একটি জনপদের নাম চনপাড়া অস্থায়ী পুনর্বাসন কেন্দ্র। নামের মধ্যেই যেন লুকিয়ে আছে এক দীর্ঘ পরিহাস। ‘অস্থায়ী’ শব্দটি সাধারণত কয়েক দিন, কয়েক মাস কিংবা বড়জোর কয়েক বছরের অপেক্ষাকে বোঝায়। কিন্তু একটি অস্থায়ী ঠিকানা যখন ৫২ বছর ধরে মানুষের ঠিকানা হয়ে থাকে, যখন সেই ঠিকানায় সন্তান জন্ম নেয়, তার সন্তান জন্ম নেয়, তারপর সেই সন্তানেরও সন্তান জন্ম নেয় তখন প্রশ্ন ওঠে, এটি আর অস্থায়ী থাকে কোথায়? নাকি অস্থায়িত্বই সেখানে স্থায়ী হয়ে যায়?
নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জ উপজেলার কায়েতপাড়া ইউনিয়নের চনপাড়ার মানুষের জীবনকথা আসলে একটি দীর্ঘ অপেক্ষার গল্প। ১৯৭৪ সালে নদীভাঙন, প্রাকৃতিক দুর্যোগ, ভূমিহীনতা এবং নানা কারণে ঘরবাড়ি ও জমি হারানো অসহায় মানুষ এবং মুক্তিযোদ্ধা পরিবারের সদস্যদের পুনর্বাসনের উদ্দেশ্যে এই জনপদের যাত্রা শুরু হয়েছিল। ঢাকার মোহাম্মদপুর, মিরপুরসহ বিভিন্ন এলাকায় ভাসমানভাবে থাকা এবং পাকিস্তানিদের ফেলে যাওয়া সরকারি-বেসরকারি কোয়ার্টারে অস্থায়ী আশ্রয়ে থাকা মানুষদের স্থায়ী পুনর্বাসনের আশ্বাস দিয়ে চনপাড়ায় আনা হয়েছিল বলে প্রবীণ বাসিন্দাদের দাবি। সেই যে এসেছিলেন, আজও তাঁরা সেখানেই। তাঁদের কেউ আর নেই, কিন্তু তাঁদের সন্তান আছে, নাতি আছে, নাতির সন্তানও আছে। বদলে গেছে সময়, বদলে গেছে মানুষ, বদলে গেছে চনপাড়া শুধু বদলায়নি একটি মৌলিক অনিশ্চয়তা: এই মাটির ওপর তাঁদের স্থায়ী অধিকার কোথায়?
বহু সংগ্রামের পর ৪৭ বছর পর চনপাড়ার মানুষ ভোটাধিকার পেয়েছেন। ভোটার হয়েছেন। রাষ্ট্রের নির্বাচনী ব্যবস্থায় তাঁদের নাম উঠেছে। একজন নাগরিক হিসেবে ভোট দেওয়ার অধিকার তাঁরা অর্জন করেছেন দীর্ঘ লড়াইয়ের মধ্য দিয়ে। কিন্তু কী আশ্চর্য রাষ্ট্রীয় বাস্তবতা যে মানুষটি রাষ্ট্রের প্রতিনিধি নির্বাচনের অধিকার রাখেন, নিজের বসতভিটার ওপর তাঁর স্থায়ী অধিকার নেই! তিনি ভোট দিতে পারেন, কিন্তু তাঁর ঘর যে মাটির ওপর দাঁড়িয়ে আছে, সেই মাটির ভবিষ্যৎ নিয়ে তিনি নিশ্চিত নন। গণতন্ত্রের কাছে এর চেয়ে বড় কোনো প্রশ্ন কি হতে পারে?
একজন মানুষ ভোট দেন রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ নির্ধারণে। অথচ নিজের ভবিষ্যতের ঠিকানা নির্ধারণের ক্ষমতা তাঁর হাতে নেই। তিনি জানেন না, যে জায়গায় তাঁর জন্ম, যে উঠানে তাঁর সন্তানের শৈশব কেটেছে, যে ঘরে তাঁর বাবা-মা শেষ নিঃশ্বাস ফেলেছেন, সেই জায়গাটি আইনগতভাবে তাঁর পরিবারের কতটা? এই অনিশ্চয়তা শুধু জমির কাগজের সমস্যা নয়; এটি মানুষের অস্তিত্বের প্রশ্ন। একটি স্থায়ী ঠিকানা মানে শুধু একটি দলিল নয় এটি নিরাপত্তা, মর্যাদা, ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা এবং নাগরিক স্বীকৃতির ভিত্তি।
চনপাড়ার ইতিহাস আরও নির্মম। ১৯৭৪ সালে ঢাকা ওয়াসার প্রায় ১২৬ একর জমির ওপর অস্থায়ী পুনর্বাসন কেন্দ্র গড়ে তোলা হয়েছিল বলে স্থানীয়দের তথ্য। তখনকার চনপাড়া আজকের চনপাড়া ছিল না। প্রবীণদের স্মৃতিতে সেটি ছিল অনেকটাই ধুধু বালুচর। ছিল না পর্যাপ্ত বিশুদ্ধ পানির ব্যবস্থা, ছিল না বসবাসের উপযোগী ঘরবাড়ি, পয়ঃনিষ্কাশন কিংবা ন্যূনতম নাগরিক সুবিধা। হাজার হাজার পরিবারকে প্রতিকূল পরিবেশে নতুন জীবন শুরু করতে হয়েছিল। কাজ ছিল না, খাবারের নিশ্চয়তা ছিল না। কেউ আশপাশের গ্রামে ভিক্ষা করে আনা খাবার খেয়েছেন, কেউ কুড়িয়ে আনা শাক-লতাপাতা রান্না করেছেন। কেউ কম দামে সংগ্রহ করেছেন চালের ফেলে দেওয়া কালো খুদ, কেউ গমের ভুসি খেয়েও বেঁচে থাকার চেষ্টা করেছেন। অনাহার, অপুষ্টি ও রোগে মৃত্যুর ঘটনাও ঘটত বলে প্রবীণদের ভাষ্য। মৃতদের দাফন পর্যন্ত ছিল কঠিন বাস্তবতা।
সেই চনপাড়া আজ আর কেবল পুনর্বাসন কেন্দ্র নয়। এটি একটি কর্মচঞ্চল জনপদ। মানুষের ঘাম, শ্রম, স্বপ্ন ও সংগ্রামে এখানে গড়ে উঠেছে জীবন। শিক্ষা, ব্যবসা-বাণিজ্য, যোগাযোগ সব ক্ষেত্রেই পরিবর্তন এসেছে। বিভিন্ন বেসরকারি ও দাতা সংস্থার উদ্যোগও এই পরিবর্তনে ভূমিকা রেখেছে। একসময় যে জনপদের মানুষের কাছে একবেলা খাবার ছিল বড় প্রশ্ন, সেই জনপদ থেকেই আজ চিকিৎসক, প্রকৌশলী, শিক্ষক, গবেষক, সাংবাদিক, কর্মকর্তা, উদ্যোক্তা ও ব্যবসায়ী বেরিয়ে এসেছেন। স্থানীয়দের তথ্য অনুযায়ী, চনপাড়ার সন্তানদের মধ্যে পিএইচডিধারী ও গবেষণার সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিও রয়েছেন। চিকিৎসক, প্রকৌশলী ও শিক্ষকসহ বিভিন্ন পেশায় বহু মানুষ প্রতিষ্ঠিত হয়েছেন। সাংবাদিকতা ও আলোকচিত্র সাংবাদিকতায়ও এই জনপদের সন্তানদের পরিচিতি রয়েছে।
অর্থাৎ চনপাড়ার মানুষ কেবল সাহায্যের অপেক্ষায় বসে থাকা কোনো জনগোষ্ঠী নয়। তাঁরা নিজেদের জীবন নিজেরাই গড়ে তুলেছেন। প্রথম প্রজন্ম লড়েছে খাবার ও আশ্রয়ের জন্য। দ্বিতীয় প্রজন্ম লড়েছে শিক্ষা ও কর্মসংস্থানের জন্য। তৃতীয় ও পরবর্তী প্রজন্ম লড়ছে একটি স্বীকৃত ভবিষ্যতের জন্য। তাঁদের চাওয়া খুব বেশি নয় তাঁরা শুধু জানতে চান, তাঁদের বসতভিটা কি তাঁদেরই থাকবে?
এই প্রশ্নটি আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে যখন দেখা যায়, বহু মানুষ জন্মসূত্রে চনপাড়ার বাসিন্দা। তাঁদের কাছে অন্য কোনো ‘ফিরে যাওয়ার জায়গা’ নেই। তাঁরা এখানেই জন্মেছেন, এখানেই বড় হয়েছেন, এখানেই সংসার পেতেছেন। তাঁদের সন্তানের জন্মও হয়েছে এখানেই। তাহলে পাঁচ দশকের বেশি সময় ধরে বসবাসকারী এই মানুষগুলোকে আর কতকাল ‘অস্থায়ী’ বলা হবে?
ভূমির স্থায়ী মালিকানা বা বন্দোবস্তের বিষয়টি পুরোপুরি নিষ্পত্তি না হওয়ায় দীর্ঘদিন ধরে অনিশ্চয়তার মধ্যে রয়েছেন বাসিন্দারা এমন অভিযোগ তাঁদের। ফলে অনেক পরিবার ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও পরিকল্পিত ও টেকসই বাড়িঘর নির্মাণ করতে পারছে না। কারণ যে মাটির ভবিষ্যৎ নিশ্চিত নয়, সেখানে মানুষ কতটা বিনিয়োগ করবে? যে জমির মালিকানা নিয়ে সংশয় আছে, সেখানে একটি পরিবার কীভাবে আগামী পঞ্চাশ বছরের পরিকল্পনা করবে? একটি জনপদের উন্নয়নও তখন থমকে যায়। রাস্তা হবে, ড্রেন হবে, পয়ঃনিষ্কাশন হবে, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা হবে, নিরাপদ আবাসন হবে সবই প্রয়োজন। কিন্তু এসবের সঙ্গে ভূমির অধিকার প্রশ্নটিও জড়িত। স্থায়ী অধিকার ছাড়া পরিকল্পিত উন্নয়ন অনেক সময় হয়ে ওঠে সাময়িক মেরামত। মানুষ চায় স্থায়ী সমাধান, কেবল সাময়িক সংস্কার নয়।
চনপাড়ার মানুষ কোনো বিশেষ সুবিধা চাইছেন না; তাঁরা চাইছেন তাঁদের দীর্ঘদিনের বাস্তবতাকে স্বীকৃতি দিতে। প্রায় ১২৬ একর জমির বর্তমান মালিকানা, দখল, বন্দোবস্ত, পূর্ববর্তী অধিগ্রহণ বা হস্তান্তরের শর্ত এবং দীর্ঘদিন বসবাসকারী পরিবারগুলোর আইনগত অধিকার সবকিছু সরকারি নথিপত্রের ভিত্তিতে স্বচ্ছভাবে পর্যালোচনা করা যেতে পারে। প্রয়োজন হলে পূর্ণাঙ্গ সরকারি জরিপ করা যেতে পারে। কত পরিবার আছে, কত মানুষ আছে, কতজন ভোটার, কতজন দীর্ঘদিনের বাসিন্দা এসবের একটি নির্ভুল সরকারি তথ্যভান্ডার তৈরি করা দরকার। কারণ অনুমান দিয়ে কোনো জনপদের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করা যায় না। স্থানীয়দের দাবি, চনপাড়ায় প্রায় এক লাখ মানুষের বসবাস। আবার স্থানীয় তথ্য অনুযায়ী ভোটার সংখ্যা ১৮ হাজারের বেশি। প্রকৃত জনসংখ্যা কত তা নিয়ে বিতর্ক থাকতেই পারে। কিন্তু সেই বিতর্কের সমাধানও কঠিন নয়। একটি পূর্ণাঙ্গ পরিবারভিত্তিক সরকারি জরিপই যথেষ্ট। রাষ্ট্র যদি নাগরিকের ভোট গণনা করতে পারে, তবে নাগরিকের ঘরও গণনা করতে পারে; ভোটার তালিকা করতে পারে, তবে বসতভিটার বাস্তবতাও যাচাই করতে পারে।
চনপাড়াকে কেবল ‘অপরাধপ্রবণ’ বা ‘দরিদ্র’ একটি এলাকা হিসেবে দেখার প্রবণতাও বদলাতে হবে। একটি জনপদের কিছু সমস্যা থাকতেই পারে। কিন্তু তার আড়ালে যদি কয়েক প্রজন্মের মানুষের সংগ্রাম, শিক্ষা, পেশাগত সাফল্য ও সামাজিক উত্তরণের ইতিহাস চাপা পড়ে যায়, তাহলে সেটি হবে অন্যায়। যে চনপাড়ার প্রথম প্রজন্মকে বেঁচে থাকার জন্য শাক-লতাপাতা, কালো খুদ কিংবা ভুসির ওপর নির্ভর করতে হয়েছে বলে প্রবীণরা স্মরণ করেন, সেই চনপাড়া থেকেই যদি চিকিৎসক, প্রকৌশলী, শিক্ষক, গবেষক, সাংবাদিক ও সরকারি-বেসরকারি কর্মকর্তা তৈরি হয়ে থাকেন, তবে সেটিই তো এই জনপদের সবচেয়ে বড় পরিচয় সংগ্রাম করে উঠে দাঁড়ানো মানুষের জনপদ। তাই এখন সময় চনপাড়াকে নতুন চোখে দেখার। দয়া দিয়ে নয়, অধিকার দিয়ে। করুণা দিয়ে নয়, নাগরিক মর্যাদা দিয়ে। অস্থায়ী পরিচয় দিয়ে নয়, স্থায়ী ভবিষ্যতের পরিকল্পনা দিয়ে।
প্রশ্নটি তাই খুব সরল ১৯৭৪ সালে যাঁদের পুনর্বাসনের জন্য এখানে আনা হয়েছিল, ২০২৬ সালে এসে তাঁদের পুনর্বাসন কি এখনও শেষ হয়নি? ৫২ বছর কোনো ছোট সময় নয়। একটি মানুষের জীবনের চেয়েও বেশি। একটি প্রজন্মের চেয়েও বেশি। তিন-চারটি প্রজন্মের জীবন পেরিয়ে গেছে। যারা এসেছিলেন, তাঁদের অনেকে পৃথিবী ছেড়ে চলে গেছেন। তাঁদের সন্তানরা বৃদ্ধ হয়েছেন। তাঁদের নাতি-নাতনিরাও আজ সংসার করছেন। তবু ‘অস্থায়ী পুনর্বাসন কেন্দ্র’ নামটি রয়ে গেছে। এই নামের মধ্যে যেন পাঁচ দশকের রাষ্ট্রীয় অপেক্ষার প্রতিচ্ছবি।
চনপাড়ার মানুষের এখন আর শুধু পুনর্বাসনের প্রতিশ্রুতি প্রয়োজন নেই। প্রয়োজন সিদ্ধান্ত। প্রয়োজন নথি যাচাই। প্রয়োজন ভূমি-অধিকারের আইনগত সমাধান। প্রয়োজন একটি নিরাপদ, পরিকল্পিত ও মর্যাদাপূর্ণ আবাসিক জনপদ। যে মানুষগুলোকে একদিন বলা হয়েছিল এসো, এখানে তোমাদের পুনর্বাসন হবে, তাদের পরবর্তী প্রজন্ম আজ বলতে চাইছে—আমরা তো চলে যাইনি। আমরা এখানেই আছি। আমরা এখানেই জন্মেছি। আমাদের সন্তানরাও এখানেই জন্মেছে। আমরা ভোটার হয়েছি। আমরা রাষ্ট্রের নাগরিক হয়েছি। আমরা এই জনপদকে আমাদের শ্রমে গড়ে তুলেছি।
তাহলে শুধু একটি প্রশ্নের উত্তর দিন- তাদের ঠিকানা কি এখনও অস্থায়ী থাকবে? ভোটাধিকার যখন মিলেছে, তখন স্থায়ী বসবাসের অধিকারও মিলবে এটাই স্বাভাবিক প্রত্যাশা। পাঁচ দশকের বেশি সময়ের অপেক্ষার পর চনপাড়ার মানুষের হাতে একটি নিরাপদ, আইনগতভাবে স্বীকৃত, স্থায়ী ও মর্যাদাপূর্ণ ঠিকানা তুলে দেওয়া এখন আর কোনো দয়া নয়; এটি তাঁদের ন্যায্য নাগরিক অধিকার। ৫২ বছরের অস্থায়িত্বের অবসান হোক। চনপাড়ার মানুষ এবার স্থায়ী ঠিকানা পাক এই প্রত্যাশা আমাদের।
লেখক: মীর আব্দুল আলীম, সাংবাদিক, কলামিস্ট।
মহাসচিব-কলামিস্ট ফোরাম অব বাংলাদেশ।