দক্ষিণ কোরিয়া সরকার স্বল্পমেয়াদী কর্মীদের জন্য ‘ন্যায্য ভাতা’ চালুর সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এর ফলে ১১ মাস চাকরি করলে কর্মীরা অতিরিক্ত প্রায় ২.৪৯ মিলিয়ন ওন ক্ষতিপূরণ পাবেন।
রাষ্ট্রীয় অর্থায়নে পরিচালিত সংস্থাগুলোতে এক বছরের কম মেয়াদের চুক্তিভিত্তিক কর্মীদের ওপর চলা বৈষম্যমূলক কর্মসংস্থান প্রথা দূর করার লক্ষ্যে সরকার নতুন ভাতা চালু এবং তাদের বেতন বাড়ানোর একটি ব্যাপক পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে।
মঙ্গলবার ক্যাবিনেট সভায় শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় এ পরিকল্পনার কথা জানায়। এর লক্ষ্য হলো ১১ মাসের চুক্তি বারবার নবায়নের মতো অন্যায্য প্রথা বন্ধ করা, যাতে সংস্থাগুলো কর্মীদের সেভারেন্স বা বিদায়ী ভাতা প্রদান এবং তাদের স্থায়ী কর্মী হিসেবে নিয়োগ দেওয়া এড়াতে না পারে। আশা করা হচ্ছে, আগামী বছর থেকেই এই নতুন ব্যবস্থা কার্যকর হবে।
২,১০০টি রাষ্ট্রীয় সংস্থার ওপর করা সরকারের এক জরিপ অনুযায়ী, সরকারি খাতে প্রায় ১ লাখ ৪৬ হাজার নির্দিষ্ট মেয়াদের কর্মী রয়েছেন। এর মধ্যে প্রায় অর্ধেক—অর্থাৎ প্রায় ৭৩ হাজার কর্মীর চুক্তি এক বছরের কম সময়ের। এই কর্মীদের গড় মাসিক বেতন ২.৮৯ মিলিয়ন ওন (প্রায় ১,৯৬০ মার্কিন ডলার), তবে যাদের চুক্তি এক বছরের কম, তাদের বেতন কিছুটা কম—প্রতি মাসে প্রায় ২.৮ মিলিয়ন ওন।
এই জরিপের ভিত্তিতে শ্রম মন্ত্রণালয় ১২ মাসের কম মেয়াদের চুক্তি নিরুৎসাহিত করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। একই সঙ্গে যেখানে এই ধরনের কর্মসংস্থান অনিবার্য, সেখানে স্বল্পমেয়াদী কর্মীদের বেতন বাড়ানো হবে। সরকারের দাবি, এর মাধ্যমে তারা বেসরকারি খাতের জন্য একটি ‘আদর্শ নিয়োগকর্তা’ হিসেবে উদাহরণ তৈরি করতে চায়।
এই পরিকল্পনার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো এক বছরের কম সময়ের জন্য নিয়োগপ্রাপ্ত সরকারি কর্মীদের জন্য ‘ন্যায্য ভাতা’ (fair allowance) প্রবর্তন। এই ভাতা নির্ধারণ করা হবে ২.৫৪ মিলিয়ন ওনের একটি ভিত্তি মূল্যের (রেফারেন্স অ্যামাউন্ট) শতাংশ হিসেবে, যাকে মন্ত্রণালয় ‘লিভিং ওয়েজ’ বা জীবনধারণযোগ্য মজুরি বলছে (যা আইনি ন্যূনতম মজুরির ১১৮ শতাংশ)। চুক্তির মেয়াদ যত কম হবে, ভাতার হার তত বেশি হবে; কারণ চাকরির অনিশ্চয়তার প্রভাব এই কর্মীদের ওপর বেশি পড়ে।
এক থেকে দুই মাসের চুক্তিতে থাকা কর্মীরা রেফারেন্স অ্যামাউন্টের ১০ শতাংশ অতিরিক্ত বেতন পাবেন। তিন থেকে চার মাসের ক্ষেত্রে ৯.৫ শতাংশ, পাঁচ থেকে ছয় মাসের ক্ষেত্রে ৯ শতাংশ এবং সাত মাস বা তার বেশি মেয়াদের ক্ষেত্রে এই হার হবে ৮.৫ শতাংশ। এই নিয়ম অনুযায়ী, ১১ মাস কাজ করা একজন কর্মী চুক্তি শেষে নিয়মিত বেতনের বাইরে অতিরিক্ত প্রায় ২.৪৯ মিলিয়ন ওন ভাতা হিসেবে পাবেন।
প্রেসিডেন্ট লি জে-মিউং সরকারের নিজস্ব নির্দিষ্ট মেয়াদের কর্মীদের ১১ মাসের চুক্তিতে আটকে রেখে স্থায়ী মর্যাদা ও বিদায়ী ভাতা না দেওয়ার মতো ‘অনৈতিক’ প্রথার তীব্র সমালোচনা করার কয়েক মাস পর এই পদক্ষেপ নেওয়া হলো।
সরকার সরকারি খাতে বেতনের ব্যবধান কমাতে স্বল্পমেয়াদী কর্মীদের অন্তত ‘লিভিং ওয়েজ’ নিশ্চিত করার দিকেও এগোচ্ছে, যা আগামী বছরের জাতীয় বাজেটে অন্তর্ভুক্ত করা হবে। পাশাপাশি, তাদের খাবার ভর্তুকি এবং ছুটির বোনাসসহ অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা উন্নত করার পরিকল্পনা রয়েছে।
শ্রম মন্ত্রণালয় পুনর্ব্যক্ত করেছে যে, কর্মীদের সাধারণত পূর্ণকালীন চুক্তিতে স্থায়ী কর্মী হিসেবে নিয়োগ দেওয়া উচিত। যেখানে স্বল্পমেয়াদী কর্মসংস্থান অনিবার্য, সেখানে সংশ্লিষ্ট সরকারি সংস্থাগুলোকে অনুমোদনের জন্য কঠোর পর্যালোচনা প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যেতে হবে। যেসব কর্মীকে বারবার স্বল্পমেয়াদী চুক্তিতে রাখা হচ্ছে, তাদের স্থায়ী কর্মী হিসেবে রূপান্তরের বিষয়টিও বিবেচনা করা হবে।
এছাড়াও, সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোকে তাদের নিয়োগকৃত অনিয়মিত বা খণ্ডকালীন কর্মীদের সংখ্যা ও অনুপাত প্রকাশ করতে বাধ্য করা হবে। কোনো প্রতিষ্ঠান যদি অনিয়মিত কর্মীর সংখ্যা বাড়ায়, তবে এর যৌক্তিক কারণ দেখাতে হবে।
শ্রমমন্ত্রী কিম ইয়ং-হুন বলেন, “সরকারি খাতের উচিত অনিয়মিত কর্মীদের ওপর চলা বৈষম্যমূলক কর্মসংস্থান প্রথা সংশোধনে নেতৃত্ব দেওয়া এবং তাদের প্রাপ্য সুযোগ-সুবিধা উন্নত করে একটি রোল মডেল হওয়া। আমরা নিশ্চিত করব, সরকারি খাতের এই অগ্রগতি বেসরকারি খাতেও ছড়িয়ে পড়বে, যাতে প্রত্যেক কর্মী কর্মক্ষেত্রে সম্মানিত বোধ করেন এবং তাদের শ্রমের ন্যায্য মূল্য পান।”
তবে সমালোচকরা সতর্ক করেছেন, এই পরিকল্পনা করদাতাদের অর্থের ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করতে পারে এবং যদি এটি বেসরকারি খাতে প্রসারিত হয়, তবে বেতন কাঠামোতে অস্থিরতা দেখা দিতে পারে। তাদের মতে, বেতন নির্ধারণ হওয়া উচিত চাকরির জটিলতা, প্রয়োজনীয় দক্ষতা ও দায়িত্বের ভিত্তিতে।
তবে বিশেষজ্ঞদের মধ্যে, প্রেসিডেন্টের একটি মন্তব্য করদাতাদের অর্থ এমনভাবে ব্যয় করার অজুহাত হতে পারে না, যা যুক্তিযুক্ত নয়। বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোকে জোর করে বেশি বেতন দিতে বলা হলে, তারা স্বল্পমেয়াদী চুক্তি বন্ধ না করে বরং কর্মী ছাঁটাইয়ের পথ বেছে নিতে পারে।”