হাইব্রিড বা নব্যদের বিষয়ে কিছু লেখার আগে একটি সংক্ষিপ্ত পারিবারিক উদাহরণ না বললেই নয়। ধরুন, কোনো শিশুর মা মারা গেলে বা বাবার সঙ্গে তার মায়ের বিচ্ছেদ হলে, বাবা শিশুকে লালন-পালনের জন্য পুনরায় বিয়ে করেন। তখন শিশুটির জীবনে আসে একজন নতুন ‘মা’। শিশুটি তাকে ভালোবাসে, মায়ের মতোই ধরে নেয়, এবং সেই মা-ও শিশুটিকে আপন সন্তানের মতোই লালন-পালন করেন। কিন্তু সময়ের ব্যবধানে শিশুটি বড় হলে বুঝে ফেলে, এই ‘মা’ তার জন্মদাত্রী নন। তখন তার হৃদয়ে জন্ম নেয় শূন্যতা। সে খুঁজে ফেরে তার প্রকৃত মাকে। যেখানে থাকুন না কেন, জন্মদাত্রী মা যেন ভালো থাকেন, সেটাই হয় তার প্রার্থনা।
রাজনীতির ময়দানেও কিছুটা এমনই চিত্র পরিলক্ষিত হচ্ছে। বিএনপির মতো একটি ঐতিহ্যবাহী দলের ক্ষেত্রে বর্তমানে ‘হাইব্রিড’ বা ‘নব্য’ নেতাকর্মীদের দৌরাত্ম্য দলের প্রকৃত চেতনা ও আত্মত্যাগের ইতিহাসকে ম্লান করে দিচ্ছে। স্বাধীনতার ঘোষক শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের হাতে গঠিত এই দলটি বিগত প্রায় পাঁচ দশকে পাঁচবার রাষ্ট্রক্ষমতায় ছিল এবং দুবার বিরোধী দলের ভূমিকা পালন করেছে। দীর্ঘ রাজনৈতিক পথপরিক্রমায় নানা চড়াই-উৎরাই পেরিয়ে দলটির নেতৃত্ব দিয়েছেন আপসহীন নেত্রী ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া।
কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে দেখা যাচ্ছে, বিএনপির অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনগুলোতে একশ্রেণির নব্য নেতা-কর্মীর আগমন ঘটেছে, যাদের অতীতে দলের দুঃসময়ে মাঠে দেখা যায়নি। ২০০৯ সালের পর থেকে ১৬ বছর ধরে বিএনপির নেতাকর্মীরা আওয়ামী শাসনামলে গুম-খুন, মামলা-হামলা, কারাবরণসহ নানা নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। এই দুঃসময়ে যারা রাজপথে ছিলেন না, বরং নিজেদের গুটিয়ে রেখেছিলেন, তারাই আজ পদ-পদবি পাওয়ার আশায় সক্রিয়। জনপ্রিয় এই দলটির সুনাম ক্ষুন্ন করতেই অনেকে আবার দলের নাম ভাঙিয়ে ব্যক্তিস্বার্থ চরিতার্থ করছেন, জড়িয়ে পড়ছেন অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে। এসব ঘটনায় বিএনপিকে পড়তে হচ্ছে বিব্রতকর পরিস্থিতিতে। অথচ দলের জন্য যাদের ত্যাগ রয়েছে, তারা দলের ক্ষতি হোক এটা কখনোই চাইবে না।
গত বছরের ৫ আগস্ট আওয়ামী সরকার পতনের পর, বিএনপিতে এসব হাইব্রিড নেতার দৌরাত্ম্য আরও বেড়েছে। পদ-পদবি নিয়ে সংঘর্ষ, চাঁদাবাজি, আধিপত্য বিস্তার-এসব ঘটনায় বিএনপির ত্যাগী ও মূলধারার নেতাকর্মীদের মনে তৈরি হয়েছে তীব্র ক্ষোভ। পুরান ঢাকায় মিটফোর্ড হাসপাতালে সোহাগ হত্যাকাণ্ডে দলের অঙ্গ সংগঠনের নেতা-কর্মীদের সম্পৃক্ততা দলটিকে আরও চাপে ফেলেছে। যদিও এ ঘটনায় অভিযুক্তদের আজীবন বহিষ্কার করা হয়েছে, তবুও জনসম্মুখে দলের ভাবমূর্তি ক্ষুন্ন হয়েছে। বিএনপিকে লক্ষ্য করে ক্ষোভ-বিক্ষোভ ও নিন্দা-প্রতিবাদের ঝড় উঠে। জামায়াত ইসলামী ও এনসিপিসহ কয়েকটি দলের সমালোচনার মূখে পড়তে হয়েছে খোদ বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানকেও। আরও উদ্বেগজনক বিষয় হলো, দলের শীর্ষ পর্যায়ের কিছু নেতা দায়িত্বশীলতার অভাব দেখাচ্ছেন। কেউ কেউ স্ববিরোধী বক্তব্য দিয়ে দলের বিরুদ্ধেই অবস্থান নিচ্ছেন। বিএনপির চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা ফজলুর রহমানের সাম্প্রতিক বক্তব্য তার উদাহরণ। শোকজ ও বহিষ্কারের মতো ব্যবস্থা গ্রহণ করলেও, তার বক্তব্যের প্রভাব থেকে যায়। এতে দলের ইমেজ ক্ষতিগ্রস্ত হয়, যা সহজে মেরামতযোগ্য নয়।
ইদানিং দেখা যাচ্ছে, ‘বিএনপি’, ‘জিয়া’, ‘আরাফাত রহমান কোকো’ প্রভৃতি নাম ব্যবহার করে প্রায় শতাধিক ভূইঁফোড় সংগঠন গজিয়েছে, এই ভূইঁফোড় সংগঠন নানা অনুষ্ঠানের নাম করে অর্থের বিনিময়ে বিতর্কিত লোকদের পদ-পদবি দিচ্ছে, এরাই আবার দলবিরোধী কাজে জড়াচ্ছে। এগুলো দলটির ভাবমূর্তিকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। বিএনপিকে এখনই এ বিষয়ে কঠোর অবস্থান নিতে হবে। তাই বিএনপি ও তার অঙ্গ-সংগঠনের নেতাকর্মীদেরকে আমি বলতে চাই, হাইব্রিড-নব্যদের দৈারাত্ব এখনই থামান। নতুবা এরাই হবে বিএনপির গলার কাঁটা। এদেরকে চিহিৃত করা উচিত। দলের নেতৃবৃন্দকে বুঝতে হবে, যারা দুঃসময়ে মাঠে ছিলেন, নির্যাতিত হয়েছেন, তারাই প্রকৃত বিএনপিকর্মী। বিভিন্ন সময়ের দলের শৃঙ্খলা বিরোধী কর্মকাণ্ডে জড়িতদের চিত্র অবলোকন করলে আচ করা যায় হাইব্রিড-নব্যদের মধ্যে স্নাইপার গ্রুপের সদস্যরাও ঘাপটি মেরে রয়েছে। যারা দেশে-বিদেশে বিএনপির সুনাম ক্ষুন্ন করার চক্রান্তে লিপ্ত। দলটির হাইকমাণ্ডকেও ভাবতে হবে, সুবিধাজনক সময়ে যারা সুবিধা নিতে এসে ‘বিএনপির লোক’ সেজেছেন, তারাই আদতে দলের ক্ষতির কারণ। এসব হাইব্রিড, সুবিধাবাদী, সুযোগসন্ধানী ব্যক্তিদের দলে ঠাঁই দিলে দলের অস্তিত্বই প্রশ্নের মুখে পড়তে পারে। আমি মনে করি, আজ প্রয়োজন একটি সুসংগঠিত শুদ্ধি অভিযান। হাইব্রিড ও নব্যদের সনাক্ত করার পাশাপাশি দলের নেতৃবৃন্দকে কঠোর পদক্ষেপ নিতে হবে। দলের প্রতি দায়বদ্ধ, আদর্শনিষ্ঠ, পরিক্ষীত ও ত্যাগী নেতাকর্মীদের হাতেই দলের ভবিষ্যৎ দায়িত্ব তুলে দিতে হবে। তাহলে বিএনপি আবারও ফিরে পেতে পারে তার হারানো গৌরব।
লেখক: সাংবাদিক।