দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের বিশ্বের সর্ববৃহৎ ম্যানগ্রোভ বনাঞ্চল ও মৎস্যভান্ডার হিসেবে খ্যাত বিশ্ব ঐতিহ্য সুন্দরবনের উপকূলে
অধ্যবসায়, পরিশ্রম আর সঠিক পরামর্শ—এই তিনের সমন্বয়ে লবণাক্ত উপকূলেও যে কৃষিতে সাফল্য পাওয়া সম্ভব, তারই উদাহরণ সৃষ্টি করেছেন বাগেরহাটের মোরেলগঞ্জ উপজেলার জিউধরা ইউনিয়নের তরুণ উদ্যোক্তা খান মাহাবুব। মৎস্যঘেরের ভেড়িতে মিষ্টি কুমড়া ও অফসিজন তরমুজ চাষ করে বাম্পার ফলন পেয়েছেন তিনি। মাত্র তিন মাসের এই চাষে খরচ বাদ দিয়ে ভালো লাভের মুখ দেখছেন শিক্ষিত এই তরুণ।
খান মাহাবুব বাগেরহাট পিসি কলেজ থেকে স্নাতকোত্তর (মাস্টার্স) সম্পন্ন করেছেন। চাকরির পেছনে না ছুটে নিজের পারিবারিক জমিকে কাজে লাগিয়ে উদ্যোক্তা হওয়ার পথ বেছে নিয়েছেন তিনি। গত সাত-আট বছর ধরে বাবার ২০ বিঘা জমিতে মৎস্যচাষ করে আসছিলেন। তবে এ বছরই প্রথম কৃষি বিভাগের পরামর্শে মৎস্যঘেরের ভেড়িতে সবজি ও ফল চাষে নামেন। প্রথমবারেই মিলেছে প্রত্যাশার চেয়ে ভালো সাফল্য।
সরেজমিনে জিউধরা ইউনিয়নের একরামখালী গ্রামে গিয়ে দেখা যায়, মৎস্যঘেরের চারপাশের ভেড়িতে সারি সারি মিষ্টি কুমড়ার গাছ। পাশাপাশি রয়েছে তরমুজের গাছ। সবুজ পাতার আড়ালে ঝুলছে বড় বড় মিষ্টি কুমড়া। কোথাও আবার মাটির ওপর বেড়ে উঠেছে তরমুজ। ফলন দেখে স্থানীয় কৃষকরাও আগ্রহী হয়ে উঠছেন।
৬০ মণ কুমড়া বিক্রি ৭০ হাজার টাকায়
খান মাহাবুবের ২০ বিঘা মৎস্যঘেরের ভেড়িতে চাষ করা মিষ্টি কুমড়ার ইতোমধ্যে প্রায় ৬০ মণ বিক্রি হয়েছে। এসব কুমড়া বিক্রি করে তিনি পেয়েছেন প্রায় ৭০ হাজার টাকা। আরও প্রায় ৬০ মণ মিষ্টি কুমড়া বিক্রি করতে পারবেন বলে আশা করছেন তিনি।
একই সঙ্গে ভেড়িতে দুই জাতের তরমুজ চাষ করেছেন। এর মধ্যে ‘সাম্মারড্রাগন’ ও ‘তৃপ্তি’ জাতের তরমুজ রয়েছে। ইতোমধ্যে প্রায় ১৫ মণ তরমুজ বিক্রি করে ৪২ হাজার টাকা পেয়েছেন। আরও ১৪ থেকে ১৫ মণ তরমুজ বিক্রি করতে পারবেন বলে আশা করছেন এই উদ্যোক্তা।
খান মাহাবুবের হিসাবে, মাত্র তিন মাসের এই চাষে সার, কীটনাশক, শ্রমিকের মজুরিসহ উৎপাদন খরচ বাদ দিয়েও তিনি লাভবান হচ্ছেন। একই জমির মৎস্যচাষের পাশাপাশি ভেড়ি ব্যবহার করে অতিরিক্ত আয়ের সুযোগ তৈরি হওয়ায় তিনি বেশ সন্তুষ্ট।
লবণাক্ত জমিতে নতুন সম্ভাবনা
উপকূলীয় মোরেলগঞ্জের জিউধরা ইউনিয়নের মানুষের প্রধান জীবিকা দীর্ঘদিন ধরে মৎস্যচাষ। অতিরিক্ত লবণাক্ততার কারণে অনেক এলাকায় আমন ধানের ফলনও আশানুরূপ হয় না। ফলে কৃষিজমির একটি বড় অংশ মৎস্যঘের হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে।
এই বাস্তবতায় মৎস্যঘেরের ভেড়িকে কাজে লাগিয়ে সবজি ও ফল চাষের উদ্যোগ স্থানীয় কৃষিতে নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলে দিয়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
খান মাহাবুব বলেন, তাঁদের এলাকার অধিকাংশ মানুষ মৎস্যচাষের ওপর নির্ভরশীল। লবণাক্ততার কারণে ধানসহ অন্যান্য ফসলের চাষও সব জায়গায় ভালো হয় না। কৃষি বিভাগের পরামর্শে এ বছর প্রথমবার ঘেরের ভেড়িতে মিষ্টি কুমড়া ও তরমুজ চাষ করেন তিনি।
তিনি বলেন, ‘নিজেদের সংসারের চাহিদা মেটানোর পাশাপাশি এখন বাজারেও সবজি ও ফল বিক্রি করতে পারছি। সার, কীটনাশক ও শ্রমিকের মজুরিসহ সব খরচ বাদ দিয়েও স্বল্প সময়ে ভালো লাভ হচ্ছে। তবে শুধু লাভই আমার কাছে বড় বিষয় নয়। এই চাষের মাধ্যমে চারটি শ্রমিক পরিবারের কর্মসংস্থান করতে পেরেছি—এটাই আমার কাছে বড় আত্মতৃপ্তির।’
খান মাহাবুবের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, চারটি শ্রমিক পরিবারের সদস্যরা তাঁর খামারে কাজ করছেন। তাঁদের পেছনে মাসে প্রায় ৪২ হাজার টাকা শ্রমিক মজুরি ব্যয় হচ্ছে। অর্থাৎ নিজের আয়ের পাশাপাশি স্থানীয় শ্রমজীবী মানুষেরও কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হয়েছে তাঁর উদ্যোগে।
কৃষি বিভাগের পরামর্শে বদলে গেল চিত্র
জিউধরা ইউনিয়নের উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা ফরহাদ হোসেন বলেন, তরুণ উদ্যোক্তা খান মাহাবুবকে কৃষি বিভাগের পক্ষ থেকে প্রথমে মৎস্যঘেরের ভেড়িতে সবজি চাষের বিষয়ে পরামর্শ দেওয়া হয়। পরে তাঁকে আধুনিক কৃষি প্রযুক্তি ও চাষাবাদ পদ্ধতি সম্পর্কে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি কৃষি প্রণোদনার ব্যবস্থাও করা হয়েছে।
তিনি বলেন, সঠিক জাত নির্বাচন, জমি প্রস্তুত, সার ও কীটনাশকের সঠিক ব্যবহার এবং নিয়মিত পরিচর্যার ফলে এবার ভালো ফলন পেয়েছেন খান মাহাবুব। তাঁর সাফল্য দেখে এলাকার অন্য কৃষকরাও মৎস্যঘেরের ভেড়িতে সবজি ও ফল চাষে আগ্রহী হবেন বলে আশা করছেন তিনি।
শিক্ষিত বেকারদের উদ্যোক্তা হওয়ার আহ্বান
মোরেলগঞ্জ উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা সাইফুল ইসলাম বলেন, শিক্ষিত বেকার তরুণদের কৃষিতে সম্পৃক্ত করে উদ্যোক্তা তৈরির চেষ্টা করছে কৃষি বিভাগ। আধুনিক প্রযুক্তি ও প্রশিক্ষণের মাধ্যমে তাঁদের কৃষিকাজে যুক্ত করা গেলে একদিকে যেমন কর্মসংস্থান তৈরি হবে, অন্যদিকে দেশের কৃষি উৎপাদনও বাড়বে।
তিনি বলেন, খান মাহাবুবের মতো শিক্ষিত তরুণদের কৃষিতে আগ্রহী করে তোলা গেলে উপকূলীয় এলাকায় কৃষির নতুন সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে।
মৎস্যঘেরের ভেড়ি সাধারণত ঘেরের পাড় হিসেবেই পড়ে থাকে। সেই ভেড়িকে উৎপাদনের আওতায় এনে একই জমি থেকে মাছের পাশাপাশি সবজি ও ফল উৎপাদন করছেন খান মাহাবুব। তাঁর এই উদ্যোগ শুধু ব্যক্তিগত সাফল্যের গল্প নয়; লবণাক্ত উপকূলে সীমিত জমির সর্বোচ্চ ব্যবহার, বাড়তি আয় এবং স্থানীয় কর্মসংস্থানেরও একটি কার্যকর উদাহরণ।
উপকূলের কৃষিতে যেখানে লবণাক্ততা দীর্ঘদিন ধরে বড় বাধা, সেখানে একটি মৎস্যঘেরের ভেড়িতে মিষ্টি কুমড়া ও অফসিজন তরমুজের বাম্পার ফলন যেন নতুন বার্তাই দিচ্ছে—পরিকল্পনা, পরিশ্রম ও আধুনিক কৃষি প্রযুক্তির সমন্বয় ঘটাতে পারলে প্রতিকূল পরিবেশেও কৃষিতে সাফল্যের পথ তৈরি করা সম্ভব।