ঢাকায় ক্লাব ক্রিকেট খেলার সময়ই পরিবারের আর্থিক সংকটের কথা মাথায় রেখে মালয়েশিয়ায় পাড়ি জমান নাজমুস সাকিব। কিন্তু সাকিবের জীবনজুড়ে ছিল ক্রিকেট। তাই সংগ্রামের সেই প্রবাসজীবনও তাকে খেলাটি থেকে আলাদা করতে পারেনি।
টেপ টেনিসে বিভিন্ন জায়গায় খেলতে খেলতেই একসময় মালয়েশিয়ার জাতীয় দলে জায়গা করে নেন সাকিব। এবার মালয়েশিয়া দলের বাংলাদেশ সফরে জন্মভূমির বিপক্ষেই খেলতে ঢাকায় এসেছেন তিনি। সেই অভিজ্ঞতা ও নিজের পথচলা নিয়ে গণমাধ্যমের সঙ্গে কথা বলেছেন ২৬ বছর বয়সী এই উইকেটকিপার-ব্যাটার।
বাংলাদেশে খুলনা জেলার হয়ে বয়সভিত্তিক পর্যায়ে একাধিক দলে খেলেছেন নাজমুস সাকিব। আরো খেলার কথা থাকলেও কাজের উদ্দেশ্যে মালয়েশিয়ায় চলে যান।
গণমাধ্যমকে সাকিব বলেন, ‘২০০৪ সালে বাবা মারা যাওয়ার পর থেকে আমাদের অনেক কষ্টের মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে। একসময় আমরা ভাত খেয়েছি শুধু পেঁয়াজের ভর্তা কিংবা সরিষার তেল দিয়ে।
ওইটা খেয়েই অনুশীলনে যেতাম। আমার বড় বোন ওই সময় টিউশনি করত। সেখান থেকে যে টাকা আসত, সেটা দিয়ে আমাদের পরিবার চলত। কিন্তু আমার ক্রিকেট চালিয়ে যাওয়ার উপায় ছিল না। তাই মালয়েশিয়া চলে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিই।’
মালয়েশিয়ায় গিয়ে পুরো দেশ ঘুরে নিয়মিত টেপ টেনিস ক্রিকেট খেলেছেন সাকিব। ভালো খেলার কারণে সব জায়গাতেই তার কদর ছিল। সেখান থেকে কিছু টাকা-পয়সা পেতেন। একদিন মালয়েশিয়া জাতীয় দলের একজন ক্রিকেটারের সঙ্গে দেখা হয়। সেই ক্রিকেটারই তার ব্যাটিং স্টাইল দেখে এসএসএফ প্যান্থারস নামের একটি ক্লাবে খেলার সুযোগ করে দেন।
এসএসএফ প্যান্থারস হয়ে একটি প্রস্তুতি ম্যাচে ৫০ বলে অপরাজিত ১০১ রানের ইনিংস খেলেন সাকিব। পরবর্তীতে নেগারি সেম্বিলান রাজ্য দলে জায়গা করে নেন। রাজ্য দলের হয়ে একটি টি-টোয়েন্টি টুর্নামেন্টে ৯ ম্যাচে আমি ৪২২ রানের মতো করেন। এরপর তাকে আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি।
ওই টুর্নামেন্টের পরই মালয়েশিয়ান ক্রিকেট বোর্ড সাকিবের সঙ্গে যোগাযোগ করে। জাতীয় দলের কোচ এবং টিম ম্যানেজমেন্টের সঙ্গে কী কথা হয়েছিল, সেটিও বলেছেন তিনি, ‘তারা আমাকে বলেছিল, তুমি তো এখানে (মালয়েশিয়ায়) তিন বছর ধরে আছো। আইসিসির নিয়ম অনুযায়ী, এ রকম ক্ষেত্রে কেউ তিন বছর থাকলে জাতীয় দলে খেলার সুযোগ দেওয়া যায়। কিন্তু আমরা চাচ্ছি তোমাকে আরো দুই-এক বছর দেখতে।’
মালয়েশিয়ায় দিন-রাত এক করে পরিশ্রমের গল্পও শুনিয়েছেন নাজমুস সাকিব, ‘আমি ৬ বছর সিলিফোকাস এসডিএন ব্র্যান্ড নামের একটি কোম্পানিতে কাজ করেছি। সকাল ৮টায় গিয়ে রাত সাড়ে ১০টায় বাসায় ফিরতাম। আমার কাজ ছিল কনটেইনার নামানো। ধরুন, কনটেইনারে ৪০ বা ৫০ কেজির একেকটা বাক্স থাকত। ওগুলো ঘাড়ে করে নামাতে হতো। দিনে চারটা কনটেইনার আনলোড করতাম। প্রতিদিন আনুমানিক ২২০০ থেকে ২৪০০ বাক্স আমি নামাতাম। ক্লান্তি নিয়ে বাসায় গিয়ে রাতেই অনুশীলন শুরু করতাম। একটা মোজায় বলটা বেঁধে দড়ির সঙ্গে ঝুলিয়ে হালকা নকিং করে নিতাম, যাতে আই কনট্যাক্ট ভালো থাকে।’
অবশেষে ২০২৪ সালে এসিসি প্রিমিয়ার কাপ দিয়ে মালয়েশিয়া জাতীয় দলে অভিষেক হয় নাজমুস সাকিবের। দলটির হয়ে এখন পর্যন্ত চারটি আন্তর্জাতিক টি-টোয়েন্টি খেলেছেন তিনি।
জাতীয় দলে জায়গা পাওয়ার পর মালয়েশিয়া ক্রিকেট বোর্ডই তাকে সিলিফোকাস এসডিএন ব্র্যান্ডের চাকরি ছাড়ায়। এখন তিনি দেশটির বোর্ডের চুক্তিভুক্ত ক্রিকেটার।
মিরপুরে আগামী শনিবার (৮ আগস্ট) বাংলাদেশ হাই-পারফরম্যান্স (এইচপি) দলের বিপক্ষে প্রথম টি-টোয়েন্টি খেলবে মালয়েশিয়া জাতীয় দল। এ ম্যাচেই জন্মভূমির বিপক্ষে সাকিবকে খেলতে দেখা যেতে পারে।