পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) চাকরি বিধি লঙ্ঘনের দায়ে ১৭ কর্মকর্তাকে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো হয়েছে। একই সঙ্গে বিভিন্ন পর্যায়ের আরও পাঁচ কর্মকর্তার বেতন সর্বনিম্ন স্তর বা গ্রেডে নামিয়ে দেওয়ার শাস্তি দেওয়া হয়েছে।
মঙ্গলবার (১৮ আগস্ট) বিএসইসির কমিশন সভায় এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। এর আগে গত ২৩ জুলাই অভিযুক্ত কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে কেন শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হবে না, তা জানতে কারণ দর্শানোর নোটিশ জারি করা হয়েছিল।
বিএসইসি সূত্রে জানা গেছে, গত বছরের ৫ মার্চ তৎকালীন চেয়ারম্যান খন্দকার রাশেদ মাকসুদ ও অন্যান্য কমিশনারকে কয়েক ঘণ্টা অবরুদ্ধ করে রাখার ঘটনায় সরকারের পক্ষ থেকে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশনা দেওয়া হয়। ওই ঘটনার তদন্ত ও বিভাগীয় কার্যক্রম শেষে মোট ২৩ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করা হয়। এর মধ্যে ২২ জনের বিরুদ্ধে মঙ্গলবার শাস্তি কার্যকর করেছে বিএসইসি। অপর একজন কর্মকর্তা এরই মধ্যে অন্য একটি অভিযোগে চাকরি থেকে বরখাস্ত হওয়ায় তার বিরুদ্ধে নতুন করে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।
বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো কর্মকর্তাদের মধ্যে রয়েছেন বিএসইসির নির্বাহী পরিচালক রেজাউল করিম, পরিচালক আবুল হাসান ও মোহাম্মদ ফখরুল ইসলাম মজুমদার, অতিরিক্ত পরিচালক নজরুল ইসলাম ও মোল্যা মো. মিরাজ উস সুন্নাহ, যুগ্ম পরিচালক রাশেদুল আলম, উপপরিচালক মো. নান্নু ভূঞা, কাজী মো. আল-ইসলাম, সহিদুল ইসলাম, বনী ইয়ামিন খান ও তৌহিদ হাসান, সহকারী পরিচালক আমিনুল হক খান, আবদুল বাতেন ও সাজ্জাদ হোসেন এবং ব্যক্তিগত কর্মকর্তা আবু ইউসুফ, কাওসার পাশা বৃষ্টি ও সমীর ঘোষ।
অন্যদিকে, বেতন অবনমনের শাস্তি পেয়েছেন সহকারী পরিচালক জনি হোসেন, রায়হান কবির, তরিকুল ইসলাম, মাকসুদ মিলা এবং লাইব্রেরিয়ান সেলিম রেজা বাপ্পী।
এর আগে চলতি বছরের শুরুতে পরিচালক আবু রায়হান মো. মোহতাছিন বিল্লাকেও বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠায় বিএসইসি।
যে ঘটনায় ব্যবস্থা
বিএসইসি সূত্র ও সংশ্লিষ্টদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, গত বছরের ৫ মার্চ তৎকালীন চেয়ারম্যান খন্দকার রাশেদ মাকসুদ এবং কমিশনার মো. মহসিন চৌধুরী, মো. আলী আকবর ও ফারজানা লালারুখ কমিশনের নির্ধারিত সভাকক্ষে বৈঠক করছিলেন। ওই সময় একদল কর্মকর্তা-কর্মচারী সভাকক্ষে জোরপূর্বক প্রবেশ করে চেয়ারম্যান ও কমিশনারদের অবরুদ্ধ করেন।
ঘটনার পর বিএসইসির মূল ফটকে তালা দেওয়া, সিসিটিভি ক্যামেরা ও ওয়াই-ফাই সংযোগ বন্ধ করে দেওয়া, লিফট অচল করা এবং বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করার অভিযোগ ওঠে। এতে কমিশন কার্যালয়ে অরাজক ও ভীতিকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয় বলে মামলার অভিযোগে উল্লেখ করা হয়।
ওই ঘটনায় গত বছরের ৬ মার্চ রাজধানীর শেরেবাংলা নগর থানায় ১৬ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে মামলা করা হয়। তৎকালীন চেয়ারম্যানের নিরাপত্তায় নিয়োজিত গানম্যান আশিকুর রহমান বাদী হয়ে মামলাটি করেন। ফৌজদারি মামলার পাশাপাশি সরকারি বিধি অনুযায়ী তদন্ত ও বিভাগীয় মামলাও হয়।
পরে অর্থ মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে তদন্ত পরিচালনা এবং অভিযুক্ত ও অভিযোগকারীদের সাক্ষ্যগ্রহণ করা হয়। তদন্ত ও অন্যান্য প্রক্রিয়া শেষে সরকারের পক্ষ থেকে ২৩ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিতে বিএসইসিকে নির্দেশনা দেওয়া হয়।
চার ঘণ্টার বেশি অবরুদ্ধ ছিলেন চেয়ারম্যান-কমিশনাররা
ওই ঘটনার সময় বিএসইসির কর্মকর্তা-কর্মচারীরা তৎকালীন চেয়ারম্যান ও কমিশনারদের চার ঘণ্টার বেশি সময় অবরুদ্ধ করে রাখেন। পরে সেনাবাহিনী গিয়ে তাদের উদ্ধার করে। বিএসইসির তৎকালীন নির্বাহী পরিচালক সাইফুর রহমানকে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানোর প্রতিবাদে কর্মকর্তা-কর্মচারীরা ওই কর্মসূচিতে জড়িয়েছিলেন বলে সংশ্লিষ্টরা জানান।
পরে কর্মকর্তা-কর্মচারীরা বিভিন্ন দাবি ও তৎকালীন কমিশনের বিরুদ্ধে দুর্ব্যবহারের অভিযোগ তোলেন। এ ঘটনায় কয়েক দিন বিএসইসিতে কর্মবিরতিও চলে এবং সংস্থাটিতে বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি তৈরি হয়।
শাস্তি পাওয়া কর্মকর্তাদের ক্ষোভ
বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, বিএসইসি কেন বা কী কারণে এ সিদ্ধান্ত নিয়েছে, তা তিনি জানেন না। তার দাবি, এমন শাস্তি পাওয়ার মতো কোনো অপরাধ তিনি করেননি। এ সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে তিনি আইনি পদক্ষেপ নেবেন।
একাধিক কর্মকর্তা জানান, মঙ্গলবার বিএসইসির পক্ষ থেকে সিদ্ধান্তের কথা তাদের জানানো হয়। পরে বুধবার অনেক কর্মকর্তা রাজধানীর আগারগাঁওয়ে বিএসইসি কার্যালয়ে গিয়ে বাধ্যতামূলক অবসরের আনুষ্ঠানিক চিঠি গ্রহণ করেন।