বৃহস্পতিবার ৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ১৯ ভাদ্র ১৪৩৩
 
শিরোনাম:


প্রকৃতিকে উপেক্ষার মূল্য
প্রকাশ: বৃহস্পতিবার, ৩ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ১২:৩০ এএম  (ভিজিট : ১৪)
বাংলাদেশকে প্রকৃতির অপার আশীর্বাদে সমৃদ্ধ একটি দেশ বলা হয়। নদী, জলাভূমি, বনভূমি ও উর্বর কৃষিজমি এ দেশের জীবন ও জীবিকার অবিচ্ছেদ্য অংশ। কিন্তু সেই প্রকৃতিই আজ নানা সংকটে বিপন্ন। বায়ুদূষণ, নদীদূষণ, জলাভূমি দখল, প্লাস্টিক বর্জ্য, নির্বিচারে বৃক্ষনিধন, অপরিকল্পিত নগরায়ণ, শিল্পবর্জ্য এবং জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত আমাদের পরিবেশকে ক্রমেই অসহনীয় করে তুলছে। প্রশ্ন এখন আর বাংলাদেশ পরিবেশগত সংকটে আছে কি না তা নয়; প্রশ্ন হলো, আমরা আর কতদিন এই সংকটকে উপেক্ষা করব?

ঢাকার চিত্র এই সংকটের সবচেয়ে স্পষ্ট প্রতিচ্ছবি। জনসংখ্যা ও অবকাঠামো বাড়ছে, কিন্তু গাছপালা, খোলা জায়গা, খাল ও জলাভূমি ক্রমেই কমছে। যানবাহনের ধোঁয়া, নির্মাণকাজের ধুলা ও শিল্পকারখানার দূষণে নগরীর বাতাস অস্বাস্থ্যকর হয়ে উঠছে। অন্যদিকে প্রাকৃতিক পানি নিষ্কাশনব্যবস্থা ধ্বংস হওয়ায় জলাবদ্ধতা নিয়মিত দুর্ভোগে পরিণত হয়েছে। সবুজ এলাকা কমে যাওয়ায় বাড়ছে নগর তাপমাত্রাও। অর্থাৎ শহরকে আধুনিক করতে গিয়ে আমরা তার স্বাভাবিক শ্বাস নেওয়ার ব্যবস্থাটিই সংকুচিত করছি।

নদীগুলোর অবস্থা আরও বেদনাদায়ক। বুড়িগঙ্গা, তুরাগ, বালু ও শীতলক্ষ্যা ঢাকার জন্য বিশাল প্রাকৃতিক সম্পদ হতে পারত। অথচ অপরিশোধিত শিল্পবর্জ্য, পয়োনিষ্কাশনের বর্জ্য ও কঠিন আবর্জনায় এসব নদীর অনেক অংশ বিপন্ন। বছরের পর বছর কমিটি হয়েছে, প্রকল্প নেওয়া হয়েছে, অভিযান হয়েছে, আদালতের নির্দেশও এসেছে। তবু দূষণ পুরোপুরি বন্ধ হয়নি। কারণ সমস্যাটি আইন না থাকার চেয়ে বেশি—সমস্যা আইন প্রয়োগের দুর্বলতায়। আমরা কী হচ্ছে তা জানি, অনেক ক্ষেত্রে কারা দায়ী তাও জানি; কিন্তু ধারাবাহিক নজরদারি ও কঠোর প্রয়োগের ঘাটতিই পরিস্থিতিকে জটিল করে রেখেছে।
পরিবেশ রক্ষায় বাংলাদেশের আইন ও নীতিমালা কম নয়। কিন্তু কোনো আইন তখনই কার্যকর, যখন তার বাস্তব প্রয়োগ নিশ্চিত হয়। কোনো কারখানা যদি অপরিশোধিত বর্জ্য নদীতে ফেলে, কোনো প্রতিষ্ঠান যদি জলাভূমি ভরাট করে কিংবা অতিরিক্ত ধোঁয়া ছড়ানো যানবাহন যদি নিয়মিত সড়কে চলতে থাকে, তাহলে শুধু অভিযান বা সামান্য জরিমানা দিয়ে সমস্যার সমাধান হবে না। পরিবেশ রক্ষা হতে হবে প্রতিদিনের সুশাসনের অংশ। প্রয়োজন নিয়মিত পরিদর্শন, কার্যকর শাস্তি, স্বচ্ছতা এবং জবাবদিহি।

প্লাস্টিক দূষণও ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। বাজারের ব্যাগ, খাবারের প্যাকেট, বোতলসহ একবার ব্যবহারযোগ্য নানা পণ্য প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ বর্জ্য তৈরি করছে। এর বড় অংশ ড্রেন, খাল, নদী ও জলাভূমিতে গিয়ে পড়ছে। প্লাস্টিক সহজে বিলীন হয় না; ক্ষুদ্র কণায় ভেঙে মাইক্রোপ্লাস্টিকে পরিণত হয়ে জলজ পরিবেশ ও খাদ্যশৃঙ্খলে প্রবেশ করতে পারে। তাই শুধু নাগরিককে প্লাস্টিক না ফেলার আহ্বান জানালেই হবে না। উৎপাদকদেরও তাদের তৈরি বর্জ্যের ব্যবস্থাপনায় দায়িত্ব নিতে হবে এবং বর্জ্য সংগ্রহ ও পুনর্ব্যবস্থাপনার অবকাঠামো শক্তিশালী করতে হবে।

জলাভূমিকে আমাদের উন্নয়নের পথে বাধা হিসেবে দেখার মানসিকতাও বদলাতে হবে। হাওর, বিল, খাল ও বন্যাপ্রবাহ এলাকা কোনো ফাঁকা জমি নয়। এগুলো প্রকৃতির তৈরি গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো যা বন্যা ও জলাবদ্ধতার ঝুঁকি কমায়, ভূগর্ভস্থ পানির পুনর্ভরণে সহায়তা করে, মাছের আবাসস্থল তৈরি করে এবং কৃষিকে টিকিয়ে রাখে। একটি জলাভূমি ভরাট করে কেউ হয়তো স্বল্পমেয়াদে লাভবান হতে পারে, কিন্তু তার দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতি বহন করতে হয় পুরো সমাজকে। তাই জলাভূমি রক্ষায় সঠিক মানচিত্র, কঠোর জোনিং, স্বচ্ছ ভূমি রেকর্ড এবং দখলদারদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা জরুরি।
এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে জলবায়ু পরিবর্তনের চাপ। ঘূর্ণিঝড়, বন্যা ও জলোচ্ছ্বাসের পাশাপাশি তীব্র গরম, অনিয়মিত বৃষ্টিপাত ও দীর্ঘস্থায়ী জলাবদ্ধতা নতুন ঝুঁকি তৈরি করছে। কৃষক, নির্মাণশ্রমিক, রিকশাচালক, দিনমজুর, শিশু ও প্রবীণরা অতিরিক্ত তাপের কারণে বেশি ঝুঁকিতে পড়ছেন। জলবায়ু পরিবর্তন তাই শুধু দুর্যোগ ব্যবস্থাপনার বিষয় নয়; এটি জনস্বাস্থ্য, কৃষি, নগর পরিকল্পনা, পানি ব্যবস্থাপনা ও অর্থনীতির সঙ্গেও সরাসরি যুক্ত। ভবিষ্যৎ পরিকল্পনায় এই বাস্তবতাকে গুরুত্ব না দিলে উন্নয়নের সুফলও টেকসই হবে না।

পরিবেশ রক্ষায় সরকারের দায়িত্ব সবচেয়ে বেশি। কিন্তু নাগরিক দায়িত্বও অস্বীকার করার সুযোগ নেই। আমরা ড্রেনে প্লাস্টিক ফেলি, খালে বর্জ্য ফেলি, গাছ কাটায় নীরব থাকি, আবার জলাবদ্ধতা ও গরমের জন্য প্রশাসনকে দায়ী করি। এই দ্বৈত মানসিকতা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। তবে নাগরিক সচেতনতা কখনোই রাষ্ট্রীয় দায়িত্বের বিকল্প নয়। স্থানীয় সরকারকে বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় সক্ষম করতে হবে, শিল্পকারখানায় বর্জ্য পরিশোধন নিশ্চিত করতে হবে, পরিবেশগত ছাড়পত্রের প্রক্রিয়া স্বচ্ছ করতে হবে এবং নদী-খাল-জলাভূমি রক্ষায় রাজনৈতিক প্রভাবের ঊর্ধ্বে থেকে আইন প্রয়োগ করতে হবে।

উন্নয়নকে দেখার দৃষ্টিভঙ্গিতেও পরিবর্তন দরকার। একটি সড়ক, সেতু, ভবন বা বাণিজ্যিক প্রকল্প তৈরি হলেই সেটিকে উন্নয়ন বলা যায় না। যদি সেই প্রকল্পের জন্য খাল ধ্বংস হয়, জলাভূমি ভরাট হয়, গাছ কাটা পড়ে কিংবা দূষণ বাড়ে, তাহলে তার প্রকৃত সামাজিক মূল্য অনেক বেশি। প্রকৃত উন্নয়ন কখনোই প্রকৃতিকে কংক্রিট দিয়ে প্রতিস্থাপন করার নাম হতে পারে না। আধুনিক শহর হলো সেই শহর, যেখানে উন্নয়নের পাশাপাশি নির্মল বাতাস, নিরাপদ পানি, সবুজ এলাকা এবং কার্যকর পানি নিষ্কাশনব্যবস্থাও নিশ্চিত থাকে।

বিশেষ করে ঢাকার জন্য প্রয়োজন সমন্বিত পরিবেশবান্ধব নগর পরিকল্পনা। নদী, খাল, জলাভূমি, গাছপালা ও খোলা জায়গাকে নগর অবকাঠামোর অপরিহার্য অংশ হিসেবে বিবেচনা করতে হবে। ভরাট হওয়া খাল পুনরুদ্ধার করতে হবে, বৃক্ষনিধন কমাতে হবে এবং প্রতিটি উন্নয়ন প্রকল্পের শুরুতেই পরিবেশগত প্রভাব বিবেচনা করতে হবে। বুড়িগঙ্গা, তুরাগ, বালু ও শীতলক্ষ্যাকে শুধু বর্জ্য বহনের পথ হিসেবে না দেখে ভবিষ্যতে নৌপরিবহন, বিনোদন, পরিবেশবান্ধব পর্যটন ও স্থানীয় অর্থনীতির সম্পদ হিসেবে গড়ে তোলার পরিকল্পনা নিতে হবে।

পরিবেশ পুনরুদ্ধারকে অর্থনৈতিক সুযোগেও পরিণত করা সম্ভব। পরিচ্ছন্ন নদী ও জলাশয় মৎস্যসম্পদ, পর্যটন ও নৌপরিবহনের সুযোগ বাড়াতে পারে। পুনর্ব্যবহারযোগ্য বর্জ্য নতুন অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড সৃষ্টি করতে পারে। সৌরবিদ্যুৎ, জ্বালানিসাশ্রয়ী ভবন, উন্নত গণপরিবহন ও জলবায়ু সহনশীল অবকাঠামো একদিকে পরিবেশ রক্ষা করবে, অন্যদিকে কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করবে। বাংলাদেশকে উন্নয়ন ও পরিবেশের মধ্যে একটিকে বেছে নিতে হবে না; আমাদের প্রয়োজন টেকসই উন্নয়নের পথ।

পরিবেশের প্রতি অবহেলা এখন আর কোনো দূরবর্তী সমস্যা নয়। দূষিত বাতাস আমাদের ঘরে ঢুকছে, দূষিত পানি ও খাদ্য আমাদের শরীরে প্রবেশ করছে, জলাবদ্ধতা আমাদের জীবনযাত্রাকে ব্যাহত করছে এবং অতিরিক্ত তাপ আমাদের দৈনন্দিন জীবনকে কঠিন করে তুলছে। তবু এখনো পথ পরিবর্তনের সুযোগ আছে। প্রয়োজন নতুন নতুন ঘোষণা নয়; প্রয়োজন বিদ্যমান আইন ও নীতির কঠোর বাস্তবায়ন, দৃশ্যমান জবাবদিহি এবং প্রকৃতিকে সম্মান করে উন্নয়ন পরিকল্পনা।
একটি নদীকে নদী হিসেবেই বাঁচতে দিতে হবে। একটি জলাভূমিকে জলাভূমি হিসেবেই থাকতে দিতে হবে। একটি গাছকে উন্নয়নের বাধা হিসেবে দেখার মানসিকতা বদলাতে হবে। নির্মল বাতাস ও নিরাপদ পানি কোনো বিলাসিতা নয় এগুলো মানুষের মৌলিক অধিকার।

শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশের পরিবেশ সংকট আমাদের একটি মৌলিক প্রশ্নের সামনে দাঁড় করিয়েছে আমরা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য কেমন বাংলাদেশ রেখে যেতে চাই? অর্থনৈতিক উন্নয়ন তখনই অর্থবহ হবে, যখন তা মানুষের জীবনমান উন্নত করার পাশাপাশি প্রকৃতির ভারসাম্যও রক্ষা করবে। সময় এসেছে বুঝে নেওয়ার পরিবেশ রক্ষা উন্নয়নের প্রতিপক্ষ নয়; বরং টেকসই উন্নয়নের সবচেয়ে শক্তিশালী ভিত্তি।

লেখক: মীর আব্দুল আলীম, সাংবাদিক,কলামিস্ট।








আরও খবর


Loading...
Loading...
প্রকাশক: এম এন এইচ বুলু
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : মাহফুজুর রহমান রিমন  |   উপদেষ্টা সম্পাদক : রাজু আলীম  
বিএনএস সংবাদ প্রতিদিন লি. এর পক্ষে প্রকাশক এম এন এইচ বুলু কর্তৃক ৪০ কামাল আতাতুর্ক এভিনিউ, বুলু ওশেন টাওয়ার, (২১ তলা), বনানী, ঢাকা ১২১৩ থেকে প্রকাশিত ও শরীয়তপুর প্রিন্টিং প্রেস, ২৩৪ ফকিরাপুল, ঢাকা থেকে মুদ্রিত।
ফোন:০২৯৮২০০১৯-২০ ফ্যাক্স: ০২-৯৮২০০১৬ ই-মেইল: [email protected]