দক্ষিণ কোরিয়ার ইতিহাসে নজিরবিহীন তাপপ্রবাহে সবচেয়ে বেশি চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছেন নির্মাণ, উৎপাদন, কৃষি ও জাহাজ নির্মাণ শিল্পে কর্মরত শ্রমিকরা। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক বাংলাদেশি শ্রমিকও প্রতিদিন খোলা আকাশের নিচে কিংবা তীব্র গরমের পরিবেশে কাজ করছেন। রেকর্ড ভাঙা তাপমাত্রার কারণে বড় বড় শিল্পপ্রতিষ্ঠান কাজের নিয়মে ব্যাপক পরিবর্তন আনলেও ছোট প্রতিষ্ঠানে কর্মরত অনেক শ্রমিক এখনও পর্যাপ্ত সুরক্ষা পাচ্ছেন না।
দেশজুড়ে চলমান তীব্র তাপপ্রবাহে দক্ষিণ গিয়ংসাং প্রদেশের ইয়াংসানে সর্বোচ্চ ৪২.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা রেকর্ড হয়েছে, যা দেশটির আবহাওয়ার ইতিহাসে অন্যতম সর্বোচ্চ। রাজধানী সিউলসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে টানা কয়েকদিন ধরে সর্বোচ্চ মাত্রার তাপপ্রবাহ সতর্কতা জারি রয়েছে।
তাপপ্রবাহের তীব্রতা এতটাই বেড়েছে যে প্রেসিডেন্ট লি জে-মিয়ং সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও স্থানীয় প্রশাসনকে সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থায় থেকে শ্রমিক ও সাধারণ মানুষের জীবন রক্ষায় সব ধরনের ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন। বহিরাঙ্গনে কর্মরত শ্রমিকদের জন্য বাধ্যতামূলক বিশ্রাম নিশ্চিত করার ওপরও বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
ক্ষমতাসীন দলের সংসদ সদস্য কিম উই-সাংয়ের তথ্য অনুযায়ী, ২০২২ সাল থেকে ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত তাপজনিত ১৯৫টি কর্মস্থল দুর্ঘটনা সরকারি স্বীকৃতি পেয়েছে। এর মধ্যে ২০ জন শ্রমিকের মৃত্যু হয়েছে। চলতি বছরের জুনের শেষ পর্যন্তই ১৩টি দুর্ঘটনা, যার মধ্যে ৪টি মৃত্যু, নথিভুক্ত হয়েছে।
গত বছর হিটস্ট্রোকে এক শ্রমিকের মৃত্যুর ঘটনায় প্রথমবারের মতো একটি নির্মাণ কোম্পানিকে Serious Accidents Punishment Act-এর আওতায় দোষী সাব্যস্ত করা হয়। এরপর থেকেই বড় শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলো কর্মীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে নতুন নতুন পদক্ষেপ গ্রহণ শুরু করে।
নির্মাণ ও ভারী শিল্পে কর্মরত শ্রমিকদের জন্য দীর্ঘ লাঞ্চ বিরতি, নির্ধারিত সময় পরপর বাধ্যতামূলক বিশ্রাম, কুলিং ভেস্ট, ঠান্ডা পানি, ইলেক্ট্রোলাইট পানীয় এবং বিশ্রামকেন্দ্রের ব্যবস্থা করা হয়েছে। বিভিন্ন কোম্পানি তাপমাত্রার মাত্রা অনুযায়ী কাজ ও বিশ্রামের সময়সূচি নির্ধারণ করছে।
জাহাজ নির্মাণ শিল্পেও অতিরিক্ত বিশ্রাম, দীর্ঘ মধ্যাহ্ন বিরতি এবং শত শত কুলিং স্টেশন চালু করা হয়েছে। অনেক প্রতিষ্ঠানে শ্রমিকরা শারীরিকভাবে অসুস্থ বোধ করলে কোনো ধরনের শাস্তির আশঙ্কা ছাড়াই কাজ বন্ধ করার সুযোগ পাচ্ছেন।
তবে এসব সুবিধা মূলত বড় কোম্পানিগুলোতেই সীমাবদ্ধ। সরকারি তথ্য বলছে, তাপজনিত দুর্ঘটনার অর্ধেকেরও বেশি ঘটেছে ৫০ জনের কম কর্মী রয়েছে এমন ছোট প্রতিষ্ঠানে। কৃষি, নির্মাণ ও অন্যান্য খোলা কর্মস্থলে কর্মরত অভিবাসী শ্রমিকরাই সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছেন।
এদিকে উত্তর গিয়ংসাং প্রদেশে প্রবীণ কৃষক ও মাঠে কর্মরত শ্রমিকদের সতর্ক করতে লাউডস্পিকার ও তাপ শনাক্তকারী ক্যামেরাযুক্ত ড্রোন মোতায়েন করা হয়েছে। ড্রোনের মাধ্যমে বারবার ঘোষণা করা হচ্ছে, "দীর্ঘ সময় রোদে কাজ করবেন না, তাপপ্রবাহের সতর্কতা চলছে।" কর্তৃপক্ষের আশা, এ উদ্যোগ তাপজনিত দুর্ঘটনা কমাতে সহায়ক হবে।
দক্ষিণ কোরিয়ায় বসবাসরত বাংলাদেশি শ্রমিকদের একটি বড় অংশ নির্মাণ, উৎপাদন, কৃষি ও বিভিন্ন কারখানায় কর্মরত। প্রচণ্ড গরমে দীর্ঘ সময় কাজ করায় তাদেরও হিটস্ট্রোক, পানিশূন্যতা ও শারীরিক অসুস্থতার ঝুঁকি বেড়েছে। অনেকেই জানিয়েছেন, দুপুরের প্রচণ্ড গরমে কাজ করা অত্যন্ত কষ্টকর হয়ে উঠেছে। যদিও বড় কিছু প্রতিষ্ঠানে অতিরিক্ত বিশ্রাম ও নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে, ছোট প্রতিষ্ঠানের অনেক শ্রমিক এখনও একইভাবে ঝুঁকি নিয়ে কাজ করে যাচ্ছেন।
কোরিয়া মুসলিম কমিউনিটির সভাপতি ইয়াসির চৌধুরী বলছেন, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে দক্ষিণ কোরিয়ায় তাপপ্রবাহের তীব্রতা ও স্থায়িত্ব ক্রমেই বাড়ছে। তাই শুধু বড় শিল্পপ্রতিষ্ঠান নয়, ছোট কারখানা, নির্মাণ প্রকল্প এবং কৃষিখাতেও সমানভাবে শ্রমিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা জরুরি। পর্যাপ্ত পানি পান, নির্ধারিত বিরতি নেওয়া, সরাসরি রোদে দীর্ঘ সময় কাজ এড়িয়ে চলা এবং অসুস্থতা অনুভব করলে দ্রুত চিকিৎসা নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন তারা।
রেকর্ড তাপপ্রবাহের এই সময়ে দক্ষিণ কোরিয়ায় কর্মরত হাজারো বাংলাদেশি শ্রমিকের জন্য কর্মস্থলে নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করা এখন শুধু শ্রম অধিকার নয়, মানবিক দায়িত্বও।