে। ভবিষ্যতে এই খাল স্থানীয় কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি, পরিবেশের উন্নয়ন এবং গ্রামীণ অর্থনীতিকে আরও গতিশীল করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে আমরা আশাবাদী।
স্থানীয়দের বিশ্বাস, পুনঃখনন করা এই খাল শুধু পানি প্রবাহের পথই নয়, এটি কৃষকদের উৎপাদন বৃদ্ধি, নতুন কর্মসংস্থান, পরিবেশ সংরক্ষণ এবং গ্রামীণ অর্থনীতিকে আরও গতিশীল করার একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম হয়ে উঠবে। কৃষির উন্নয়নের পাশাপাশি এই খাল ভবিষ্যতে এলাকার মানুষের জীবনমান পরিবর্তনেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে মনে করছেন তারা।