বাংলাদেশে নারী ও শিশু নির্যাতন, ধর্ষণ, হত্যা, শিশু নিখোঁজ এবং কিশোর গ্যাংয়ের সহিংসতা উদ্বেগজনকভাবে সংবাদমাধ্যমে উঠে আসছে। প্রতিটি ঘটনার পর আমরা সাধারণত সরকার ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে দায়ী করি। রাষ্ট্রের দায় অবশ্যই সবচেয়ে বেশি—আইন প্রয়োগ, দ্রুত তদন্ত, অপরাধীকে গ্রেপ্তার, ন্যায়বিচার, চিকিৎসা, আশ্রয় ও পুনর্বাসন নিশ্চিত করা সরকারের মৌলিক দায়িত্ব।
তবে এটিও বাস্তব যে প্রতিটি বাড়ির বন্ধ দরজার ভেতরে কী ঘটছে, কোন শিশু কার সঙ্গে মিশছে, কার আচরণ হঠাৎ বদলে যাচ্ছে কিংবা কোন নারী নিয়মিত নির্যাতনের শিকার হচ্ছেন—এসব তথ্য প্রশাসনের পক্ষে আগে থেকেই জানা সম্ভব নয়। প্রথম সতর্কসংকেত সাধারণত দেখতে পান পরিবারের সদস্য, প্রতিবেশী, বন্ধু, শিক্ষক কিংবা স্থানীয় কোনো দায়িত্বশীল ব্যক্তি।
সুতরাং প্রশ্নটি শুধু “সরকার কী করছে?” নয়; প্রশ্নটি হওয়া উচিত—“পরিবার, স্কুল, প্রতিবেশী এবং স্থানীয় প্রতিষ্ঠান হিসেবে আমরা কী দেখছি এবং কী করছি?”
সমস্যার ব্যাপকতা
শুধু সংবাদ প্রকাশের সংখ্যা দেখে অপরাধের প্রকৃত হার বেড়েছে কি না নিশ্চিত হওয়া যায় না; এর জন্য কয়েক বছরের পুলিশ, হাসপাতাল ও আদালতের সমন্বিত তথ্য প্রয়োজন। তবে পরিস্থিতির ভয়াবহতা অস্বীকার করার সুযোগ নেই।
ইউনিসেফ (UNICEF) এর ২০১৯ সালের মাল্টিপল ইন্ডিকেটর ক্লাস্টার সার্ভে (Multiple Indicator Cluster Survey) অনুযায়ী, বাংলাদেশে ১–১৪ বছর বয়সী প্রায় ১০ শিশুর মধ্যে ৯ জন নিজ ঘরে কোনো না কোনো শারীরিক শাস্তি বা মানসিক আগ্রাসনের শিকার হয়েছে।
আরও উদ্বেগজনকভাবে, পুলিশ সদর দপ্তরের ২০২৬ সালের ২১ সেপ্টেম্বর প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে—জানুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত ১৫,৭১৭ শিশুর নিখোঁজ হওয়ার তথ্য পাওয়া যায়; এর মধ্যে ১৩,৬৭৯ জন উদ্ধার হলেও ২,০৩৮ জন তখনো নিখোঁজ ছিল। একই প্রতিবেদনে আইন ও সালিশ কেন্দ্র জানায়, জানুয়ারি থেকে আগস্টের মধ্যে নিখোঁজ হওয়ার পর ৩৬ শিশুর মরদেহ উদ্ধার এবং বিভিন্ন ঘটনায় ২৫৪ শিশুর মৃত্যুর তথ্য তাদের পর্যবেক্ষণে এসেছে। তবে তথ্য নিয়মিত হালনাগাদ না হওয়ায় সংখ্যায় বিভ্রান্তির আশঙ্কার কথাও পুলিশ জানিয়েছে। এই সীমাবদ্ধতাই একটি সমন্বিত জাতীয় নিখোঁজ শিশু তথ্যব্যবস্থার প্রয়োজনীয়তা প্রমাণ করে।
কিশোর গ্যাং: আইনশৃঙ্খলার পাশাপাশি পরিবার ও সমাজের ব্যর্থতা
কিশোর গ্যাং কেবল পুলিশের সমস্যা নয়। পরিবারের নজরদারির অভাব, সন্তানের সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হওয়া, স্কুল থেকে ঝরে পড়া, মাদক, অনলাইন সহিংসতা, নিষ্ক্রিয় জীবন, রাজনৈতিক বা স্থানীয় “বড় ভাইয়ের” আশ্রয় এবং সুস্থ বিনোদনের অভাব—সবকিছু মিলে কিশোরদের ঝুঁকিপূর্ণ গোষ্ঠীর দিকে ঠেলে দিতে পারে।
একজন সচেতন অভিভাবক হিসেবে আমাদের জানতে হবে:
সন্তান কার সঙ্গে বন্ধুত্ব করছে। স্কুল বা কোচিংয়ের পরে কোথায় যাচ্ছে। তার হাতে হঠাৎ অতিরিক্ত টাকা, দামি ফোন বা নতুন জিনিস আসছে কি না। গভীর রাতে বাইরে থাকা, মিথ্যা বলা, আক্রমণাত্মক আচরণ বা অস্ত্র বহনের প্রবণতা দেখা যাচ্ছে কি না। তার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সহিংস গ্রুপ, হুমকি, মাদক বা অপরাধী চক্রের যোগাযোগ আছে কি না। কোনো প্রভাবশালী “বড় ভাই” তাকে ব্যবহার করছে কি না।
শুধু শাসন ও মোবাইল পরীক্ষা যথেষ্ট নয়। সন্তানকে নিয়মিত সময় দিতে, কথা শুনতে এবং এমন পরিবেশ তৈরি করতে হবে—যেখানে সে ভয় না পেয়ে নিজের সমস্যা, ভুল বা বিপদের কথা বলতে পারে। সন্তানকে না শুনে কেবল অর্থ, মোবাইল ও স্বাধীনতা দিয়ে দায়িত্ব শেষ করলে সেই শূন্যস্থান অনেক সময় অপরাধী চক্র পূরণ করে।
কিশোরদের খেলাধুলা, সাংস্কৃতিক কার্যক্রম, স্বেচ্ছাসেবা, স্কাউটিং এবং দক্ষতা উন্নয়নমূলক কাজে যুক্ত করাও প্রতিরোধের অংশ। সন্দেহ হলেই কোনো কিশোরকে “অপরাধী” আখ্যা দেওয়া নয়; প্রাথমিক পর্যায়ে পরিবার, স্কুল, কাউন্সেলর ও সমাজসেবার মাধ্যমে তাকে ফিরিয়ে আনতে হবে।
প্রতিবেশীকে চেনা নজরদারি নয়—সামাজিক নিরাপত্তা
শহরের একই ভবনে বছরের পর বছর বসবাস করেও অনেকেই জানেন না পাশের ফ্ল্যাটে কারা থাকেন, তাদের সন্তান কারা কিংবা নিয়মিত কারা সেখানে যাতায়াত করে। এই সামাজিক বিচ্ছিন্নতা অপরাধী ও নির্যাতনকারীর জন্য সুযোগ তৈরি করতে পারে।
একটি ভবন বা মহল্লায় বাসিন্দাদের অন্তত এতটুকু পরিচিতি থাকা প্রয়োজন যে তারা অস্বাভাবিক কিছু বুঝতে পারেন। কোনো শিশুর বন্ধু, আত্মীয় বা “ভাই” পরিচয়ে অপরিচিত ব্যক্তি নিয়মিত ফ্ল্যাটে আসছে কি না, স্কুলপড়ুয়া শিশুরা দীর্ঘ সময় অভিভাবক ছাড়া অবস্থান করছে কি না, কিংবা কোনো বাসা থেকে নিয়মিত কান্না, চিৎকার বা সাহায্যের শব্দ আসছে কি না—এসব দায়িত্বশীলভাবে লক্ষ্য করা প্রয়োজন।
প্রতিবেশীর সাথে এই যোগাযোগ এর অর্থ ব্যক্তিগত জীবনে অনধিকার প্রবেশ নয়, বরং আস্থার জায়গা তৈরী করা। লক্ষ্য হবে:
• প্রতিবেশীদের নিয়মিত পরিচিতিমূলক সভা।
• নতুন ভাড়াটিয়া ও গৃহকর্মীর পরিচয় যাচাই।
• দর্শনার্থীর রেকর্ড রাখা।
• শিশুদের বিশ্বস্ত প্রতিবেশী চেনানো।
• জরুরি অবস্থায় যোগাযোগের ব্যবস্থা।
• সন্দেহজনক ঘটনায় গুজব না ছড়িয়ে অভিভাবক বা কর্তৃপক্ষকে জানানো।
সমাজ ব্যবস্থায় CPTED-এর বাস্তব প্রয়োগ
পুলিশ সাইন্সের একটি বিষয় হল Crime Prevention Through Environmental Design (CPTED)। যার উদ্দেশ্য হলো পরিবেশকে এমনভাবে সাজানো, যাতে অপরাধের সুযোগ কমে এবং সাহায্য দ্রুত পৌঁছাতে পারে।
বাংলাদেশের সকল আবাসিক, বানিজ্যিক ভবন, স্কুল, হাসপাতাল, মার্কেট ও মহল্লায় এর প্রয়োগ হতে পারে:
• গেট, সিঁড়ি, ছাদ, পার্কিং ও নির্জন স্থানে পর্যাপ্ত আলোর ব্যবস্থা করা।
• যেকোন ভবনে প্রবেশ নিয়ন্ত্রিত ও দর্শনার্থীর পরিচয় সংরক্ষণ করা।
• অরক্ষিত ও পরিত্যক্ত স্থান দ্রুত সংস্কার করা।
• স্কুলে নিরাপদ শিশু হস্তান্তর ব্যবস্থা।
• সকল ভবন এবং প্রতিশঠানে প্রশিক্ষিত নিরাপত্তাকর্মী ও কেয়ারটেকার নিয়োগ।
• জরুরি নম্বর দৃশ্যমান স্থানে রাখা।
• ব্যক্তিগত গোপনীয়তা রক্ষা করে গুরুত্বপূর্ণ স্থানে সিসিটিভি (CCTV) স্থাপন করা।
তবে কোনো অবস্থাতেই কোন ব্যক্তি বা কমিটি যেন সন্দেহভাজনকে মারধর, প্রকাশ্যে অপমান বা জোরপূর্বক সালিশ করতে না পারে সেই বিষয় সজাগ থাকতে হবে। মনে রাখতে হবে, নাগরিক অংশগ্রহণ মানে কখনোই নিজের হাতে আইন তুলে নেওয়া নয়।
নিখোঁজ শিশু বা ঝুঁকিতে থাকা নারীর ক্ষেত্রে প্রতিটি মুহূর্ত গুরুত্বপূর্ণ
কোনো শিশু বা ঝুঁকিতে থাকা নারী নিখোঁজ হলে “২৪ ঘণ্টা না গেলে পুলিশ কাজ করবে না”—এমন ধারণা অত্যন্ত বিপজ্জনক। মনে রাখতে হবে, সম্ভাব্য অপহরণ, পাচার, যৌন সহিংসতা বা জীবনহানির ঝুঁকিতে প্রথম কয়েক ঘণ্টাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
সুতরাং অভিযোগ পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে থানা ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের উচিত হবে:
• অভিযোগ বা জিডি গ্রহণ করে তাৎক্ষণিক ঝুঁকি নিরূপণ করা।
• ভিকটিম এর সাম্প্রতিক ছবি, পোশাক, ফোন নম্বর, সম্ভাব্য স্থান ও পরিচিতদের তথ্য সংগ্রহ করা।
• নিকটবর্তী সিসিটিভি ফুটেজ দ্রুত সংরক্ষণ করা।
• মোবাইল ও ডিজিটাল তথ্যের জন্য প্রয়োজনীয় আইনগত প্রক্রিয়া শুরু করা।
• হাসপাতাল, পরিবহনকেন্দ্র, ৯৯৯, ১০৯৮ এবং সংশ্লিষ্ট থানাকে সমন্বিতভাবে সতর্ক করা।
• পরিবারকে নিয়মিত তদন্তের আপডেট জানানো।
• দায়িত্বে অবহেলা হলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাকে জবাবদিহির আওতায় আনা।
একই ভাবে যদি কোন ব্যক্তি কোন শিশু, মহিলা বা কাউকে কোন বিপদ অথবা সন্দেহজনক পরিস্থিতিতে দেখতে পায়, তাহলে তাৎক্ষণিক জরুরীসেবা ৯৯৯, শিশু সহায়তায় টোল-ফ্রি ১০৯৮ এবং নারী ও শিশু নির্যাতন বিষয়ে ১০৯-এ যোগাযোগ করে জানাবে।
স্থানীয় কমিউনিটি নিরাপত্তা কাঠামো
প্রতিটিআবাসিক বা বানিজ্যিক ভবন, পাড়া–মহল্লায় অথবা ওয়ার্ড, ইউনিয়নে স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, পুলিশ, কমিউনিটি পুলিশিং প্রতিনিধি, শিক্ষক, নারী প্রতিনিধি, সমাজকর্মী, অভিভাবক এবং প্রশিক্ষিত নিরাপত্তা প্রতিনিধিকে নিয়ে ছোট একটি কমিউনিটি সেফটি ও চাইল্ড-প্রোটেকশন কমিটি করা যেতে পারে।
কমিটির দায়িত্ব হবে:
• ঝুঁকিপূর্ণ স্থান ও কিশোর গ্যাংয়ের হটস্পট চিহ্নিত করা।
• স্কুলছুট ও ঝুঁকিতে থাকা কিশোরদের সহায়তায় যুক্ত করা।
• যেকণ ভবন বা প্রতিষ্ঠানে পর্যাপ্ত আলো, সিসিটিভি ও প্রবেশ নিয়ন্ত্রণ নিয়মিত পরীক্ষা করা।
• জরুরি যোগাযোগ তালিকা হালনাগাদ রাখা।
• অভিযোগ গ্রহণ ও যথাযথ কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠানোর লিখিত নীতিমালা তৈরি করা।
• প্রতি মাসে ঘটনা, ব্যবস্থা গ্রহন ও সমাধানের সময় ও অসমাপ্ত অভিযোগ পর্যালোচনা করা।
• পুলিশ, হাসপাতাল ও সমাজসেবা বিভাগের সঙ্গে নিয়মিত সমন্বয় করা।
এই দায়িত্ব শুধু স্বেচ্ছাসেবী উদ্যোগে সীমাবদ্ধ না রেখে সিটি করপোরেশন, পৌরসভা ও ইউনিয়ন পর্যায়ে নীতিমালা, নির্ধারিত দায়িত্ব, রিপোর্টিং ব্যবস্থা এবং জবাবদিহির আওতায় আনা প্রয়োজন।
পরিবার ও স্কুলের জরুরি করণীয়
পরিবারকে শিশুর কথা বিশ্বাস ও মনোযোগ দিয়ে শুনতে হবে। শিশুকে শরীরের নিরাপত্তা, অনিরাপদ স্পর্শ, অনলাইন ব্ল্যাকমেইল এবং অন্তত তিনজন বিশ্বস্ত প্রাপ্তবয়স্ক চিহ্নিত করতে শেখাতে হবে।
সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে নিজ উদ্দ্যোগে সচেতনাতামূলক প্রচারের ব্যবস্থা নিতে হবে। এই লক্ষ্যে প্রতিটি স্কুলে থাকতে হবে:
• লিখিত শিশু সুরক্ষা নীতিমালা।
• শিশু সুরক্ষা বিষয়ক প্রশিক্ষিত ব্যক্তি।
• গোপনীয়ভাবে অভিযোগ প্রদানের ব্যবস্থা।
• শিক্ষক-কর্মচারীর পরিচয় যাচাই।
• শারীরিক শাস্তির বিরুদ্ধে শূন্য সহনশীলতা নীতিমালা।
• স্কুল পরিবহন ও ছুটির সময় নিরাপত্তা নিশ্চিত করন।
• অনুপস্থিতি ও আচরণের পরিবর্তন পর্যবেক্ষণ এবং অবিভাবকের সাথে পর্যালোচনা করা।
শিশু নির্যাতনের কথা জানালে তাকে বারবার জেরা করা যাবে না। বলতে হবে,“আমি তোমার কথা বিশ্বাস করছি। এটি তোমার দোষ নয়। তোমাকে নিরাপদ রাখা আমাদের দায়িত্ব।”
শেষ কথা
নিরাপত্তা শুধু পুলিশের দায়িত্ব নয়; আবার নাগরিকের দায়িত্বের কথা বলে রাষ্ট্রের ব্যর্থতাও আড়াল করা যাবে না। রাষ্ট্রকে দ্রুত সাড়া, তদন্ত, বিচার ও পুনর্বাসন নিশ্চিত করতে হবে। পরিবারকে সন্তানকে সময় দিতে হবে, স্কুলকে সুরক্ষা নীতি বাস্তবায়ন করতে হবে এবং প্রতিবেশীদের সামাজিক বিচ্ছিন্নতা ভেঙে দায়িত্বশীল সম্পর্ক গড়ে তুলতে হবে।
আমাদের লক্ষ্য পাড়া-মহল্লা ভিত্তিক পুলিশিং নয়, বরং পাড়া-মহল্লা ভিত্তিক সুরক্ষা নিশ্চিত করা; গোপন নজরদারি নয়, সকলের দায়িত্বশীল পরিচিতি; কিশোরকে অপরাধী বানানো নয়, যেকোন বিপদের আগেই তাকে ফিরিয়ে আনা; এবং ঘটনার পর প্রতিক্রিয়া নয়, ঘটনার আগেই ঝুঁকি কমানো।
কারণ একটি শিশু বা অসহায় নারী নিখোঁজ কিংবা বিপদের মধ্যে থাকলে প্রতিটি ঘণ্টা নয়—প্রতিটি মুহূর্তই গুরুত্বপূর্ণ।
লেখক: মেজর (অবঃ) মোঃ আশেক কামাল