শনিবার ● ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ● ১১ আশ্বিন ১৪৩৩
 
শিরোনাম:


আউলিয়ার ঘাট নৌ-ট্র্যাজেডির চার বছর আজ
স্বজন হারানোর ক্ষত এখনো অমলিন, সেতুর অপেক্ষায় ৫০ হাজার মানুষ
প্রকাশ: শুক্রবার, ২৫ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ১০:১৪ পিএম  (ভিজিট : ১১)
পঞ্চগড়ের বোদা উপজেলার করতোয়া নদীতে ভয়াল আউলিয়ার ঘাট নৌ-ট্র্যাজেডির চার বছর পূর্তি আজ। ২০২২ সালের ২৫ সেপ্টেম্বর মহালয়ার দিনে ঘটে যাওয়া দেশের অন্যতম মর্মান্তিক নৌদুর্ঘটনায় নারী, পুরুষ ও শিশুসহ ৭২ জনের প্রাণহানি ঘটে। চার বছর পরও নিখোঁজ রয়েছেন একজন। স্বজন হারানোর বেদনা আজও বয়ে বেড়াচ্ছেন ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের সদস্যরা। অন্যদিকে দুর্ঘটনার পর শুরু হওয়া দুটি সেতুর নির্মাণকাজ এখনো শেষ না হওয়ায় পাঁচ ইউনিয়নের প্রায় ৫০ হাজার মানুষকে প্রতিদিন জীবনের ঝুঁকি নিয়ে নৌকায় করতোয়া নদী পারাপার করতে হচ্ছে।

২০২২ সালের ২৫ সেপ্টেম্বর দুপুরে মহালয়া উপলক্ষে বদেশ্বরী মন্দিরে যাওয়ার পথে শতাধিক যাত্রী নিয়ে একটি নৌকা আউলিয়ার ঘাট থেকে করতোয়া নদী পার হচ্ছিল। নদীর মাঝপথে নৌকাটি দুলতে শুরু করলে তীরে থাকা স্বেচ্ছাসেবকেরা সতর্কবার্তা দেন। নৌকা ঘোরানোর চেষ্টা করতে গিয়ে সেটি ডুবে যায়। মুহূর্তেই নদীতে তলিয়ে যান শতাধিক যাত্রী। স্থানীয় বাসিন্দা ও অন্যান্য নৌকার মাঝিরা উদ্ধারকাজে অংশ নিলেও শেষ রক্ষা হয়নি। ওই ঘটনায় ৭২ জনের মৃত্যু হয়। উদ্ধার করা হয় ৭১ জনের মরদেহ। নিখোঁজ রয়েছেন বোদা উপজেলার সাকোয়া ইউনিয়নের সরেন্দ্রনাথ বর্মণ (৬৩)।

চার বছর পেরিয়ে গেলেও সেই দুর্ঘটনার শোক কাটিয়ে উঠতে পারেননি স্বজনরা। নৌকাডুবিতে স্বামীকে হারিয়েছেন আদুরী রানী। দুই সন্তান ও শাশুড়িকে নিয়ে সংগ্রামের জীবন তাঁর। অন্যের জমিতে কাজ করে কোনোরকমে সংসার চালান তিনি। আদুরী রানী বলেন, সন্তানরা যখন বাবাকে খোঁজে, তখন কী বলব বুঝে উঠতে পারি না। সংসারে একজন পুরুষ মানুষ না থাকার কষ্ট প্রতিদিন অনুভব করি। শুরুতে কিছু সহযোগিতা পেয়েছিলাম, কিন্তু এখন কেউ খোঁজ নেয় না।
একই দুর্ঘটনায় বাবা, বোন ও দুলাভাইসহ পরিবারের ছয় সদস্যকে হারিয়েছেন সাকোয়া ইউনিয়নের স্বপন কুমার রায়। তিনি বলেন, সবচেয়ে বড় কষ্ট হলো বাবার মরদেহটাও পাইনি। চার বছর পরও তাঁর কোনো খোঁজ নেই। নাতি-নাতনিরা এখনো দাদুকে খোঁজে।

জেলার ইতিহাসে সবচেয়ে ভয়াবহ এই নৌ-ট্র্যাজেডির পর করতোয়া নদীর ওপর স্থায়ী সেতু নির্মাণের দাবি জোরালো হয়ে ওঠে। ২০২৪ সালে পৃথক দুটি সেতুর নির্মাণকাজ শুরু হয়। বর্তমানে কাজ দৃশ্যমান হলেও স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রত্যাশার তুলনায় অগ্রগতি ধীর। ফলে দুর্ভোগ কমার বদলে দীর্ঘায়িত হচ্ছে। নদী পারাপারকারী আইনুল ইসলাম বলেন, এত বড় দুর্ঘটনার পরও মানুষকে এখনো নৌকায় চলাচল করতে হচ্ছে। দ্রুত সেতুর কাজ শেষ হলে আমাদের দুর্ভোগ কমবে।

স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি) সূত্রে জানা গেছে, প্রায় ১১৬ কোটি টাকা ব্যয়ে আউলিয়ারঘাট-কালিয়াগঞ্জ রুটে ৩৪৫ মিটার এবং মাড়েয়া-বড়শশী রুটে ৫৪৫ মিটার দীর্ঘ দুটি সেতু নির্মাণ করা হচ্ছে। প্রকল্পের প্রায় ৭৭ শতাংশ কাজ শেষ হয়েছে। তবে সংযোগ সড়কের জন্য জমি অধিগ্রহণসংক্রান্ত জটিলতার কারণে কিছু অংশের কাজ ধীরগতিতে এগোচ্ছে।

পঞ্চগড় এলজিইডির সিনিয়র সহকারী প্রকৌশলী মনোজ কুমার আচার্য্য বলেন, জমি সংক্রান্ত কিছু জটিলতা রয়েছে। তবে সেগুলো সমাধানের চেষ্টা চলছে। মাড়েয়া-কালিয়াগঞ্জ সেতুর কাজ প্রায় শেষ পর্যায়ে। আমরা দ্রুত দুটি সেতুই যান চলাচলের উপযোগী করার চেষ্টা করছি।

সম্প্রতি নির্মাণাধীন সেতুর কাজ পরিদর্শন করেন পানি সম্পদ প্রতিমন্ত্রী ফরহাদ হোসেন আজাদ। তিনি প্রকল্প বাস্তবায়নে কোনো ধরনের অনিয়ম বরদাশত করা হবে না বলে সংশ্লিষ্টদের সতর্ক করেন।

এলজিইডির পরিকল্পনা অনুযায়ী সবকিছু ঠিক থাকলে ২০২৭ সালের ৩০ জুনের মধ্যে সেতু দুটি যান চলাচলের জন্য উন্মুক্ত করা হবে। তবে চার বছর আগে করতোয়া নদীর বুকে ঘটে যাওয়া সেই মর্মান্তিক ট্র্যাজেডির স্মৃতি আজও তাড়া করে ফেরে পঞ্চগড়বাসীকে। স্বজন হারানোর বেদনার পাশাপাশি এখন তাদের একটাই প্রত্যাশা—দ্রুত শেষ হোক সেতুর কাজ, নিরাপদ হোক করতোয়া নদী পারাপার।








আরও খবর


Loading...
Loading...
প্রকাশক: এম এন এইচ বুলু
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : মাহফুজুর রহমান রিমন  |   উপদেষ্টা সম্পাদক : রাজু আলীম  
বিএনএস সংবাদ প্রতিদিন লি. এর পক্ষে প্রকাশক এম এন এইচ বুলু কর্তৃক ৪০ কামাল আতাতুর্ক এভিনিউ, বুলু ওশেন টাওয়ার, (২১ তলা), বনানী, ঢাকা ১২১৩ থেকে প্রকাশিত ও শরীয়তপুর প্রিন্টিং প্রেস, ২৩৪ ফকিরাপুল, ঢাকা থেকে মুদ্রিত।
ফোন:০২৯৮২০০১৯-২০ ফ্যাক্স: ০২-৯৮২০০১৬ ই-মেইল: [email protected]