বাংলাদেশ ও দক্ষিণ কোরিয়ার অর্থনৈতিক সম্পর্ক আরও জোরদার করতে বাণিজ্য, বিনিয়োগ, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই), অবকাঠামো, জ্বালানি ও শিল্পায়নে সহযোগিতা বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এ লক্ষ্যে সরকারি ও বেসরকারি খাতের সমন্বয়ে একটি যৌথ ওয়ার্কিং গ্রুপ গঠনে সম্মত হয়েছে দুই দেশ। পাশাপাশি বাংলাদেশে নতুন বিনিয়োগের সম্ভাবনা খতিয়ে দেখতে আগ্রহ প্রকাশ করেছে দক্ষিণ কোরিয়ার শীর্ষস্থানীয় বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান।
দক্ষিণ কোরিয়ার রাজধানী সিউলে ২ থেকে ৬ নভেম্বর বাংলাদেশের অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী এমপির নেতৃত্বে প্রতিনিধিদলের ধারাবাহিক বৈঠকে এসব আলোচনা হয়। কোরিয়া সরকারের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা, আর্থিক প্রতিষ্ঠান, প্রযুক্তি সংস্থা ও শীর্ষস্থানীয় ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিরা এতে অংশ নেন। সিইপিএ আলোচনা শেষ হওয়ার পর ২ নভেম্বর কোরিয়ার বাণিজ্যমন্ত্রী জং-সুং পার্কের সঙ্গে বৈঠকে যৌথ ওয়ার্কিং গ্রুপ গঠনের সিদ্ধান্ত হয়। এর মাধ্যমে বিনিয়োগের ক্ষেত্র চিহ্নিতকরণ, ব্যবসায়িক প্রতিবন্ধকতা দূর করা এবং নতুন প্রকল্প বাস্তবায়নে কাজ করবে দুই দেশ। তৈরি পোশাকের বাইরে ইলেকট্রনিকস, সেমিকন্ডাক্টর, জাহাজ নির্মাণ, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, ওষুধ ও উন্নত প্রযুক্তি খাতে সহযোগিতা বাড়ানোর প্রস্তাবও তুলে ধরে বাংলাদেশ।
৩ নভেম্বর কোরিয়া এক্সপোর্ট-ইমপোর্ট ব্যাংকের (কেইএক্সআইএম) সঙ্গে বৈঠকে ২০২৩–২০২৭ মেয়াদের জন্য নির্ধারিত ৩ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের ইকোনমিক ডেভেলপমেন্ট কো-অপারেশন ফান্ড (ইডিসিএফ) নিয়ে আলোচনা হয়। ঢাকা মেট্রোরেল, মতলব উত্তর–গজারিয়া সেতু এবং রেলকোচ প্রকল্পসহ অগ্রাধিকারমূলক উন্নয়ন প্রকল্পের অর্থায়ন ও অগ্রগতি পর্যালোচনা করা হয়।
দক্ষিণ কোরিয়ার বিনিয়োগ করপোরেশনের (কেআইসি) সঙ্গে বৈঠকে বাংলাদেশের অবকাঠামো, নবায়নযোগ্য জ্বালানি ও ডিজিটাল খাতে বিনিয়োগের সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা হয়। এ সময় সম্ভাব্য ১ থেকে ২ বিলিয়ন ডলারের বাংলাদেশ সার্বভৌম তহবিলের মাধ্যমে কোরীয় বিনিয়োগ আকর্ষণের বিষয়টিও উঠে আসে।
প্রযুক্তি খাতে সহযোগিতার অংশ হিসেবে এলজি এআই রিসার্চের সঙ্গে বাংলাদেশের ভাষা ও সংস্কৃতির উপযোগী কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক ভাষা মডেল তৈরির সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা হয়। ফিউরিওসা এআইয়ের সঙ্গেও উচ্চপ্রযুক্তি ও দক্ষতাভিত্তিক শিল্প গড়ে তোলার বিষয়ে আলোচনা করেন প্রতিনিধিদলের সদস্যরা।
এ ছাড়া হুন্দাই গ্লোভিসের সঙ্গে লজিস্টিকস, বন্দর উন্নয়ন ও অটোমোবাইল শিল্প; হানওয়া ওশানের সঙ্গে জাহাজ নির্মাণ ও মেরামত; এবং স্যামসাং ইলেকট্রনিকসের সঙ্গে ইলেকট্রনিকস উৎপাদন, এআই ও দক্ষ জনশক্তি উন্নয়নে সহযোগিতার বিষয় উঠে আসে। প্রতিষ্ঠানগুলো বাংলাদেশে বিনিয়োগ ও ভবিষ্যৎ সহযোগিতার সম্ভাবনা অনুসন্ধানে আগ্রহ প্রকাশ করে।
স্যামসাং সিঅ্যান্ডটির সঙ্গে অবকাঠামো, সৌরবিদ্যুৎ ও নগর উন্নয়ন প্রকল্প নিয়ে আলোচনা হয়। অন্যদিকে ইয়াংওনের উদ্যোগে আয়োজিত ব্যবসায়িক বৈঠকে বাংলাদেশের হালকা প্রকৌশল, যন্ত্রাংশ উৎপাদন, যৌথ বিনিয়োগ ও প্রযুক্তি স্থানান্তরের সম্ভাবনা তুলে ধরা হয়।
সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, এসব উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে বাংলাদেশের শিল্পের বহুমুখীকরণ, প্রযুক্তি স্থানান্তর, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং বৈশ্বিক সরবরাহব্যবস্থায় সম্পৃক্ততা বাড়বে। একই সঙ্গে দক্ষিণ কোরিয়া বাংলাদেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক ও প্রযুক্তিগত অংশীদার হয়ে ওঠার নতুন সুযোগ তৈরি হবে।