দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের গর্ব, বিশ্বের সর্ববৃহৎ ম্যানগ্রোভ বনাঞ্চল ও মৎস্যসম্পদে সমৃদ্ধ বিশ্ব ঐতিহ্য সুন্দরবনের বঙ্গোপসাগর উপকূলবর্তী দুবলারচরে শুরু হয়েছে এবারের শুঁটকি আহরণ মৌসুম। ঘূর্ণিঝড় ‘অর্ণব’-এর প্রভাব কেটে যাওয়ার পর সাগরে মাছ ধরতে নেমেছেন হাজারো জেলে। মৌসুমের প্রথম দুই দিনেই প্রচুর মাছ পাওয়ায় জেলেদের মুখে ফুটেছে স্বস্তি ও আনন্দের হাসি। অন্যদিকে জলদস্যুর আতঙ্ক, বৈরী আবহাওয়ার ঝুঁকি এবং গত মৌসুমের লোকসান ও ঋণের বোঝা নিয়ে নতুন মৌসুম শুরু করেছেন জেলে-মহাজনরা।
জেলে ও মৎস্যজীবীদের পদচারণায় এখন মুখরিত দুবলার আলোরকোল, মাঝেরকিল্লা, নারিকেলবাড়িয়া ও শেলারচর। বঙ্গোপসাগরের উত্তাল ঢেউয়ের সঙ্গে জীবন-জীবিকার লড়াইয়ে নেমেছেন উপকূলের হাজারো মানুষ। মাছ আহরণ, শুঁটকি শুকানো, অস্থায়ী ঘর নির্মাণ এবং মাছ সংরক্ষণের কাজে ব্যস্ত সময় পার করছেন তারা।
দেশের ৮০ শতাংশ শুঁটকি আসে দুবলার চর থেকে
বন বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, পূর্ব সুন্দরবনের আলোরকোল, মাঝেরকিল্লা, নারিকেলবাড়িয়া ও শেলারচর নিয়ে প্রায় ৮১ বর্গমাইল এলাকাজুড়ে গড়ে উঠেছে দুবলার জেলেপল্লি। দেশের মোট শুঁটকি উৎপাদনের প্রায় ৮০ শতাংশ আসে এই শুঁটকিপল্লি থেকে।
সাগর থেকে লইট্যা, ছুরি, চিংড়ি, রূপচাঁদা, পোয়াসহ বিভিন্ন প্রজাতির মাছ আহরণ করে শুঁটকি তৈরির জন্য এবার ১০ হাজারের বেশি জেলে সমবেত হয়েছেন চারটি চরে। ৩১ অক্টোবর থেকে মার্চ পর্যন্ত প্রায় পাঁচ মাস তারা সেখানে অবস্থান করে মাছ আহরণ ও শুঁটকি উৎপাদন করবেন।
এবারের মৌসুমে জেলে ও বহরদারদের জন্য ১ হাজার ১৮টি অস্থায়ী ঘর, ৬৭টি ডিপো এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের ১১৬টি অস্থায়ী দোকান স্থাপনের অনুমতি দেওয়া হয়েছে।
তবে মাছ ধরার এই কর্মযজ্ঞের আড়ালে রয়েছে নানা প্রতিকূলতা। গত মৌসুমের লোকসান ও ঋণের বোঝা মাথায় নিয়ে অনেক জেলে-মহাজন নতুন করে ঋণ এবং চড়া সুদে পুঁজি সংগ্রহ করেছেন। দস্যু আতঙ্ক, সাগরের বৈরী আবহাওয়া এবং অনিশ্চিত জীবিকার ঝুঁকি তাদের দুশ্চিন্তা বাড়িয়ে তুলেছে।
প্রথমবার সার্বক্ষণিক ভাসমান ফ্রেন্ডশিপ হাসপাতাল
এবারের শুঁটকি মৌসুমে জেলে-মহাজনদের জন্য আশার খবর হলো, দুবলারচরে প্রথমবারের মতো সার্বক্ষণিক চিকিৎসাসেবা দিতে ভাসমান ফ্রেন্ডশিপ হাসপাতালের ব্যবস্থা করা হয়েছে। পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী শেখ ফরিদুল ইসলামের উদ্যোগে এ চিকিৎসাসেবার ব্যবস্থা করা হয়েছে বলে জানা গেছে।
দীর্ঘ পাঁচ মাস সাগর ও বিচ্ছিন্ন চরাঞ্চলে অবস্থান করা জেলেদের জন্য জরুরি চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে এ উদ্যোগ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে সংশ্লিষ্টরা আশা করছেন।
উৎপাদন বাড়ার প্রত্যাশা, রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা ৮ কোটি টাকা
সুন্দরবন পূর্ব বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা (ডিএফও) রেজাউল করিম চৌধুরী জানান, দেশের মোট শুঁটকি উৎপাদনের প্রায় ৮০ শতাংশ আসে দুবলার চরকেন্দ্রিক শুঁটকিপল্লি থেকে। গত মৌসুমে সেখানে ৭ হাজার ৯৬০ দশমিক ২৭৬৬ মেট্রিক টন শুঁটকি উৎপাদিত হয়েছে। রাজস্ব আদায় হয়েছে প্রায় সাড়ে ৭ কোটি টাকা।
তিনি আশা প্রকাশ করেন, চলতি মৌসুমে সাড়ে ৮ হাজার মেট্রিক টনের বেশি শুঁটকি উৎপাদন এবং প্রায় ৮ কোটি টাকা রাজস্ব আদায় সম্ভব হবে।
তিনি আরও জানান, দুবলার শুঁটকিপল্লিতে অস্থায়ী ঘর নির্মাণের জন্য জেলেদের প্রয়োজনীয় দেশীয় সরঞ্জাম সঙ্গে নিতে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। আবাসস্থল নির্মাণে সুন্দরবনের কোনো গাছপালা ব্যবহার করা যাবে না। বনজ সম্পদ ও বন্যপ্রাণী রক্ষায় বনরক্ষীরা সার্বক্ষণিক নজরদারি করবেন।
জলদস্যু আতঙ্কে নিরাপত্তা চায় জেলে-মহাজনরা
দুবলার আলোরকোল থেকে রবিবার দুপুরে মোবাইল ফোনে দুবলা ফিশারমেন গ্রুপের সভাপতি বীর মুক্তিযোদ্ধা মো. কামাল উদ্দিন আহমেদ বলেন, ঘূর্ণিঝড় অর্ণবের প্রভাবের মধ্যেই দুবলারচরে এবারের শুঁটকি মৌসুম শুরু হয়েছে। তবে সাগরের আবহাওয়া ভালো হওয়ায় গত দুই দিনে জেলেরা প্রচুর মাছ পেয়েছেন। এবার ১০ হাজারের বেশি জেলে দুবলারচর অঞ্চলে এসেছেন।
তিনি বলেন, জেলেদের মধ্যে জলদস্যু আতঙ্ক রয়েছে। দস্যুদের নিয়ন্ত্রণ ও জেলেদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে দুবলা ফিশারমেন গ্রুপের পক্ষ থেকে কোস্টগার্ড, র্যাব ও পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ার আবেদন জানানো হয়েছে।
মাছ পেয়ে উচ্ছ্বসিত জেলেরা
আলোরকোলের রামপাল জেলে সমিতির সভাপতি মোতাসিম ফরাজী মোবাইল ফোনে বলেন, মৌসুমের প্রথম দিন থেকেই আলোরকোলে এসে জেলেরা কেউ অস্থায়ী ঘর নির্মাণ করছেন, আবার কেউ সাগরে মাছ ধরতে নেমে পড়েছেন। গত দুই দিনে প্রচুর মাছ পাওয়ায় জেলেরা বেশ খুশি।
সুন্দরবন পূর্ব বন বিভাগের শরণখোলা রেঞ্জের দুবলা টহল ফাঁড়ির ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ফরেস্ট রেঞ্জার মো. খলিলুর রহমান বলেন, ঘূর্ণিঝড়ের প্রভাব কেটে যাওয়ার পর শনিবার থেকে জেলেরা সাগরে মাছ ধরতে নেমেছেন। তারা সময় নষ্ট করতে চান না। গত দুই দিনে আহরিত মাছের একটি অংশ শুঁটকি তৈরির জন্য মাচায় বিছিয়ে দেওয়া হয়েছে, আবার কেউ কেউ মাটিতে ত্রিপল বিছিয়ে মাছ শুকানোর কাজ শুরু করেছেন।
সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্য রক্ষায় বন বিভাগের নজরদারি
বন বিভাগের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, মাছ আহরণের আড়ালে কেউ যাতে সুন্দরবনের বন্যপ্রাণী শিকার, গাছপালা কাটা কিংবা বনজ সম্পদ ব্যবহার করতে না পারে, সে বিষয়ে কঠোর নজরদারি রাখা হবে। জেলেদের অস্থায়ী আবাসস্থল নির্মাণেও সুন্দরবনের গাছপালা ব্যবহার নিষিদ্ধ করা হয়েছে।
সব মিলিয়ে দুবলারচরে শুরু হয়েছে নতুন স্বপ্ন ও সম্ভাবনার শুঁটকি মৌসুম। একদিকে সাগরে প্রচুর মাছ পাওয়ার আনন্দ, অন্যদিকে জলদস্যুর ভয়, বৈরী আবহাওয়া ও ঋণের চাপ—সবকিছু নিয়েই জীবিকার সন্ধানে সাগরের বুকে লড়াই করছেন হাজারো জেলে। তাদের প্রত্যাশা, নিরাপদ পরিবেশে নির্বিঘ্নে মাছ আহরণ করতে পারলে এবারের মৌসুমে লোকসান কাটিয়ে ঘুরে দাঁড়ানো সম্ভব হবে। একই সঙ্গে বাড়বে শুঁটকি উৎপাদন ও সরকারি রাজস্ব আয়।