চাকরির বাজারের চাহিদা অনুযায়ী শিক্ষার্থীদের দক্ষ করে তুলতে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ব্যবস্থায় বড় ধরনের পরিবর্তনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এর অংশ হিসেবে বর্ষভিত্তিক পরীক্ষা পদ্ধতির পরিবর্তে সেমিস্টার পদ্ধতি চালুর প্রস্তুতি নিয়েছে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। পাশাপাশি সিলেবাস ও শিক্ষাক্রম পরিবর্তন, ট্রেড কোর্স চালু এবং আউটকাম-বেইসড এডুকেশন (ওবিই) কারিকুলাম বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ অন্যান্য পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো বছরে দুটি সেমিস্টার চালুর পরিকল্পনা রয়েছে। তবে প্রয়োজনীয় অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতার কারণে এটি বাস্তবায়নে প্রায় ২ বছর সময় লাগতে পারে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
এ বিষয়ে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. এ এস এম আমানুল্লাহ বলেন, ‘শিক্ষাক্রম ও সিলেবাস পরিবর্তনের প্রস্তুতি আমাদের রয়েছে। শিক্ষার্থীদের দক্ষ কর্মী হিসেবে তৈরি করতে সেমিস্টার পদ্ধতিতে যাওয়ার প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। বিজি প্রেসের (বাংলাদেশ সরকারি মুদ্রণালয়) সীমাবদ্ধতার কারণে এই মুহূর্তে সেমিস্টার পদ্ধতিতে যেতে পারছি না। তবে দুই বছরের মধ্যে যাওয়ার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।’
আসছে একগুচ্ছ ট্রেড কোর্স
চাকরির বাজার বিবেচনায় অনার্স ও পাস কোর্সের শিক্ষার্থীদের দক্ষ করে তুলতে একগুচ্ছ ট্রেড কোর্স চালু করবে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়। এছাড়া বর্তমানে বিশ্ববিদ্যালয়ের সব বিভাগের অনার্স শিক্ষার্থীদের জন্য ইংরেজি ও আইসিটি বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। উপাচার্য বলেন, ‘নতুন ব্যবস্থায় একাধিক ট্রেড কোর্স যুক্ত করা হবে। এর মধ্যে অন্তত একটি ট্রেড কোর্স বাধ্যতামূলক থাকবে। শিক্ষার্থীরা নিজেদের পছন্দ অনুযায়ী কোর্স নির্বাচন করতে পারবেন।’
তিনি বলেন, ‘গ্র্যাজুয়েশন করে চাকরি পাওয়ার জন্য কাউকে যাতে বসে থাকতে না হয়, সে জন্য শিক্ষা ব্যবস্থায় এই পরিবর্তন আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। আমরা ট্রেড কোর্সের একটা ঝুলি ছাত্রদের উপহার দেবো। একটা বাস্কেট থাকবে। সেখান থেকে শিক্ষার্থীরা নিজেরাই বেছে নেবে কোন কোর্সটি করবে। ফ্রিল্যান্সিং থেকে শুরু করে ডিজিটাল মার্কেটিং, ডাটা সায়েন্স, হসপিটালিটি ম্যানেজমেন্ট, কেয়ার-গিভার পর্যন্ত বিভিন্ন কোর্স থাকবে।’
তবে এসব কোর্স কলেজে পড়ানো হবে নাকি অন্য প্রতিষ্ঠানের সার্টিফিকেট মৌখিক পরীক্ষার মাধ্যমে গ্রহণ করা হবে, তা নিয়ে কাজ চলছে।
উপাচার্য জানান, মেকানিক্যালসহ বিভিন্ন টেকনিক্যাল, ভোকেশনাল ও কারিগরি কোর্স চালুর বিষয়ে সংশ্লিষ্ট বিশ্ববিদ্যালয়, কলেজ, বোর্ড এবং এনএসডির সঙ্গে আলোচনা চলছে।
উপাচার্য বলেন, ‘কেউ যদি মনে করে কম্পিউটারের বেসিক শিখবে, কম্পিউটার কীভাবে অ্যাসেম্বল করতে হয়, ফ্রিজ-এসি কীভাবে মেরামত করতে হয়, সেগুলো শেখানো হবে। কোথায় কোন কোর্স চালানো সম্ভব, কোথায় রিসোর্স পারসন আছে এবং টেকনিক্যাল ও ভোকেশনাল প্রতিষ্ঠান থেকে কোথায় সহযোগিতা পাওয়া যাবে, তা নিয়ে স্টাডি চলছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘কেউ যদি মনে করে তিনি দুবাই, সৌদি আরব, আমেরিকা, কানাডা বা জাপান যাবেন, তাহলে সংশ্লিষ্ট দেশের ভাষা শেখানোরও উদ্যোগ নেওয়া হবে।’
দুই বছরের মধ্যে সেমিস্টার, আছে চ্যালেঞ্জও
বর্তমানে প্রচলিত বর্ষভিত্তিক পরীক্ষা পদ্ধতির পরিবর্তে সেমিস্টার পদ্ধতি চালু করতে অন্তত এক থেকে দুই বছর সময় লাগবে বলে জানিয়েছেন উপাচার্য। তিনি বলেন, ‘এখনই না। এক বছর-দুই বছর লাগবে। ভবিষ্যতের পরিকল্পনায় এখন যে সংস্কারটা করছি, সেটা হলো বছরে পরীক্ষা দিচ্ছে ঠিকই, কিন্তু বছর শেষে কী পরীক্ষা দিচ্ছে, কী পড়াচ্ছেন শিক্ষকরা। যে সিলেবাসে পড়ানো হচ্ছে, এই সিলেবাস দিয়ে কী চলবে? উত্তর হলো, চলবে না।’
জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রতিবছর লাখ লাখ শিক্ষার্থীর পরীক্ষা নেওয়া হয়। সেমিস্টার পদ্ধতি চালু হলে বছরে প্রতিটি বিষয়ের দুটি করে পরীক্ষা নিতে হবে। সে ক্ষেত্রে অনার্সে আটটি, মাস্টার্সে চারটি এবং বিএ পাস কোর্সে ছয়টি পরীক্ষা হবে। এছাড়া আইন, বিএড, সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি ইনস্টিটিউটসহ অন্যান্য ইনস্টিটিউটের পরীক্ষাও রয়েছে।
উপাচার্য বলেন, ‘এসবের পরীক্ষা নিতে সক্ষম জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়। কিন্তু বিজি প্রেস এই মুহূর্তে প্রশ্ন দিতে পারবে না। এই অবস্থার মধ্যেও আমরা সেমিস্টারে যেতে চাই। সেমিস্টারে অনেক সুযোগ-সুবিধা আছে। সেই সেমিস্টারে গেলে শিক্ষার্থীদের আগ্রহ আরেকটু বাড়বে। আর তাছাড়া পরে হলেও সেমিস্টারে যেতেই হবে। এখন যে ব্যবস্থা রয়েছে, তাতে সেমিস্টারে যেতে বছরে আমাকে ২০টি প্রশ্ন (২০ সেট) লাগবে। বিজি প্রেসের সেই ক্যাপাসিটি নেই। বিজি প্রেস ছাড়া ভিন্ন ব্যবস্থাপনায় প্রশ্ন ছাপানো ঝুঁকিপূর্ণ। দেশের ৬৪ জেলায় প্রশ্ন ট্রেজারিতে পাঠাতে হয়। সরকারি ট্রেজারি থেকে শিক্ষক ও অধ্যক্ষরা প্রশ্ন তোলেন। বিজি প্রেস ছাড়া অন্য সিকিউরিটি প্রিন্টিং প্রেসগুলোরও এ ধরনের বিশাল পরিসরে প্রশ্ন ছাপানোর সক্ষমতা নেই। আর প্রাইভেট লেভেলে নিয়ে যাওয়াটাও ঝুঁকিপূর্ণ।’
তবে এই সংকট দূর করতে রাজধানীর তেজগাঁওয়ে সরকারি বিজি প্রেসে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য আলাদা ভবন ও সেকশন করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে বলেও জানান উপাচার্য। তিনি বলেন, ‘বিজি প্রেসের সঙ্গে আমাদের চুক্তিও হয়েছে গত সরকারের সময়। সেই চুক্তি অনুযায়ী আমরা কিছু টাকাও দিয়ে রেখেছি। কিন্তু কাজটা আগায়নি। ওই চুক্তি বাস্তবায়ন করতে পারলে এবং কিছু অভ্যন্তরীণ বিষয় সমাধান করা গেলে সেমিস্টার সিস্টেমে যাওয়া সম্ভব হবে।’
পরিবর্তন হচ্ছে সিলেবাস
বিদ্যমান সিলেবাস পরিবর্তনের কাজও শুরু হয়েছে। পরিকল্পনা অনুযায়ী দুই ধাপে সিলেবাস সংশোধন করা হবে। প্রথম ধাপে অর্ধেক এবং আগামী ডিসেম্বরের মধ্যে বাকি অংশের কাজ শেষ করার পরিকল্পনা রয়েছে।
উপাচার্য বলেন, ‘এই সিলেবাসে যারা ২০২৭ ও ২০২৮ সালে পাস করে বের হবে, তারা এক ধরনের দক্ষ কর্মী হিসেবে বের হবে। বিদ্যমান ব্যবস্থায় যে ধারণা ছিল—জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পড়ে বাংলাও জানে না, ইংরেজিও জানে না, কোনও ধরনের দক্ষতাও নেই, অথচ পাস করে বেরিয়ে গেছে; ওইদিন শেষ হচ্ছে।’
ওবিই কারিকুলাম বাস্তবায়নের প্রস্তুতি
দেশব্যাপী শিক্ষার গুণগত মান উন্নয়নে মডেল টিচিং পদ্ধতি তৈরির ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়। এ লক্ষ্যে গত বৃহস্পতিবার (৯ জুলাই) বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনেট হলে ‘ডেভেলপমেন্ট অব আউটকাম-বেইসড এডুকেশন কারিকুলাম’ শীর্ষক দিনব্যাপী কর্মশালা অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের আধুনিক ও কর্মনির্ভর কারিকুলাম নিয়ে আলোচনা হয়।
উপাচার্য বলেন, ‘শ্রেণিকক্ষে পাঠদান যুগোপযোগী ও আনন্দময় করতে হলে বিদ্যমান পদ্ধতি পরিবর্তন করতে হবে। শিক্ষার্থীদের দক্ষতাভিত্তিক, চাকরির বাজারের চাহিদা অনুযায়ী শিক্ষাদান নিশ্চিত করতে হবে। অন্যথায় আমরা পিছিয়ে যাবো। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় দেশের শিক্ষা খাতে অন্যতম প্রধান স্টেকহোল্ডার হওয়ায় আমাদেরই এ ক্ষেত্রে বড় ভূমিকা পালন করতে হবে। শিক্ষার্থীদের যোগ্য ও দক্ষ করে গড়ে তুলতে হবে।’
তিনি বলেন, ‘বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় আধুনিক ও উন্নত বাংলাদেশ বিনির্মাণে উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থাকে যুগোপযোগী করা অপরিহার্য। আউটকাম-বেইসড এডুকেশন বা ওবিই কারিকুলাম প্রবর্তনের মাধ্যমে আমরা শিক্ষার্থীদের কেবল তাত্ত্বিক জ্ঞান নয়, কর্মক্ষেত্রের উপযোগী দক্ষতা ও সৃজনশীলতা অর্জনে সহায়তা করতে সক্ষম হবো। আমাদের লক্ষ্য এমন একটি শিক্ষাক্রম তৈরি করা, যা আন্তর্জাতিক মানদণ্ড বজায় রাখবে এবং শিক্ষার্থীদের জাতীয় ও আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারের উপযোগী করে গড়ে তুলবে। ওবিই কারিকুলাম বাস্তবায়নে শিক্ষকদের ভূমিকা হবে মুখ্য। তাদের নিয়মিত প্রশিক্ষণ ও আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহারে অভ্যস্ত হয়ে উঠতে হবে।’