শনিবার ১ আগস্ট ২০২৬ ১৭ শ্রাবণ ১৪৩৩
 
শিরোনাম:


৩৪ বছর বয়সেও উচ্চতা ২৮ ইঞ্চি, সুন্দরবনপাড়ের মিলির স্বপ্ন শুধু একটি ঘর, গরু আর ছাগল
প্রকাশ: শুক্রবার, ৩১ জুলাই, ২০২৬, ৬:৫৬ পিএম  (ভিজিট : ১৭)
বিশ্বের সর্ববৃহৎ ম্যানগ্রোভ বন সুন্দরবনের কোলঘেঁষা বাগেরহাটের মোরেলগঞ্জ উপজেলার নিশানবাড়িয়া ইউনিয়নের গুলিয়াখালী গ্রামের বাসিন্দা মিলি আক্তার। ৩৪ বছর বয়স হলেও শারীরিক গঠনে তিনি অন্যদের চেয়ে আলাদা। পরিবারের সদস্যদের ভাষ্য, জন্মের পর থেকেই হরমোনজনিত জটিলতার কারণে তার শারীরিক বৃদ্ধি স্বাভাবিকভাবে হয়নি। বর্তমানে তার উচ্চতা মাত্র ২৮ ইঞ্চি বা ২ ফুট ৪ ইঞ্চি।

শারীরিক সীমাবদ্ধতা থাকলেও থেমে নেই মিলির স্বপ্ন। তার চাওয়া খুব বেশি কিছু নয়। একটি নিরাপদ ঘর, একটি গরু আর একটি ছাগল—এই তিনটি জিনিসই তার কাছে বড় স্বপ্ন।

পরিবারের সদস্যরা জানান, ১৯৯২ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি জন্ম নেওয়া মিলির বয়স বাড়লেও শারীরিক বৃদ্ধি হয়নি। জন্মের আগেই তার বাবা নজরুল ইসলাম তার মাকে ছেড়ে চলে যান। পরে মাত্র দুই বছর বয়সে মিলিকে নানা-নানির কাছে রেখে জীবিকার সন্ধানে সৌদি আরবে পাড়ি জমান তার মা ফরিদা ইয়াসমিন।

দীর্ঘ ২৭ বছর প্রবাসজীবন শেষে দেশে ফিরে তিনি দেখেন, মেয়ের বয়স বেড়েছে, কিন্তু স্বাভাবিকভাবে তার উচ্চতা বাড়েনি। মায়ের দেশে ফেরার পর মিলির জীবনে কিছুটা স্বস্তি এলেও সংসারের অভাব-অনটন কাটেনি।

মিলি মাঝেমধ্যে জরাজীর্ণ ঘরের দিকে তাকিয়ে মাকে প্রশ্ন করেন, ‘আমাদের ঘরটা এত ছোট কেন? দোতলা ঘর হবে কবে? আমি সিঁড়ি দিয়ে দোতলায় উঠব।’
মায়ের কাছে এই প্রশ্নের কোনো সহজ উত্তর নেই। কারণ সীমিত আয়ের সংসারে একটি ভালো ঘর তৈরি করাই কঠিন। এরপরও মিলির স্বপ্নের কমতি নেই। তিনি গরু ও ছাগল পালন করতে চান। নিজের ছোট্ট উঠানে সেগুলো নিয়ে সময় কাটানোর স্বপ্ন দেখেন। তবে আর্থিক সংকটের কারণে এখনো পূরণ হয়নি তার এই ইচ্ছা।

বয়স ৩৪ হলেও আনন্দ-বিনোদনের জগতে মিলি অনেকটাই শিশুর মতোই সরল। মুঠোফোনে গেম খেলতে, গান শুনতে এবং সুযোগ পেলে নাচতে ভালোবাসেন। মাছ-মাংস, পিঠা, আপেল ও কমলা তার পছন্দের খাবার। তবে পরিবারের আর্থিক সামর্থ্য সীমিত হওয়ায় সবসময় তার পছন্দের খাবার জোটে না।

দামী খেলনা কেনার সামর্থ্যও নেই পরিবারের। তাই হাতের কাছে থাকা সাধারণ জিনিসই কখনো কখনো তার খেলনার সঙ্গী হয়ে ওঠে। নিজের দৈনন্দিন অনেক কাজই তিনি নিজে করার চেষ্টা করেন। পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে সময় কাটানোর পাশাপাশি অসুস্থ মায়েরও খোঁজখবর রাখেন। ছোট ভাইয়ের প্রতি রয়েছে তার বিশেষ টান।

মিলির মা ফরিদা ইয়াসমিন বলেন, ‘মিলিকে গর্ভে রেখে আর সাড়ে তিন বছরের বড় মেয়ে পলিকে নিয়ে যখন জীবনযুদ্ধ শুরু করি, তখন পাশে কেউ ছিল না। অনেক কষ্ট করে বড় মেয়েকে লেখাপড়া করিয়েছি, বিয়ে দিয়েছি। কিন্তু মিলির জন্য ভালো চিকিৎসা বা পুষ্টিকর খাবারের ব্যবস্থা করতে পারিনি।’

জীবনের প্রয়োজনে তিনি দ্বিতীয় বিয়ে করেন। দুই মেয়েকে নিয়ে সিলেটের গোয়াইনঘাটে স্বামীর বাড়িতে চলে যান। পরে আবার ফিরে আসেন নিজের জন্মভূমি মোরেলগঞ্জে।

বর্তমানে ৪২ শতক জমির ওপর বসতভিটাটুকুই তাদের একমাত্র সম্বল। পরিবারের এক ছেলে কলেজে পড়াশোনা করছে। দ্বিতীয় স্বামী দিনমজুরের কাজ করে সংসার চালান। সীমিত আয়ের কারণে সংসারের খরচের পাশাপাশি অসুস্থ মায়ের চিকিৎসা ও ছেলের পড়াশোনার ব্যয় বহন করাও কঠিন হয়ে পড়েছে।

ফরিদা ইয়াসমিন বলেন, ‘সরকারি সাহায্য বলতে সমাজসেবা অধিদপ্তরের প্রতিবন্ধী ভাতাটাই আমাদের একমাত্র ভরসা। মেয়ের গরু আর ছাগল পালনের শখ এখনো পূরণ করতে পারিনি। কোথায় গেলে কী ধরনের সহযোগিতা পাওয়া যায়, সেটাও জানি না। আমি বেঁচে থাকতে মেয়ের জন্য অন্তত দুবেলা খাবার আর মাথা গোঁজার একটা নিরাপদ ব্যবস্থা করে যেতে পারলে শান্তি পেতাম।’

মিলির বিষয়ে উপজেলা প্রতিবন্ধী বিষয়ক কর্মকর্তা কায়কোবাদ আকুঞ্জী বলেন, ‘মিলির চলাচলে সমস্যা হলে দ্রুত সময়ের মধ্যে তাকে একটি হুইলচেয়ারের ব্যবস্থা করে দেওয়া হবে। এছাড়া জাতীয় প্রতিবন্ধী উন্নয়ন ফাউন্ডেশন থেকে কোনো আর্থিক সহায়তা পাওয়া গেলে সেটিও দেওয়ার চেষ্টা করা হবে।’

মোরেলগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. হাবিবুল্লাহ বলেন, ‘মিলি বর্তমানে প্রতিবন্ধী ভাতা পাচ্ছে। এছাড়া সরকারের যেসব সামাজিক নিরাপত্তা ও কল্যাণমূলক কর্মসূচি রয়েছে, সেগুলোর আওতায় তাকে অন্তর্ভুক্ত করার বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

সুন্দরবনের কোলঘেঁষা এই জনপদে মিলির জীবনসংগ্রাম হয়তো অনেকের চোখের আড়ালে। অথচ তার স্বপ্ন খুবই সাধারণ—একটি নিরাপদ ঘর, একটি গরু, একটি ছাগল এবং পরিবারের সঙ্গে সম্মানের সঙ্গে বেঁচে থাকা। সরকারি সহায়তার পাশাপাশি সমাজের বিত্তবান ব্যক্তি ও মানবিক সংগঠনগুলো পাশে দাঁড়ালে হয়তো মিলির ছোট ছোট স্বপ্নগুলোর কিছুটা পূরণ হতে পারে।








আরও খবর


Loading...
Loading...
প্রকাশক: এম এন এইচ বুলু
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : মাহফুজুর রহমান রিমন  |   উপদেষ্টা সম্পাদক : রাজু আলীম  
বিএনএস সংবাদ প্রতিদিন লি. এর পক্ষে প্রকাশক এম এন এইচ বুলু কর্তৃক ৪০ কামাল আতাতুর্ক এভিনিউ, বুলু ওশেন টাওয়ার, (২১ তলা), বনানী, ঢাকা ১২১৩ থেকে প্রকাশিত ও শরীয়তপুর প্রিন্টিং প্রেস, ২৩৪ ফকিরাপুল, ঢাকা থেকে মুদ্রিত।
ফোন:০২৯৮২০০১৯-২০ ফ্যাক্স: ০২-৯৮২০০১৬ ই-মেইল: [email protected]