সময়টি ছিল স্বাধীনতা যুদ্ধ চলাকালীন ১৯৭১ সালের শেষ দিকে ঘটে যাওয়া কোনো এক মধ্যাহ্নবেলার। ক্লাস টেন অর্থাৎ দশম শ্রেণিতে পড়ি। চাচাতো বোন 'হেনা' আপুর শুভ বিবাহ উপলক্ষে অনুষ্ঠিতব্য অনুষ্ঠানে যোগদান করতে বিয়ের আগের দিনই সকাল সকাল ফ্রেশ হয়ে মায়ের অনুমতি নিয়ে বিয়েবাড়ির উদ্দেশ্যে রওনা হই। নারায়ণগঞ্জ ঢাকা থেকে ১৭ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত হলেও তখনকার দিনে দুর্বল বাস ও খানাখন্দে ভরা রাস্তার কারণে সকালে ছেড়ে যাওয়া বাস দিনশেষে গন্তব্যে পৌঁছাত।
নারায়ণগঞ্জের বাস ছাড়া হতো গুলিস্তান ও ভিক্টোরিয়া পার্ক থেকে। ভিক্টোরিয়া পার্ক থেকে চলাচলকারী বাসগুলো ছিল লক্কর-ঝক্কর। এ কারণে এই এলাকার বাসগুলোকে 'মুড়ির টিন' বলা হতো। খুবই আগ্রহ নিয়ে যখন ভিক্টোরিয়া পার্কে গিয়ে শুনলাম বাস আজ চলবে না, তখন ফুটন্ত বেলুনে পিন ফুটলে যে চুপসে যাওয়ার অবস্থা হয়, ঠিক একই অবস্থা হলো আমার। লক্ষ্য একটাই—নারায়ণগঞ্জ যাব। অতি আপনজনদের সঙ্গে দেখা-সাক্ষাৎসহ আনন্দ-ফূর্তি হবে, সারাক্ষণ ছিল এ রকম ভাবনাই। তাই বাস্তব অবস্থা না জেনে গুলিস্তান থেকে ভালো বাসে নারায়ণগঞ্জ যাওয়ার চিন্তা-ভাবনা করতে করতে পায়ে হেঁটে গুলিস্তান চলে আসলাম। গুলিস্তান এসে শুনলাম আরও ভয়াবহ অবস্থা। গত রাতে মুক্তিযোদ্ধাগণ টিকাটুলি-হাটখোলা সংলগ্ন দয়াগঞ্জ ব্রিজ বোমা মেরে ক্ষতিগ্রস্ত করার কারণে উক্ত রুটে সকল বাস সার্ভিস আপাতত বন্ধ আছে। এগুলোর ভয়াবহতা অনুধাবন করার শক্তি সেই বয়সে ছিল না বললেই চলে। অদম্য ইচ্ছাশক্তির কাছে সকল ভয়াবহতাকেই তুচ্ছ মনে হলো। তাই ভালো-মন্দ যাচাই না করেই তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্ত—পায়ে হেঁটেই জুরাইন পর্যন্ত যাব এবং মনে অগাধ বিশ্বাস, সেখান থেকে কোনো না কোনো গণপরিবহন অবশ্যই ভাগ্যে জুটে যাবে।
যেমন চিন্তা তেমন কাজ। পায়ে হেঁটে যখন অভিসার সিনেমা হল অতিক্রম করছিলাম, দেখলাম ডানে দয়াগঞ্জের গলিমুখে কৌতূহলী এবং ভয়ার্ত অবয়বযুক্ত বেশ কিছু মুখ যেন দেখছে আমায়।
তাদের দিক থেকে কোনো সাড়া শব্দ নেই, শুধু একদৃষ্টিতে তাকিয়ে থেকে নিজেদের মধ্যে মুখ চাওয়া-চাওয়ি করছিল। তাদের এই আচরণ আমাকে রীতিমতো বিব্রতকর পরিস্থিতিতে ফেলে দিয়েছিল।
এত বড় প্রশস্ত রাস্তায় পথচারী আমি একাই। বুঝতে পারছি যে বিপদ আসন্ন, তবুও কোনো এক অজানা ভয় বুকে নিয়েই সায়েদাবাদ রেলওয়ের উঁচু পথে এগিয়ে যাচ্ছি, দয়াগঞ্জের সেই অনেক জোড়া চোখকে অতিক্রম করে। এ পাড় থেকে রেলওয়ে লাইন ছাড়া কিছুই চোখে পড়ছে না। আস্তে আস্তে যখন রেলওয়ে লাইনের উপরে উঠছি, ঠিক তখনি টের পেলাম যে 'মালাকাল মউত'-এর এলাকায় ঢুকে পড়েছি। এটাই বোধহয় জীবনের শেষ সময়। ঐ সময় যা দেখলে অন্তরাত্মা কেঁপে উঠত, তাই দেখে কেমন যেন নিস্তব্ধ হয়ে গেলাম। আল্লাহ-খোদার নামও ভুলে গেলাম।
আমি ঢাকার আরমানিটোলায় অবস্থিত হাম্মাদিয়া হাই স্কুলে লেখাপড়া করতাম। স্কুল ছুটি হলে যখন বাসায় ফিরতাম, তখন বেশিরভাগ সময়ই পাকিস্তানি আর্মিরা জংলি ক্যাপ ও ড্রেস পরে নয়াবাজার ব্যারিকেড দিয়ে রাখত। প্রায় ২০০/২৫০ ফুট দূর থেকেই জংলি ড্রেস ও জংলি ক্যাপ পরিহিত আর্মিদের সামনে আসতেই ভয় পেতাম। বিধায় প্রায় ২০০/২৫০ ফুট দূর থেকেই বাসায় আসার সহজ রাস্তাটিকে বাদ দিয়ে অনেকটা রাস্তা ঘুরে কসাইটুলি, সামসাবাবাদ এলাকা দিয়ে ফ্রেঞ্চ রোডে এসে বংশালের হাজী আবদুল্লাহ সরকার লেনের বাসায় ঢুকে যেতাম। প্রতিদিন বাসায় আসার সময় স্থানীয় বড় ভাইদের নিকট স্কুলের ছাত্র-শিক্ষক সম্পর্কে অসামঞ্জস্যপূর্ণ কোনো ঘটনা আছে কি না? থাকলে কেমন ঘটনা? এ সম্পর্কিত প্রশ্নের জবাব দিয়ে বাসায় আসতে হতো। পরবর্তীতে জেনেছি এই বড় ভাইরাই ছিলেন প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধা। তাদেরকে বিভিন্ন তথ্য জানিয়ে আমরা সহযোগিতা করতাম।
ঠিক যখন রেলওয়ে লাইনের উপর পায়জামা-পাঞ্জাবি পরিহিত ও হাতে অতিরিক্ত জামাকাপড়ের ব্যাগ নিয়ে দাঁড়িয়ে অস্পষ্ট দৃষ্টিতে কয়েকজন পাকিস্তানি আর্মিকে অবলোকন করলাম, তখন কেমন যেন ভাবলেশহীন বস্তুতে পরিণত হলাম। যেখানে বাঘের ভয় সেখানেই রাত হয়—প্রবাদটি যে আমার জীবনে এমন রূঢ় বাস্তব হয়ে ধরা দেবে, তা কস্মিনকালেও ভাবিনি। যখন পাকিস্তানি সেনাদের এলাকা অর্থাৎ সাক্ষাৎ 'মালাকাল মউতের' সীমানায় গিয়ে দাঁড়ালাম, ঠিক তখনই এই কথাটি আমার মনে বারবার আছড়ে পড়ছিল।
ওদের মধ্যে কেমন যেন উচ্ছ্বাস পরিলক্ষিত হচ্ছে। আমাকে দেখে ওদের ধারণা—শিকার পেয়েছে, অর্থাৎ মুক্তিযোদ্ধা তাদের কব্জায়। কর্কশ শব্দে আমার দৃষ্টি আকর্ষণ করে একজন পাকিস্তানি আর্মি ডাকছে— "ইধার আও"। বাধ্যগত ছেলের মতো আমি তার কাছে গেলাম।
"তুম কাহা যা রাহে থে?" আমার সাবলীল সাহসী জবাব— "ম্যায় নারায়ণগঞ্জ যাউঙ্গা।" পাকিস্তানি আর্মির কৌতূহলী প্রশ্ন— "নারায়ণগঞ্জ কেয়া চিজ হ্যায়?" এ প্রশ্নের জবাবে আমি কী বলব, ভেবে পাচ্ছিলাম না। এরপরই সেই মালাকাল মউতরূপী পাকিস্তানি আর্মির উচ্চস্বরে নির্দেশ— "শো যাও উহা পার"। অর্থাৎ যেখানটায় দাঁড়িয়ে কথা হচ্ছিল, সেটা ছিল সমগ্র ঢাকার ময়লা-আবর্জনা ফেলার সরকার অনুমোদিত ভাগাড় বা সায়েদাবাদ ল্যান্ডফিল সাইট (আউটফল)। সুবোধ বালকের ন্যায় নির্দেশ পালনে যখন আমি আন্তরিক, আল্লাহ রাব্বুল আলামিন তখন আমার প্রতি আরও বেশি আন্তরিক। পাকিস্তানি আর্মি যখন আমাকে এ জগত থেকে ভিন্ন জগতে অর্থাৎ পরপারে পাঠাবার শেষ চেষ্টায় তার বন্দুকের ট্রিগারে চাপ দিচ্ছিল, ঠিক তক্ষুনি ময়লা জমতে জমতে ভাগাড়টি ছোট-বড় অনেক টিলায় রূপান্তরিত হওয়া কোনো এক টিলা থেকে মালাকাল মউতরূপী পাকিস্তানি আর্মির প্রতি সরাসরি আল্লাহ রাব্বুল আলামিন প্রদত্ত আরেক পাকিস্তানি আর্মির মাধ্যমে নির্দেশ প্রদান— "ছোর দো উসকো"। সেই কর্কশ কণ্ঠের জংলি পাকিস্তানি আর্মিকে সেই উঁচু টিলা থেকে আরেক পাকিস্তানি আর্মির মাধ্যমে আল্লাহ রাব্বুল আলামিন কর্তৃক ঐশ্বরিক নির্দেশে আমাকে ছেড়ে দিয়ে বলছে— "যাও, জলদি ভাগো ইহাছে"।
বেঁচে যাওয়ার কারণে মা-বাবা, ভাই-বোন, আত্মীয়স্বজন ও বন্ধু-বান্ধবদের নিকট যে ফিরে যেতে পারছি, সে রকম কোনো অনুভূতি আদৌ কাজ করেছে বলে মনে হয়নি। শুধু একটি কথাই মনে হয়েছে যে, দয়াগঞ্জের গলিমুখে কৌতূহলী ও ভয়ার্ত অবয়বযুক্ত যে মুখগুলোকে অতিক্রম করে আমি এই মৃত্যুপুরীতে পৌঁছেছিলাম, এখন রাব্বুল আলামিনের ইচ্ছায় প্রাণভ্রমরা নিয়ে যে তাদের সামনে দিয়ে যাব, তারা এখন প্রশ্ন করলে কী জবাব দেব। সেই সময়ে দোয়া-দরুদ ও আল্লাহ-খোদার নাম ভুলে গিয়েছিলাম। হিতাহিত জ্ঞানশূন্য ছিলাম আমি। আল্লাহ রাব্বুল আলামিন যদি সেই সময়ে দয়াপরবশ হয়ে আমাকে না বাঁচাতেন, তাহলে ঢাকা শহরের ময়লা-আবর্জনা ফেলার একমাত্র ভাগাড়টিই হতো আমার নিষ্প্রাণ দেহটির শেষ ঠিকানা। কুকুর, শিয়াল বা শকুনের খাবারে পরিণত হয়ে চিরকালের জন্য মিশে যেতাম ভাগাড়ের উঁচু-নিচু টিলার মধ্যে। বাবা-মা, ভাই-বোন, আত্মীয়স্বজন ও বন্ধু-বান্ধব কেউ জানত না আমি কোথায়? সবার কাছে মুক্তিযুদ্ধে হারিয়ে যাওয়া 'আফতাব' হিসেবেই পরিচিতি পেতাম।
যাহোক, পাকিস্তানি আর্মিদের মরণফাঁদ থেকে রাব্বুল আলামিন যখন "যাও জলদি ভাগো ইহাছে" এর মাধ্যমে আমাকে নতুন জীবন দিয়ে সেই দয়াগঞ্জের রাস্তা দিয়ে আবার আমাকে আমার পরিচিত পৃথিবীর বাসিন্দা করার জন্য নিয়ে আসেন, তখনই সেই ভয়ার্ত অবয়বগুলির চাপা প্রশ্ন— "ছোট ভাই, আর্মিরা তোমারে কিছু কয় নাই?" তাৎক্ষণিক আমার মিথ্যা জবাব— "না, আমার পরিচিত জনের সাথে দেখা করে আসলাম।" জবাব পেয়ে তারা একে অপরের সাথে অবিশ্বাসের দৃষ্টি বিনিময় করে নিশ্চুপ থেকে একবার আমার দিকে আরেকবার রেলওয়ের অপর প্রান্তে লুকানো জংলি পাকিস্তানি আর্মিদের দেখার বৃথা চেষ্টায় নিয়োজিত। উল্লেখ্য যে, আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের অশেষ মেহেরবানি না হলে যেখানটায় আমার শেষ ঠিকানা বা সমাধি রচনা হতো, সেখানে এখন বাংলাদেশের সর্ববৃহৎ আধুনিক মানের সায়েদাবাদ বাস টার্মিনাল।
ভাবতে অবাক লাগে যে, নিশ্চিত মৃত্যুর হাত থেকে রক্ষা পাওয়া স্কুলপড়ুয়া একটি ছেলে কীভাবে নিজ বাড়িতে ফিরে না এসে এত বড় দুর্ঘটনাকে বেমালুম ভুলে গিয়ে পুনরায় পায়ে হেঁটে পুরান ঢাকার লোহারপুল, মিল ব্যারাক, জুরাইন পৌঁছে বাসযোগে নারায়ণগঞ্জ পৌঁছায়। বিয়েবাড়িতে দাদা-দাদি, ফুফাতো বোন, চাচাতো বোন ও আপন বড় ভাইয়ের মতো আপনজনদের দেখে আনন্দে আত্মহারা হয়ে পড়ি। ভুলে যাই ঘণ্টা কয়েক আগের সেই দুঃসহ ঘটনাগুলির কথা। অলৌকিকভাবে বেঁচে যাওয়ার কথাটি বহু বছর কারো সঙ্গে শেয়ার করা হয়নি—যা কিনা পৃথিবীর সপ্তম আশ্চর্যের একটি বলেই মনে করি।
লেখক: কর্মকর্তা (অবঃ), বিআরডিবি, পল্লী ভবন, ঢাকা-১২১৫
anwaraftab611@gmail.com