বৃহস্পতিবার ৪ জুন ২০২৬ ২১ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩
 
শিরোনাম:


আপোষহীন দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া, গনতন্ত্রের মূর্ত প্রতীক
প্রকাশ: সোমবার, ৫ জানুয়ারি, ২০২৬, ৪:৪০ পিএম  আপডেট: ০৫.০১.২০২৬ ৪:৪৩ পিএম  (ভিজিট : )
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে কিছু মানুষ কেবল ক্ষমতার আসনে বসেন না। তাঁরা ইতিহাসের ভাষা হয়ে ওঠেন। তাঁরা সময়ের প্রবাহে হারিয়ে যান না, বরং সময় তাঁদের মাধ্যমেই নিজেকে চেনায়। দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া তেমনই এক অনন্য নাম। যিনি রাজনীতির পটভূমিতে আবির্ভূত হয়েছিলেন নিছক কোনো উচ্চাকাঙ্ক্ষা নিয়ে নয়, বরং ইতিহাসের এক নির্মম দায়িত্ব কাঁধে নিয়ে। তিনি কোনো বংশানুক্রমিক রাজনীতির উত্তরাধিকারী ছিলেন না। জনীতির পাঠশালায় তাঁর হাতেখড়ি হয়নি কৈশোরে বা ছাত্রজীবনে। একজন গৃহিণী হিসেবেই ছিল তাঁর পরিচয়। অথচ সময়ের নির্মম বাস্তবতা, জাতির সংকট এবং জনগণের প্রত্যাশা তাঁকে রূপান্তরিত করেছে বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক রাজনীতির এক দৃঢ় ও আপোষহীন নেতৃত্বে। এই রূপান্তরের ইতিহাস শুধু একজন নারীর উত্থানের গল্প নয়। 

এটি একটি জাতির দীর্ঘ লড়াই, আশা ও প্রতিরোধের দলিল। ১৯৪৫ সালের ১৫ আগস্ট জন্ম নেওয়া খালেদা খানম  অর্থাৎ বেগম খালেদা জিয়ার জীবন প্রবাহ ছিল অনেকটা সাধারণ মধ্যবিত্ত নারীর মতোই- সংযমী, আড়ালমুখী এবং রাজনীতির আলোঝলমলে জগৎ থেকে দূরে। কিন্তু ১৯৮১ সালের ৩০ মে সেই স্বাভাবিক জীবনের অবসান ঘটে এক নির্মম ঘটনার মধ্য দিয়ে। স্বাধীনতার ঘোষক, শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের হত্যাকাণ্ড শুধু একটি পরিবারকে বিধ্বস্ত করেনি; জাতির রাজনীতিকে নিক্ষেপ করেছিল এক গভীর অনিশ্চয়তার মধ্যে। ইতিহাসে বহু উদাহরণ আছে, এমন বিপর্যয়ের পর মানুষ ভেঙে পড়ে, নিজেকে গুটিয়ে নেয়। কিন্তু খালেদা জিয়ার ক্ষেত্রে ঘটেছিল তার বিপরীত। ব্যক্তিগত শোককে তিনি রূপান্তরিত করেন জাতীয় দায়িত্ববোধে। তিনি উপলব্ধি করেছিলেন, এই শূন্যতা শুধু পারিবারিক নয়; এটি একটি রাজনৈতিক দর্শন, একটি গণতান্ত্রিক সম্ভাবনার শূন্যতা। সেই শূন্যতা পূরণ না হলে ক্ষতিগ্রস্ত হবে রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ। রাজনীতিতে তাঁর প্রবেশ ছিল কোনো পরিকল্পিত উচ্চাকাঙ্ক্ষার ফল নয়। এটি ছিল জনগণের আহ্বানে সাড়া দেওয়া এক অনিবার্য সিদ্ধান্ত। সে কারণেই তাঁর নেতৃত্ব কখনো কৃত্রিম হয়ে ওঠেনি; বরং ধীরে ধীরে, সংগ্রামের মধ্য দিয়ে তা পরিণত হয়েছে এক গভীরভাবে জনসম্পৃক্ত নেতৃত্বে।

বেগম খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক উত্থান ছিল ধীর, কিন্তু অবিচল। তাঁকে প্রতিনিয়ত মোকাবিলা করতে হয়েছে অবমূল্যায়ন, সংশয় ও রাজনৈতিক কটাক্ষ। অনেকেই ভেবেছিলেন, তিনি কেবল শহীদ রাষ্ট্রপতির স্ত্রী হিসেবেই সীমাবদ্ধ থাকবেন। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তিনি প্রমাণ করেছেন, নেতৃত্ব কোনো পরিচয়ের দান নয়, এটি অর্জনের বিষয়। ১৯৯০ সনে স্বৈরশাসনবিরোধী আন্দোলনে তাঁর ভূমিকা আজ ইতিহাসের অংশ। রাজপথে তাঁর দৃঢ় উপস্থিতি, রাজনৈতিক সিদ্ধান্তে আপসহীনতা এবং আন্দোলনের ধারাবাহিকতা তাঁকে পরিণত করে গণতন্ত্রকামী মানুষের আস্থার কেন্দ্রে। ১৯৯১ সালে সংসদীয় গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠার মাধ্যমে তিনি বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। এটি কেবল নারী নেতৃত্বের বিজয় ছিল না; এটি ছিল জনগণের ভোটে প্রতিষ্ঠিত গণতন্ত্রের পুনর্জন্ম। পরবর্তী সময়ে আরো দুইবার প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হয়ে তিনি দেখিয়েছেন, এই দেশের মানুষ বারবার তাঁর ওপর আস্থা রেখেছে। কারণ তিনি ক্ষমতাকে দেখেছেন দায়িত্ব হিসেবে, অধিকার হিসেবে নয়। তিনি কখনো স্বৈরশাসক হিসেবে নিজেকে দেখতে চাননি। এজন্যই বেগম খালেদা জিয়ার শাসনামলের একটি মৌলিক বৈশিষ্ট্য ছিল বহুদলীয় গণতন্ত্রের কার্যকর চর্চা। সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা, মতপ্রকাশের সুযোগ এবং সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলোর তুলনামূলক সক্রিয়তা তাঁর সময়ে ছিল দৃশ্যমান। তিনি বিশ্বাস করতেন, গণতন্ত্র মানে কেবল ক্ষমতায় থাকা নয়, গণতন্ত্র মানে ভিন্নমতের সহাবস্থান। বিরোধী কণ্ঠকে দমন নয়, বরং রাজনৈতিকভাবে মোকাবিলা করাই গণতান্ত্রিক রাজনীতির সৌন্দর্য। এই দর্শন থেকেই তিনি কখনো একদলীয় কর্তৃত্ববাদে আস্থা রাখেননি।

২০১৭ সালের দিকে বাংলাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতা নতুন এক মোড় নেয়। বিরোধী রাজনীতির পরিসর সংকুচিত হতে থাকে, গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলো দুর্বল হয়ে পড়ে। ক্রমেই ভোটার বিহীন নির্বাচনের দিকে এগিয়ে যাচ্ছিল বাংলাদেশ। শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান প্রবর্তিত বহু দলীয় গণতন্ত্রের শ্বাস রোধ করে, ফ্যাসিস্ট কায়দায় একদলীয় শাসন ব্যবস্থা কায়েমে সকল ইনতেজার সম্পন্ন করতে মরিয়া হয়ে ওঠে সরকার। এই প্রেক্ষাপটে বেগম খালেদা জিয়া হয়ে ওঠেন গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের প্রধান প্রতীক। তিনি দৃঢ় কন্ঠে ব্যক্ত করেন, অবাধ সুষ্ঠু নিরপেক্ষ নির্বাচন ব্যতীত দেশে গনতন্ত্র ও আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা অসম্ভব। এই দৃঢ় ঘোষণার পর তাঁর বিরুদ্ধে শুরু হয় একের পর এক মামলা, রাজনৈতিক হয়রানি, সভা-সমাবেশে বাধা, রাজনৈতিক নেতাকর্মী গুম-খুন। জুলুম নির্যাতন সহ সর্বোচ্চ কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করে সরকার। সব মিলিয়ে তাঁকে রাজনৈতিকভাবে নিঃসঙ্গ করার একটি সুপরিকল্পিত প্রক্রিয়া স্পষ্ট হয়ে ওঠে। তবুও তিনি আপোষ করেননি। বিদেশে নিরাপদ জীবন বেছে নেওয়ার সুযোগ থাকা সত্ত্বেও তিনি দেশ ছাড়েননি।

তিনি বারবার বলেছেন, “দেশের বাইরে আমার কোন ঠিকানা নাই, এই দেশই আমার শক্তি, এই দেশের মানুষই আমার আশ্রয়।” এই উচ্চারণ ছিল না কেবল আবেগের বহিঃপ্রকাশ; এটি ছিল এক আজীবন সংগ্রামের সারমর্ম। রাজনীতির বাইরে খালেদা জিয়া একজন মমতাময়ী মা। তিনি তারেক রহমান ও প্রয়াত আরাফাত রহমান কোকোর স্নেহময়ী জননী। ব্যক্তিগত জীবনে তিনি ছিলেন সংযমী, নীরব ও শালীন। রাজনীতির নিষ্ঠুর বাস্তবতার মাঝেও তাঁর মানবিক সত্তা তাঁকে আলাদা রেখেছে। তিনি কখনো রাজনীতির কারণে পরিবারের প্রতি উদাসীন হননি। তিনি ছিলেন একজন মানবিক দায়িত্ববোধ সম্পন্ন ব্যক্তিত্ব।

শারীরিক অসুস্থতা, ব্যক্তিগত ক্ষতি কিংবা রাজনৈতিক নিপীড়ন, কোনোটিকেই তিনি কখনো সহানুভূতি আদায়ের হাতিয়ার বানাননি। এটাই তাঁর ব্যক্তিত্বের অন্যতম শক্তি।

ইতিহাসের বিচার তাৎক্ষণিক নয়, ইতিহাস দীর্ঘমেয়াদি বিচার করে। রাজনৈতিক মতপার্থক্য থাকতেই পারে, কিন্তু ইতিহাস আবেগে নয় বরং অবদানে কথা বলে। ২০২৪ সাল পর্যন্ত বেগম খালেদা জিয়ার পথচলা ছিল কণ্টকাকীর্ণ, কিন্তু অটুট। তিনি ছিলেন, আছেন এবং থাকবেন বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক রাজনীতির এক অবিচ্ছেদ্য অধ্যায় হয়ে। একজন গৃহিণী কীভাবে আপোষহীন নেতৃত্বে রূপান্তরিত হয়ে একটি জাতির গণতান্ত্রিক আকাঙ্ক্ষার প্রতীক হয়ে ওঠেন, বেগম খালেদা জিয়ার জীবন তারই প্রমাণ। উপসংহারে বলা যায়, একটি জাতির ইতিহাস কেবল বিজয়ীদের নিয়ে লেখা হয় না; লেখা হয় সংগ্রামীদের নিয়েও। দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া সেই সংগ্রামীদের অন্যতম। যিনি আপোষ করেননি ক্ষমতার সঙ্গে, আদর্শের সঙ্গে কিংবা জন প্রত্যাশা বিরুদ্ধ নীতির সঙ্গে।

লেখক : নির্বাহী সম্পাদক, দৈনিক সংবাদ প্রতিদিন ও কলামিস্ট








আরও খবর


  সর্বশেষ সংবাদ

সেই বৃদ্ধার ছেলে যুগ্ম সচিব আনিসুরকে দায়িত্ব থেকে প্রত্যাহার
তরুণ সমাজকে মাদকমুক্ত রাখতে খেলার মাঠ সচল রাখার বিকল্প নেই: রাঙ্গুনিয়ায় আন্তঃস্কুল ক্রিকেটের ফাইনালে হুমাম কাদের চৌধুরী এমপি
‘সংঘাত নয়, শান্তি ও সম্প্রীতির বাংলাদেশ গড়ি’ প্রতিপাদ্যে সচেতনতা বৃদ্ধির আহ্বান
বাগেরহাটে ইটবোঝাই ট্রাক ও অটোভ্যানের মুখোমুখি সংঘর্ষে নিহত ২, আহত ২
শেষ হলো সাড়ে ছয় শতকের ঐতিহ্য! খানজাহান আলী (রহ.) মাজার দিঘি থেকে সরানো হলো শেষ কুমির
আরো খবর ⇒


  সর্বাধিক পঠিত

ইতালিতে গ্রেটার সিলেট অ্যাসোসিয়েশনের নতুন কমিটি
‎ফরিদপুরের সালথায় ৮ বিঘা সমতল জমিতে প্রথমবারের মতো বাণিজ্যিক আনারস চাষ-৮০ লাখ টাকা আয়ের আশা
ভালুকায় শহিদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের ৪৫ তম মৃত্যু বার্ষিকী পালন
সখিপুরে বিএনপি প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমানের ৪৫তম শাহাদাৎ বার্ষিকী
হজে গিয়ে সৌদি আরবে ৪৪ বাংলাদেশির মৃত্যু
প্রকাশক: এম এন এইচ বুলু
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : মাহফুজুর রহমান রিমন  |   উপদেষ্টা সম্পাদক : রাজু আলীম  
বিএনএস সংবাদ প্রতিদিন লি. এর পক্ষে প্রকাশক এম এন এইচ বুলু কর্তৃক ৪০ কামাল আতাতুর্ক এভিনিউ, বুলু ওশেন টাওয়ার, (১০তলা), বনানী, ঢাকা ১২১৩ থেকে প্রকাশিত ও শরীয়তপুর প্রিন্টিং প্রেস, ২৩৪ ফকিরাপুল, ঢাকা থেকে মুদ্রিত।
ফোন:০২৯৮২০০১৯-২০ ফ্যাক্স: ০২-৯৮২০০১৬ ই-মেইল: [email protected]