বৃহস্পতিবার ● ৫ নভেম্বর ২০২৬ ● ২১ কার্তিক ১৪৩৩
 
শিরোনাম:


অনুমোদনহীন প্ল্যান্টের ক্রুড আমদানি করতে চায় সুপার পেট্রোকেমিক্যাল
প্রকাশ: বুধবার, ৪ নভেম্বর, ২০২৬, ৮:৩৮ পিএম  (ভিজিট : ১৯)
প্ল্যান্ট নির্মাণের কোনো অনুমোদন নেই। কয়েক দফা চালুর অনুমোদন চেয়েও মেলেনি। তবু সেই প্ল্যান্টে পরিশোধনের জন্য ভারী অপরিশোধিত তেল (হেভি ক্রুড) আমদানি করতে এবার বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) দ্বারস্থ হয়েছে বেসরকারি উদ্যোক্তা সুপার পেট্রোকেমিক্যাল পিএলসি।

অনুমোদনহীন এ প্রকল্পটিকে দেশের জ্বালানি নিরাপত্তার জন্য হুমকি হিসেবে দেখছেন সমালোচকরা।
অনেক প্রতিবন্ধকতা পেরিয়ে রাষ্ট্রীয় একমাত্র জ্বালানি পরিশোধনাগার ইস্টার্ন রিফাইনারি সম্প্রসারণ প্রকল্পের কাজে হাত দিয়েছে বিপিসি। ইতোমধ্যে পিএমসি (প্রজেক্ট ম্যানেজমেন্ট কনসালটেন্ট) নিয়োগের কার্যক্রম শুরু হয়েছে। এর মধ্যে অনুমোদনহীন বেসরকারি রিফাইনারির নতুন প্ল্যান্ট নির্মাণ কার্যক্রম চলমান থাকলেও তা বন্ধে কোনো পদক্ষেপ নেই বিপিসি। এ নিয়ে বিশেষজ্ঞ ও সমালোচকরা সরকারের দিকে অভিযোগের আঙুল তুলেছেন।

গত ২৭ অক্টোবর বিপিসির চেয়ারম্যানকে লেখা সুপার পেট্রোকেমিক্যাল পিএলসির ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ মোস্তফা হায়দার স্বাক্ষরিত চিঠিতে চার লাখ টন লাইট ক্রুড এবং আট লাখ টন হেভি ক্রুড আমদানির অনুমোদন চাওয়া হয়। অথচ এর আগে ১৪ জুলাই জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রীকে দেওয়া চিঠিতে সুপার পেট্রোকেমিক্যালের নির্মাণাধীন প্ল্যান্টটিতে লাইট ক্রুড পরিশোধন করার কথা জানানো হয়।

জাগো নিউজের হাতে আসা ২৭ অক্টোবরের ওই চিঠি এবং সংশ্লিষ্ট আরও বেশ কিছু নথি পর্যালোচনা করে দেখা যায়, ক্রুড আমদানির অনুমোদন চাওয়ার চিঠিতে নানান কৌশলের আশ্রয় নেওয়া হয়। চিঠিতে বিপিসির ১০ আগস্টের একটি চিঠির পত্র সূত্র (২৮.০৩.০০০০.০৪১.২৫.৩৩০/২২/(চাহিদা)/৭৫৩) উল্লেখ করে ২০২৭ পঞ্জিকাবর্ষে ২ লাখ ৫৬ হাজার ৫শ টন অকটেন, ১ লাখ ১৯ হাজার টন পেট্রোল, ৪ লাখ ৬৬ হাজার ৫শ টন ডিজেল এবং ৩ লাখ ৬১ হাজার এইচএফও (হাই সালফার ফার্নেস অয়েল) বিপিসিকে সরবরাহের পরিকল্পনার কথা উল্লেখ করা হয়।

ওই পরিকল্পনা অনুসারে পরিশোধিত জ্বালানি সরবরাহ নিরবচ্ছিন্ন রাখতে ২০২৭ পঞ্জিকাবর্ষের জন্য ৪ লাখ টন লাইট ক্রুড (কনডেনসেট) এবং ৮ লাখ টন হেভি ক্রুড আমদানি করা প্রয়োজন বলে ওই চিঠির তৃতীয় প্যারায় উল্লেখ করা হয়। এতে বলা হয়, আমদানি করা কাঁচামাল থেকে উৎপাদিত জ্বালানি পণ্য বিপিসিকে সরবরাহ করা হবে।

অথচ এর আগে গত ১৪ জুলাই বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রীকে দেওয়া চিঠিতে সুপার পেট্রোকেমিক্যালের নির্মাণাধীন প্ল্যান্টটিকে লাইট ক্রুড পরিশোধন উপযোগী করে নির্মাণের কথা উল্লেখ করা হয়। চিঠিতে বছরে ২০ লাখ টন সৌদি অ্যারাবিয়ান লাইট ক্রুড অথবা সংযুক্ত আরব আমিরাতের মারবান ক্রুড আমদানি করার আগ্রহের কথা জানানো হয়।
কিন্তু ২৭ অক্টোবরের চিঠিতে লাইট ক্রুড ও কনডেনসেটকে উপস্থাপন করা হয় একইভাবে। বিশেষজ্ঞ ও সংশ্লিষ্ট বেশ কয়েকজন বর্তমান এবং অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তার সঙ্গে কথা হলে তারা সবাই কনডেনসেটকে সরাসরি লাইট ক্রুড হিসেবে সংজ্ঞায়িত করার সুযোগ নেই বলে জানান। তাছাড়া বিপিসির এর আগে কনডেনসেট আমদানির অনুমতি পত্রে কোথাও কনডেনসেটকে লাইট ক্রুড হিসেবে উল্লেখ করেনি।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে ইস্টার্ন রিফাইনারির সাবেক একজন মহাব্যবস্থাপক জাগো নিউজকে বলেন, ‘কনডেনসেটকে স্বাভাবিকভাবে লাইট ক্রুড অয়েল বলার সুযোগ নেই। বিপিসি কখনো কনডেনসেটকে কখনো লাইট ক্রুড অয়েল হিসেবে চিহ্নিত করে না। কারণ কনডেনসেট হচ্ছে গ্যাসক্ষেত্র থেকে পাওয়া গ্যাসের উপজাত। কিন্তু ক্রুড অয়েল হচ্ছে পেট্রোলিয়াম প্রোডাক্ট।’

একই কথা বলেন জ্বালানি বিশেষজ্ঞ, বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের সাবেক সদস্য মকবুল-ই-ইলাহী চৌধুরী। তিনি একজন দেশের প্রখ্যাত ভূতত্ত্ববিদ। মধ্যপাড়া গ্রানাইট মাইনিং কোম্পানি লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন।

তিনি জাগো নিউজকে বলেন, ‘কনডেনসেট এক ধরনের লাইট ক্রুড হলেও আমাদের ইস্টার্ন রিফাইনারিতে পরিশোধনের জন্য আমদানি করা লাইট ক্রুড ও কনডেনসেট এক নয়। কনডেনসেট আসে গ্যাসক্ষেত্র থেকে, আর লাইট ক্রুড আসে তেলক্ষেত্র থেকে। দুটোই পরিশোধন করে পেট্রোলিয়াম জ্বালানি পণ্য উৎপাদন করা হয়।’

তবে গত ১৪ জুলাই জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রীকে চিঠি দিয়ে দৈনিক ৩৫ হাজার ব্যারেল ধারণক্ষমতাসম্পন্ন একটি ক্রুড অয়েল রিফাইনারি প্রকল্পের সফল বাস্তবায়নে সহায়তা চায় সুপার পেট্রোকেমিক্যাল। প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ মোস্তফা হায়দার স্বাক্ষরিত ওই চিঠিতেও রিফাইনারি প্রতিষ্ঠার আবেদন নাকচ হওয়ার বিষয়টি পুরোপুরি এড়িয়ে যাওয়া হয়। চিঠিতে প্রকল্পটি বার্ষিক সাড়ে ১৭ লাখ মেট্রিক টন অপরিশোধিত তেল ধারণক্ষমতার এবং প্ল্যান্টে লাইট ক্রুড পরিশোধন করা হবে বলে উল্লেখ করা হয়। চিঠিতে প্রকল্পের সরকারি অনুমোদনের কোনো তথ্য উল্লেখ করা হয়নি।

বিপিসির ১০ আগস্টের ২৮.০৩.০০০০.০৪১.২৫.৩৩০/২২/(চাহিদা)/৭৫৩ সূত্রের চিঠিটি পর্যালোচনা করে দেখা যায়, বিপিসির মহাব্যবস্থাপক মোহাম্মদ জাহিদ হোসাইন স্বাক্ষরিত ওই চিঠিতে উল্লেখ করা হয়, ২০২৭ পঞ্জিকাবর্ষে আমদানির জন্য পরিশোধিত জ্বালানি তেলের চাহিদা নিরূপণ করার লক্ষ্যে সুপার পেট্রোকেমিক্যাল পিএলসি বিপিসিতে সরবরাহ করতে যাওয়া জ্বালানি তেলের (অকটেন, পেট্রোল, ডিজেলসহ অন্যান্য গ্রেড) পরিমাণ সম্পর্কে জানা জরুরি প্রয়োজন।

ক্রুড আমদানির বিষয়ে সুপার পেট্রোকেমিক্যালসের একটি চিঠি আমার কাছে এসেছে। চিঠিটি আমাদের বিপিসির টিম পর্যালোচনা করছে।-বিপিসির চেয়ারম্যান ড. রফিকুল ইসলাম বিপিসি গত ৩০ জুলাই, ২০২৬ তারিখের মধ্যে সরবরাহ করতে যাওয়া জ্বালানি তেলের পরিমাণ বিপিসিতে পাঠানোর অনুরোধ করা হয়েছিল। এ বিষয়ে সুপার পেট্রোকেমিক্যাল পিএলসি এখন পর্যন্ত পরিমাণ না পাওয়ায় ২০২৭ পঞ্জিকাবর্ষের আমদানি পরিকল্পনা প্রণয়ন করা সম্ভব হচ্ছে না। এ পরিপ্রেক্ষিতে ২০২৭ পঞ্জিকাবর্ষে (জানুয়ারি-জুন ও জুলাই-ডিসেম্বর) মাসভিত্তিক এবং গ্রেডভিত্তিক সরবরাহ করতে যাওয়া জ্বালানি তেলের পরিমাণ ১২ আগস্টের মধ্যে ছক অনুযায়ী আবশ্যিকভাবে পাঠানোর অনুরোধ করা হয়।

বিপিসির ওই চিঠির পর ১২ আগস্ট সুপার পেট্রোকেমিক্যাল পিএলসির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা প্রণব কুমার সাহা স্বাক্ষরিত এক চিঠিতে ২০২৭ পঞ্জিকাবর্ষে ১২ লাখ ৩ হাজার টন পরিশোধিত জ্বালানি বিপিসিকে সরবরাহের পরিকল্পনার কথা জানানো হয়। এতে শুধু ফেব্রুয়ারি মাস বাদে বছরের অন্য ১১ মাসে ২১ হাজার ৫শ টন করে অকটেন, ১০ হাজার টন করে পেট্রোল, মে-ডিসেম্বর মাসে ৫০ হাজার টন করে ডিজেল এবং ৪২ হাজার টন করে হাই সালফার ফার্নেস অয়েল (এইচএফও) দেওয়ার পরিকল্পনার কথা জানানো হয়।

পাশাপাশি ফেব্রুয়ারি মাসে ২০ হাজার টন অকটেন, ৯ হাজার টন পেট্রোল, জানুয়ারিতে ১২ হাজার ৫শ টন, ফেব্রুয়ারিতে ১১ হাজার ৫শ টন, মার্চে ১২ হাজার ৫শ টন এবং এপ্রিলে ৩০ হাজার টন ডিজেল এবং ২৫ হাজার টন এইচএফও সরবরাহের পরিকল্পনার কথা উল্লেখ করা হয়।

ওই চিঠির ৩ নম্বর প্যারায় উল্লেখ করা হয়, ‘বর্তমানে নির্মাণাধীন ৩৫ হাজার ব্যারেল ক্ষমতার ক্রুড ডিস্টিলেশন ইউনিটটি (সিডিইউ) আগামী মার্চ ২০২৭ সালে চালু করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে এবং উক্ত পরিকল্পনার আলোকে এপ্রিল, ২০২৭ সাল থেকে জ্বালানি তেল সরবরাহের পরিমাণ প্রাক্কলন করা হয়েছে।’

এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে সুপার পেট্রোকেমিক্যাল পিএলসির ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ মোস্তফা হায়দার ও প্রতিষ্ঠানটির সিইও প্রণব কুমার সাহার মোবাইল ফোনে কল ও হোয়াটসঅ্যাপে খুদেবার্তা দিলে তারা কোনো সাড়া দেননি।
সুপার পেট্রোকেমিক্যাল পিএলসির হেভি ক্রুড আমদানির অনুমতির চিঠির বিষয়ে জানতে কথা হলে বিপিসির চেয়ারম্যান ড. রফিকুল ইসলাম জাগো নিউজকে বলেন, ‘ক্রুড আমদানির বিষয়ে সুপার পেট্রোকেমিক্যালসের একটি চিঠি আমার কাছে এসেছে। চিঠিটি আমাদের বিপিসির টিম পর্যালোচনা করছে।’

তবে অনুমোদনহীনভাবে জ্বালানির মতো একটি স্পর্শকাতর পণ্যের রিফাইনারি প্ল্যান্ট কীভাবে নির্মাণ হচ্ছে- এমন প্রশ্নের বিষয়টি তিনি এড়িয়ে যান।

বর্তমানে সারাবিশ্বে জ্বালানি একটি স্পর্শকাতর পণ্য। দেশে সরকারি অনুমোদন ছাড়া ব্যক্তিপর্যায়ে রিফাইনারি নির্মিত হলে তা জ্বালানি নিরাপত্তাকে হুমকিতে ফেলবে। অনুমোদন না নিয়ে রিফাইনারি করা আইনের লঙ্ঘন। এতে তাদের শাস্তির আওতায় আনা উচিত।-ক্যাবের জ্বালানি উপদেষ্টা ও জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ড. এম শামসুল আলম কনজিউমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) জ্বালানি উপদেষ্টা ও জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ড. এম শামসুল আলম জাগো নিউজকে বলেন, ‘বর্তমানে সারাবিশ্বে জ্বালানি একটি স্পর্শকাতর পণ্য। দেশে সরকারি অনুমোদন ছাড়া ব্যক্তিপর্যায়ে রিফাইনারি নির্মিত হলে তা জ্বালানি নিরাপত্তাকে হুমকিতে ফেলবে। অনুমোদন না নিয়ে রিফাইনারি করা আইনের লঙ্ঘন। এতে তাদের শাস্তির আওতায় আনা উচিত।’

সুপার পেট্রোকেমিক্যালস পিএলসি তাদের বর্তমান ফ্রাকশনেশন প্ল্যান্ট থেকে বিপিসিকে অকটেন, পেট্রোল ও ডিজেল সরবরাহ করে। বিপিসির তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে প্রতিষ্ঠানটি অকটেন, পেট্রোল, ডিজেল, এমটিটি, লাইট এমএস, এসবিপিএস মিলে ২ লাখ ৫৬ হাজার ৩৭ টন পেট্রোলিয়াম পণ্য সরবরাহ করেছে।

এসব পণ্য উৎপাদনের জন্য বিপিসি থেকে পূর্বানুমোদন নিয়ে ইস্টার্ন রিফাইনারি থেকে নির্দিষ্ট পরিমাণে ন্যাফতা, পেট্রোবাংলা থেকে দেশি কনডেনসেট এবং বিদেশ থেকে কনডেনসেট আমদানি করে থাকে সুপার পেট্রোকেমিক্যাল পিএলসি।








আরও খবর


Loading...
Loading...
প্রকাশক: মাহফুজুর রহমান রিমন
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : মাহফুজুর রহমান রিমন  |   উপদেষ্টা সম্পাদক : রাজু আলীম  
বিএনএস সংবাদ প্রতিদিন লি. এর পক্ষে প্রকাশক এম এন এইচ বুলু কর্তৃক ৪০ কামাল আতাতুর্ক এভিনিউ, বুলু ওশেন টাওয়ার, (২১ তলা), বনানী, ঢাকা ১২১৩ থেকে প্রকাশিত ও শরীয়তপুর প্রিন্টিং প্রেস, ২৩৪ ফকিরাপুল, ঢাকা থেকে মুদ্রিত।
ফোন:০২৯৮২০০১৯-২০ ফ্যাক্স: ০২-৯৮২০০১৬ ই-মেইল: [email protected]