
সাম্প্রতিক সময়ে দেশের বিদ্যুৎ ও জ্বালানি পরিস্থিতি ফের এক গভীর সংকটের মুখোমুখি দাঁড়িয়েছে। রাজধানী ঢাকার বিভিন্ন এলাকা সহ দেশের প্রায় সর্বত্রই বিদ্যুৎ সরবরাহে চরম বিঘ্ন ঘটছে, যা কেবল জনজীবনকে বিপর্যস্ত করছে না, বরং সমগ্র অর্থনৈতিক কাঠামোকেই মারাত্মকভাবে ধাক্কা দিচ্ছে। আধুনিক নাগরিক জীবনে বিদ্যুৎ কোনো বিলাসিতা নয়, এটি মানুষের মৌলিক চাহিদা এবং অর্থনৈতিক প্রগতির প্রাথমিক নিয়ামক। অথচ প্রতিদিনের এই লোডশেডিং এবং জ্বালানি সরবরাহ ঘাটতির কারণে গৃহস্থালি থেকে শুরু করে কলকারখানা সবখানেই স্থবিরতা নেমে এসেছে। সরকারের পক্ষ থেকে প্রায়শই বিশ্ববাজারের মন্দা, ডলার সংকট বা কারিগরি ত্রুটির অজুহাত তুলে ধরে সাময়িক বিভ্রান্তি সৃষ্টির চেষ্টা করা হলেও, সাধারণ মানুষের ভোগান্তি একটুও কমেনি। বিদ্যুৎ খাতের এই সংকটের পেছনের প্রকৃত বাস্তবতা বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, সমস্যাটি কেবল সাময়িক কোনো বিপর্যয় নয়; এটি বিগত বহু বছরের ভুল নীতি, অপরিকল্পিত জ্বালানি ব্যবস্থাপনা, অপব্যয় এবং স্বচ্ছতার অভাবের এক সম্মিলিত ও মারাত্মক পরিণতি। একটি দেশের দীর্ঘমেয়াদি জাতীয় অগ্রাধিকার হিসেবে জ্বালানি নিরাপত্তাকে বিবেচনা না করে সাময়িক বা খণ্ডকালীন সমাধানের দিকে হেঁটে যে ভুল করা হয়েছে, আজ তার মাশুল দিতে হচ্ছে কোটি কোটি সাধারণ নাগরিক ও উদ্যোক্তাকে।
বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতার তথ্য বিশ্লেষণ করলে এক অদ্ভুত বৈপরীত্য চোখে পড়ে। খাতভিত্তিক কাগজ-কলমে আমাদের বিদ্যুৎ উৎপাদনের সক্ষমতা প্রায় ত্রিশ হাজার মেগাওয়াটের কাছাকাছি হলেও, বাস্তবে গড়ে বারো থেকে চৌদ্দ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ সরবরাহ করতেই হিমশিম খেতে হচ্ছে। চাহিদা ও প্রকৃত সরবরাহের মধ্যকার এই বিশাল ব্যবধান স্পষ্ট করে দেয় যে সমস্যাটি কেবল ক্ষমতার নয়, বরং প্রাথমিক জ্বালানি জোগানের ও সঠিক ব্যবস্থাপনার। দেশের অধিকাংশ বিদ্যুৎকেন্দ্রের সক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও জ্বালানির মারাত্মক অভাব এবং প্রয়োজনীয় আর্থিক তারল্য না থাকার কারণে সেগুলোকে পূর্ণ ক্ষমতায় চালু রাখা সম্ভব হচ্ছে না। বিপুল পরিমাণ ধারণক্ষমতা বা ক্যাপাসিটি তৈরি করেও যদি প্রয়োজনীয় প্রাথমিক জ্বালানি যেমন প্রাকৃতিক গ্যাস, কয়লা বা জ্বালানি তেল সরবরাহ নিশ্চিত করা না যায়, তবে সেই সক্ষমতা শুধুই এক ব্যয়বহুল শ্বেতহস্তীতে পরিণত হয়। এর পাশাপাশি পুরনো এবং দুর্বল সরবরাহ ও সঞ্চালন ব্যবস্থার কারণে কারিগরি অপচয় বা সিস্টেম লস এখনো কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় কমিয়ে আনা যায়নি, যা মূল সংকটের গভীরতাকে আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে। চাহিদা ও জোগানের এই চরম সমন্বয়হীনতা প্রমাণ করে যে বিদ্যুৎ খাতের পরিকল্পনা বাস্তবায়নে টেকসই চিন্তার বিশাল অভাব ছিল।
অতীতের অপরিকল্পিত জ্বালানি নীতি এবং তড়িঘড়ি করে প্রণীত দ্রুত ভাড়াভিত্তিক বা কুইক রেন্টাল বিদ্যুৎকেন্দ্রের ওপর অতি-নির্ভরতা এই সংকটের অন্যতম প্রধান মূল কারণ। তাৎক্ষণিক চাহিদা মেটানোর অজুহাতে যেসব সাময়িক রেন্টাল ও কুইক রেন্টাল কেন্দ্র স্থাপন করা হয়েছিল, সেগুলোকে বছরের পর বছর ধরে চালু রেখে বিপুল অঙ্কের বিদ্যুৎ কেন্দ্র ভাড়া বা ক্যাপাসিটি চার্জ প্রদান করা হয়েছে। কোনো বিদ্যুৎ না তৈরি করলেও চুক্তি অনুযায়ী বেসরকারি কোম্পানিগুলোকে বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার পরিশোধ করতে হয়েছে, যা জাতীয় অর্থনীতি ও বিদ্যুৎ খাতের ওপর এক পর্বতসম আর্থিক বোঝা সৃষ্টি করেছে। দীর্ঘমেয়াদে দেশীয় জ্বালানি অনুসন্ধান ও উত্তোলনে পর্যাপ্ত অর্থ ও মনোযোগ না দিয়ে, আমদানিভিত্তিক ব্যয়বহুল জ্বালানির ওপর ভর করে বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণের যে নীতি গ্রহণ করা হয়েছিল, তা আজ চরমভাবে ব্যর্থ প্রমাণিত হয়েছে। যদি ওই সময়ে ক্যাপাসিটি চার্জের হাজার হাজার কোটি টাকা অপচয় না করে দেশীয় প্রাকৃতিক গ্যাস অনুসন্ধান ও উত্তোলন বাড়াতে বা অবকাঠামো উন্নয়নে বিনিয়োগ করা হতো, তবে আজকে বিদ্যুৎ খাতকে এমন ভয়াবহ দেউলিয়াত্বের মুখে দাঁড়িয়ে আন্তর্জাতিক বাজারের অনিশ্চয়তার ওপর নির্ভর করতে হতো না।
বিদ্যুৎ উৎপাদনে গ্যাস, কয়লা এবং তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) আমদানিনির্ভরতার ঝুঁকি আজ অত্যন্ত স্পষ্ট ও বিপজ্জনক আকার ধারণ করেছে। আমাদের দেশীয় প্রাকৃতিক গ্যাসের মজুদ দিনে দিনে কমে আসছে, অথচ নতুন গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কারে গত এক-দুই দশকে তেমন কোনো কার্যকর বা সুদূরপ্রসারী উদ্যোগ দেখা যায়নি। দেশের নিজস্ব গ্যাসের সরবরাহ কমে যাওয়ায় সরকারকে বিশ্ববাজার থেকে অতিরিক্ত চড়া মূল্যে এলএনজি, কয়লা ও জ্বালানি তেল আমদানি করতে হচ্ছে। ফলস্বরূপ, আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির মূল্য কিছুটা বৃদ্ধি পেলেই কিংবা দেশে ডলার সংকট দেখা দিলেই সরাসরি তার আঘাত এসে পড়ছে বিদ্যুৎ উৎপাদনের ওপর। আমদানি করা জ্বালানির বকেয়া বিল পরিশোধ করতে না পারায় অনেক সময় বিদ্যুৎকেন্দ্র বন্ধ রাখতে হচ্ছে, যা পুরোপুরি আমাদের জাতীয় জ্বালানি নিরাপত্তাকে চরম ঝুঁকিতে ফেলে দিয়েছে। নিজস্ব প্রাকৃতিক সম্পদের সর্বোচ্চ ব্যবহার না করে বিদেশের বাজারের ওপর এভাবে পুরোপুরি সঁপে দেওয়ার সিদ্ধান্ত কোনো স্বাধীন অর্থনীতির জ্বালানি নীতি হতে পারে না এবং এই আমদানিনির্ভরতার মারাত্মক খেসারত দিতে হচ্ছে সাধারণ ভোক্তাদের।
বিশ্বজুড়ে যখন পরিবেশবান্ধব এবং সাশ্রয়ী সৌরবিদ্যুৎসহ অন্যান্য নবায়নযোগ্য জ্বালানির দিকে দ্রুত রূপান্তর ঘটছে, তখন আমাদের দেশে এই খাতে বিনিয়োগ ও অগ্রগতি অত্যন্ত হতাশাজনক। আমাদের মতো ভৌগোলিক অবস্থানের দেশে সৌরবিদ্যুতের সম্ভাবনা অপার হওয়া সত্ত্বেও পর্যাপ্ত জমির অভাব, সঠিক নীতিমালার ঘাটতি এবং কায়েমী স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠীর বাধার কারণে এই খাতের কাঙ্ক্ষিত বিকাশ ঘটেনি। আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে ছাদভিত্তিক বা রোফটপ সোলার, অনাবিষ্কৃত বা অনাবাদি জমিতে সোলার পার্ক এবং কৃষি জমিতে দ্বৈত ব্যবহারের মাধ্যমে বিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রচুর সুযোগ রয়ে গেছে। বাতাস বা বায়ুবিদ্যুৎ এবং বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের মতো বিকল্প ক্ষেত্রগুলোতেও আমাদের অগ্রগতি প্রায় শূন্যের কোঠায়। নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে দ্রুত মেগা প্রকল্প গ্রহণ ও দেশি-বিদেশি বড় বিনিয়োগ আকৃষ্ট করা এখন সময়ের দাবি। সস্তা এবং পরিচ্ছন্ন নবায়নযোগ্য শক্তি যদি মোট উৎপাদিত বিদ্যুতের একটি বড় অংশ দখল করতে পারে, তবে তা কেবল আমদানির ওপর চাপ কমাবে না, বরং পরিবেশ সুরক্ষায় এবং বিদ্যুৎ উৎপাদন খরচ তাৎপর্যপূর্ণভাবে কমাতে সহায়তা করবে।
বিদ্যুৎ খাতের ধারাবাহিক লোকসান, ভর্তুকির বিশাল চাপ এবং ক্রমাগত বিদ্যুৎ ও জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি সাধারণ মানুষের কাঁধে অসহনীয় আর্থিক বোঝা চাপিয়ে দিচ্ছে। বিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রকৃত খরচ অত্যধিক বেড়ে যাওয়ার কারণে সরকার প্রতি বছর বিশাল অংকের ভর্তুকি দিতে বাধ্য হচ্ছে, যা প্রকারান্তরে জনগণের করের টাকা থেকেই পরিশোধ করা হচ্ছে। অথচ দুর্নীতি, অপচয় এবং অপ্রয়োজনীয় অবকাঠামোগত ব্যয় না কমিয়ে বারবার বিদ্যুতের দাম বাড়িয়ে গ্রাহকদের ওপর বাড়তি আর্থিক চাপ তৈরি করা হচ্ছে। এর ফলে মূল্যস্ফীতি বৃদ্ধি পাচ্ছে এবং নিম্ন ও মধ্যবিত্ত শ্রেণির মানুষের জীবনযাত্রার মান চরম সঙ্কটে পড়ছে। এই চক্র থেকে বেরিয়ে আসতে হলে সর্বাগ্রে বিদ্যুৎ খাতের যাবতীয় অদক্ষতা দূর করতে হবে এবং অনিয়ম প্রতিরোধ করে উৎপাদন খরচ কমিয়ে আনতে হবে। ক্যাপাসিটি চার্জের মতো অন্যায় ও অপব্যয়মূলক চুক্তি পর্যালোচনা করা এবং কম খরচে বিদ্যুৎ উৎপাদনের কৌশল প্রণয়ন ছাড়া গ্রাহকের ওপর থেকে আর্থিক চাপ কমানোর আর কোনো বিকল্প উপায় নেই।
বিদ্যুতের এই ঘন ঘন বিভ্রাট ও চরম অনিশ্চয়তা দেশের সামগ্রিক অর্থনীতিতে এক ভয়াবহ ধস নামিয়ে আনছে। বিশেষ করে শিল্পকারখানাগুলোতে নিয়মিত বিদ্যুৎ সরবরাহ না থাকায় উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে, রফতানিমুখী পোশাক খাতসহ বিভিন্ন ম্যানুফ্যাকচারিং শিল্প তাদের প্রতিশ্রুত সময়ে পণ্য সরবরাহ করতে পারছে না, যা বৈশ্বিক বাজারে দেশের সুনাম ও প্রতিযোগিতার সক্ষমতা নষ্ট করছে। অন্যদিকে, ছোট ও মাঝারি শিল্প এবং ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা ডিজেল চালিত জেনারেটর চালিয়ে বাড়তি খরচে ব্যবসা চালাতে বাধ্য হচ্ছেন, যা অনেক ক্ষেত্রেই তাদের ব্যবসার টিকে থাকার ক্ষমতা কেড়ে নিচ্ছে। এর চেয়েও করুণ পরিস্থিতি তৈরি হচ্ছে হাসপাতালগুলোতে, যেখানে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুতের অভাবে মুমূর্ষু রোগীর জীবন সংশয়ের মুখে পড়ে এবং জীবন রক্ষাকারী বিভিন্ন চিকিৎসা সরঞ্জাম সচল রাখা দুরূহ হয়ে ওঠে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে গরমের তীব্রতা ও বিদ্যুৎহীনতায় শিক্ষার্থীদের লেখাপড়ার ব্যাপক ব্যাঘাত ঘটছে। এভাবে বিদ্যুৎ সংকট দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড ও সামাজিক সুরক্ষাকে ক্রমান্বয়ে থমকে দিচ্ছে, যা দীর্ঘ মেয়াদে অপূরণীয় ক্ষতি সাধন করছে।
সুতরাং, বিদ্যুৎ সংকট মোকাবিলায় কেবল রাজনৈতিক পারস্পরিক দোরারোপ বা সাময়িক তালি দেওয়ার নীতি পরিত্যাগ করে একটি সুস্পষ্ট, টেকসই ও দূরদর্শী সমাধান নীতি গ্রহণ করতে হবে। সর্বাগ্রে প্রয়োজন বিদ্যুৎ খাতের অতীত ও বর্তমানের সমস্ত চুক্তি, ব্যয়কাঠামো এবং ক্রয়প্রক্রিয়ার ওপর একটি স্বাধীন ও নিরপেক্ষ তদন্ত পরিচালনা করা। বিদ্যুৎ উৎপাদনে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে যেন কোনো ধরনের কায়েমি স্বার্থ বা অনৈতিক সুবিধা লেনদেন জাতীয় স্বার্থের ওপরে স্থান না পায়। জাতীয় জ্বালানি নিরাপত্তাকে দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত অগ্রাধিকার হিসেবে বিবেচনা করে দেশীয় গ্যাস ও খনিজ সম্পদ অনুসন্ধানে জরুরি ভিত্তিতে মেগা ড্রিলিং কার্যক্রম শুরু করা আবশ্যক। একইসঙ্গে আন্তর্জাতিক বাজারের ওঠানামার ঝুঁকি কমাতে নবায়নযোগ্য জ্বালানি নীতি দ্রুত বাস্তবায়ন করতে হবে। অজুহাত ও প্রথাগত আমলাতান্ত্রিক লালফিতার দৌরাত্ম্য বন্ধ করে একটি স্বচ্ছ, জবাবদিহিমূলক এবং বাস্তবসম্মত পরিকল্পনা গ্রহণের মাধ্যমেই কেবল এই বিদ্যুৎ সংকটের স্থায়ী ও টেকসই সমাধান সম্ভব, অন্যথায় দেশের সামগ্রিক উন্নয়ন ও সমৃদ্ধির পথ চরমভাবে অবরুদ্ধ হয়ে পড়বে।
লেখক: মীর আব্দুল আলীম, সাংবাদিক ও কলামিস্ট।