ঘূর্ণিঝড়-জলোচ্ছ্বাসে প্রাণ বাঁচাবে উঁচু মাটির প্ল্যাটফর্ম, পাশে মিঠাপানির পুকুর; পরিবেশবিদদের দাবি আরও ৩৫টি টিলা নির্মাণের
দক্ষিণ পশ্চিম অঞ্চলের সর্ববৃহৎ বনাঞ্চল মৎস ভান্ডার নামে খ্যাত বিশ্ব ঐতিহ্য সুন্দরবনে ঘূর্ণিঝড়ের তাণ্ডব, জলোচ্ছ্বাসের উত্তাল ঢেউ কিংবা অস্বাভাবিক জোয়ারে যখন সুন্দরবনের বিস্তীর্ণ এলাকা পানির নিচে তলিয়ে যায়, তখন বিপাকে পড়ে বনের অসংখ্য বন্যপ্রাণী। নিরাপদ আশ্রয়ের অভাবে হরিণ, বন্য শূকরসহ নানা প্রাণী ভেসে যায় কিংবা মৃত্যুর মুখে পড়ে। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে এমন দুর্যোগের মাত্রা ও ঘনত্ব বাড়তে থাকায় এবার বন্যপ্রাণীদের নিরাপত্তায় নতুন উদ্যোগ নিয়েছে বন বিভাগ। সুন্দরবনের বিভিন্ন এলাকায় নির্মাণ করা হয়েছে ২০টি উঁচু টিলা, যা দুর্যোগকালে প্রাণীদের নিরাপদ আশ্রয়স্থল হিসেবে কাজ করবে। টিলাগুলোর পাশেই খনন করা হয়েছে মিঠাপানির পুকুর, যেখানে বর্ষার পানি সংরক্ষিত থাকবে এবং শুষ্ক মৌসুমে প্রাণীদের পানির চাহিদা পূরণ করবে।
তবে পরিবেশবাদীদের মতে, বিশ্বের বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বন সুন্দরবনের বিস্তৃত এলাকার তুলনায় ২০টি টিলা যথেষ্ট নয়। বনের গুরুত্বপূর্ণ এলাকাগুলোতে আরও আশ্রয়স্থল নির্মাণ এবং বন সংরক্ষণ আইন কঠোরভাবে বাস্তবায়নের দাবি জানিয়েছেন তারা।
৩৫ কোটি টাকার প্রকল্পে নির্মাণ
খুলনা বন বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের অনুমোদনের পর ২০২২ সালের এপ্রিলে ৩৫ কোটি ৯০ লাখ ৮০ হাজার টাকা ব্যয়ে ‘সুন্দরবন বাঘ সংরক্ষণ প্রকল্প’ শুরু হয়। প্রকল্পটির দুটি প্রধান অংশ ছিল বাঘ জরিপ এবং বাঘ সংরক্ষণ কার্যক্রম।
২০২৫ সালের মার্চে প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হওয়ার কথা থাকলেও কাজ অসম্পূর্ণ থাকায় আরও এক বছর সময় বাড়ানো হয়। চলতি বছরের মার্চে প্রকল্পের কার্যক্রম শেষ হয়। সরকারের নিজস্ব অর্থায়নে বাস্তবায়িত এই প্রকল্পের আওতায় সুন্দরবনের বিভিন্ন পয়েন্টে ২০টি টিলা নির্মাণ করা হয়েছে।
প্রথম দুই বছরে ১২টি এবং শেষ পর্যায়ে আরও ৮টি টিলা নির্মিত হয়। এর মধ্যে দুটি টিলা সুন্দরবন পশ্চিম বিভাগের আওতায় রয়েছে।
টিলার পাশে মিঠাপানির আধার
বন বিভাগ জানায়, প্রতিটি টিলা প্রায় ৫০ মিটার দীর্ঘ এবং তিন মিটার উঁচু। টিলা নির্মাণে ব্যবহার করা হয়েছে পাশের পুকুর খনন থেকে উত্তোলিত মাটি। ফলে একই সঙ্গে তৈরি হয়েছে আশ্রয়স্থল এবং মিঠাপানির জলাধার।
বর্ষাকালে এসব পুকুরে বৃষ্টির পানি জমা থাকবে। শুষ্ক মৌসুমে যখন সুন্দরবনের বিভিন্ন এলাকায় লবণাক্ততার মাত্রা বেড়ে যায়, তখন এই সংরক্ষিত পানি প্রাণীদের জন্য সুপেয় পানির উৎস হিসেবে কাজ করবে। জলোচ্ছ্বাসের লবণাক্ত পানি যাতে সহজে প্রবেশ করতে না পারে, সেজন্য পুকুরগুলোর চারপাশে উঁচু বাঁধও তৈরি করা হয়েছে।
কোথায় কোথায় নির্মাণ হয়েছে
চাঁদপাই, শরণখোলা, খুলনা ও সাতক্ষীরা রেঞ্জে তিনটি করে মোট ১২টি টিলা নির্মাণ করা হয়েছে। এছাড়া কয়রার নীলকমল অভয়ারণ্য কেন্দ্র, খুলনা রেঞ্জের পাটকোস্ট ও ভোমরণালী, সাতক্ষীরা রেঞ্জের পুষ্পাকাটি, মান্দারবাড়িয়া ও নোটাবেকী এবং চাঁদপাই-শরণখোলা রেঞ্জের কটকা, কচিখালী, কোকিলমুনি, সুপতি, টিয়ারচর ও দুধমুদিতে নির্মাণ করা হয়েছে বাকি টিলাগুলো।
রেমালে মিলেছে কার্যকারিতার প্রমাণ
বন কর্মকর্তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, বঙ্গোপসাগরে সৃষ্ট নিম্নচাপ, পূর্ণিমার জোয়ার ও ঘূর্ণিঝড়ের প্রভাবে সুন্দরবনের অনেক এলাকা পানিতে তলিয়ে যায়। কোথাও কোথাও তিন ফুট পর্যন্ত পানি জমে থাকে।
গত বছরের ঘূর্ণিঝড় রেমালের সময় সুন্দরবনের বিভিন্ন এলাকায় পানি বেড়ে গেলে নীলকমল এলাকার টিলায় আশ্রয় নিতে দেখা যায় অসংখ্য হরিণ ও বন্য শূকরকে। বন কর্মকর্তাদের মতে, এটি প্রমাণ করেছে যে উঁচু টিলাগুলো দুর্যোগের সময় বন্যপ্রাণীদের জন্য কার্যকর আশ্রয়স্থল হিসেবে কাজ করতে পারে।
প্রতিবছর ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসে সুন্দরবনের বহু প্রাণী মারা যায়। বিশেষ করে শাবক ও অপেক্ষাকৃত দুর্বল প্রাণীগুলো সবচেয়ে বেশি ক্ষতির মুখে পড়ে। তাই এই টিলাগুলোকে বন্যপ্রাণী সংরক্ষণের নতুন আশা হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা।
আরও টিলার দাবি পরিবেশবিদদের
বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা) খুলনা শাখার সমন্বয়কারী অ্যাডভোকেট বাবুল হাওলাদার বলেন, “টিলা ও মিঠাপানির আধার নির্মাণ নিঃসন্দেহে ইতিবাচক উদ্যোগ। তবে এগুলোকে লবণাক্ত পানির অনুপ্রবেশ থেকে রক্ষা করতে হবে। না হলে সংরক্ষিত মিঠাপানির উৎস অকার্যকর হয়ে পড়বে।”
তিনি বলেন, “টিলাগুলোর আশপাশে মানুষের যাতায়াত ও শব্দদূষণ নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। কারণ অতিরিক্ত মানবিক উপস্থিতি বন্যপ্রাণীর স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ও প্রজননে বিরূপ প্রভাব ফেলে।”
তার মতে, সুন্দরবনের মতো বিশাল বনে মাত্র ২০টি টিলা যথেষ্ট নয়। গুরুত্বপূর্ণ এলাকাগুলোতে আরও অন্তত ৩৫টি টিলা নির্মাণ করা প্রয়োজন, যাতে দুর্যোগের সময় অধিকাংশ প্রাণী নিরাপদ আশ্রয় পেতে পারে।
বন বিভাগের আশাবাদ
সুন্দরবন পশ্চিম বন বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা ও বাঘ সংরক্ষণ প্রকল্পের পরিচালক এ জেড এম হাছানুর রহমান বলেন, “প্রাকৃতিক দুর্যোগের বিষয়টি বিবেচনায় নিয়েই টিলাগুলো নির্মাণ করা হয়েছে। বনে পানি বৃদ্ধি পেলে বন্যপ্রাণীরা এসব উঁচু স্থানে আশ্রয় নিতে পারবে। আমরা নিয়মিতভাবে টিলাগুলোর রক্ষণাবেক্ষণ করছি এবং কোথাও সমস্যা দেখা দিলে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।”
তিনি বলেন, “বাঘ সংরক্ষণ প্রকল্পের কাজ সফলভাবে সম্পন্ন হয়েছে। বনে হরিণের সংখ্যাও বৃদ্ধি পেয়েছে। ভবিষ্যতেও বন্যপ্রাণী সংরক্ষণে এ ধরনের কার্যক্রম অব্যাহত থাকবে।”
প্রকৃতির জন্য নতুন আশার আলো
জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে উপকূলীয় অঞ্চলে দুর্যোগের ঝুঁকি বাড়ছে। এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্যের ওপর। এমন পরিস্থিতিতে বনের প্রাণীদের জন্য উঁচু টিলা ও মিঠাপানির আধার নির্মাণ শুধু একটি উন্নয়ন প্রকল্প নয়, বরং জলবায়ু অভিযোজনের বাস্তব উদাহরণ।
তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, এই উদ্যোগের প্রকৃত সাফল্য নির্ভর করবে টি