বুধবার ১২ আগস্ট ২০২৬ ২৮ শ্রাবণ ১৪৩৩
 
শিরোনাম:


টরন্টোয় কনসাল জেনারেলের দম্ভ:
পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে রুম শেয়ার করেছি, আমার সম্পর্কের গভীরতা বুঝেন!
প্রকাশ: বুধবার, ১২ আগস্ট, ২০২৬, ৫:১২ পিএম  (ভিজিট : ৪)
জুলাই গণঅভ্যুত্থান দিবসে টরন্টোয় কানাডা বিএনপি নেতাদের ‘খুঁটির জোর’ দেখিয়েছেন কনস্যাল জেনারেল শাহ আলম খোকন। অনুষ্ঠানে বক্তব্য প্রদানকালে ‘ক্ষমতার দম্ভ’ প্রকাশ করে বলেছেন, ‘পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে আমার সম্পর্ক অত্যন্ত ঘনিস্ট। তার সঙ্গে আমি নিউইয়র্কে রুম শেয়ার করেছি। এবার সম্পর্কের গভীরতা বুঝেন। আমি যা করি, তার সঙ্গে পরামর্শ করেই করি। আর কে কি বললো, তাতে আমার কিছুই যায়-আসে না’। অনুষ্ঠান উপস্থিত কয়েকজন প্রবাসী বাংলাদেশি এবং বিএনপি নেতারা তার এই বক্তব্যকে ‘ক্ষমতার দম্ভ’, ‘অশোভন’ এবং ‘কূটনৈতিক শিষ্টাচারবহির্ভূত’ বলে অভিহিত করেছেন। জুলাই দিবসের অনুষ্ঠানে তার এমন বক্তব্যে উপস্থিত সবাই বিস্মিত হয়েছেন। কনস্যুলেটে একটি জাতীয় দিবসের অনুষ্ঠানে বিএনপি নেতাদের দাওয়াত দিয়ে নিয়ে নিজের ব্যক্তিগত প্রভাব বোঝাতে প্রকাশ্যে মন্ত্রীর সঙ্গে রুম শেয়ার করার এই বক্তব্যে টরন্টোর বাংলাদেশ কমিউনিটির মধ্যে চলছে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনা।

অনুষ্ঠানে উপস্থিত একাধিক বিএনপি নেতা জানান, অনুষ্ঠানের শুরুতেই কনস্যাল জেনারেল সঞ্চালককে নির্দেশ দেন, বিএনপি নেতাদের পদ-পদবী উল্লেখ না করে সবাইকে বাংলাদেশি কানাডিয়ান সম্মোধন করে বক্তব্যে দেয়ার জন্য। এসময় বিএনপি নেতারা আপত্তি করলে কনস্যাল জেনারেল বলেন ‘তিনি যা নির্দেশ দেবেন, তাই চূড়ান্ত’। সে অনুযায়ী বিএনপি নেতাদের বক্তব্য দেয়ার সময় তাঁদের পদবী উল্লেখ করা হয়নি। তার এ নির্দেশকে উপস্থিত বিএনপি নেতাদের প্রতি প্রকাশ্য অসম্মান হিসেবে দেখছেন অনেকে।

জাতীয় তাৎপর্য বহনকারী এ অনুষ্ঠানে জাতীয় সংগীত, কোরআন তেলাওয়াত কিংবা জুলাই গণঅভ্যুত্থানের শহীদদের জন্য দোয়ার কোনো আয়োজন ছিল না। বেলা ৩টায় অতিথিদের আমন্ত্রণ জানিয়ে চা ও মিষ্টি দিয়ে আপ্যায়ন করা হয়। বক্তব্যের সময় কনসাল জেনারেল একাধিকবার বলেন, ‘এই অনুষ্ঠানের জন্য পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় আমাকে এক টাকাও বরাদ্দ দেয়নি। আমি আমার পকেট থেকে আপনাদের জন্য একটু চা-মিষ্টির ব্যবস্থা করেছি।’ রাষ্ট্রীয় কূটনৈতিক প্রতিষ্ঠানের অনুষ্ঠানে অতিথিদের আপ্যায়ন নিয়ে প্রকাশ্যে বারবার ব্যক্তিগত অর্থ ব্যয়ের কথা বলা কতটা শোভন— তা নিয়ে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেন অতিথিরা। বিএনপি নেতাদের প্রশ্ন, আপ্যায়ন বাবদ কনস্যুলেটের কি কোনো বাজেট থাকে না? যে ঐতিহাসিক আন্দোলনের মধ্য দিয়ে দেশের রাজনীতিতে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা হলো, সেই জুলাইয়ের শহীদদের স্মরণে আয়োজিত অনুষ্ঠানে তাঁদের আত্মার মাগফিরাত বা আনুষ্ঠানিক শ্রদ্ধা নিবেদনের ব্যবস্থা কেন রাখা হলো না?

কনসাল জেনারেলের বক্তব্যের একপর্যায়ে উপস্থিত কয়েকজন প্রবাসী প্রতিবাদ জানিয়ে বলেন, অনুষ্ঠানে কয়েকজন ফ্যাসিস্টের দোসর উপস্থিত রয়েছে এবং তাঁদেরই দাওয়াত দেওয়া হয়েছে। এ সময় কানাডা বিএনপি নেতাদের উদ্দেশ্যে কনসাল জেনারেল বেশ কঠোর সুরে বলেন, ‘সরকার ও দলকে এক ভাববেন না। দলের নামে আমার ওপর চাপ প্রয়োগ করবেন না। কনস্যুলেটের অনুষ্ঠানে দাওয়াত কাকে দেবো আর কাকে দেবো না— এটা আমার সিদ্ধান্ত’ একইসাথে অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখার সময় তিনি বিএনপির অভ্যন্তরীণ গ্রুপিং নিয়েও নেতাদের সতর্ক করেন।

উপস্থিত বিএনপি নেতাদের অভিযোগ, ‘বক্তব্যের সময় তাঁর শারীরিক অঙ্গভঙ্গি (বডি ল্যাঙ্গুয়েজ) ও ভাষা প্রয়োগ ছিল চরম অশালীন, অশোভন ও কর্কশ, যা একটি কূটনৈতিক পরিবেশের জন্য সম্পূর্ণ অপ্রত্যাশিত।’ অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময় ‘একজন ক্ষমতাধর ব্যক্তি’র প্রভাবে সিনিয়রদের ডিঙ্গিয়ে কনস্যাল জেনারেল হিসাবে নিয়োগ পাওয়া শাহ আলম খোকন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে একজন ‘প্রচণ্ড বদমেজাজি ও বেয়াদপ’ কর্মকর্তা হিসাবে পরিচিত। অতীতে যে সব স্থানে তার পোস্টিং ছিলো, সবখানে তার বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ ছিলো। আওয়ামী সরকারের সময়ে সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও অর্থমন্ত্রী মাহমুদ আলীর ভাগ্নি জামাই পরিচয় দিয়ে দাপট খাটানো ২৭ ব্যাচের এই কর্মকর্তা টরন্টোও সেবা প্রার্থীদের সঙ্গে অশোভন আচরণ, এমনকি পুলিশ ও সিকিউরিটি ডেকে সেবাপ্রার্থীদের হয়রাণীর অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। অভিযোগ রয়েছে, তিনি প্রায়ই সেবাপ্রার্থীদের বলে থাকেন, ‘এখানে আমি যা বলবো, তা-ই আইন’। 

অনুষ্ঠানের আমন্ত্রণ প্রক্রিয়া নিয়েও নানা প্রশ্ন উঠেছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক সিনিয়র এক বিএনপি নেতা বলেন, ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলনে পুরো জুলাইজুড়ে টরন্টোয় অসংখ্য বিক্ষোভ ও সমাবেশ হয়েছে। অথচ সেই আন্দোলনের প্রকৃত সংগঠকদের কনস্যুলেটের অনুষ্ঠানে আমন্ত্রণ জানানো হয়নি; উল্টো আওয়ামী লীগ-সমর্থক হিসেবে পরিচিত কয়েকজনকে উপস্থিত থাকতে দেখা গেছে। সূত্রমতে, কনসাল জেনারেলের ‘আমন্ত্রণের ধরন’ সবাইকে বিস্মিত করেছে। তিনি বিএনপি সভাপতিকে ফোন করে তার দলের ২০ জন নেতা-কর্মী নিয়ে আসার কথা বলেন, একইভাবে জামায়াত ও এনসিপিকে ১০ জন করে নিয়ে আসতে বলেন। এর বাইরে তাঁর ব্যক্তিগত ঘনিষ্ঠ কয়েকজনকেও দাওয়াত দেন। সব মিলিয়ে অনুষ্ঠানে ২৫ থেকে ৩০ জনের মতো উপস্থিতি ছিল।
অনুষ্ঠানে প্রদর্শিত প্রামাণ্যচিত্র নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন অনেকে। অভিযোগ উঠেছে, প্রদর্শিত ভিডিও চিত্রে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের বিভিন্ন দৃশ্য দেখানো হলেও বর্তমান সরকারের কার্যক্রম, প্রধানমন্ত্রী কিংবা সরকারের কোনো ইতিবাচক তৎপরতা তুলে ধরা হয়নি। কনস্যুলেটের ওয়েবসাইট নিয়েও একই ধরনের অভিযোগ করেছেন কয়েকজন প্রবাসী। তাদের দাবি, ওয়েবসাইটে বাংলাদেশের জাতীয় পতাকা, মুক্তিযুদ্ধ, প্রধানমন্ত্রী, পররাষ্ট্রমন্ত্রী কিংবা সরকারের কোনো অস্তিত্ব নেই; বরং যে সুবিশাল ভবনের এক কোণে ভাড়া নেওয়া অফিসে কনস্যুলেটের কার্যক্রম চলে, সেই পুরো ভবনের ছবি ওয়েবসাইটের ব্যানার ইমেজ হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে। বিএনপি নেতারা বর্তমান কনসাল জেনারেলের সামগ্রিক প্রশাসনিক ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। তাঁদের মতে, সরকারি অনুষ্ঠানে তাঁদের সম্মান না জানানো, "কাকে দাওয়াত দেবো তা আমার সিদ্ধান্ত"— এমন মনোভাব এবং মন্ত্রীর সঙ্গে ব্যক্তিগত সম্পর্কের দোহাই দেওয়া কোনোভাবেই পেশাদার কূটনৈতিক আচরণের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
অনুষ্ঠানে কানাডা পশ্চিম বিএনপির সভাপতি খন্দকার আব্দুল আহাদ বক্তব্যে ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘অনেকেই এখন নতুন জুলাই যোদ্ধা সাজছেন— তাঁদের ধন্যবাদ। সেজেছেন ভালো কথা, তবে বেশি দূর এগোবেন না!’

অনুষ্ঠানে অন্যান্যদের মধ্যে বক্তব্য রাখেন বিএনপির উপেদেষ্টা ইঞ্জিনিয়ার রেজাউর রহমান, সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট মাহবুবুর রব চৌধুরী, সহসভাপতি তপন মাহমুদ, ফারুক খান, জাকির খান, মাহবুব চৌধুরী রনি, ওন্টারিও স্টেট বিএনপির ভারপ্রাপ্ত সভাপতি ইমন চৌধুরী, টরন্টো সিটি বিএনপির সভাপতি মঈন চৌধুরী প্রমুখ।   
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, অনুষ্ঠান শেষ হতেই কনসাল জেনারেলের বিতর্কিত বক্তব্যের তীব্র প্রতিবাদ জানাতে থাকেন বিএনপি নেতাকর্মীরা। অনেকে ক্ষোভ প্রকাশ করতে শুরু করলে খন্দকার আব্দুল আহাদ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে এনে সকলকে শান্ত করেন এবং কনস্যুলেট ভবন থেকে বের করে নিয়ে যান।
এ বিষয়ে ওন্টারিও স্টেট বিএনপির ভারপ্রাপ্ত সভাপতি ইমন চৌধুরী জানান, জুলাই গণঅভ্যুত্থান দিবসের অনুষ্ঠানে কনসাল জেনারেল শাহ আলম খোকনের আচরণ ছিল অপেশাদার ও অ-কূটনৈতিক সুলভ। তাঁর বক্তব্যে মনে হয়েছে, তিনি রাজনৈতিক নেতাদের ডেকে এনে জ্ঞান দিচ্ছেন, নিজের প্রভাব বোঝাচ্ছেন এবং অত্যন্ত পরিকল্পিতভাবে অপমান করছেন। তিনি পরিকল্পিতভাবে প্রবাসী বাংলাদেশিদের কাছে বিএনপি নেতাদের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করতে চেয়েছেন। ইমন চৌধুরী আরও জানান, এর আগেও স্বাধীনতা ও জাতীয় দিবসের অনুষ্ঠানে কনস্যাল জেনারেল বিএনপি সভাপতির কাছ থেকে অতিথিদের তালিকা চেয়ে নিয়ে বিতর্কিত এক ব্যক্তির কাছে ‘ভেটিং’-এর জন্য পাঠিয়েছিলেন। এ বিষয়ে প্রতিবাদ করলে তিনি তখন বলেন, তালিকার সবাই বিএনপি করে কি না নিশ্চিত হতে এই ভেটিং। অথচ টরন্টোয় প্রকাশ্যে নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের প্রকাশ্যে রাজনৈতিক তৎপরতা থাকলেও কনস্যুলেটের পক্ষ থেকে এ বিষয়ে কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। আসলে তিনি কী চান, তা তিনিই ভালো বলতে পারবেন।

টরন্টো সিটি বিএনপির সভাপতি মঈন চৌধুরী বলেন, “টরন্টোয় কূটনৈতিক মিশনের প্রধান হিসেবে কনসাল জেনারেলের কাছ থেকে দল-মত নির্বিশেষে সব বাংলাদেশির প্রতি সম্মানজনক ও নিরপেক্ষ আচরণ প্রত্যাশিত। কিন্তু জুলাই দিবসের অনুষ্ঠানে তিনি প্রকাশ্যে ‘মন্ত্রীর সঙ্গে রুম শেয়ার’ করার তথ্য দিয়ে কী বোঝাতে চেয়েছেন, তা আমাদের বোধগম্য নয়। তাঁর বক্তব্য কূটনৈতিক শিষ্টাচারের পরিপন্থী। অনুষ্ঠানে তিনি সরকার প্রধানের বাণী পাঠ করে শোনালেও একবারের জন্যও প্রধানমন্ত্রীর নাম কিংবা প্রবাসীদের জন্য সরকারের বিভিন্ন উল্লেখযোগ্য উদ্যোগের কথা  উল্লেখ করেননি। কনস্যুলেটে ঢুকলে সরকারের কোনো অস্তিত্ব বুঝা যায় না। বরং বারবার পররাষ্ট্রমন্ত্রীর নাম ব্যবহার করে নিজের ক্ষমতার প্রভাব দেখানোর চেষ্টা করেছেন, যা অত্যন্ত দৃষ্টিকটু ও অশোভন।”

বিএনপি নেতারা আরও জানান, এর আগে ১৬ জুলাই ‘জুলাই শহীদ দিবস’ পালনে সরকারের স্পষ্ট নির্দেশনা থাকা সত্ত্বেও কনস্যুলেটে কোনো আনুষ্ঠানিক কর্মসূচি রাখা হয়নি। বরং ৪-৫ দিন পর হঠাৎ করে কনস্যুলেটের অফিশিয়াল কার্যক্রম বন্ধ রেখে সেবা নিতে আসা প্রবাসীদের ডেকে এনে ফটোসেশন করেন কনসাল জেনারেল, যা শহীদদের প্রতি চরম অবমাননার শামিল।








আরও খবর


Loading...
Loading...
প্রকাশক: এম এন এইচ বুলু
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : মাহফুজুর রহমান রিমন  |   উপদেষ্টা সম্পাদক : রাজু আলীম  
বিএনএস সংবাদ প্রতিদিন লি. এর পক্ষে প্রকাশক এম এন এইচ বুলু কর্তৃক ৪০ কামাল আতাতুর্ক এভিনিউ, বুলু ওশেন টাওয়ার, (২১ তলা), বনানী, ঢাকা ১২১৩ থেকে প্রকাশিত ও শরীয়তপুর প্রিন্টিং প্রেস, ২৩৪ ফকিরাপুল, ঢাকা থেকে মুদ্রিত।
ফোন:০২৯৮২০০১৯-২০ ফ্যাক্স: ০২-৯৮২০০১৬ ই-মেইল: [email protected]