১৯৫৩ সালের এপ্রিল। নিউইয়র্কের আইডলওয়াইল্ড বিমানবন্দরে নিজের উত্তরসূরিকে স্বাগত জানাতে অপেক্ষা করছিলেন জাতিসংঘের তৎকালীন মহাসচিব ত্রিগভে লি। সুইডিশ কূটনীতিক দাগ হামারশোল্ডকে স্বাগত জানিয়ে তিনি বলেছিলেন, ‘পৃথিবীর সবচেয়ে অসম্ভব চাকরিতে স্বাগতম।’ সাত দশক পরও জাতিসংঘের মহাসচিবের পদটি বিশ্বের অন্যতম কঠিন দায়িত্ব হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
বর্তমান মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেসের উত্তরসূরি বাছাইয়ের প্রক্রিয়া চলছে। সাধারণত মহাসচিবের মেয়াদ হয় পাঁচ বছর। প্রচলিত রীতি অনুযায়ী, পরপর দ্বিতীয় মেয়াদেও দায়িত্ব পালনের সুযোগ থাকে।
লাতিন আমেরিকা থেকে আসতে পারেন নতুন মহাসচিব
এবারের প্রতিযোগিতায় মোট আটজন প্রার্থী রয়েছেন। ভৌগোলিক ভারসাম্যের অনানুষ্ঠানিক রীতি অনুযায়ী, পরবর্তী মহাসচিব লাতিন আমেরিকা ও ক্যারিবীয় অঞ্চল থেকে আসতে পারেন।
এই অঞ্চল থেকে সর্বশেষ মহাসচিব ছিলেন পেরুর হাভিয়ের পেরেজ দে কুয়েলার। তিনি ১৯৯২ সালে দায়িত্ব ছাড়েন।
এর পাশাপাশি জাতিসংঘের ৮০ বছরের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো একজন নারীকে মহাসচিব করার দাবিও জোরালো হয়ে উঠেছে। বর্তমান প্রতিযোগিতায় লাতিন আমেরিকার একাধিক নারী প্রার্থী থাকায় এই সম্ভাবনাও আলোচনায় রয়েছে।
সামনে বড় চ্যালেঞ্জ
নতুন মহাসচিব এমন এক সময়ে দায়িত্ব নেবেন, যখন জাতিসংঘ নানা দিক থেকে চাপে রয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্র জাতিসংঘের সবচেয়ে বড় অর্থদাতা। কিন্তু ওয়াশিংটন স্বেচ্ছা তহবিলে অর্থ দেওয়া কমিয়েছে। জাতিসংঘের বিভিন্ন সংস্থার সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্কও টানাপোড়েনের মধ্যে রয়েছে।
অন্যদিকে, সদস্যদেশগুলোর বকেয়া চাঁদার কারণে সংস্থাটির অর্থসংকট আরও গভীর হয়েছে। গাজা, সুদান ও ইউক্রেনের যুদ্ধ থামাতে নিরাপত্তা পরিষদের অক্ষমতাও জাতিসংঘের কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে।
ফলে নতুন মহাসচিবের সামনে শুধু কূটনৈতিক সংকট নয়, প্রতিষ্ঠানটিকে আরও কার্যকর ও দক্ষ করার চ্যালেঞ্জও থাকবে।
নির্বাচন হয় যেভাবে
মহাসচিব নির্বাচনের প্রক্রিয়া শুরু হয় ২০২৫ সালের নভেম্বরের শেষ দিকে। জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ ও নিরাপত্তা পরিষদের সভাপতিরা সদস্যদেশগুলোকে প্রার্থী মনোনয়নের আহ্বান জানান।
জাতিসংঘ সনদ অনুযায়ী, ১৫ সদস্যের নিরাপত্তা পরিষদ একজন প্রার্থীকে সুপারিশ করে। এরপর ১৯৩ সদস্যের সাধারণ পরিষদ সেই প্রার্থীকে অনুমোদন করে।
তবে বাস্তবে মূল লড়াই হয় নিরাপত্তা পরিষদেই। একজন প্রার্থীকে অন্তত নয়টি দেশের সমর্থন পেতে হয়।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, নিরাপত্তা পরিষদের পাঁচ স্থায়ী সদস্যের কেউ যেন তাকে ভেটো না দেয়। এই পাঁচ দেশ হলো যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, রাশিয়া ও চীন।
গোপন ভোটে কে এগিয়ে
প্রার্থীদের জনপ্রিয়তা যাচাই করতে নিরাপত্তা পরিষদ অনানুষ্ঠানিক ও গোপন ভোট নেয়। এগুলোকে ‘স্ট্র পোল’ বলা হয়।
প্রতি প্রার্থীর ক্ষেত্রে সদস্যরা তিন ধরনের মত দেন। ‘এনকারেজ’ অর্থ ইতিবাচক সমর্থন। ‘নো ওপিনিয়ন’ অর্থ নিরপেক্ষ বা সিদ্ধান্তহীন অবস্থান। আর ‘ডিসকারেজ’ অর্থ নেতিবাচক অবস্থান।
এখন পর্যন্ত দুটি স্ট্র পোল হয়েছে। দ্বিতীয় দফার ভোটে গায়ানার ক্যারোলিন রদ্রিগেস-বির্কেট এগিয়ে রয়েছেন।
তার পরেই রয়েছেন কোস্টারিকার রেবেকা গ্রিনস্প্যান এবং আর্জেন্টিনার রাফায়েল মারিয়ানো গ্রোসি।
ক্যারোলিন রদ্রিগেস-বির্কেট: এই মুহূর্তের এগিয়ে থাকা প্রার্থী
ক্যারোলিন রদ্রিগেস-বির্কেট জাতিসংঘে গায়ানার দূত। এর আগে তিনি দেশটির পররাষ্ট্র ও আদিবাসীবিষয়ক মন্ত্রী ছিলেন। ২০২৪ ও ২০২৫ সালে তিনি জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে গায়ানার প্রতিনিধিত্ব করেন।
ক্যারিবীয় দেশগুলোর জোট ক্যারিকম আনুষ্ঠানিকভাবে তার প্রার্থিতাকে সমর্থন করেছে। রদ্রিগেস-বির্কেট নিজেকে ছোট রাষ্ট্রগুলোর জন্য একজন নীতিনিষ্ঠ ও বাস্তববাদী প্রার্থী হিসেবে তুলে ধরেছেন।
তিনি জাতিসংঘ সনদের ৯৯ অনুচ্ছেদ আরও সক্রিয়ভাবে ব্যবহার করতে চান। এর মাধ্যমে সম্ভাব্য আন্তর্জাতিক শান্তি ও নিরাপত্তার হুমকি নিরাপত্তা পরিষদের নজরে আনার ক্ষমতা মহাসচিবের রয়েছে।
আগস্টের দ্বিতীয় স্ট্র পোলেও তিনি সবচেয়ে ভালো ফল করেছেন। আটটি ‘এনকারেজ’, তিনটি ‘ডিসকারেজ’ এবং চারটি ‘নো ওপিনিয়ন’ ভোট পেয়েছেন তিনি।
রেবেকা গ্রিনস্প্যান: প্রথম দফায় এগিয়ে ছিলেন
কোস্টারিকার রেবেকা গ্রিনস্প্যান প্রথম স্ট্র পোলে সবচেয়ে ভালো করেছিলেন। জুলাইয়ের ভোটে তিনি ১০টি ‘এনকারেজ’ ভোট পান। ‘ডিসকারেজ’ ভোট ছিল মাত্র একটি।
তবে পরের ভোটে তার সমর্থন কমে যায়। আগস্টে তিনি সাতটি ‘এনকারেজ’ এবং চারটি ‘ডিসকারেজ’ ভোট পান।
গ্রিনস্প্যান মহাসচিবের কার্যালয় পুনর্গঠন করতে চান। জাতিসংঘের মধ্যস্থতাকারী ভূমিকা আরও শক্তিশালী করার পাশাপাশি তিনি সংস্থার বিভিন্ন বিভাগের কাজের পুনরাবৃত্তি কমাতে চান। দরিদ্র দেশগুলোর ঋণের বোঝা কমানোও তার অন্যতম অগ্রাধিকার।
রাফায়েল গ্রোসি: পারমাণবিক কূটনীতির অভিজ্ঞ মুখ
আর্জেন্টিনার রাফায়েল মারিয়ানো গ্রোসি সাত বছর ধরে আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার (আইএইএ) মহাপরিচালক। চার দশকের কূটনৈতিক অভিজ্ঞতা রয়েছে তার।
গ্রোসি নিজেকে কোনো নির্দিষ্ট শক্তিশালী দেশের ওপর নির্ভরশীল নন—এমন একজন স্বাধীন প্রার্থী হিসেবে তুলে ধরছেন। তিনি জাতিসংঘে বক্তৃতার চেয়ে বাস্তব ফলাফলকে বেশি গুরুত্ব দিতে চান।
শান্তি ও নিরাপত্তা, উন্নয়ন, মানবাধিকার, প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার এবং বাস্তববাদী বহুপক্ষীয় কূটনীতিকে তিনি অগ্রাধিকার দিয়েছেন।
আগস্টের ভোটে সাতটি ‘এনকারেজ’ ভোট পেয়েছেন গ্রোসি। বিপরীতে ছয়টি ‘ডিসকারেজ’ ভোট পান তিনি। ফলে তার প্রার্থিতার বিরুদ্ধে শক্তিশালী আপত্তিও রয়েছে। ফকল্যান্ড দ্বীপপুঞ্জ নিয়ে আর্জেন্টিনার নতুন করে সার্বভৌমত্ব আলোচনার দাবিও তার প্রার্থিতাকে জটিল করে তুলেছে।
মারিয়া ফার্নান্দা এসপিনোসা: নারী প্রার্থীদের একজন
ইকুয়েডরের কূটনীতিক মারিয়া ফার্নান্দা এসপিনোসা ২০১৮-১৯ মেয়াদে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের সভাপতি ছিলেন। তিনি ছিলেন ওই পদে বসা মাত্র চতুর্থ নারী। আর লাতিন আমেরিকা ও ক্যারিবীয় অঞ্চল থেকে প্রথম ব্যক্তি।
ইকুয়েডরের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে তিনি দুই দফা দায়িত্ব পালন করেছেন। তার অন্যতম প্রস্তাব হলো ‘প্রিভেনশন অ্যান্ড আর্লি অ্যাকশন হাব’ তৈরি করা। এর মাধ্যমে সম্ভাব্য সংকট আগেই শনাক্ত করে ব্যবস্থা নেওয়ার চেষ্টা করা হবে।
মারিয়ার আরেকটি অগ্রাধিকার হলো কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও নতুন প্রযুক্তি নিয়ে আন্তর্জাতিক নিয়ম তৈরি করা।
তবে আগস্টের ভোটে তিনি মাত্র চারটি ‘এনকারেজ’ ভোট পেয়েছেন। ফলে তার সামনে ঘুরে দাঁড়ানোর বড় চ্যালেঞ্জ রয়েছে।
মিশেল ব্যাশেলে: অভিজ্ঞ হলেও পিছিয়ে
চিলির সাবেক প্রেসিডেন্ট মিশেল ব্যাশেলেও এবারের প্রার্থীদের মধ্যে অন্যতম আলোচিত নাম। তিনি দুই মেয়াদে চিলির প্রেসিডেন্ট ছিলেন। পরে ২০১৮ থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনারের দায়িত্ব পালন করেন।
ব্যাশেলে জাতিসংঘের আমলাতন্ত্র কমিয়ে সংস্থাটিকে আরও কার্যকর করতে চান। জলবায়ু পরিবর্তন, জীববৈচিত্র্য ও দূষণকে তিনি ‘ত্রিমুখী বৈশ্বিক সংকট’ হিসেবে দেখেন।
তবে স্ট্র পোলে তার অবস্থান নেমে গেছে। আগস্টের ভোটে তিনি মাত্র দুটি ‘এনকারেজ’ ভোট পেয়েছেন। বিপরীতে, ‘ডিসকারেজ’ ভোট পেয়েছেন ছয়টি।
আফ্রিকার প্রার্থীরাও রয়েছেন
সেনেগালের সাবেক প্রেসিডেন্ট ম্যাকি সালও প্রতিযোগিতায় রয়েছেন। তিনি ২০১২ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত সেনেগালের প্রেসিডেন্ট ছিলেন।
তার প্রচারের মূল বক্তব্য ‘নতুন ও অন্তর্ভুক্তিমূলক বহুপক্ষীয় ব্যবস্থা’। আফ্রিকার স্বার্থকে জাতিসংঘের আলোচনায় আরও গুরুত্ব দেওয়ার ওপর জোর দিচ্ছেন তিনি।
উগান্ডার ওলার ওতুনুও একজন অভিজ্ঞ কূটনীতিক। জাতিসংঘে উগান্ডার রাষ্ট্রদূত এবং দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী ছিলেন তিনি।
১৯৯৭ থেকে ২০০৫ সাল পর্যন্ত শিশু ও সশস্ত্র সংঘাত বিষয়ে জাতিসংঘের আন্ডার সেক্রেটারি জেনারেল হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন।
আগস্টের স্ট্র পোলে ওতুনু সবচেয়ে বেশি অগ্রগতি দেখানো প্রার্থীদের একজন। তবে লাতিন আমেরিকার প্রার্থীকে বেছে নেওয়া এবং প্রথম নারী মহাসচিব নিয়োগের অনানুষ্ঠানিক প্রত্যাশা তার সম্ভাবনাকে কঠিন করে তুলছে।
আরও একজন প্রার্থী, তবে সম্ভাবনা কম
ইকুয়েডরের ইভন এ-বাকিও প্রতিযোগিতায় রয়েছেন। তাকে মনোনয়ন দিয়েছে টোঙ্গা।
সংঘাত নিরসনকে তিনি তার প্রচারের কেন্দ্রে রেখেছেন। তিনি জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের সংস্কার এবং আফ্রিকা, লাতিন আমেরিকা ও ক্যারিবীয় অঞ্চলের জন্য স্থায়ী প্রতিনিধিত্বের দাবি জানিয়েছেন।
আগস্টের স্ট্র পোলে তার ফল সবচেয়ে দুর্বল। তিনি কোনো ‘এনকারেজ’ ভোট পাননি। আটটি ‘ডিসকারেজ’ এবং সাতটি ‘নো ওপিনিয়ন’ ভোট পেয়েছেন।
ফলে তার পক্ষে প্রতিযোগিতায় শক্ত অবস্থানে ফেরা কঠিন বলে মনে করা হচ্ছে।
শেষ পর্যন্ত কে?
এখন পর্যন্ত গায়ানার ক্যারোলিন রদ্রিগেস-বির্কেটই সবচেয়ে এগিয়ে।
তবে জাতিসংঘ মহাসচিব নির্বাচনে শেষ মুহূর্তের কূটনীতি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কোনো প্রার্থীকে শুধু সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্যের সমর্থন পেলেই হবে না। নিরাপত্তা পরিষদের পাঁচ স্থায়ী সদস্যের ভেটোও এড়াতে হবে।
জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশন শুরু হলে দর-কষাকষি ও কূটনৈতিক তৎপরতা আরও বাড়বে।
নতুন মহাসচিব আগামী ১ জানুয়ারি দায়িত্ব নেবেন। ততদিনে প্রশ্নটির উত্তরও মিলবে—জাতিসংঘের ‘পৃথিবীর সবচেয়ে অসম্ভব চাকরি’ এবার কার হাতে যাচ্ছে?