বৃহস্পতিবার ৪ জুন ২০২৬ ২১ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩
 
শিরোনাম:


শেকড় উপড়ানো অট্টালিকা: আমরা আসলে কী হারাচ্ছি?
প্রকাশ: বুধবার, ২৫ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬, ৫:১৩ পিএম  আপডেট: ২৫.০২.২০২৬ ৫:১৬ পিএম  (ভিজিট : )

"বাড়ি তো কেবল ইট-পাথরের দালান নয়,
বাড়ি হলো এক মুঠো স্মৃতি আর এক বুক মায়া;
যেখানে মিশে আছে প্রিয় মানুষের নিঃশ্বাস,
আর এক চিলতে উঠোনে মা-বাবার ছায়া।"

পুরান ঢাকার অলিগলিতে একসময় যে স্মৃতিবিজড়িত পুরনো বাড়িগুলো ঐতিহ্যের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে ছিল, আজ সেগুলোর অস্তিত্ব প্রায় বিলীন। আমাদের শৈশব, কৈশোর আর শত শত বছরের আবেগ ধুলোয় মিশিয়ে দিয়ে সেখানে এখন সগর্বে দাঁড়িয়ে আছে একেকটি আধুনিক আকাশছোঁয়া ভবন। যে মাটি একসময় হাসনাহেনা, গন্ধরাজ আর কামিনীর সুবাসে ম ম করত, সেখানে আজ শুধু ইট-পাথরের রাজত্ব।

খুব কষ্ট হয় যখন ভাবি—কী নির্মমভাবে কসাইয়ের ধারালো অস্ত্রের মতো বুলডোজার আর হাতুড়ির ঘায়ে খুন করা হলো শহরের সেই প্রিয় গাছগুলোকে! সন্ধ্যারাত পাগল করা সুবাস ছড়ানো হাসনাহেনা, নাইটকুইন, রজনীগন্ধা থেকে শুরু করে শিমুল, বকুল, বেলি, জবা কিংবা রক্তলাল করবী—সবই আজ বহুতল ভবনের অতল গহ্বরে চাপা পড়া এক অতীত। শুধু ফুলই তো নয়, শত বছরের শেকড় আগলে রাখা আম, জাম, লিচু, কাঁঠাল আর ডাবের গাছগুলোকে উপড়ে ফেলতে আমাদের বুক একবারও কাঁপল না। যেখানে অর্জুন, নিম আর সর্পগন্ধার মতো ঔষধি গাছগুলো আমাদের ছায়া ও মায়া দিয়ে আগলে রাখত, সেখানে আজ রাজত্ব করছে একেকটি 'গারদখানা' সদৃশ ফ্ল্যাট।

হারিয়ে যাওয়া সেই যৌথ জীবনের সুর:
সত্তর-আশি বছরের সেই স্মৃতিময় আঙিনাগুলো আজ বিলীন। আমরা গড়ে তুলেছি আলিশান ভবন, কিন্তু হারিয়ে ফেলেছি আত্মার বন্ধন। যখন একান্নবর্তী পরিবারে ছিলাম, তখন আমাদের মধ্যে ছিল এক অদৃশ্য কিন্তু মজবুত সুতোর বাঁধন। একটা আমড়া বা পেয়ারা ভাই-বোনেরা ভাগ করে খাওয়ার সেই টক-মিষ্টি স্বাদে মিশে থাকত অফুরন্ত ভালোবাসা। আজ আমাদের ফ্রিজ ভরা দামি দামি ফল থাকে, কিন্তু তা ভাগ করে নেওয়ার সেই মানুষগুলো পাশের ফ্ল্যাটে থেকেও কত অচেনা!

ফ্ল্যাটের এই ভারী লোহার গেটগুলো আসলে আমাদের নিরাপত্তার দেয়াল নয়, বরং আমাদের একে অপরের থেকে আলাদা করার 'বিভেদের দেয়াল'। আমরা আজ আকাশের দিকে উঠছি ঠিকই, কিন্তু মাটির সাথে আমাদের যে নাড়ির টান ছিল, সেই শেকড়গুলোকে নিজ হাতে কেটে ফেলেছি।

প্রিয়জনদের প্রতি আকুতি:
ইট-সিমেন্টের এই দালানগুলো হয়তো মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে থাকবে কয়েক যুগ, কিন্তু আমাদের পূর্বপুরুষের সেই হাসি-কান্নার স্মৃতিগুলো বাঁচিয়ে রাখার দায়িত্ব বর্তমান প্রজন্মের। এই বহুতল ভবনের দেয়ালে দেয়ালে যে ফাটল ধরছে সম্পর্কের, তা জোড়া লাগানোর জন্য কোনো কৃত্রিম আঠা বাজারে পাওয়া যায় না। এর একমাত্র ওষুধ হলো—পরস্পরের প্রতি সেই পুরনো শ্রদ্ধা আর ভালোবাসা।

শেকড়হীন মানুষ বেশিদিন সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে পারে না। আমাদের শৈশবের সেই পুকুরে ঝপাঝপ ডুব দেওয়া, খোলা মাঠে ধুলোবালি মেখে ঘুড়ি ওড়ানো, ডাংগুলি বা গোল্লাছুট খেলার সেই নির্মল দিনগুলো আজ ইতিহাসের পাতায়। আধুনিকতার এই স্রোতে আমরা যেন হারিয়ে না ফেলি আমাদের আসল পরিচয়।

এই বহুতল ভবনগুলো যেন একেকটি 'বিচ্ছিন্ন দ্বীপ' না হয়ে ওঠে; বরং প্রতিটি ফ্ল্যাট হোক আমাদের সেই পুরনো একান্নবর্তী হৃদয়ের একেকটি স্পন্দন। আধুনিকতার চাকচিক্যে আমাদের ভুলে গেলে চলবে না—আমরা একেকটি পরিবারের অংশ, নিছক কোনো ফ্ল্যাট নম্বর নই।

লেখক: কর্মকর্তা (অবঃ), বিআরডিবি, পল্লী ভবন, ঢাকা। [email protected]








আরও খবর


  সর্বশেষ সংবাদ

সেই বৃদ্ধার ছেলে যুগ্ম সচিব আনিসুরকে দায়িত্ব থেকে প্রত্যাহার
তরুণ সমাজকে মাদকমুক্ত রাখতে খেলার মাঠ সচল রাখার বিকল্প নেই: রাঙ্গুনিয়ায় আন্তঃস্কুল ক্রিকেটের ফাইনালে হুমাম কাদের চৌধুরী এমপি
‘সংঘাত নয়, শান্তি ও সম্প্রীতির বাংলাদেশ গড়ি’ প্রতিপাদ্যে সচেতনতা বৃদ্ধির আহ্বান
বাগেরহাটে ইটবোঝাই ট্রাক ও অটোভ্যানের মুখোমুখি সংঘর্ষে নিহত ২, আহত ২
শেষ হলো সাড়ে ছয় শতকের ঐতিহ্য! খানজাহান আলী (রহ.) মাজার দিঘি থেকে সরানো হলো শেষ কুমির
আরো খবর ⇒


  সর্বাধিক পঠিত

ইতালিতে গ্রেটার সিলেট অ্যাসোসিয়েশনের নতুন কমিটি
‎ফরিদপুরের সালথায় ৮ বিঘা সমতল জমিতে প্রথমবারের মতো বাণিজ্যিক আনারস চাষ-৮০ লাখ টাকা আয়ের আশা
ভালুকায় শহিদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের ৪৫ তম মৃত্যু বার্ষিকী পালন
সখিপুরে বিএনপি প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমানের ৪৫তম শাহাদাৎ বার্ষিকী
হজে গিয়ে সৌদি আরবে ৪৪ বাংলাদেশির মৃত্যু
প্রকাশক: এম এন এইচ বুলু
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : মাহফুজুর রহমান রিমন  |   উপদেষ্টা সম্পাদক : রাজু আলীম  
বিএনএস সংবাদ প্রতিদিন লি. এর পক্ষে প্রকাশক এম এন এইচ বুলু কর্তৃক ৪০ কামাল আতাতুর্ক এভিনিউ, বুলু ওশেন টাওয়ার, (১০তলা), বনানী, ঢাকা ১২১৩ থেকে প্রকাশিত ও শরীয়তপুর প্রিন্টিং প্রেস, ২৩৪ ফকিরাপুল, ঢাকা থেকে মুদ্রিত।
ফোন:০২৯৮২০০১৯-২০ ফ্যাক্স: ০২-৯৮২০০১৬ ই-মেইল: [email protected]