কুড়িগ্রামে সরকারি প্রতিবন্ধী সেবা ও সাহায্য কেন্দ্রে বিনামূল্যে পুনর্বাসনমূলক চিকিৎসা সেবা, থেরাপি ও বিভিন্ন সহায়ক উপকরণ নিয়ে উপকৃত হচ্ছেন জেলার বিভিন্ন প্রান্তের মানুষ। জাতীয় প্রতিবন্ধী উন্নয়ন ফাউন্ডেশনের আওতায় সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের অধীনে পরিচালিত এ কেন্দ্রে প্রতিদিন গড়ে ৪০ থেকে ৫০ জন বিভিন্ন ধরনের শারীরিক প্রতিবন্ধিতা, স্ট্রোক, ব্যথাজনিত সমস্যা, কথা বলা ও শোনার সমস্যা নিয়ে সেবা নিতে আসছেন।
কুড়িগ্রাম শহরের মধুরমোড়, নিমবাগান এলাকায় অবস্থিত কেন্দ্রটিতে সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, জেলার প্রত্যন্ত চরাঞ্চলসহ বিভিন্ন এলাকা থেকে নারী, পুরুষ ও শিশুদের নিয়ে অভিভাবকরা চিকিৎসা ও থেরাপি নিতে এসেছেন।
উলিপুর উপজেলার বেগমগঞ্জ ইউনিয়নের প্রত্যন্ত চরাঞ্চল থেকে শিশু সন্তান আবু বক্করকে নিয়ে কেন্দ্রে এসেছেন মজনু ইসলাম। তার শিশুটি কথা বলতে পারে না। শিশুটি কানে কম শোনে কি না তা জানার জন্য কেন্দ্র থেকে শ্রবণ পরীক্ষা করা হয়। সংশ্লিষ্টদের মতে, বাইরে কোনো প্রাইভেট ক্লিনিক বা ডায়াগনস্টিক সেন্টারে এ ধরনের পরীক্ষায় প্রায় ২ হাজার টাকা পর্যন্ত খরচ হতে পারে। তবে প্রতিবন্ধী সেবা ও সাহায্য কেন্দ্রে শিশুটির পরীক্ষাটি বিনামূল্যে করা হয়। প্রায় পাঁচ মিনিটের মধ্যে পাওয়া রিপোর্টে শিশুটির কানে উল্লেখযোগ্য সমস্যা পাওয়া যায়নি। চিকিৎসকদের পরামর্শ অনুযায়ী কথা বলার সক্ষমতা বাড়াতে শিশুটিকে স্পিচ অ্যান্ড ল্যাংগুয়েজ থেরাপি দেওয়ার ব্যবস্থা করা হয়েছে।
কেন্দ্র সূত্রে জানা যায়, এখানে প্রতিবন্ধিতা শনাক্তকরণ, ধরন ও মাত্রা নির্ণয়ের পাশাপাশি ফিজিওথেরাপি, স্পিচ অ্যান্ড ল্যাংগুয়েজ থেরাপি, অকুপেশনাল থেরাপি, শ্রবণ মাত্রা নির্ণয়, দৃষ্টিশক্তির মাত্রা নির্ণয়, কাউন্সেলিং, এনডিডি কর্নার সেবা, মোবাইল থেরাপি ভ্যান ক্যাম্পেইন, সহায়ক উপকরণ বিতরণ, রেফারেল সেবা ও সচেতনতামূলক কার্যক্রম পরিচালনা করা হয়।
ফিজিওথেরাপির মাধ্যমে স্ট্রোক, কোমর, ঘাড়, হাত-পা ও বিভিন্ন ব্যথাজনিত সমস্যায় শারীরিক নড়াচড়া ও কার্যক্ষমতা ফিরিয়ে আনার জন্য প্রয়োজনীয় ফিজিওথেরাপি দেওয়া হয়। স্পিচ অ্যান্ড ল্যাংগুয়েজ থেরাপির মাধ্যমে কথা বলা ও যোগাযোগের বিভিন্ন সমস্যার সমাধান করা হয়।অকুপেশনাল থেরাপির মাধ্যমে দৈনন্দিন কাজ করার সক্ষমতা বাড়াতে সহায়তা করা হয়। শ্রবণ পরীক্ষার মাধ্যমে কানে শোনার মাত্রা নির্ণয় এবং প্রয়োজন অনুযায়ী পরবর্তী পরামর্শ দেওয়া হয়। দৃষ্টিশক্তি পরীক্ষার মাধ্যমে চোখের দৃষ্টির সমস্যা শনাক্ত করা হয়। কাউন্সেলিংয়ের মাধ্যমে রোগী ও অভিভাবকদের প্রয়োজনীয় মানসিক ও সামাজিক পরামর্শ দেওয়া হয়। এনডিডি কর্নারের মাধ্যমে নিউরো ডেভেলপমেন্টাল ডিজঅ্যাবিলিটি বা স্নায়ুবিক বিকাশজনিত সমস্যায় প্রয়োজনীয় সেবা ও পরামর্শ দেওয়া হয়। এছাড়া মোবাইল থেরাপি ভ্যানের মাধ্যমে বিভিন্ন প্রত্যন্ত এলাকায় গিয়ে সেবা দেওয়ার কার্যক্রমও রয়েছে।
কেন্দ্র সূত্র আরও জানায়, ২০১৫ সাল থেকে এ পর্যন্ত প্রায় ৮ হাজার ৫০০ জন ব্যক্তি কে প্রায় ১ লাখ ৮০ হাজার বিভিন্ন ধরনের সেবা দেওয়া হয়েছে। বর্তমানে প্রতিদিন গড়ে ৪০ থেকে ৫০ জন ব্যাক্তি ১০০থেকে ১২০ ধরনের সেবা নিতে আসেন। মাসিক হিসাবে এ সংখ্যা প্রায় ২০০০ থেকে ২৫০০ টি সেবা। রাজারহাট উপজেলার ফরকেরহাট এলাকা থেকে কোমরের ব্যথার চিকিৎসা নিতে আসা মোছা. বিবিজন বলেন, দীর্ঘদিন ধরে কোমরের ব্যথায় ভুগছিলেন তিনি। বিভিন্ন চিকিৎসকের পরামর্শ নিয়ে ও ওষুধ সেবন করেও তেমন উপকার পাচ্ছিলেন না। পরিচিতদের পরামর্শে প্রতিবন্ধী সেবা ও সাহায্য কেন্দ্রে এসে বিনামূল্যে বিভিন্ন থেরাপি ও চিকিৎসা নেওয়ার পর এখন আগের তুলনায় কিছুটা সুস্থ বোধ করছেন। এখানকার পরিবেশ ও সেবার ব্যবস্থাপনাতেও তিনি সন্তোষ প্রকাশ করেন।
ঘাড়ের ব্যথার চিকিৎসা নিতে আসা নুর ইসলাম বলেন, নিয়মিত থেরাপি নেওয়ার পর তার ব্যথার সমস্যা আগের তুলনায় কমেছে। সরকারি এই কেন্দ্রে বিনামূল্যে প্রয়োজনীয় থেরাপি ও পরামর্শ পাওয়ায় তার মতো অনেক মানুষ উপকৃত হচ্ছেন বলেও জানান তিনি।
ছিনাই ইউনিয়ন থেকে আসা হাসান আলী বলেন, প্রয়োজন অনুযায়ী চিকিৎসক ও থেরাপিস্টরা রোগীর সমস্যা শুনে পরামর্শ দেন এবং থেরাপি প্রদান করেন। দূর এলাকা থেকে এলেও এখানে সেবা পাওয়ার কারণে তাদের অনেকটাই সুবিধা হচ্ছে।
অফিস সূত্রে জানা যায়, শুধু চিকিৎসা ও থেরাপি নয়, অসচ্ছল প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের জন্য সহায়ক উপকরণ দেওয়ার ব্যবস্থাও রয়েছে। এ পর্যন্ত প্রায় ৮০০টি হুইলচেয়ার, ১৫ থেকে ১৮টি তিন চাকার সাইকেলসহ শ্রবণ সমস্যায় আক্রান্ত অনেক মানুষকে কানের মেশিন দেওয়া হয়েছে। চিকিৎসার ক্ষেত্রে আর্থিক সহায়তার প্রয়োজন হলে সমাজসেবা অফিসের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগের ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বিনামূল্যে চিকিৎসা, থেরাপি, পরীক্ষা, পরামর্শ ও সহায়ক উপকরণ পাওয়ার সুযোগ থাকায় জেলার প্রত্যন্ত এলাকার মানুষের জন্য কেন্দ্রটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। বিশেষ করে যেসব পরিবারের পক্ষে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে নিয়মিত থেরাপি বা পরীক্ষা করানোর খরচ বহন করা কঠিন, তাদের জন্য সরকারি এই সেবা আর্থিক চাপ কমাতে সহায়তা করছে।
তবে সেবার পরিধি বাড়লেও জনবল সংকট রয়েছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। কনসালট্যান্ট ফিজিওথেরাপি, থেরাপি সহকারী,টেকনিশিয়ান ও ষ্টাফ সহ মোট ৭ জন জনবল দিয়ে বর্তমানে কেন্দ্রটির কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। সেবা নিতে আগ্রহী মানুষের সংখ্যা দিন দিন বাড়ায় প্রয়োজনের তুলনায় জনবল কম রয়েছে বলে জানান দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রতিবন্ধী বিষয়ক কর্মকর্তা ও কনসালট্যান্ট ফিজিওথেরাপি ডা. মো. আরিফুর রহমান।
তিনি বলেন, দিন দিন এই সেবায় মানুষের চাপ বাড়ছে। রোগী আসার পর প্রাথমিকভাবে প্রতিবন্ধিতার ধরন ও মাত্রা নির্ণয় করে প্রয়োজন অনুযায়ী সেবা দেওয়া হয়। কুড়িগ্রামের মানুষ যাতে কোনো ধরনের হয়রানির শিকার না হন, সে বিষয়ে কঠোর নজরদারি রাখা হয়। একজন রোগীর নিবন্ধন থেকে শুরু করে প্রয়োজনীয় সেবা সরকারি ব্যবস্থাপনায় বিনামূল্যে দেওয়া হচ্ছে। তবে রোগীর চাপের তুলনায় জনবল সংকট রয়েছে। এই সংকট কাটানো গেলে আরও ভালোভাবে সেবা দেওয়া সম্ভব হবে।
এদিকে সাম্প্রতিক সময়ে কুড়িগ্রাম প্রতিবন্ধী সেবা ও সাহায্য কেন্দ্রকে ঘিরে একটি স্বার্থান্বেষী মহল বিভিন্ন মাধ্যমে কেন্দ্রে সুনাম নষ্টের অপচেষ্টা চালাচ্ছে। এ বিষয়ে ডা. মো. আরিফুর রহমান বলেন, সরকারি সেবামূলক কার্যক্রম নিয়ে বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়ানোর বিষয়টি খতিয়ে দেখা হচ্ছে। স্বার্থান্বেষী মহলের সঙ্গে বর্তমান বা সাবেক কোনো কর্মচারীর সম্পৃক্ততা রয়েছে কি না, সেটিও যাচাই করা হচ্ছে। সাধারণ মানুষকে সঠিক তথ্য যাচাই না করে কোনো প্রকার অপপ্রচারে বিভ্রান্ত না হওয়ার জন্য তিনি আহ্বান জানান ।সংশ্লিষ্টদের মতে, সরকারি এই সেবাগুলো সম্পর্কে মানুষের মধ্যে সঠিক তথ্য পৌঁছে দেওয়া জরুরি। কারণ প্রত্যন্ত এলাকার অনেক রোগী এসব সেবার সুযোগ সম্পর্কে জানেন না। একই সঙ্গে কোনো অনিয়ম বা অভিযোগ থাকলে তা যাচাই করে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে উপস্থাপন করা প্রয়োজন। সেবার পরিধি আরও বাড়ানো, প্রয়োজনীয় জনবল নিশ্চিত করা এবং প্রত্যন্ত এলাকায় প্রচার কার্যক্রম জোরদার করা গেলে কুড়িগ্রামের আরও বেশি মানুষ বিনামূল্যে চিকিৎসা ও পুনর্বাসনমূলক সেবার আওতায় আসতে পারবেন।