বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌ-পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআইডব্লিউটিএ)-এর পরিচালক (বন্দর ও পরিবহন) এ.কে.এম আরিফ উদ্দিনের সরাসরি তত্ত্বাবধানে কিছু উচ্চপদস্থ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে প্রায় ২ হাজার কোটি টাকার রাষ্ট্রীয় সম্পদ নামমাত্র মূল্যে বিক্রির অভিযোগে বিশেষ তদন্ত শুরু করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)।
কক্সবাজার সদর উপজেলার এন্ডারসন রোড এলাকার মরহুম নুরুল ইসলামের ছেলে আতিকুল ইসলাম সিআইপি (৪ মার্চ) দুদকের প্রধান কার্যালয়ে এ অভিযোগ দায়ের করেন। অভিযোগের প্রেক্ষিতে বিষয়টি গুরুত্বসহকারে অনুসন্ধান করছে দুদক।
অভিযোগে বলা হয়েছে, বিআইডব্লিউটিএর কিছু কর্মকর্তা পরস্পরের যোগসাজশে দুর্নীতির মাধ্যমে প্রায় ২ হাজার কোটি টাকার রাষ্ট্রীয় সম্পদ মাত্র ২ কোটি ৭৯ লাখ ৩৯ হাজার ৭৩৮ টাকায় ‘টোকিও মিল জেভি’ নামের একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের কাছে বিক্রি করে বিপুল পরিমাণ রাষ্ট্রীয় রাজস্ব ক্ষতি করেছেন।
এদিকে, তদন্ত কার্যক্রম সুষ্ঠুভাবে পরিচালনার স্বার্থে অভিযুক্ত কর্মকর্তারা যেন তাদের সরকারি ক্ষমতার অপব্যবহার করে তদন্তে বাধা সৃষ্টি করতে না পারেন এবং গুরুত্বপূর্ণ নথিপত্র নষ্ট করতে না পারেন—সেজন্য সংশ্লিষ্টদের সাময়িকভাবে দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দিয়ে তদন্ত সংশ্লিষ্ট নথিপত্র সংরক্ষণের আবেদন জানিয়েছেন অভিযোগকারী আতিকুল ইসলাম।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, অভিযোগের বিষয়ে অনুসন্ধানপূর্বক প্রতিবেদন প্রস্তুতের জন্য বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ নথিপত্র পর্যালোচনার প্রয়োজন হয়েছে। এজন্য সংশ্লিষ্ট দপ্তরের কাছে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে প্রয়োজনীয় নথিপত্র সরবরাহের অনুরোধ জানানো হয়েছে।
চাহিত নথিপত্রের মধ্যে রয়েছে কক্সবাজারের মাতারবাড়ি বন্দর উন্নয়ন প্রকল্পের (সওজ অংশ) আওতায় মাতারবাড়ি পোর্ট এক্সেস রোড নির্মাণের জন্য মহেশখালী চ্যানেলে নুনিয়ার ছড়া (বাঁকখালী নদীর মোহনা) থেকে আদিনাথ মন্দিরের উজানে পাহাড় ঠাকুরতলা এলাকা পর্যন্ত প্রায় ৬ কোটি ৩৪ লাখ ৫৯ হাজার ১৮২ ঘনফুট বালু বা মাটি উত্তোলনের অনুমোদন সংক্রান্ত নথি।
এ বিষয়ে জানতে চাওয়া হয়েছে, প্রকল্পে নিয়োজিত ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ‘টোকিও মিল জেভি’-এর অনুকূলে কক্সবাজার জেলা প্রশাসকের কার্যালয় থেকে কোনো অনুমোদন দেওয়া হয়েছিল কি না। হয়ে থাকলে সংশ্লিষ্ট রেকর্ডপত্রের সত্যায়িত অনুলিপি সরবরাহ করতে বলা হয়েছে।
এছাড়া ২০২৫ সালের ২ অক্টোবর পরিচালিত মোবাইল কোর্টের আদেশ, জব্দ তালিকা এবং সংশ্লিষ্ট অন্যান্য রেকর্ডপত্রের সত্যায়িত কপিও চাওয়া হয়েছে।
একই সঙ্গে ২০২৪ ও ২০২৫ সালে কক্সবাজার জেলায় ড্রেজিংয়ের মাধ্যমে উত্তোলিত ড্রেজড ম্যাটেরিয়াল বিক্রির বিষয়ে সকল দরপত্র মূল্যায়ন প্রতিবেদন, কার্যাদেশ এবং চুক্তিনামার সত্যায়িত অনুলিপি সরবরাহের জন্য বলা হয়েছে। এ বিষয়ে কোনো বিভাগীয় তদন্ত হয়ে থাকলে সেই তদন্ত প্রতিবেদনও দিতে বলা হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
দুদক সূত্রে জানা গেছে, সুষ্ঠু তদন্তের স্বার্থে সংশ্লিষ্ট দপ্তরকে গত ২৭ ফেব্রুয়ারির মধ্যে প্রয়োজনীয় নথিপত্র সরবরাহের জন্য অনুরোধ জানানো হয়েছিল।
এদিকে, আরিফ উদ্দিন ঢাকা ও নারায়ণগঞ্জ নদীবন্দরের দায়িত্ব পালনকালে তুরাগ ও বুড়িগঙ্গা নদীতীরের অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ এবং নদীর তীরভূমি ইজারা ও রাজস্ব আদায়ের ক্ষেত্রেও নানা অনিয়ম ও স্বেচ্ছাচারিতার অভিযোগ উঠেছে। এসব অভিযোগ তদন্তে দুদক দুই সদস্যবিশিষ্ট একটি অনুসন্ধান টিম গঠন করেছে।
দুদকের উপ-পরিচালক (অনুসন্ধান ও তদন্ত-২) মো. হাফিজুল ইসলামকে প্রধান করে এবং সহকারী পরিচালক সুভাষ চন্দ্র মজুমদারকে সদস্য করে সম্প্রতি এই টিম গঠন করা হয়।
সূত্র জানায়, অনুসন্ধান টিম গঠনের পর আরিফ উদ্দিনের ব্যক্তিগত নথি, চাকরিজীবনের শুরু থেকে ২০২৩ সালের জুন পর্যন্ত উত্তোলিত বেতন-ভাতার বিবরণ, দায়-দায়িত্ব সম্পর্কিত অফিস আদেশসমূহ এবং তার নিজ, স্ত্রী, সন্তান ও ভাইদের নামে ব্যবসা বা শেয়ার পরিচালনার আবেদন ও অনুমোদন সংক্রান্ত সকল রেকর্ডপত্র চেয়ে গত বছরের ৩ সেপ্টেম্বর বিআইডব্লিউটিএকে চিঠি দিয়েছে দুদক।
অন্যদিকে, একাধিক নদী খনন প্রকল্পে ব্যাপক অনিয়ম ও অর্থ আত্মসাতের অভিযোগে প্রকৌশলী ছাইদুর রহমানের বিরুদ্ধেও দীর্ঘদিন ধরে অনুসন্ধান চলছে। অনুসন্ধানকালে তার ও তার স্ত্রীর নামে বিপুল পরিমাণ সম্পদের তথ্য পাওয়া গেছে। অবৈধ সম্পদ বৈধ করতে তিনি মিথ্যা তথ্য ও ভুয়া কাগজপত্র জমা দিয়েছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। দুদক বলছে, প্রাপ্ত নথিপত্র ও তথ্য-উপাত্ত যাচাই-বাছাই শেষে প্রয়োজনীয় আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।