বাংলাদেশ মানবাধিকার কমিশন, কুড়িগ্রাম জেলার উলিপুর উপজেলার দুর্গাপুর ইউনিয়ন শাখার সাবেক সাধারণ সম্পাদক মো. আব্দুর রাজ্জাকের বিরুদ্ধে প্রতারণা, জালিয়াতি, মামলা বাণিজ্য, বিদেশে লোক পাঠানোর নামে অর্থ আত্মসাৎ এবং মানবাধিকার কমিশনের পরিচয় ব্যবহার করে অর্থ আদায়ের অভিযোগ উঠেছে। এসব কর্মকাণ্ডে তার সহযোগী হিসেবে একই কমিটির সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক মো. ফেরদৌস ওয়াহিদ ও সাবেক প্রচার ও প্রকাশনা সম্পাদক মো. এরশাদুল হকের নামও আলোচনায় এসেছে।
স্থানীয় সূত্র ও ভুক্তভোগীদের অভিযোগে জানা যায়, দীর্ঘদিন ধরে একটি সংঘবদ্ধ চক্রের মাধ্যমে নিরীহ মানুষকে বিভিন্ন মামলায় জড়িয়ে আর্থিক সুবিধা আদায়ের চেষ্টা করা হচ্ছে। অভিযোগ রয়েছে, বিদেশে পাঠানোর প্রলোভন দেখিয়ে অনেকের কাছ থেকে টাকা গ্রহণ করা হলেও পরবর্তীতে ভুয়া ভিসা প্রদান কিংবা বিদেশে পাঠাতে ব্যর্থ হওয়ার ঘটনা ঘটেছে।
ভুক্তভোগীদের দাবি, বিদেশে পাঠানোর নামে ফাঁকা স্ট্যাম্পে স্বাক্ষর নেওয়া হতো। পরে টাকা ফেরত চাইলে সেই স্ট্যাম্প ব্যবহার করে উল্টো ভুক্তভোগীদের বিরুদ্ধেই আইনি নোটিশ পাঠানোর চেষ্টা করা হয়েছে। প্রতিবেদকের হাতে এ-সংক্রান্ত বেশ কিছু নথি ও অভিযোগপত্র এসেছে।
অভিযোগ অনুযায়ী, আব্দুর রাজ্জাক তার ভায়রা মেজবাবুল ইসলামের আত্মীয়স্বজনদের বিদেশে পাঠানোর কথা বলে প্রায় ১১ লাখ টাকা গ্রহণ করেন। নির্ধারিত সময়ে বিদেশে পাঠাতে না পারায় টাকা ফেরতের দাবিতে ভুক্তভোগীরা বিভিন্ন জায়গায় ধর্ণা দিচ্ছেন। অভিযোগ রয়েছে, টাকা ফেরত চাইলে প্রাণনাশের হুমকিও দেওয়া হয়েছে। এ বিষয়ে একাধিক নথি ও তথ্য প্রতিবেদকের কাছে সংরক্ষিত রয়েছে।
শুধু তাই নয়, আব্দুর রাজ্জাকের আপন ভাগ্নি সালমার কাছ থেকেও বিদেশে পাঠানোর প্রতিশ্রুতি দিয়ে প্রায় ৮ লাখ টাকা নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। ভুক্তভোগী পরিবারের দাবি, বিদেশে পাঠানোর আশ্বাসে টাকা গ্রহণ করা হলেও নির্ধারিত সময়ে বিদেশে পাঠানো হয়নি এবং অর্থও ফেরত দেওয়া হয়নি। এ ঘটনায় পরিবারটি আর্থিক ও মানসিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে অভিযোগ করা হয়েছে। এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট নথিপত্র ও তথ্যও প্রতিবেদকের কাছে সংরক্ষিত রয়েছে।
শুধু বিদেশে পাঠানোর নামে অর্থ আত্মসাতের অভিযোগই নয়, জমিজমা সংক্রান্ত বিরোধকে কেন্দ্র করে মানুষকে মামলায় জড়িয়ে অর্থ আদায়ের অভিযোগও রয়েছে তার বিরুদ্ধে।
এমনই এক ঘটনায় মো. মোজ্জামেল হক বাচ্চুর কাছে ৪ লাখ টাকার একটি লিগ্যাল নোটিশ পাঠানো হয় বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। প্রথমে বিষয়টি জমিজমা সংক্রান্ত বিরোধ হিসেবে উপস্থাপন করা হলেও পরবর্তীতে নোটিশে উল্লেখ করা হয়, পারিবারিক সমস্যার কারণে বাচ্চু নাকি আব্দুর রাজ্জাকের কাছ থেকে ৪ লাখ টাকা ধার নিয়েছিলেন। তবে ওই অর্থের উৎস সম্পর্কে সন্তোষজনক কোনো ব্যাখ্যা পাওয়া যায়নি বলে অভিযোগ করেন সংশ্লিষ্টরা।
এদিকে বিভিন্ন ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে ভয়ভীতি প্রদর্শন করে চাঁদা দাবির অভিযোগও উঠেছে এই চক্রের বিরুদ্ধে। সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাদের বিরুদ্ধে চাঁদাবাজির কিছু তথ্য ছড়িয়ে পড়লে বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় আসে।
বাংলাদেশ মানবাধিকার কমিশন, কুড়িগ্রাম আঞ্চলিক শাখার সভাপতি মো. মিনহাজুল ইসলামের সঙ্গে কথা হলে তিনি জানান, দীর্ঘদিন ধরে আব্দুর রাজ্জাকের বিরুদ্ধে বিভিন্ন অনিয়ম ও প্রতারণার অভিযোগ থাকলেও অনেক ভুক্তভোগী ভয়ে মুখ খুলতে সাহস পাননি। পরবর্তীতে একের পর এক অভিযোগ সংগঠনের কাছে আসতে থাকলে তদন্ত করে গত ২০ মে ২০২৬ তারিখে আব্দুর রাজ্জাক, ফেরদৌস ওয়াহিদ ও এরশাদুল হককে সংগঠন থেকে বহিষ্কার করা হয়।
তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশ মানবাধিকার কমিশনের কার্ড দেওয়ার কথা বলে বিভিন্ন মানুষের কাছ থেকে অর্থ গ্রহণের অভিযোগ আমরা পেয়েছি। বহিষ্কারের পর আব্দুর রাজ্জাক সংগঠনের বিরুদ্ধে ক্ষুব্ধ হয়ে বাংলাদেশ মানবাধিকার কমিশন, কুড়িগ্রাম আঞ্চলিক শাখা সম্পর্কে বিভিন্ন বিভ্রান্তিকর, ভিত্তিহীন ও অপপ্রচারমূলক তথ্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমসহ বিভিন্ন মাধ্যমে ছড়িয়ে বেড়াচ্ছেন। এসব তথ্যের কোনো সত্যতা নেই।
মিনহাজুল ইসলাম বলেন, আব্দুর রাজ্জাক ও তার সহযোগীরা বর্তমানে বাংলাদেশ মানবাধিকার কমিশনের কোনো পর্যায়ের সদস্য নন। তারা যদি কোথাও সংগঠনের পরিচয় ব্যবহার করেন বা মানবাধিকার কমিশনের প্রতিনিধি দাবি করেন, তাহলে তাদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য প্রশাসন ও সাধারণ জনগণের সহযোগিতা কামনা করছি।
তিনি আরও জানান, ভবিষ্যতে যাতে তারা মানবাধিকার কমিশনের নাম ব্যবহার করে কোনো ধরনের প্রতারণা, জালিয়াতি বা অর্থ আত্মসাৎ করতে না পারে, সে লক্ষ্যে কুড়িগ্রাম জেলা প্রশাসক ও পুলিশ সুপারের কাছে লিখিত অভিযোগ দেওয়ার প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে।
বাংলাদেশ মানবাধিকার কমিশন, কুড়িগ্রাম আঞ্চলিক শাখার সাধারণ সম্পাদক মো. তাজুল ইসলাম খন্দকার বলেন, অভিযোগ পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই তাদের বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। তারা বর্তমানে সংগঠনের কোনো দায়িত্বে নেই।
অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য জানতে মো. আব্দুর রাজ্জাকের ব্যবহৃত মোবাইল নম্বরে একাধিকবার কল করা হলেও ফোনটি বন্ধ পাওয়া যায়। ফলে এ বিষয়ে তার বক্তব্য নেওয়া সম্ভব হয়নি।
এলাকাবাসীর দাবি, আব্দুর রাজ্জাক ও তার সহযোগীদের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত করে সত্যতা যাচাই করা হোক। একই সঙ্গে অভিযোগ প্রমাণিত হলে দ্রুত আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণেরও দাবি জানিয়েছেন তারা।
স্থানীয়দের মতে, দীর্ঘদিন ধরে চলমান এসব অভিযোগের সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত সত্য উদঘাটন এবং দায়ীদের আইনের আওতায় আনা এখন সময়ের দাবি।