ত্রাণ বরাদ্দে সরকারি ও বিরোধী দলের সংসদ সদস্যদের (এমপি) মধ্যে বৈষম্যের অভিযোগ উঠেছে জাতীয় সংসদে। তবে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণমন্ত্রী আসাদুল হাবিব দুলু বলেছেন, মন্ত্রণালয়ের বরাদ্দ রাজনৈতিক বিবেচনায় নয়, চাহিদা ও প্রয়োজনের ভিত্তিতে দেওয়া হয়।
সোমবার (৮ জুন) ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রশ্নোত্তরে এমন অভিযোগ তুলেছেন জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) থেকে নির্বাচিত এমপি আখতার হোসেন। ডেপুটি স্পিকার কায়সার কামালের সভাপতিত্বে প্রশ্নোত্তর অনুষ্ঠিত হয়।
রংপুর-৪ আসনের সংসদ সদস্য আখতার হোসেন অভিযোগ করেন, গত ৩০ এপ্রিল দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয় থেকে ৮৫ লাখ টাকা ও ৯০ টন চাল-গমের যে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে, তা শুধু সরকারি দলের সংসদ সদস্যদের আসনে গেছে। তিনি বলেন, ‘দুর্যোগ কিন্তু সরকারি দল, বিরোধী দল দেখে আসে না। জনগণের ট্যাক্সের টাকায় এই বরাদ্দ দেওয়া হয়।’
এর জবাবে ত্রাণমন্ত্রী বলেন, মন্ত্রণালয়ের বিভিন্ন ধরনের কর্মসূচি রয়েছে। যখন যেখানে দুর্যোগ সংঘটিত হয়, জেলা প্রশাসকদের কাছে আমাদের জিআর ক্যাশ এবং জিআর রাইসের বরাদ্দ থাকে।
তিনি বলেন, টিআর ও কাবিখা কর্মসূচির ক্ষেত্রে সংসদ সদস্যরা চাহিদাপত্র দিলে সে অনুযায়ী বরাদ্দ দেওয়া হয়। আমার মনে হয় কাল-পরশুর মধ্যে ওনারা ওনাদের বরাদ্দ পেয়ে যাবেন। এ সময় স্পিকারও বলেন, আপনারাও পেয়ে যাবেন।
এনসিপির সংসদ সদস্য আবদুল হান্নান মাসউদের একই ধরনের প্রশ্নের জবাবে ত্রাণ মন্ত্রী বলেন, বর্তমান সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর সব সংসদীয় আসনে চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরে সাম্প্রতিক সময়ে নির্বাচনি আসন প্রতি কাবিটা ২৫ লাখ টাকা এবং টিআর ৩০ লাখ টাকা করে এবং কাবিখা (চাল) ২০ মেট্রিক টন গম বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। এর অতিরিক্ত বিভিন্ন সংসদীয় আসনে (সরকরি ও বিরোধী উভয়ই) সংসদ সদস্যদের ডিও ও স্থানীয় চাহিদার আলোকে প্রয়োজনীয় বরাদ্দ দেওয়া হয়।
কক্সবাজার-৩ আসনের সংসদ সদস্য লুৎফুর রহমান কাজল বলেন, তার এলাকার মানুষ একদিকে সমুদ্রের জলোচ্ছ্বাস, অন্যদিকে বন্যার ঝুঁকিতে থাকে। তিনি কক্সবাজারের জন্য বিশেষ বরাদ্দ বাড়ানোর দাবি জানান।
জবাবে মন্ত্রী বলেন, দুর্যোগপ্রবণ এলাকায় সরকার নিয়মিত সাইক্লোন শেল্টার নির্মাণ করছে এবং পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণে রাখছে। বিশেষ বরাদ্দের বিশেষ আবেদন থাকলে সেটা আমরা বিবেচনা করবো।
টাঙ্গাইল-৭ আসনের এসপি আবুল কালাম আজাদ সিদ্দিকী তার নির্বাচনি এলাকায় ভয়াবহ শিলাবৃষ্টিতে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের জন্য সহায়তা চান। তিনি বলেন, অনেক বাড়ির টিনের চাল এমনভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে যে ঘরের ভেতর থেকে আকাশ দেখা যায়।
জবাবে মন্ত্রী বলেন, সাম্প্রতিক সময়ে শিলাবৃষ্টি ও বজ্রপাত বড় ধরনের দুর্যোগ হিসেবে দেখা দিচ্ছে। শিলাবৃষ্টিতে প্রচুর মানুষের টিনের ঘর ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। আমরা রিপোর্ট সংগ্রহ করেছি।
তিনি জানান, অন্তর্বর্তী সরকারের সময় ঢেউটিন কেনার কোনো ব্যবস্থা করা হয়নি। বর্তমানে নতুন করে টিন সংগ্রহের প্রক্রিয়া এগিয়েছে। মন্ত্রী বলেন, শিগগিরই টিন পাওয়া গেলে যেসব অঞ্চলে শিলাবৃষ্টির কারণে বাড়িঘর ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, তাদের আমরা ঢেউটিন দিয়ে সহায়তা করবো। এছাড়া ক্ষতিগ্রস্তদের জন্য গৃহ মঞ্জুরি বরাদ্দ দেওয়ার কথাও জানান মন্ত্রী।
সিলেট-৬ আসনের এমপি ইমরান আহমেদ চৌধুরী দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা মন্ত্রণালয়ের অধীনে নির্মিত সেতু, কালভার্ট ও রাস্তার মান নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। তিনি বলেন, অনেক ক্ষেত্রে নির্মাণকাজ নিম্নমানের হওয়ার অভিযোগ রয়েছে।
জবাবে আসাদুল হাবিব দুলু অভিযোগটি সরাসরি মানতে রাজি হননি। তিনি বলেন, সংসদ সদস্যদের কাছ থেকেই এসব প্রকল্পের সবচেয়ে বেশি চাহিদা আসে। যদি কোথাও স্পেসিফিক কোনো কাজের গুণগত মান খারাপ হয়ে থাকে, ওনারা আমাদের নোটিশে আনলে অবশ্যই আমরা সেটা দেখবো।
মন্ত্রী দাবি করেন, মন্ত্রণালয়ের চার থেকে ১৫ মিটার দৈর্ঘ্যের সেতু ও কালভার্টগুলো টেকসই এবং কার্যকর।
প্রশ্নোত্তর পর্বে আরও জানানো হয়, গ্রামীণ রাস্তা, সেতু ও কালভার্ট নির্মাণ প্রকল্পের মেয়াদ বাড়ানোর প্রস্তাব পরিকল্পনা কমিশনে পাঠানো হয়েছে। অনুমোদন পেলে নতুন প্রকল্প অন্তর্ভুক্ত করা হবে।
সংরক্ষিত আসনের জামায়াত দলীয় নারী সংসদ সদস্য নূরুন্নিসা সিদ্দীকার প্রশ্নের জবাবে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রী বলেন, বন্যা, ঘূর্ণিঝড় ও অন্যান্য প্রাকৃতিক দুর্যোগকালীন সময়ে আশ্রয় গ্রহণের জন্য মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে দেশব্যাপী ৫৮৮টি বন্যা আশ্রয়কেন্দ্র, ৩২৭টি ঘূর্ণিঝড় আশ্রয়কেন্দ্র, ১১৫টি দুযোর্গ আশ্রয়কেন্দ্র নির্মাণ করা হয়েছে। এছাড়া আরও ১১৫টি বন্যা আশ্রয়কেন্দ্র, ৯০টি বহুমুখী আশ্রয়কেন্দ্র এবং ১১২টি দুযোর্গ আশ্রয়কেন্দ্র নির্মাণ করা হবে।
বিএনপি দলীয় সংসদ সদস্য খায়রুল কবির খোকনের প্রশ্নের জবাবে ত্রাণ মন্ত্রী আসাদুল হাবিব দুলু বলেন, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে সারাদেশে ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আজহা উপলক্ষে ভিজিএফ কর্মসূচির আওতায় উপকারভোগীর সংখ্যা সর্বমোট ২ কোটি ২ লাখ এক হাজার ৫৩৬ জন। উপকারভোগী প্রতি ১০ কেজি হারে মোট দুই লাখ ২ হাজার ১৫ দশমিক ৩৬ টন চাল বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে।
ভবিষ্যতে উপকারভোগী প্রতি ভিজিএফ চাল বিতরণের পরিমাণ বৃদ্ধি করার পরিকল্পনা আছে বলেও জানান মন্ত্রী।