মঙ্গলবার ১৮ আগস্ট ২০২৬ ৩ ভাদ্র ১৪৩৩
 
শিরোনাম:


রাজস্ব আহরণ আত্মনির্ভরশীল রাষ্ট্র বিনির্মাণের পবিত্র ব্রত: এনবিআর চেয়ারম্যান
প্রকাশ: মঙ্গলবার, ১৮ আগস্ট, ২০২৬, ৩:০৮ পিএম  (ভিজিট : ৩)
রাজস্ব আহরণকে নিছক প্রশাসনিক দায়িত্ব নয়, আত্মনির্ভরশীল রাষ্ট্র গঠনের পবিত্র দায়িত্ব হিসেবে উল্লেখ করেছেন জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান আহসান হাবিব। তিনি বলেন, ২০২৬-২৭ অর্থবছরে ৬ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকার রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে প্রায় ৪৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধি প্রয়োজন। এটি বড় চ্যালেঞ্জ হলেও দেশের প্রয়োজনেই এ চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করেছে এনবিআর।

মঙ্গলবার (১৮ আগস্ট) রাজধানীর আগারগাঁওয়ে বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে আয়োজিত ‘রাজস্ব সম্মেলন-২০২৬’-এ তিনি এসব কথা বলেন।

অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান, অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী এবং প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনাবিষয়ক উপদেষ্টা ড. রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর উপস্থিত ছিলেন।

আহসান হাবিব বলেন, সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর রাজস্ব আহরণ বাড়াতে এনবিআরে তিনটি টাস্কফোর্স গঠন করা হয়। ২০২৫-২৬ অর্থবছরের শেষ চার মাস বর্তমান সরকারের নেতৃত্বে পরিচালিত হয়েছে। এ সময়ে এনবিআর অর্থবছরের শেষ প্রান্তিকে এ যাবৎকালের সর্বোচ্চ রাজস্ব আদায় করেছে।

তিনি জানান, গত পাঁচ দশকে দেশের রাজস্ব আহরণ প্রায় আড়াই হাজার গুণ বেড়েছে। একই সময়ে রাজস্ব আহরণের কাঠামোতেও বড় পরিবর্তন এসেছে। ১৯৭২-৭৩ অর্থবছরে মোট রাজস্বের ৫৫ শতাংশ আসত আমদানি শুল্ক থেকে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে এই হার কমে ২৭ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। তার মতে, এর মাধ্যমে বাংলাদেশের অর্থনীতি উৎপাদনমুখী শিল্পের দিকে এগিয়ে যাওয়ার প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে।

বর্তমানে আয়কর ও ভ্যাট মিলে মোট রাজস্বের ৭৩ শতাংশ আসে উল্লেখ করে এনবিআরের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান বলেন, বাংলাদেশ ক্রমেই অভ্যন্তরীণ সম্পদনির্ভর অর্থনীতির দিকে এগিয়ে যাচ্ছে।

তিনি বলেন, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে রাজস্ব আদায়ে ১২ শতাংশের বেশি প্রবৃদ্ধি হয়েছে। এর আগের অর্থবছরে প্রবৃদ্ধি ছিল মাত্র ২ দশমিক ৫ শতাংশ। ফলে গত অর্থবছরের প্রবৃদ্ধি রাজস্ব আহরণে একটি উল্লেখযোগ্য পুনরুদ্ধারের ইঙ্গিত দিচ্ছে।

২০২৬-২৭ অর্থবছরের লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে উৎসে আয়কর কর্তনকে অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি হিসেবে দেখছে এনবিআর বলে জানান আহসান হাবিব। এ জন্য নতুন খাতসহ উৎসে কর কর্তনের ক্ষেত্রে মাঠপর্যায়ে কঠোর নজরদারি, নির্ধারিত নীতির সময়মতো বাস্তবায়ন এবং নিয়মিত তদারকি জোরদার করা হবে।

তিনি বলেন, পণ্য রপ্তানি, খুচরা বিক্রেতার কাছে পণ্য বিক্রি, জুয়েলারি ব্যবসা, সম্পত্তি হস্তান্তর এবং লভ্যাংশ আয়ের মতো খাত থেকে রাজস্ব আহরণ বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হবে।

অগ্রিম ও বকেয়া কর আদায়ে কর অঞ্চলগুলোতে মাসভিত্তিক লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করে নিয়মিত মনিটরিং করা হবে জানিয়ে তিনি বলেন, কর ফাঁকি শনাক্তে ‘ট্র্যাক অ্যান্ড ট্রেস’ পদ্ধতি ব্যবহার করা হবে। অনিবাসী করদাতাদের কর ফাঁকির বিষয়েও নজরদারি বাড়ানো হবে।

এ ছাড়া বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তি (এডিআর) দ্রুত সম্পন্ন করা, আদালতে বিচারাধীন উচ্চ রাজস্বসংবলিত মামলা দ্রুত নিষ্পত্তি এবং অডিট নিষ্পত্তির গতি বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেন তিনি। নিজস্ব জনবল ব্যবহার করে কর ফাঁকি থেকে রাজস্ব আদায়ের কথাও জানান এনবিআর চেয়ারম্যান।

ভ্যাট খাতে ভ্যাটের আওতা বাড়ানো, নিয়মিত রিটার্ন দাখিলের হার বৃদ্ধি এবং নতুন ভ্যাটদাতা শনাক্তের পরিকল্পনার কথাও তুলে ধরেন তিনি।

সিগারেট ও তামাকজাত পণ্যে ‘ট্র্যাক অ্যান্ড ট্রেস’ ব্যবস্থা চালুর উদ্যোগ নেওয়া হবে জানিয়ে আহসান হাবিব বলেন, ভ্যাটসংক্রান্ত মামলাগুলো দ্রুত নিষ্পত্তির জন্যও ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

শুল্ক খাতে যথাযথ মূল্যায়ন ও দ্রুত পণ্য খালাস, বকেয়া আদায়, মামলা নিষ্পত্তি, বন্ডের অপব্যবহার রোধ এবং সব ধরনের চোরাচালান ঠেকাতে গোয়েন্দা ও প্রতিরোধমূলক কার্যক্রম জোরদারের কথা জানান তিনি। পাশাপাশি নিলাম কার্যক্রমও দ্রুত করার উদ্যোগ নেওয়া হবে।

‘কর-জিডিপি অনুপাত কম হওয়ার পেছনে কাঠামোগত সমস্যা’

দেশে কর-জিডিপি অনুপাত কম থাকার পেছনে বেশ কিছু কাঠামোগত সমস্যা রয়েছে বলে উল্লেখ করেন এনবিআরের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান। তিনি বলেন, দেশের অর্থনীতির বড় অংশ এখনো নগদনির্ভর ও অনানুষ্ঠানিক। ব্যবসায়িক লেনদেনেরও বড় অংশ অপ্রাতিষ্ঠানিক পর্যায়ে রয়েছে।

তিনি আরও বলেন, সাপ্লাই চেইনের ডিজিটাইজেশন এখনো পর্যাপ্ত নয় এবং বিভিন্ন ব্যবস্থার মধ্যে আন্তঃসংযোগের ঘাটতি রয়েছে। একই সঙ্গে এনবিআরের অটোমেশন প্রক্রিয়াও এখনো পুরোপুরি সম্পন্ন হয়নি।

সীমিত লজিস্টিকসের মধ্যেও এনবিআরের কর্মকর্তারা কাজ করছেন উল্লেখ করে আহসান হাবিব বলেন, রাজস্ব প্রশাসনে বিনিয়োগকে ব্যয় হিসেবে দেখলে হবে না। এটি এমন একটি বিনিয়োগ, যা রাষ্ট্রকে সর্বোচ্চ প্রতিদান দিতে পারে।

করদাতাদের জন্য পাঁচটি অঙ্গীকার তুলে ধরে তিনি বলেন, এনবিআরের কাছে সব করদাতা সমান। করসেবা গ্রহণের প্রক্রিয়া সহজ করা হবে। আইনের পরিবর্তন হবে পূর্বানুমানযোগ্য এবং অংশীজনদের সঙ্গে আলোচনা করে তা করা হবে।

তিনি বলেন, সামগ্রিক অটোমেশনের মাধ্যমে আইন পরিপালন নিশ্চিত করা হবে এবং রাজস্ব প্রশাসনকে আরও স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক করা হবে।

কর-জিডিপি অনুপাত কম, রাজস্ব আদায়ে বিনিয়োগও কম’

অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্যে এনবিআর সদস্য (ভ্যাট বাস্তবায়ন ও আইটি বিভাগ) সৈয়দ মুসফিকুর রহমান বলেন, গত কয়েক দশকে বাংলাদেশের অর্থনীতি অনেক বড় ও বহুমাত্রিক হয়েছে। টেকসই উন্নয়নের জন্য পুঁজি ও প্রাকৃতিক সম্পদের পাশাপাশি শক্তিশালী প্রতিষ্ঠানও জরুরি।

তিনি বলেন, বাংলাদেশের কর-জিডিপি অনুপাত বিশ্বের সর্বনিম্নগুলোর মধ্যে রয়েছে। এটি নির্দেশ করে যে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডকে একটি শক্তিশালী প্রতিষ্ঠানে পরিণত করার ক্ষেত্রে এখনো ঘাটতি রয়েছে। তার মতে, এটি পুরো আর্থিক ব্যবস্থার একটি ‘কালেক্টিভ ফেইলিউর’।

প্রধানমন্ত্রীর উদ্দেশে তিনি বলেন, রাজস্ব প্রশাসনকে শক্তিশালী প্রতিষ্ঠানে পরিণত করতে কাজ চলছে। ডিজিটাল রূপান্তরের মাধ্যমে করদাতাদের অধিকাংশ সেবা অনলাইনে নিয়ে আসা হয়েছে। এনবিআরের হাতে থাকা গুরুত্বপূর্ণ তথ্যের কার্যকর ব্যবহার করে ডেটাভিত্তিক রাজস্ব প্রশাসন গড়ে তোলার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এতে সৎ করদাতারা উপকৃত হচ্ছেন।

গত অর্থবছরের তুলনায় প্রায় ৪৫ শতাংশ বেশি রাজস্ব আদায় সম্ভব বলেও আশাবাদ ব্যক্ত করেন তিনি। মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদের সক্ষমতা ও দক্ষতার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, উপযুক্ত পরিবেশ পেলে তারা বড় ধরনের সাফল্য অর্জন করতে পারবেন।

সৈয়দ মুসফিকুর রহমান আরও বলেন, বাংলাদেশের কর-জিডিপি অনুপাত কম হওয়ার পাশাপাশি রাজস্ব আদায় ব্যবস্থায় বিনিয়োগও আঞ্চলিক দেশগুলোর তুলনায় কম। প্রতি ১০০ টাকা রাজস্ব আদায়ে এনবিআরের ব্যয় মাত্র ২১ পয়সা। তাই রাজস্ব বোর্ডের সক্ষমতা বৃদ্ধিতে প্রয়োজনীয় ব্যয়কে তিনি ‘ভালো বিনিয়োগ’ হিসেবে উল্লেখ করেন।








আরও খবর


Loading...
Loading...
প্রকাশক: এম এন এইচ বুলু
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : মাহফুজুর রহমান রিমন  |   উপদেষ্টা সম্পাদক : রাজু আলীম  
বিএনএস সংবাদ প্রতিদিন লি. এর পক্ষে প্রকাশক এম এন এইচ বুলু কর্তৃক ৪০ কামাল আতাতুর্ক এভিনিউ, বুলু ওশেন টাওয়ার, (২১ তলা), বনানী, ঢাকা ১২১৩ থেকে প্রকাশিত ও শরীয়তপুর প্রিন্টিং প্রেস, ২৩৪ ফকিরাপুল, ঢাকা থেকে মুদ্রিত।
ফোন:০২৯৮২০০১৯-২০ ফ্যাক্স: ০২-৯৮২০০১৬ ই-মেইল: [email protected]