বৃহস্পতিবার ৪ জুন ২০২৬ ২১ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩
 
শিরোনাম:


দেশের অনিবার্য এক নাম শহীদ জিয়াউর রহমান
প্রকাশ: শনিবার, ৩০ মে, ২০২৬, ৭:৪০ এএম  আপডেট: ৩০.০৫.২০২৬ ৫:৪২ পিএম  (ভিজিট : )
 

রাষ্ট্রগঠন ও আধুনিক জাতীয়তাবাদী রাজনীতির ইতিহাসে এক অনিবার্য নাম শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান। তিনি শুধু একজন সামরিক কর্মকর্তা কিংবা রাষ্ট্রনায়ক ছিলেন না, তিনি ছিলেন এক সংকটকালীন সময়ের সাহসী নেতৃত্বের প্রতীক, যিনি যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশকে পুনর্গঠনের স্বপ্ন দেখিয়েছিলেন। বহুদলীয় গণতন্ত্রের পুনঃপ্রবর্তন, উৎপাদনমুখী অর্থনীতি, গ্রামকেন্দ্রিক উন্নয়ন, বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও আত্মনির্ভরশীল বিনির্মাণে তাঁর অবদান দেশের ইতিহাসে গভীরভাবে স্মরণীয় হয়ে আছে। ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের উত্তাল সময়ে যখন পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী নিরস্ত্র বাঙালির ওপর গণহত্যা চালাচ্ছিল, তখন মেজর জিয়াউর রহমান চট্টগ্রামের কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র থেকে সর্ব প্রথম স্বাধীনতার ঘোষণা পাঠ করেন। সেই ঘোষণা মুক্তিকামী বাঙালির মনে সাহস ও উদ্দীপনা সৃষ্টি করে এবং স্বাধীনতার সংগ্রামকে সংগঠিত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। তিনি শুধু ঘোষণাতেই থেমে থাকেননি, সম্মুখযুদ্ধে অংশ নিয়ে একজন দক্ষ সেক্টর কমান্ডার হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন। দেশের স্বাধীনতার জন্য নিজের জীবন বাজি রেখে যুদ্ধ করা এই সাহসী সেনানায়ক পরবর্তীকালে রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব নিয়ে প্রমাণ করেন, তিনি কেবল যোদ্ধাই নন, একজন দূরদর্শী রাষ্ট্রনায়কও।

স্বাধীনতার পর বাংলাদেশ যখন রাজনৈতিক অস্থিরতা, দুর্ভিক্ষ, অর্থনৈতিক সংকট ও প্রশাসনিক বিশৃঙ্খলায় বিপর্যস্ত, তখন জিয়াউর রহমান দেশের মানুষের মধ্যে নতুন আশা জাগান। তিনি বিশ্বাস করতেন, “গ্রাম উন্নয়ন মানেই বাংলাদেশের প্রকৃত উন্নয়ন।” তাই তার প্রবর্তিত “৬৮ হাজার গ্রাম বাঁচলে বাংলাদেশ বাঁচবে” স্লোগান ছিল মূলত একটি উন্নয়ন দর্শন। তিনি বুঝেছিলেন, বাংলাদেশের প্রাণশক্তি গ্রামে নিহিত। তাই শহরকেন্দ্রিক উন্নয়নের পরিবর্তে তিনি কৃষি, গ্রামীণ অবকাঠামো ও স্থানীয় অর্থনীতিকে অগ্রাধিকার দেন। রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের পর তিনি কৃষিকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেন। খাল খনন কর্মসূচি, সেচ ব্যবস্থার সম্প্রসারণ, কৃষিঋণ সহজীকরণ এবং উন্নত বীজ ও প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে তিনি কৃষিতে এক নতুন জাগরণ সৃষ্টি করেন। তার সময়েই দেশে “সবুজ বিপ্লব” বাস্তব রূপ পেতে শুরু করে। খাদ্য ঘাটতির বাংলাদেশ ধীরে ধীরে খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতার পথে এগিয়ে যায়। কৃষকের মুখে হাসি ফোটানোকে তিনি রাষ্ট্র পরিচালনার অন্যতম প্রধান দায়িত্ব হিসেবে বিবেচনা করতেন।

শুধু কৃষিই নয়, শিল্পায়ন ও অর্থনৈতিক পুনর্গঠনেও তিনি যুগান্তকারী পদক্ষেপ গ্রহণ করেন। বাংলাদেশের তৈরি পোশাক শিল্পের ভিত্তি তার সময়েই শক্তিশালী হতে শুরু করে। বিদেশি বিনিয়োগ উৎসাহিত করা, বেসরকারি খাতকে উন্নয়নের অংশীদার করা এবং রপ্তানিমুখী শিল্পনীতি গ্রহণের মাধ্যমে তিনি দেশের অর্থনীতিকে নতুন গতিপথে পরিচালিত করেন। আজকের বাংলাদেশের অর্থনীতির অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি তৈরি পোশাক শিল্পের প্রাথমিক বিকাশে তার নীতিগত ভূমিকা বিশেষভাবে স্মরণীয়। জিয়াউর রহমান মানবসম্পদ উন্নয়নেও অসামান্য অবদান রাখেন। তিনি উপলব্ধি করেছিলেন যে, জনশক্তিকে দক্ষ সম্পদে রূপান্তর করতে পারলে বৈদেশিক কর্মসংস্থানের মাধ্যমে দেশের অর্থনীতি শক্তিশালী হবে। তার উদ্যোগেই মধ্যপ্রাচ্যসহ বিভিন্ন দেশে বাংলাদেশি শ্রমবাজার উন্মুক্ত হয়। ফলে রেমিটেন্স প্রবাহ শুরু হয়, যা পরবর্তীকালে বাংলাদেশের অর্থনীতির অন্যতম ভিত্তিতে পরিণত হয়েছে। রাজনৈতিক ক্ষেত্রে তার সবচেয়ে বড় অবদান ছিল বহুদলীয় গণতন্ত্র পুনঃপ্রবর্তন। স্বাধীনতার পর দেশে যখন একদলীয় শাসনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল, তখন জিয়াউর রহমান রাজনৈতিক বহুমতের পথ উন্মুক্ত করেন। সংবাদপত্রের স্বাধীনতা, রাজনৈতিক দল গঠন এবং গণতান্ত্রিক চর্চাকে তিনি উৎসাহিত করেন। তার প্রতিষ্ঠিত Bangladesh Nationalist Party বা বিএনপি বাংলাদেশের জাতীয়তাবাদী রাজনীতিকে নতুন আদর্শিক ভিত্তি দেয়। “বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ” ধারণার মাধ্যমে তিনি স্বাধীন দেশের নিজস্ব পরিচয়, সংস্কৃতি ও সার্বভৌমত্বকে নতুনভাবে উপস্থাপন করেন।

পররাষ্ট্রনীতিতেও তিনি ছিলেন অত্যন্ত বাস্তববাদী ও দূরদর্শী। মুসলিম বিশ্বের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক জোরদারে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। ইসলামিক সহযোগিতা সংস্থা বা Organisation of Islamic Cooperation-এ বাংলাদেশের সক্রিয় অংশগ্রহণ নিশ্চিত করেন এবং মুসলিম বিশ্বের কাছে বাংলাদেশের মর্যাদা বৃদ্ধি করেন। একই সঙ্গে তিনি পশ্চিমা বিশ্ব, চীন এবং প্রতিবেশী রাষ্ট্রগুলোর সঙ্গে ভারসাম্যপূর্ণ কূটনৈতিক সম্পর্ক বজায় রাখেন। তার পররাষ্ট্রনীতি ছিল—“সবার সঙ্গে বন্ধুত্ব, কারও সঙ্গে বৈরিতা নয়” নীতির বাস্তব প্রয়োগ। শহীদ জিয়াউর রহমান ছিলেন কর্মমুখী নেতৃত্বের প্রতীক। তিনি মাঠপর্যায়ে প্রশাসনকে সক্রিয় করতে গ্রাম সরকার, স্বেচ্ছাশ্রম, গণমুখী উন্নয়ন কার্যক্রম ও স্থানীয় উদ্যোগকে উৎসাহিত করেন। সরকারি কর্মকর্তাদের জনগণের কাছে নিয়ে যাওয়ার জন্য তিনি জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে উন্নয়ন কর্মকাণ্ড তদারকির ব্যবস্থা করেন। সাধারণ মানুষের সমস্যা সরাসরি শোনার অভ্যাস তাকে জনগণের নেতা হিসেবে বিশেষ মর্যাদা দেয়। তার ব্যক্তিজীবনও ছিল অত্যন্ত সাদামাটা ও শৃঙ্খলাপূর্ণ। সততা, দেশপ্রেম ও দায়িত্ববোধের কারণে তিনি জনগণের কাছে দ্রুত জনপ্রিয় হয়ে ওঠেন। রাজনৈতিক মতভেদ থাকা সত্ত্বেও তার দেশপ্রেম, সাহসিকতা ও উন্নয়ন ভাবনার প্রশংসা বহু মহলেই স্বীকৃত। তিনি বিশ্বাস করতেন, জাতীয় ঐক্য, উৎপাদনশীলতা এবং কঠোর পরিশ্রমই পারে বাংলাদেশকে আত্মমর্যাদাশীল রাষ্ট্রে পরিণত করতে।

দুর্ভাগ্যজনকভাবে ১৯৮১ সালের ৩০ মে চট্টগ্রামে এক সামরিক অভ্যুত্থানে তিনি শাহাদাতবরণ করেন। তার মৃত্যু বাংলাদেশের রাজনীতিতে এক গভীর শূন্যতা সৃষ্টি করে। কিন্তু মৃত্যু তাকে ইতিহাস থেকে মুছে দিতে পারেনি। আজও বাংলাদেশের রাজনীতি, অর্থনীতি ও উন্নয়ন ভাবনায় তার প্রভাব সুস্পষ্টভাবে অনুভূত হয়। বর্তমান বাংলাদেশে কৃষি উৎপাদন, রেমিটেন্স, পোশাক শিল্প ও বহুদলীয় রাজনৈতিক সংস্কৃতির যে ভিত্তি দৃশ্যমান, তার পেছনে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের অবদান অনস্বীকার্য। তিনি ছিলেন এমন একজন নেতা, যিনি যুদ্ধবিধ্বস্ত একটি জাতিকে আত্মবিশ্বাসী হতে শিখিয়েছিলেন। তার উন্নয়ন দর্শন ছিল জনগণকেন্দ্রিক, বাস্তবমুখী ও আত্মনির্ভরশীলতার ওপর প্রতিষ্ঠিত। ইতিহাসের বিচারে জিয়াউর রহমান শুধু একটি রাজনৈতিক দলের প্রতিষ্ঠাতা নন; তিনি বাংলাদেশের রাষ্ট্রগঠন ও উন্নয়ন অভিযাত্রার এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। তার আদর্শ, কর্মনিষ্ঠা ও দেশপ্রেম নতুন প্রজন্মের জন্য অনুপ্রেরণার উৎস হয়ে থাকবে। বাংলাদেশের স্বাধীনতা, গণতন্ত্র ও উন্নয়নের ইতিহাসে তার নাম চিরভাস্বর হয়ে থাকবে।

লেখক: সিনিয়র সাংবাদিক ও কলামিস্ট।








আরও খবর


  সর্বশেষ সংবাদ

সেই বৃদ্ধার ছেলে যুগ্ম সচিব আনিসুরকে দায়িত্ব থেকে প্রত্যাহার
তরুণ সমাজকে মাদকমুক্ত রাখতে খেলার মাঠ সচল রাখার বিকল্প নেই: রাঙ্গুনিয়ায় আন্তঃস্কুল ক্রিকেটের ফাইনালে হুমাম কাদের চৌধুরী এমপি
‘সংঘাত নয়, শান্তি ও সম্প্রীতির বাংলাদেশ গড়ি’ প্রতিপাদ্যে সচেতনতা বৃদ্ধির আহ্বান
বাগেরহাটে ইটবোঝাই ট্রাক ও অটোভ্যানের মুখোমুখি সংঘর্ষে নিহত ২, আহত ২
শেষ হলো সাড়ে ছয় শতকের ঐতিহ্য! খানজাহান আলী (রহ.) মাজার দিঘি থেকে সরানো হলো শেষ কুমির
আরো খবর ⇒


  সর্বাধিক পঠিত

ইতালিতে গ্রেটার সিলেট অ্যাসোসিয়েশনের নতুন কমিটি
‎ফরিদপুরের সালথায় ৮ বিঘা সমতল জমিতে প্রথমবারের মতো বাণিজ্যিক আনারস চাষ-৮০ লাখ টাকা আয়ের আশা
ভালুকায় শহিদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের ৪৫ তম মৃত্যু বার্ষিকী পালন
সখিপুরে বিএনপি প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমানের ৪৫তম শাহাদাৎ বার্ষিকী
হজে গিয়ে সৌদি আরবে ৪৪ বাংলাদেশির মৃত্যু
প্রকাশক: এম এন এইচ বুলু
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : মাহফুজুর রহমান রিমন  |   উপদেষ্টা সম্পাদক : রাজু আলীম  
বিএনএস সংবাদ প্রতিদিন লি. এর পক্ষে প্রকাশক এম এন এইচ বুলু কর্তৃক ৪০ কামাল আতাতুর্ক এভিনিউ, বুলু ওশেন টাওয়ার, (১০তলা), বনানী, ঢাকা ১২১৩ থেকে প্রকাশিত ও শরীয়তপুর প্রিন্টিং প্রেস, ২৩৪ ফকিরাপুল, ঢাকা থেকে মুদ্রিত।
ফোন:০২৯৮২০০১৯-২০ ফ্যাক্স: ০২-৯৮২০০১৬ ই-মেইল: [email protected]