ব্রাজিল জাতীয় দলের জার্সিতে আর দেখা যাবে না তারকা ফুটবলার নেইমার ডি সিলভা জুনিয়রকে। দীর্ঘ আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের ইতি টানার ঘোষণা দিয়েছেন সেলেসাওর সর্বকালের অন্যতম সেরা এই ফুটবলার। কোপা সুদামেরিকানায় ভেনেজুয়েলার ইউনিভার্সিদাদ সেন্ট্রালের বিপক্ষে সান্তোসের জয় শেষে জাতীয় দল থেকে অবসরের সিদ্ধান্তের কথা নিজেই নিশ্চিত করেছেন তিনি।
ভিলা বেলমিরো স্টেডিয়ামের মিক্সড জোনে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলতে গিয়ে আবেগঘন কণ্ঠে নেইমার বলেন, ‘জাতীয় দলের সঙ্গে আমার সময় শেষ। আমি ইতিহাস গড়েছি, অসাধারণ সময় কাটিয়েছি। দেশের জন্য নিজের রক্ত, জীবন- সবকিছু উজাড় করে দিয়েছি। সবসময় লড়েছি। কিন্তু এখন আর চাই না’
২০২৬ বিশ্বকাপে ব্রাজিলের স্বপ্ন ভেঙে যায় শেষ ষোলোতেই। নরওয়ের কাছে ২-১ গোলে হেরে বিদায় নেয় পাঁচবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়নরা। ওই ম্যাচই হয়ে রইল নেইমারের ব্রাজিল ক্যারিয়ারের শেষ অধ্যায়।
ম্যাচে নরওয়ের হয়ে জোড়া গোল করেন আর্লিং হালান্ড। অন্যদিকে যোগ করা সময়ে পেনাল্টি থেকে একমাত্র গোলটি করেন নেইমার। শেষ বাঁশি বাজার পর কান্নায় ভেঙে পড়েছিলেন তিনি। তখনই জাতীয় দল ছাড়ার ইঙ্গিত দিয়েছিলেন, যদিও ওই সময় আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেননি। অবশেষে কয়েকদিন পর নিজের সিদ্ধান্ত স্পষ্ট করে জানিয়ে দিলেন ব্রাজিলের নাম্বার টেন।
১৩০ ম্যাচে ৮০ গোল
দীর্ঘ আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারে ব্রাজিলের হয়ে ১৩০টি ম্যাচ খেলেছেন নেইমার। করেছেন ৮০টি গোল এবং সতীর্থদের দিয়ে করিয়েছেন আরও ৫৮টি গোল।
পরিসংখ্যানের পাশাপাশি ব্রাজিলের আক্রমণভাগের অন্যতম প্রধান ভরসা ছিলেন তিনি। ড্রিবলিং, সৃজনশীলতা, গতি ও গোল করার দক্ষতায় এক দশকের বেশি সময় ধরে সেলেসাওদের আক্রমণভাগকে নেতৃত্ব দিয়েছেন।
ব্যক্তিগত সাফল্য অসাধারণ হলেও জাতীয় দলের হয়ে বড় শিরোপার ঝুলিটা খুব ভারী হয়নি নেইমারের। সিনিয়র দলের হয়ে তার একমাত্র বড় ট্রফি ২০১৩ সালের ফিফা কনফেডারেশন্স কাপ। এছাড়া ২০১৬ রিও অলিম্পিকে অনূর্ধ্ব-২৩ দলের হয়ে ব্রাজিলকে প্রথমবারের মতো অলিম্পিক ফুটবলে স্বর্ণপদক এনে দিয়েছিলেন।
২০২৬ বিশ্বকাপ ছিল নেইমারের চতুর্থ বিশ্বকাপ। এর আগে ২০১৪, ২০১৮ ও ২০২২ আসরেও খেলেছেন তিনি। তবে চারটি বিশ্বকাপ খেলেও ব্রাজিলকে কাঙ্ক্ষিত ষষ্ঠ শিরোপা এনে দিতে পারেননি। বিশ্বকাপে ব্রাজিলের হয়ে তার গোলসংখ্যা ৯, যা তাকে দেশটির বিশ্বকাপ ইতিহাসের তৃতীয় সর্বোচ্চ গোলদাতার তালিকায় জায়গা দিয়েছে।
এছাড়া বিশ্বকাপে মোট ১৪টি ম্যাচ খেলেছেন তিনি। এই সংখ্যায় তিনি কিংবদন্তি পেলে, গোলরক্ষক জিলমার ও লেয়াওয়ের পাশে নিজের নাম লিখিয়েছেন।
নরওয়ের বিপক্ষে ম্যাচটি শুধু বিদায়ের জন্যই নয়, নানা ঘটনার কারণেও আলোচনায় ছিল। যোগ করা সময়ে পেনাল্টি থেকে গোল করার পর নরওয়ের গোলরক্ষক অরইয়ান নিল্যান্ডের সঙ্গে তার বাকবিতণ্ডা নতুন বিতর্কের জন্ম দেয়।
তবে শেষ পর্যন্ত পরাজয়ের হতাশা ঢাকতে পারেননি নেইমার। মাঠেই চোখের জল ফেলেন তিনি। আর সেই কান্নাই যেন ছিল ব্রাজিলের জার্সিতে তার দীর্ঘ পথচলার শেষ দৃশ্য।
এক যুগের অবসান
নেইমারের বিদায়ের মাধ্যমে ব্রাজিল ফুটবলের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের সমাপ্তি ঘটল। প্রায় দেড় দশক ধরে জাতীয় দলের সবচেয়ে বড় তারকা ছিলেন তিনি। অসংখ্য স্মরণীয় মুহূর্ত, অসাধারণ গোল, জাদুকরী ড্রিবল আর অগণিত প্রত্যাশার ভার কাঁধে নিয়ে খেলেছেন দেশের হয়ে।
তবে বিশ্বকাপ জয়ের স্বপ্ন অপূর্ণ রেখেই আন্তর্জাতিক ফুটবলকে বিদায় জানালেন ব্রাজিলের ইতিহাসের অন্যতম সেরা এই ফুটবলার। এখন সেলেসাওকে নতুন প্রজন্মের হাতেই খুঁজে নিতে হবে ভবিষ্যতের পথ।