কুড়িগ্রামের মাওলানা ওলী উল্লাহকে ঘিরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নারী বিষয়ক ছবি, ফটোকার্ড, ভিডিও ও বিভিন্ন মন্তব্য ছড়িয়ে পড়াকে কেন্দ্র করে তৈরি হয়েছে নানা প্রশ্ন। এসব প্রচারণায় তার সাবেক কর্মস্থল আত-তাহযিব আইডিয়াল মাদ্রাসা এবং তার বর্তমান কর্মস্থল ওহী ইন্টারন্যাশনাল স্কুলের নামও বিভিন্নভাবে উঠে এসেছে। বিষয়টি নিয়ে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশিত কনটেন্ট এবং প্রাপ্ত নথি ও তথ্য যাচাই করে প্রকৃত ঘটনা অনুসন্ধানের চেষ্টা করেছে অনুসন্ধানী টিম।
অনুসন্ধানে জানা যায়, গত ১২ সেপ্টেম্বর মাওলানা ওলী উল্লাহ আত-তাহযিব আইডিয়াল মাদ্রাসার প্রিন্সিপাল ও পরিচালক আরিফুল ইসলামকে নিয়ে ফেসবুকে একটি পোস্ট করেন। এ বিষয়ে মাওলানা ওলী উল্লাহর সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি জানান, গত ১৫ জুলাই আত-তাহযিব আইডিয়াল মাদ্রাসা থেকে পদত্যাগের পর প্রতিষ্ঠানটির পক্ষ থেকে পরোক্ষভাবে তার বিরুদ্ধে অভিভাবকসহ বিভিন্ন মহলে মিথ্যা ও কুরুচিপূর্ণ মন্তব্য প্রচার করা হচ্ছে বলে কয়েকটি সূত্রের মাধ্যমে জানতে পারেন। এতে ক্ষুব্ধ হয়ে তিনি আরিফুল ইসলামের সঙ্গে WhatsApp এ যোগাযোগ করে অভিযোগের সত্যতা ও প্রমাণ নিয়ে সরাসরি আলোচনায় বসার আহ্বান জানান। তার দাবি, এতে কোনো সাড়া না পাওয়ায় তিনি বিষয়টি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সংক্ষেপে তুলে ধরেন।
ওলী উল্লাহর অভিযোগ, এর পর অভিযোগের জবাব দেওয়ার পরিবর্তে আরিফুল ইসলামের ঘনিষ্ঠ বন্ধু হিসেবে পরিচিত আব্দুল্লাহ আল মামুনের মাধ্যমে ব্যবহৃত ‘মাহমুদ আবদুল্লাহ’ নামের একটি ফেসবুক আইডি থেকে তাকে নিয়ে নারী বিষয়ক বিভিন্ন ছবি, ফটোকার্ড ও ভিডিও প্রচার করা শুরু হয়। এসব কনটেন্টে তার বর্তমান কর্মস্থল ওহী ইন্টারন্যাশনাল স্কুলের নামও জড়ানো হয় বলে তিনি দাবি করেন।
অনুসন্ধানে পাওয়া কিছু নথি ও তথ্য যাচাই করে ‘মাহমুদ আবদুল্লাহ’ নামে ব্যবহৃত ফেসবুক আইডিটির সঙ্গে আব্দুল্লাহ আল মামুনের সম্পৃক্ততার অভিযোগের বিষয়টি সামনে আসে। ওই আইডি থেকে মাওলানা ওলী উল্লাহকে নিয়ে নারী বিষয়ক ছবি, ফটোকার্ড ও ভিডিও প্রচারের তথ্যও অনুসন্ধানে পাওয়া গেছে বলে সংশ্লিষ্ট নথিতে দেখা যায়। তবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের কোনো আইডির প্রকৃত ব্যবহারকারী নির্ধারণের ক্ষেত্রে প্রযুক্তিগতভাবে নিশ্চিত হওয়ার জন্য প্ল্যাটফর্মের তথ্য বা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তদন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা।
অন্যদিকে আত-তাহযিব আইডিয়াল মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষ ওলী উল্লাহর অভিযোগ অস্বীকার করেছে। প্রতিষ্ঠানটির অধ্যক্ষের বক্তব্য অনুযায়ী, ওলী উল্লাহ নিজেই স্বেচ্ছায় চাকরি থেকে পদত্যাগ করেছেন। আরবি শিক্ষক হিসেবে যোগদানের পাশাপাশি তিনি প্রতিষ্ঠানের ডিজিটাল সেক্টরে ভিডিও ধারণ ও সম্পাদনার কাজ করতেন। এসব অতিরিক্ত কাজের জন্য তিনি অতিরিক্ত পারিশ্রমিক দাবি করেছিলেন। কিন্তু প্রতিষ্ঠানটির পক্ষ থেকে অতিরিক্ত বেতন দেওয়া সম্ভব নয় বলে জানানো হলে তিনি স্বেচ্ছায় পদত্যাগ করেন বলে কর্তৃপক্ষ দাবি করে। তার বিরুদ্ধে কোনো বিভ্রান্তিকর তথ্য প্রতিষ্ঠান থেকে প্রচার করা হয়নি বলেও জানায় তারা।
তবে ওলী উল্লাহর দাবি, চাকরি থেকে পদত্যাগের পর তার বিরুদ্ধে প্রায় এক বছর আগের একটি বিষয় নতুন করে সামনে এনে ব্যক্তি চরিত্র হননের চেষ্টা করা হচ্ছে। এ বিষয়ে আত-তাহযিব আইডিয়াল মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষের বক্তব্য, ওলী উল্লাহ নিজেই পদত্যাগ করেছেন এবং প্রতিষ্ঠান থেকে তার বিরুদ্ধে কোনো অপপ্রচার চালানো হয়নি।
এদিকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশিত একটি ভিডিওতে এক নারী মাওলানা ওলী উল্লাহর সঙ্গে কথিত সম্পর্কের বিষয়ে অভিযোগ করেন। বিষয়টির সত্যতা যাচাই করতে অনুসন্ধানী টিম ওই নারীর সঙ্গে যোগাযোগ করে। তিনি ওলী উল্লাহর সঙ্গে যোগাযোগ ও সম্পর্কের দাবি করেন এবং তার বিরুদ্ধে প্রতারণার অভিযোগ তোলেন। তবে এ বিষয়ে জানতে চাওয়া হলে তিনি কোনো নির্ভরযোগ্য নথি বা যাচাইযোগ্য প্রমাণ উপস্থাপন করতে পারেননি এবং এক পর্যায়ে ফোনের সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেন।
প্রায় সাত মাস আগের একটি বিষয় সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কেন সামনে আনা হয়েছে জানতে চাইলে ওই নারী জানান, কুড়িগ্রামের একটি প্রতিষ্ঠানের একাধিক ব্যক্তি তার সঙ্গে যোগাযোগ করেছিলেন এবং তাকে এ বিষয়ে ভিডিও বক্তব্য দেওয়ার জন্য উৎসাহিত করেছিলেন। পরবর্তীতে তার ভিডিও বক্তব্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশ করা হয় বলে তিনি জানান। তবে ওই ব্যক্তিদের পরিচয় ও তাদের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার বিষয়টি স্বাধীনভাবে নিশ্চিত করা যায়নি।
অন্যদিকে মাওলানা ওলী উল্লাহ তার বিরুদ্ধে ওঠা অনৈতিক সম্পর্কের অভিযোগ সম্পূর্ণ অস্বীকার করেন। তিনি বলেন, তার পূর্বের কর্মস্থলে থাকাকালীন প্রায় সাত মাস আগের একটি বিষয় তখনই মীমাংসিত হয়েছিল এবং বিষয়টি মিথ্যা প্রমাণিত হয়েছিল। তার দাবি, পরিকল্পিতভাবে সেই পুরোনো বিষয় সামনে এনে তার ব্যক্তি চরিত্র হননের চেষ্টা করা হচ্ছে। তিনি আরও বলেন, অভিযোগটি সত্য হলে আত-তাহযিব আইডিয়াল মাদ্রাসা তখনই তার বিরুদ্ধে প্রশাসনিক ব্যবস্থা নিতে পারত। কিন্তু এমন কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি এবং পরবর্তীতে তিনি ব্যক্তিগত কারণে পরপর দুইবার পদত্যাগ করে প্রতিষ্ঠান থেকে চলে আসেন।
ওলী উল্লাহর সঙ্গে ওই নারীর যোগাযোগের বিষয়ে পূর্বের তথ্যও অনুসন্ধানে উঠে এসেছে। তার ভাষ্য অনুযায়ী, আত-তাহযিব আইডিয়াল মাদ্রাসায় একটি চাকরির বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের সময় তিনি নিয়োগ বোর্ডের সদস্য ছিলেন। নাগেশ্বরীর পোয়াড়াডাঙ্গা এলাকার নিলুফা ইয়াসমিন ওই পদে আবেদন করলেও তাকে পরীক্ষা বা ভাইবার জন্য ডাকা হয়নি। এরপর চাকরির বিষয়ে নিলুফা ইয়াসমিন তার সঙ্গে যোগাযোগ করেন। ওলী উল্লাহর দাবি, চাকরি সংক্রান্ত বিষয়ে তিন থেকে চার দিন তাদের মধ্যে যোগাযোগ হয়েছিল। তবে কোনো অনৈতিক সম্পর্ক ছিল না বলে তিনি দাবি করেন।
অন্যদিকে নিলুফা ইয়াসমিনের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি দাবি করেন, ওলী উল্লাহ তার বৈবাহিক বিষয় গোপন রেখে তার সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তুলেছিলেন এবং তাকে বিয়ের প্রলোভন দেখিয়েছিলেন। তবে কথিত সম্পর্কের বিষয়ে কোনো নথি বা যাচাইযোগ্য প্রমাণ চাইলে তিনি তা উপস্থাপন করতে পারেননি। পরবর্তীতে তিনি ফোনের সংযোগ বিচ্ছিন্ন করেন।
নাগেশ্বরীর স্থানীয় কয়েকজন বাসিন্দার সঙ্গেও কথা বলে ওই নারীকে নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিভিন্ন কর্মকাণ্ডের কথা জানা যায়। তারা দাবি করেন, তার একাধিক ফেসবুক আইডি রয়েছে এবং বিভিন্ন সময় বিভিন্ন ব্যক্তিকে নিয়ে এসব আইডি থেকে পোস্ট করা হয়।
এদিকে ওহী ইন্টারন্যাশনাল স্কুলের নাম জড়িয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভিডিও ও ফটোকার্ড প্রকাশের ঘটনায় প্রতিষ্ঠানটির পক্ষ থেকেও কুড়িগ্রাম সদর থানায় সাধারণ ডায়েরি করা হয়েছে বলে জানানো হয়। মাওলানা ওলী উল্লাহর পক্ষ থেকেও একটি সাধারণ ডায়েরি করার কথা জানা গেছে।
স্কুলের নাম জড়িয়ে ভিডিও প্রকাশের বিষয়ে প্রতিষ্ঠানের প্রিন্সিপাল মোঃ শহিদুল ইসলামের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি জানান, বিষয়টি নিয়ে ইতোমধ্যে থানায় সাধারণ ডায়েরি করা হয়েছে। ফেক আইডি থেকে প্রকাশিত ভিডিওটি পরে ডিলিট করা হয়েছে এবং একটি ফটোকার্ড থেকে স্কুলের নাম মুছে দিয়ে দুঃখ প্রকাশ করা হয়েছে। ভবিষ্যতে প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে মিথ্যা বা মানহানিকর তথ্য পরিবেশন করা হলে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও তিনি জানান। একই সঙ্গে সংশ্লিষ্ট নারী ও তার পরিবারের পক্ষ থেকেও পরবর্তীতে দুঃখ প্রকাশ এবং ভবিষ্যতে এ ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি না করার কথা জানানো হয়েছে বলে তিনি দাবি করেন।
পুরো ঘটনাপ্রবাহ পর্যালোচনা করে দেখা যায়, মাওলানা ওলী উল্লাহ ও নিলুফা ইয়াসমিনের মধ্যে একসময় যোগাযোগ ছিল বলে উভয় পক্ষের বক্তব্যে উঠে এসেছে। তবে সেই যোগাযোগ কেবল চাকরি সংক্রান্ত ছিল, নাকি এর বাইরে ব্যক্তিগত কোনো সম্পর্ক তৈরি হয়েছিল, সে বিষয়ে দুই পক্ষের বক্তব্য পরস্পরবিরোধী। নিলুফা ইয়াসমিন সম্পর্ক ও বিয়ের প্রলোভনের অভিযোগ তুলেছেন, অন্যদিকে ওলী উল্লাহ তা অস্বীকার করেছেন। অভিযোগের পক্ষে এই অনুসন্ধানে কোনো নির্ভরযোগ্য নথি বা প্রত্যক্ষ প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
একইভাবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ‘মাহমুদ আবদুল্লাহ’ নামের আইডি থেকে প্রকাশিত নারী বিষয়ক প্রচারণার সঙ্গে আব্দুল্লাহ আল মামুনের সম্পৃক্ততার অভিযোগের বিষয়ে কিছু নথি ও তথ্য অনুসন্ধানে পাওয়া গেলেও এর চূড়ান্ত সত্যতা নির্ধারণে আরও প্রযুক্তিগত ও আইনগত যাচাই প্রয়োজন। আত তাযহীব কর্তৃপক্ষও ওই প্রচারণার সঙ্গে তাদের কোনো সম্পৃক্ততা থাকার অভিযোগ অস্বীকার করেছে।
সার্বিক অনুসন্ধানে মাওলানা ওলী উল্লাহর বিরুদ্ধে প্রচারিত নারী বিষয়ক অভিযোগের সঙ্গে তার গভীরতর বা অনৈতিক সম্পৃক্ততার নির্ভরযোগ্য প্রমাণ এই অনুসন্ধানে পাওয়া যায়নি। একই সঙ্গে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচারিত এসব অভিযোগের পেছনে কারা সক্রিয় এবং এর উদ্দেশ্য কী, সে বিষয়টিও পুরোপুরি নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
পুরো ঘটনাটি পর্যালোচনা করলে এটি মাওলানা ওলী উল্লাহ ও তার সাবেক কর্মস্থল আত-তাহযিব আইডিয়াল মাদ্রাসার সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মধ্যে তৈরি হওয়া বিরোধের পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নারী বিষয়ক প্রচারণায় রূপ নেওয়ার একটি ঘটনা হিসেবে সামনে আসে। তবে এই বিরোধের প্রকৃত কারণ এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচারণার নেপথ্যে কারা রয়েছে, তা নিশ্চিত করতে আরও তথ্য ও নথি যাচাই প্রয়োজন। একই সঙ্গে তৃতীয় কোনো পক্ষ ব্যক্তিগত বিরোধকে ব্যবহার করে কুড়িগ্রামের দুটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত করার চেষ্টা করছে কিনা, সেটিও অনুসন্ধানের দাবি রাখে। প্রকৃত সত্য উদঘাটনে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর বক্তব্যের পাশাপাশি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রযুক্তিগত তথ্য, নথিপত্র এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তদন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।