দক্ষিণ কোরিয়ায় বাংলাদেশি শ্রমিকদের জন্য একসময় অত্যন্ত সম্ভাবনাময় শ্রমবাজার হিসেবে পরিচিত ছিল ইপিএস (EPS) কর্মসূচি। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বরাদ্দকৃত কোটার তুলনায় শ্রমিক পাঠানোর হার কমে যাওয়া, ভাষাগত ও কারিগরি দক্ষতার ঘাটতি এবং শ্রমিকদের ঘনঘন কর্মস্থল পরিবর্তনের কারণে এই গুরুত্বপূর্ণ শ্রমবাজারে বাংলাদেশের অবস্থান নিয়ে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। সংশ্লিষ্টরা আশঙ্কা করছেন, সময়মতো কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ না করলে বাংলাদেশ ধীরে ধীরে দক্ষিণ কোরিয়ার শ্রমবাজারে তার শক্ত অবস্থান হারাতে পারে।
দক্ষিণ কোরিয়ার Employment Permit System (EPS) বা কর্মসংস্থান অনুমতি ব্যবস্থার আওতায় বাংলাদেশ থেকে শ্রমিক নিয়োগ আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হয় ২০০৮ সালে। এর আগে ২০০৭-০৮ সালে বাংলাদেশ ও দক্ষিণ কোরিয়ার মধ্যে সমঝোতা স্মারক (MOU) স্বাক্ষর এবং প্রয়োজনীয় প্রস্তুতিমূলক কার্যক্রম সম্পন্ন হয়। বাংলাদেশ সরকারের পক্ষে BOESL এবং দক্ষিণ কোরিয়ার পক্ষে HRD Korea এই কর্মসূচি পরিচালনা করে আসছে।
সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ২০০৮ সাল থেকে জুন ২০২৫ পর্যন্ত ৩৪ হাজারেরও বেশি বাংলাদেশি শ্রমিক ইপিএস কর্মসূচির মাধ্যমে দক্ষিণ কোরিয়ায় কর্মসংস্থানের সুযোগ পেয়েছেন। শুরুতে বাংলাদেশের জন্য বরাদ্দ কোটা সীমিত থাকলেও বাংলাদেশি শ্রমিকদের কর্মদক্ষতা ও চাহিদা বৃদ্ধির ফলে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে কোটা বৃদ্ধি পায়। বিশেষ করে করোনা-পরবর্তী সময়ে দক্ষিণ কোরিয়ায় শ্রমিক সংকট দেখা দিলে বিদেশি শ্রমিক নিয়োগ উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ানো হয়।
তথ্য অনুযায়ী, ২০২২ সালে বাংলাদেশ থেকে ৫ হাজার ৮৯১ জন এবং ২০২৩ সালে ৪ হাজার ৮০৪ জন শ্রমিক দক্ষিণ কোরিয়ায় যান। ২০২৪ ও ২০২৫ সালে বাংলাদেশের জন্য ১০ থেকে ১১ হাজারের বেশি কোটা বরাদ্দের সুযোগ সৃষ্টি হলেও বাস্তবে সেই অনুপাতে শ্রমিক পাঠানো সম্ভব হয়নি।
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, কোরিয়ান ভাষায় দক্ষতার অভাব, দক্ষ জনশক্তির সংকট এবং নিয়োগ প্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতার পাশাপাশি শ্রমিকদের একটি অংশের ঘনঘন কর্মস্থল পরিবর্তনের প্রবণতা দক্ষিণ কোরিয়ার নিয়োগদাতাদের মধ্যে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। অনেক নিয়োগকর্তার অভিযোগ, কিছু বাংলাদেশি শ্রমিক কর্মস্থলে যোগদানের পর অল্প সময়ের মধ্যেই বেশি বেতনের আশায় কিংবা সামান্য সমস্যার কারণে অন্য প্রতিষ্ঠানে যাওয়ার চেষ্টা করেন, যা নিয়োগ প্রক্রিয়ায় অনিশ্চয়তা সৃষ্টি করে।
দীর্ঘদিন ধরে দক্ষিণ কোরিয়ায় একই প্রতিষ্ঠানে কর্মরত বাংলাদেশি শ্রমিকদের অনেকেই মনে করেন, করোনা-পরবর্তী সময়ে নতুন আসা কিছু শ্রমিকের অসচেতন আচরণ এবং কর্মপরিবেশের সঙ্গে দ্রুত খাপ খাওয়াতে না পারার কারণে বাংলাদেশের সুনাম ক্ষুণ্ন হচ্ছে। বিশেষ করে খাদ্যাভ্যাস, কর্মঘণ্টা এবং শিল্প-কারখানার কঠোর কর্মসংস্কৃতির সঙ্গে মানিয়ে নিতে না পেরে অনেকেই চাকরি পরিবর্তনের পথ বেছে নিচ্ছেন।
দক্ষিণ কোরিয়া সরকার ২০২৫ সালের জন্য বিদেশি শ্রমিকদের E-9 ভিসার আওতায় মোট ১ লাখ ৩০ হাজার শ্রমিক গ্রহণের পরিকল্পনা গ্রহণ করে। যদিও ২০২৪ সালের তুলনায় এ সংখ্যা কিছুটা কম। পাশাপাশি ২০২৬ সালে বিদেশি শ্রমিক গ্রহণের সংখ্যা আরও কমানোর পরিকল্পনার কথাও বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে। ফলে বিদেশি শ্রমিক প্রেরণকারী দেশগুলোর মধ্যে প্রতিযোগিতা আরও তীব্র হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
শ্রমবাজার বিশ্লেষক ও দক্ষিণ কোরিয়ার মুসলিম কমিউনিটির সভাপতি ইয়াসির চৌধুরী বলেন, “কোরিয়ায় বাংলাদেশিদের শ্রমবাজারে বর্তমান চ্যালেঞ্জের প্রধান কারণগুলোর মধ্যে রয়েছে ঘনঘন কর্মস্থল পরিবর্তনের প্রবণতা, প্রশাসনিক দুর্বলতা, ভাষাগত সীমাবদ্ধতা, কারিগরি দক্ষতার ঘাটতি এবং আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতা। এসব কারণে বাংলাদেশি কর্মীদের প্রতি নিয়োগদাতাদের আস্থা কমে যাচ্ছে।”
তিনি আরও বলেন, “এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় বাংলাদেশ দূতাবাসের কূটনৈতিক তৎপরতা বাড়াতে হবে। শ্রমিক সুরক্ষা নিশ্চিত করা, নিয়োগদাতাদের আস্থা পুনর্গঠন এবং দক্ষ জনশক্তি তৈরিতে সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণ জরুরি। পাশাপাশি কোরিয়ান নিয়োগদাতা প্রতিষ্ঠান, HRD Korea এবং সংশ্লিষ্ট সরকারি সংস্থাগুলোর সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ ও বৈঠকের মাধ্যমে বাংলাদেশি কর্মীদের ইতিবাচক ভাবমূর্তি তুলে ধরতে হবে।
ইপিএস বাংলা কমিউনিটির সভাপতি রাজু খাঁন, এবং( ইসো কোরিয়ার) সভাপতি আলামিন ইসলাম এর মতে, বর্তমানে দক্ষিণ কোরিয়ার শ্রমবাজারে ভিয়েতনাম, নেপাল, ইন্দোনেশিয়া, শ্রীলঙ্কা, পাকিস্তান ও উজবেকিস্তানসহ বিভিন্ন দেশের শ্রমিকদের সঙ্গে বাংলাদেশকে প্রতিযোগিতা করতে হচ্ছে। এ অবস্থায় ভাষা শিক্ষা, কারিগরি দক্ষতা এবং কর্মসংস্কৃতির উন্নয়ন ছাড়া বাংলাদেশের জন্য এই বাজার ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়বে।
সংশ্লিষ্টদের মতে, কোরিয়ায় অবস্থিত বাংলাদেশ দূতাবাসের করণীয়ও কম নয়। বিশেষ করে কোরিয়ান নিয়োগদাতাদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ বৃদ্ধি, নতুন নিয়োগকারী প্রতিষ্ঠান খুঁজে বের করা এবং বাংলাদেশি শ্রমিকদের দক্ষতা ও কর্মনিষ্ঠা সম্পর্কে ইতিবাচক ধারণা তৈরি করা সময়ের দাবি।
এ বিষয়ে সিউলে অবস্থিত বাংলাদেশ দূতাবাসের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাদের পক্ষ থেকে কোনো আনুষ্ঠানিক মন্তব্য পাওয়া যায়নি।
সংশ্লিষ্টদের মতে, বাংলাদেশ দূতাবাস, BOESL, HRD Korea এবং দক্ষিণ কোরিয়ার বিভিন্ন নিয়োগকর্তা সংগঠনের মধ্যে যোগাযোগ আরও জোরদার করতে হবে। পাশাপাশি যেসব প্রতিষ্ঠানে এখনো বাংলাদেশি শ্রমিক নেই, সেখানে নতুনভাবে শ্রমিক নিয়োগের সুযোগ সৃষ্টি, কোরিয়ান ভাষা শিক্ষার মানোন্নয়ন, কারিগরি প্রশিক্ষণ সম্প্রসারণ এবং শ্রমিকদের মধ্যে পেশাগত দায়বদ্ধতা বৃদ্ধির উদ্যোগ নিতে হবে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, সঠিক পরিকল্পনা ও কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ করা গেলে দক্ষিণ কোরিয়ার লাভজনক এই শ্রমবাজারে বাংলাদেশ তার অবস্থান আরও সুদৃঢ় করতে পারবে। অন্যথায় দীর্ঘদিনের অর্জিত সম্ভাবনাময় এই বাজার ধীরে ধীরে প্রতিযোগী দেশগুলোর দখলে চলে যাওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।