রবিবার ১৬ আগস্ট ২০২৬ ১ ভাদ্র ১৪৩৩
 
শিরোনাম:


ফ্যাসিস্টের সংজ্ঞা কি হারিয়ে যাচ্ছে রাজনৈতিক স্লোগানের ভিড়ে?
প্রকাশ: শনিবার, ১৫ আগস্ট, ২০২৬, ৮:২২ পিএম  (ভিজিট : ১৬)
বাংলাদেশের রাজনীতিতে কিছু শব্দ আছে, যেগুলো শুধু রাজনৈতিক অভিধানের অংশ নয়; ক্ষমতার লড়াইয়ে সেগুলো অস্ত্র হিসেবেও ব্যবহৃত হয়। ‘ফ্যাসিস্ট’ এখন তেমনই একটি শব্দ। প্রতিপক্ষকে রাজনৈতিকভাবে কোণঠাসা করতে, তার বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন তুলতে কিংবা জনগণের কাছে তাকে অগ্রহণযোগ্য করে তুলতে শব্দটির ব্যবহার ক্রমেই বাড়ছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে ‘ফ্যাসিস্ট’ বললেই কি সে ফ্যাসিস্ট হয়ে যায়? নাকি কোনো দল বা সরকারের রাজনৈতিক আচরণ, প্রতিষ্ঠানবিরোধী অবস্থান, ক্ষমতা প্রয়োগের ধরন এবং ভিন্নমতের প্রতি মনোভাবের ভিত্তিতেই এই পরিচয় নির্ধারিত হওয়া উচিত?

সাম্প্রতিক বাংলাদেশের রাজনীতিতে এই প্রশ্নটি নতুন করে সামনে এসেছে। বিশেষ করে ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের পর জামায়াতে ইসলামী ও জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) বিএনপি সরকারের বিরুদ্ধে স্বৈরাচারী প্রবণতা এবং ফ্যাসিবাদী রাজনীতির দিকে অগ্রসর হওয়ার অভিযোগ তুলেছে। জামায়াতের নেতারা বিএনপির রাজনৈতিক অবস্থানকে একদলীয় শাসনের প্রবণতা হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। কখনো বিএনপিকে ‘ফ্যাসিস্ট’, কখনো ‘পলাতক ফ্যাসিস্টের পথ অনুসরণকারী’ হিসেবেও আখ্যায়িত করা হয়েছে।

এনসিপির বক্তব্যও অনেকটা একই ধরনের। দলটির আশঙ্কা, বিএনপি গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক পথ থেকে সরে গেলে ভবিষ্যতে স্বৈরাচারী কিংবা ফ্যাসিবাদী চরিত্র ধারণ করতে পারে। অর্থাৎ, বাংলাদেশের রাজনীতিতে ‘ফ্যাসিস্ট’ শব্দটি এখন শুধু অতীতের কোনো নির্দিষ্ট শাসনব্যবস্থার বর্ণনা নয়; এটি বর্তমান রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতারও একটি গুরুত্বপূর্ণ অস্ত্র হয়ে উঠছে।

কিন্তু এখানেই মৌলিক প্রশ্নটি তৈরি হয়—ফ্যাসিবাদ কী? শব্দটি কি কেবল রাজনৈতিক বক্তৃতায় প্রতিপক্ষকে আক্রমণ করার জন্য ব্যবহার করা হবে, নাকি এর একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক ও ঐতিহাসিক অর্থ রয়েছে?

রাজনৈতিক তত্ত্বে ফ্যাসিবাদ সাধারণত চরম কর্তৃত্ববাদ, অতিরিক্ত জাতীয়তাবাদ, রাজনৈতিক বহুত্ববাদ প্রত্যাখ্যান, ভিন্নমত দমন, বিরোধীদের ওপর নিপীড়ন এবং রাষ্ট্রীয় ক্ষমতাকে একক রাজনৈতিক কর্তৃত্বের অধীনে কেন্দ্রীভূত করার প্রবণতার সঙ্গে যুক্ত। ইতিহাসে ইতালির বেনিতো মুসোলিনি কিংবা জার্মানির অ্যাডলফ হিটলারের শাসন ফ্যাসিবাদের সবচেয়ে আলোচিত উদাহরণ। তবে আধুনিক রাজনীতিতে শব্দটির ব্যবহার আরও বিস্তৃত হয়েছে। কোনো সরকার বা রাজনৈতিক শক্তি যখন গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানকে দুর্বল করে, বিরোধী মতকে রাষ্ট্রীয় শক্তি দিয়ে দমন করে, সংবাদমাধ্যম ও বিচারব্যবস্থার স্বাধীনতা সংকুচিত করে এবং ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণ ঘটায়, তখন তার মধ্যে ফ্যাসিবাদী প্রবণতা আছে কি না—সে প্রশ্ন উঠতে পারে।

অতএব, কোনো রাজনৈতিক দলের গায়ে ‘ফ্যাসিস্ট’ তকমা লাগানোর আগে তার রাজনৈতিক আচরণ পরীক্ষা করা প্রয়োজন। সে কীভাবে রাষ্ট্র পরিচালনা করে? বিরোধী দলের অস্তিত্বকে কতটা স্বীকার করে? নির্বাচনকে কতটা প্রতিযোগিতামূলক রাখে? সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা কতটা নিশ্চিত করে? বিচার বিভাগ ও সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানকে দলীয় প্রভাবের বাইরে রাখতে কতটা আগ্রহী? প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এবং রাষ্ট্রীয় সম্পদকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ব্যবহার করে কি না? এসব প্রশ্নের উত্তর ছাড়া শুধু স্লোগানের ভিত্তিতে কাউকে ফ্যাসিস্ট ঘোষণা করা রাজনৈতিক বিশ্লেষণকে দুর্বল করে।

বিএনপি যে সমালোচনার ঊর্ধ্বে নয়, সেটি বলার অপেক্ষা রাখে না। একটি নির্বাচিত সরকারও জবাবদিহির বাইরে থাকতে পারে না। ক্ষমতাসীন দল যদি রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানকে দলীয় স্বার্থে ব্যবহার করে, বিরোধী মতকে দমন করে, নির্বাচন ও গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানকে দুর্বল করে কিংবা রাষ্ট্রক্ষমতাকে স্থায়ী রাজনৈতিক আধিপত্যের হাতিয়ারে পরিণত করার চেষ্টা করে, তবে তার বিরুদ্ধে প্রশ্ন ওঠাই স্বাভাবিক।

কিন্তু একই সঙ্গে প্রশ্ন উঠতে পারে—যারা বিএনপিকে ফ্যাসিবাদের পাঠ পড়াচ্ছে, তাদের নিজেদের রাজনৈতিক অতীত ও বর্তমান কি সেই নৈতিক অবস্থানকে সমর্থন করে?

এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হলে জামায়াতে ইসলামীর ইতিহাস এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই।

বাংলাদেশের রাজনীতিতে জামায়াতে ইসলামীর সবচেয়ে বড় ঐতিহাসিক বিতর্কের কেন্দ্র ১৯৭১। দলটির তৎকালীন রাজনৈতিক নেতৃত্ব বাংলাদেশের স্বাধীনতার বিরোধিতা করেছিল এবং পাকিস্তানি রাষ্ট্রের অখণ্ডতার পক্ষে অবস্থান নিয়েছিল। মুক্তিযুদ্ধের সময় দলটির রাজনৈতিক অবস্থান এবং এর নেতাদের ভূমিকা বাংলাদেশের ইতিহাসের অত্যন্ত বিতর্কিত ও বেদনাদায়ক অধ্যায়ের অংশ।

এটি শুধু অতীতের একটি রাজনৈতিক অবস্থান নয়; বাংলাদেশের রাষ্ট্রের জন্মের ইতিহাসের সঙ্গে যুক্ত একটি প্রশ্ন। ফলে আজ জামায়াত বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব, গণতন্ত্র ও জনগণের অধিকার রক্ষার রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে নিজেদের তুলে ধরতে চাইলে তাদের রাজনৈতিক পুনর্গঠনকে অবশ্যই ইতিহাসের এই অধ্যায়ের সঙ্গে মোকাবিলা করেই করতে হবে।

একটি রাজনৈতিক দল সময়ের সঙ্গে পরিবর্তিত হতে পারে। মতাদর্শের পরিবর্তন সম্ভব। রাজনৈতিক অবস্থানের পুনর্মূল্যায়নও সম্ভব। এমনকি কোনো দল অতীতের ভুল স্বীকার করে নতুন রাজনৈতিক দর্শন নিয়ে জনগণের সামনে দাঁড়াতেও পারে। কিন্তু ইতিহাসকে সম্পূর্ণ অস্বীকার করে রাজনৈতিক নৈতিকতার দাবি প্রতিষ্ঠা করা কঠিন।

বিশেষ করে যখন সেই দলই অন্য একটি রাজনৈতিক দলের অতীত ও সম্ভাব্য ভবিষ্যৎ আচরণকে গণতন্ত্রের মানদণ্ডে বিচার করতে চায়।

জামায়াতের সমালোচনার অর্থ এই নয় যে দলটির প্রত্যেক নেতা বা সমর্থক সহিংস কিংবা গণতন্ত্রবিরোধী। একটি দলের লাখো কর্মী-সমর্থকের প্রত্যেককে তার সংগঠনের ঐতিহাসিক সিদ্ধান্তের জন্য ব্যক্তিগতভাবে দায়ী করা ন্যায়সংগত নয়। কিন্তু একটি রাজনৈতিক সংগঠনকে বিচার করার সময় তার দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক ইতিহাস, সাংগঠনিক আচরণ, মতাদর্শ এবং ক্ষমতার প্রতি তার দৃষ্টিভঙ্গিও বিবেচনায় রাখতে হয়।

জামায়াতের ছাত্র সংগঠন ইসলামী ছাত্রশিবিরের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডও বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে বিতর্কের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের সঙ্গে সংঘর্ষ, হামলা এবং সহিংসতার অভিযোগ বহু বছর ধরে আলোচনায় এসেছে। এসব ঘটনার সবগুলোকে একইভাবে বিচার করার সুযোগ নেই, আবার অভিযোগগুলোকে সম্পূর্ণ অগ্রাহ্য করারও সুযোগ নেই। একটি রাজনৈতিক সংগঠন যখন জাতীয় ক্ষমতার অংশীদার হতে চায়, তখন তার সাংগঠনিক সংস্কৃতি ও অতীত কর্মকাণ্ড নিয়ে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক।

২০১৩ সালে যুদ্ধাপরাধের বিচারকে কেন্দ্র করে সংঘটিত রাজনৈতিক সহিংসতার ঘটনাগুলোও এই আলোচনার বাইরে রাখা যায় না। সে সময় জামায়াত ও এর সহযোগী সংগঠনের কর্মী-সমর্থকদের বিরুদ্ধে সহিংসতা, পুলিশের ওপর হামলা, রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের ওপর আক্রমণ এবং হত্যাকাণ্ডের অভিযোগ ওঠে। এসব অভিযোগের অনেকগুলো নিয়ে তদন্ত, মামলা ও বিচারিক প্রক্রিয়াও হয়েছে।

অতীতের এসব ঘটনা সামনে আনা কোনো সংগঠনের প্রত্যেক বর্তমান কর্মীকে অভিযুক্ত করা নয়। বরং প্রশ্নটি হলো—যে দল অন্যদের রাজনৈতিক আচরণের হিসাব চাইছে, সেই দল নিজের রাজনৈতিক ইতিহাসের হিসাব দিতে কতটা প্রস্তুত?

এখানেই রাজনৈতিক নৈতিকতার বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। গণতন্ত্রে কোনো রাজনৈতিক দলই কেবল অন্যের ভুলের ওপর দাঁড়িয়ে নিজের বৈধতা প্রতিষ্ঠা করতে পারে না। তাকে নিজের আচরণ দিয়েও প্রমাণ করতে হয় যে সে যে গণতন্ত্রের কথা বলছে, তা শুধু ক্ষমতায় যাওয়ার উপায় নয়; বরং ক্ষমতায় থাকার সময়ও অনুসরণ করার রাজনৈতিক নীতি।

জামায়াতের রাজনৈতিক পুনর্গঠনের আলোচনায় নারী অধিকারও গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। সাম্প্রতিক সময়ে দলটির নেতারা নারী শিক্ষা, কর্মসংস্থান, সরকারি চাকরি এবং রাজনৈতিক অংশগ্রহণের সুযোগের পক্ষে বক্তব্য দিয়েছেন। নির্বাচনী রাজনীতিতে নারীর সমান সুযোগের কথাও বলা হয়েছে। এই বক্তব্যগুলোকে অবশ্যই ইতিবাচক পরিবর্তনের সম্ভাবনা হিসেবে দেখা যেতে পারে।

কিন্তু একই সঙ্গে দলের নীতি, সাংগঠনিক সংস্কৃতি এবং বাস্তব রাজনৈতিক আচরণও দেখতে হবে।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জামায়াতের একজন শীর্ষ নেতার নামে একটি বিতর্কিত পোস্ট নিয়ে তীব্র আলোচনা তৈরি হয়েছিল। সেখানে কর্মজীবী নারীদের নিয়ে অবমাননাকর মন্তব্য করা হয়। পরে দলটির পক্ষ থেকে বলা হয়, সংশ্লিষ্ট অ্যাকাউন্টটি হ্যাক করা হয়েছিল এবং পোস্টটি ওই নেতার ব্যক্তিগত মতামত নয়।

দলটির এই ব্যাখ্যা বিবেচনায় নেওয়া উচিত। কিন্তু একটি ঘটনা যদি জনমনে প্রশ্ন তৈরি করে, সেই প্রশ্নের রাজনৈতিক উত্তরও প্রয়োজন। নারী স্বাধীনতা, কর্মজীবন, সামাজিক ভূমিকা এবং রাজনৈতিক নেতৃত্ব সম্পর্কে জামায়াতের প্রকৃত অবস্থান কী—সেটি স্পষ্টভাবে জনগণের সামনে তুলে ধরা দরকার।

কারণ আধুনিক গণতন্ত্রে নারী শুধু ভোটার নন; তিনি রাজনৈতিক নেতৃত্বের অংশীদার, অর্থনীতির অংশীদার, প্রশাসনের অংশীদার এবং রাষ্ট্র পরিচালনারও সমান অধিকারী। কোনো দল যদি রাষ্ট্রক্ষমতায় যেতে চায়, তাহলে নারীকে নিয়ে তার রাজনৈতিক দর্শন কেবল নির্বাচনী ইশতেহারে নয়, সাংগঠনিক কাঠামো ও বাস্তব আচরণেও প্রতিফলিত হতে হবে।

একই প্রশ্ন সংখ্যালঘু নাগরিকদের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য।

বাংলাদেশ একটি বহুত্ববাদী রাষ্ট্র। মুসলমানের পাশাপাশি হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিস্টানসহ বিভিন্ন ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক সম্প্রদায়ের মানুষ এই দেশের সমান নাগরিক। সংবিধানের দৃষ্টিতে নাগরিক অধিকার ধর্মীয় পরিচয়ের ভিত্তিতে নির্ধারিত হওয়ার কথা নয়।

এই বাস্তবতায় কোনো রাজনৈতিক দল যখন ধর্মীয় পরিচয়কে তার রাজনীতির গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হিসেবে সামনে আনে, তখন স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন ওঠে—রাষ্ট্রক্ষমতায় গেলে সংখ্যালঘু নাগরিকরা নিজেদের কতটা সমান ও নিরাপদ মনে করবেন?

জামায়াতকে এই প্রশ্নের উত্তর দিতে হবে। শুধু জামায়াত নয়, ধর্মকে রাজনৈতিক পরিচয়ের অংশ হিসেবে ব্যবহার করে এমন প্রতিটি রাজনৈতিক দলকেই এই প্রশ্নের উত্তর দিতে হবে। কারণ সংখ্যাগরিষ্ঠের অধিকার রক্ষা করা গণতন্ত্রের একটি অংশ; সংখ্যালঘুর নিরাপত্তা, মর্যাদা ও সমঅধিকার নিশ্চিত করাও গণতন্ত্রের মৌলিক পরীক্ষা।

এখানে আবার ফিরে আসতে হয় ‘ফ্যাসিস্ট’ শব্দটির ব্যবহারে।

একটি রাজনৈতিক দলকে ফ্যাসিস্ট বলার আগে তার ক্ষমতা প্রয়োগের ধরন দেখতে হবে। একটি সরকারকে স্বৈরাচারী বলার আগে তার রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান ব্যবহারের ধরন দেখতে হবে। কোনো রাজনৈতিক দল গণতন্ত্রবিরোধী কি না, তা বিচার করতে হলে দেখতে হবে সে বিরোধী দলের অধিকারকে কতটা স্বীকার করে, সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতার প্রতি কতটা শ্রদ্ধাশীল এবং রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠানগুলোকে দলীয় নিয়ন্ত্রণের বাইরে রাখার বিষয়ে কতটা প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।

শুধু রাজনৈতিক বক্তৃতায় ‘ফ্যাসিস্ট’ শব্দটি বারবার উচ্চারণ করলে এর অর্থ বদলে যায়। তখন এটি আর রাজনৈতিক বিশ্লেষণের ধারণা থাকে না; পরিণত হয় প্রতিপক্ষকে বৈধতা থেকে বঞ্চিত করার স্লোগানে।

এতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হয় গণতান্ত্রিক বিতর্কের।

কারণ একটি শব্দ যখন অতিরিক্ত এবং নির্বিচারে ব্যবহৃত হয়, তখন বাস্তব ফ্যাসিবাদী প্রবণতাও চিহ্নিত করা কঠিন হয়ে পড়ে। কেউ সত্যিই রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান ধ্বংস করছে কি না, বিরোধীদের দমন করছে কি না, নির্বাচনকে নিয়ন্ত্রণ করছে কি না—এসব গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তখন শব্দের রাজনৈতিক ব্যবহারের আড়ালে হারিয়ে যায়।

এর অর্থ অবশ্যই বিএনপিকে ছাড় দেওয়া নয়।

বিএনপি ক্ষমতায় থাকলে তাকে তার কর্মকাণ্ডের জন্য জবাব দিতে হবে। রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানকে দলীয় নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার চেষ্টা করলে তার সমালোচনা করতে হবে। বিরোধী দলকে দমন করলে প্রশ্ন তুলতে হবে। গণমাধ্যমের স্বাধীনতা ক্ষুণ্ন হলে প্রতিবাদ করতে হবে। প্রশাসনকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ব্যবহার করলে তার জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। নির্বাচন ও বিচারব্যবস্থার স্বাধীনতা ক্ষতিগ্রস্ত হলে রাজনৈতিক ও সাংবিধানিক প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে।

কিন্তু বিএনপিকে বিচার করার যে মানদণ্ড, জামায়াতসহ অন্য সব রাজনৈতিক দলের ক্ষেত্রেও একই মানদণ্ড প্রয়োগ করতে হবে।

এখানেই গণতন্ত্রের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নীতি—একই মানদণ্ড—প্রাসঙ্গিক হয়ে ওঠে।

একটি দলের জন্য যে আচরণ স্বৈরাচারী, অন্য দলের জন্য একই আচরণ গণতান্ত্রিক হতে পারে না। একটি দলের ক্ষেত্রে যে সহিংসতা অপরাধ, অন্য দলের ক্ষেত্রে সেটি রাজনৈতিক কৌশল হতে পারে না। একটি দলের নেতার বক্তব্যকে যদি গণতন্ত্রবিরোধী বলা হয়, অন্য দলের নেতার একই ধরনের বক্তব্যকে শুধু রাজনৈতিক বাস্তবতা বলে এড়িয়ে যাওয়া যায় না।

গণতন্ত্রে রাজনৈতিক দলের পরিচয় নির্ধারিত হওয়া উচিত তার বক্তব্যের পাশাপাশি তার বাস্তব রাজনৈতিক আচরণ দিয়ে।

জুলাইয়ের গণঅভ্যুত্থানের রাজনৈতিক উত্তরাধিকার বহনকারী এনসিপির সামনে এই প্রশ্নটি আরও গুরুত্বপূর্ণ। স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে আন্দোলনের ভাষা কোনো একটি রাজনৈতিক দলের একচেটিয়া সম্পত্তি হতে পারে না। জুলাইয়ের আন্দোলনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক শিক্ষা যদি হয়ে থাকে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার জবাবদিহি, নাগরিক স্বাধীনতা এবং রাজনৈতিক আধিপত্যের বিরুদ্ধে অবস্থান, তাহলে সেই শিক্ষা শুধু একটি দলকে সরিয়ে অন্য একটি দলকে ক্ষমতার কেন্দ্রে বসানোর মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকতে পারে না।

রাজনৈতিক পরিবর্তনের প্রকৃত অর্থ হলো ক্ষমতার চরিত্রের পরিবর্তন।

অর্থাৎ বিএনপির আধিপত্য যেমন প্রশ্নবিদ্ধ হতে পারে, তেমনি জামায়াতের আধিপত্যের সম্ভাবনাও প্রশ্নের বাইরে থাকতে পারে না। একইভাবে এনসিপিও সমালোচনার ঊর্ধ্বে নয়। যে দলই ক্ষমতায় যাক, তাকে একই সাংবিধানিক সীমারেখা, একই নাগরিক অধিকার এবং একই গণতান্ত্রিক জবাবদিহির কাঠামোর মধ্যে থাকতে হবে।

এখানেই বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ রাজনীতির বড় চ্যালেঞ্জ।

রাজনীতিতে ক্ষমতার পরিবর্তন হয়েছে বহুবার। কিন্তু ক্ষমতা ব্যবহারের সংস্কৃতি কতটা বদলেছে—সেটিই আসল প্রশ্ন। একটি সরকার পরিবর্তনের পর যদি রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান আবারও দলীয় প্রভাবের অধীনে চলে যায়, বিরোধী মতকে আবারও শত্রু হিসেবে দেখা হয়, প্রশাসন আবারও রাজনৈতিক আনুগত্যের ভিত্তিতে পরিচালিত হয় এবং গণমাধ্যম আবারও চাপের মুখে পড়ে, তাহলে শুধু ক্ষমতাসীন দলের নাম পরিবর্তন করে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব নয়।

তাই বাংলাদেশের রাজনৈতিক বিতর্কে ‘কে ফ্যাসিস্ট’—এই প্রশ্নের পাশাপাশি আরও বড় প্রশ্ন করতে হবে—কোন আচরণ ফ্যাসিবাদী?

কেউ বিরোধী মতকে সহ্য করে না—এটি কি ফ্যাসিবাদী প্রবণতা? রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানকে দলীয় নিয়ন্ত্রণে নেওয়া কি ফ্যাসিবাদী প্রবণতা? নির্বাচনী ব্যবস্থাকে নিয়ন্ত্রণ করা কি ফ্যাসিবাদী প্রবণতা? সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা সংকুচিত করা কি ফ্যাসিবাদী প্রবণতা? বিচারব্যবস্থাকে রাজনৈতিকভাবে ব্যবহার করা কি ফ্যাসিবাদী প্রবণতা? রাষ্ট্রীয় শক্তিকে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে ব্যবহার করা কি ফ্যাসিবাদী প্রবণতা?

এসব প্রশ্নের উত্তর নির্দিষ্ট মানদণ্ডে দিতে হবে।

তারপর সেই মানদণ্ড একইভাবে বিএনপি, জামায়াত, এনসিপি কিংবা অন্য যেকোনো রাজনৈতিক দলের ওপর প্রয়োগ করতে হবে।

জামায়াত যদি সত্যিই বাংলাদেশে ফ্যাসিবাদবিরোধী রাজনীতির নেতৃত্ব দিতে চায়, তাহলে তাকে প্রথমেই নিজের ইতিহাসের কঠিন প্রশ্নগুলোর মুখোমুখি হতে হবে। ১৯৭১ সালে তাদের রাজনৈতিক অবস্থান, মুক্তিযুদ্ধের সময়কার ভূমিকা, যুদ্ধাপরাধের বিচারে দলটির শীর্ষ নেতাদের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ ও বিচারিক ইতিহাস, শিবিরের রাজনৈতিক সহিংসতার অভিযোগ, নারী ও সংখ্যালঘুদের অধিকার সম্পর্কে তাদের অবস্থান এবং ভবিষ্যৎ রাষ্ট্রচিন্তা—সবকিছুর বিষয়ে স্পষ্ট ও বিশ্বাসযোগ্য বক্তব্য প্রয়োজন।

ইতিহাসকে চাপা দিয়ে কোনো রাজনৈতিক দল দীর্ঘমেয়াদে নৈতিক নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠা করতে পারে না।

একইভাবে বিএনপিকেও বলতে হবে—অতীতের ভুল, অন্যের ব্যর্থতা কিংবা নির্বাচনী বিজয় দিয়ে বর্তমানের ক্ষমতার জবাবদিহি এড়ানো যাবে না। জনগণ ভোট দিয়েছে মানেই সরকার যা খুশি করতে পারবে—গণতন্ত্রের ধারণা এমন নয়। নির্বাচনী বৈধতার পাশাপাশি সাংবিধানিক বৈধতা, প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহি, নাগরিক অধিকার এবং বিরোধী মতের স্বাধীনতাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।

এনসিপির ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য। নতুন রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে জনগণের প্রত্যাশা তাদের কাছে বেশি। তারা যদি পুরোনো রাজনৈতিক সংস্কৃতির সমালোচনা করে, তাহলে নিজেদের রাজনৈতিক আচরণেও সেই পরিবর্তনের প্রমাণ দিতে হবে। শুধু পুরোনো দলগুলোর বিরুদ্ধে অভিযোগ করলেই নতুন রাজনীতি প্রতিষ্ঠিত হয় না; নতুন রাজনৈতিক সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠা করতে হয় নিজেদের আচরণের মধ্য দিয়ে।

বাংলাদেশের জনগণ এখন সম্ভবত শুধু রাজনৈতিক স্লোগান শুনতে চায় না। তারা জানতে চায়, ক্ষমতায় গেলে কে কী করবে।

কে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানকে স্বাধীন রাখবে?

কে বিরোধী দলের রাজনৈতিক অধিকার নিশ্চিত করবে?

কে সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা রক্ষা করবে?

কে বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিশ্চিত করবে?

কে সংখ্যালঘুর নিরাপত্তা ও সমঅধিকার নিশ্চিত করবে?

কে নারীর রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অধিকারকে বাস্তবে প্রতিষ্ঠা করবে?

কে রাষ্ট্রের সম্পদকে দলীয় সম্পদে পরিণত করবে না?

এই প্রশ্নগুলোর উত্তরই একটি রাজনৈতিক দলের প্রকৃত চরিত্র নির্ধারণ করবে।

‘ফ্যাসিস্ট’ শব্দটি যদি সত্যিই রাজনৈতিক বিশ্লেষণের অংশ হয়, তাহলে এর ব্যবহারেও থাকতে হবে প্রমাণ, ইতিহাস, রাজনৈতিক আচরণ এবং ধারাবাহিকতার ভিত্তি। আর যদি এটি কেবল প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করার স্লোগানে পরিণত হয়, তাহলে শব্দটি যত বেশি উচ্চারিত হবে, তার রাজনৈতিক গুরুত্ব ততই কমবে।

সবচেয়ে বড় কথা, ফ্যাসিবাদবিরোধিতা নিজেই যেন আরেক ধরনের রাজনৈতিক একচেটিয়াত্বে পরিণত না হয়।

একটি দল যদি বলে, ‘আমরাই গণতন্ত্রের একমাত্র রক্ষক’, তাহলে সেখানেও প্রশ্ন করতে হবে। একটি দল যদি বলে, ‘আমরাই ফ্যাসিবাদবিরোধী’, তাহলে জানতে হবে তার নিজের সংগঠনে ভিন্নমতের জায়গা কতটা। একটি দল যদি অন্যের রাজনৈতিক আধিপত্যের সমালোচনা করে, তাহলে তাকেও বলতে হবে—ক্ষমতায় গেলে সে কীভাবে নিজের আধিপত্যকে সীমাবদ্ধ রাখবে।

কারণ গণতন্ত্রের সবচেয়ে বড় পরীক্ষা বিরোধী অবস্থানে নয়; ক্ষমতায় থাকার সময়।

বিরোধী দলে থাকলে প্রায় সব রাজনৈতিক দলই গণতন্ত্র, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, নির্বাচন এবং জনগণের অধিকারের কথা বলে। কিন্তু ক্ষমতায় যাওয়ার পর সেই প্রতিশ্রুতিগুলো কতটা বাস্তবায়িত হয়, সেখানেই রাজনৈতিক চরিত্রের আসল পরীক্ষা।

বাংলাদেশের রাজনীতিতে তাই আসল প্রশ্ন হওয়া উচিত নয়—কে কাকে ‘ফ্যাসিস্ট’ বলল। আসল প্রশ্ন হওয়া উচিত—কে কীভাবে ক্ষমতা ব্যবহার করছে, কে ভিন্নমতকে কতটা সহ্য করছে, কে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানকে কতটা স্বাধীন রাখছে এবং কে নাগরিকের সমান অধিকার নিশ্চিত করতে কতটা প্রস্তুত।

কোনো রাজনৈতিক দলই স্থায়ীভাবে নৈতিকতার একমাত্র মালিক নয়। ইতিহাসে যারা ক্ষমতার অপব্যবহার করেছে, তারা ভবিষ্যতে নিজেদের পরিবর্তনের দাবি করতে পারে; কিন্তু সেই পরিবর্তনের প্রমাণ দিতে হবে আচরণের মাধ্যমে। আবার যারা আজ গণতন্ত্রের কথা বলছে, তাদেরও আগামীকাল ক্ষমতায় গিয়ে সেই গণতন্ত্র রক্ষা করতে হবে।

বাংলাদেশের জনগণ কোনো রাজনৈতিক দলের কাছ থেকেই অন্ধ আনুগত্য চায় না। তারা চায় জবাবদিহি। বিএনপিকে বিএনপির কাজের জন্য জবাব দিতে হবে। এনসিপিকে তাদের রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের জন্য জবাব দিতে হবে। জামায়াতকেও তার ইতিহাস, মতাদর্শ ও বর্তমান অবস্থানের জন্য জবাব দিতে হবে।

কারণ গণতন্ত্রে কাউকে ‘ফ্যাসিস্ট’ ঘোষণা করার অধিকার কোনো দলের একার নয়। রাজনৈতিক অভিধানের কোনো শব্দ জনগণের বিবেচনাকে প্রতিস্থাপন করতে পারে না।

শেষ পর্যন্ত জনগণই বিচার করবে—কোন রাজনৈতিক শক্তি স্বাধীনতা, বহুত্ববাদ, গণতন্ত্র, মানবিক মর্যাদা এবং নাগরিক অধিকারের প্রতি সত্যিকার অর্থে কতটা বিশ্বস্ত।

তাই ‘ফ্যাসিস্ট’ শব্দটি রাজনৈতিক স্লোগানে সীমাবদ্ধ থাকবে, নাকি রাজনৈতিক বিশ্লেষণের একটি সুনির্দিষ্ট ধারণা হিসেবে ব্যবহৃত হবে—সেটি নির্ভর করছে রাজনৈতিক দলগুলোর সততা ও নিজেদের প্রতি একই মানদণ্ড প্রয়োগ করার সক্ষমতার ওপর।

যে দল অন্যকে ফ্যাসিস্ট বলবে, তাকে নিজের গণতান্ত্রিক চরিত্রও প্রমাণ করতে হবে। যে দল অন্যের স্বৈরাচারী আচরণের সমালোচনা করবে, তাকে নিজের ক্ষমতার সীমাও নির্ধারণ করতে হবে। আর যে দল জনগণের মুক্তি ও গণতন্ত্রের কথা বলবে, তাকে নিশ্চিত করতে হবে—ক্ষমতার কেন্দ্রে গিয়ে যেন সেই জনগণই আবার তার ভয়ের কারণ হয়ে না দাঁড়ায়।

ফ্যাসিবাদবিরোধী রাজনীতির প্রকৃত পরীক্ষা তাই শব্দে নয়, ক্ষমতার ব্যবহারে। স্লোগানে নয়, প্রতিষ্ঠানে। বক্তৃতায় নয়, আচরণে। আর শেষ বিচারে—কোনো দলের মুখে নয়, জনগণের স্বাধীন ও নির্ভয়ে কথা বলার অধিকারেই।


লেখক: রাজু আলীম, কবি, সাংবাদিক, মিডিয়া ব্যক্তিত্ব








আরও খবর


Loading...
Loading...
প্রকাশক: এম এন এইচ বুলু
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : মাহফুজুর রহমান রিমন  |   উপদেষ্টা সম্পাদক : রাজু আলীম  
বিএনএস সংবাদ প্রতিদিন লি. এর পক্ষে প্রকাশক এম এন এইচ বুলু কর্তৃক ৪০ কামাল আতাতুর্ক এভিনিউ, বুলু ওশেন টাওয়ার, (২১ তলা), বনানী, ঢাকা ১২১৩ থেকে প্রকাশিত ও শরীয়তপুর প্রিন্টিং প্রেস, ২৩৪ ফকিরাপুল, ঢাকা থেকে মুদ্রিত।
ফোন:০২৯৮২০০১৯-২০ ফ্যাক্স: ০২-৯৮২০০১৬ ই-মেইল: [email protected]