বুধবার ৮ জুলাই ২০২৬ ২৪ আষাঢ় ১৪৩৩
 
শিরোনাম:


টানা চার দিনের বৃষ্টির প্রভাবে সুন্দরবন-উপকূলে স্থবির জনজীবন
কর্মহীন দিনমজুর, জলাবদ্ধতায় দুর্ভোগ; মোংলা বন্দরে ব্যাহত পণ্য খালাস
প্রকাশ: বুধবার, ৮ জুলাই, ২০২৬, ৮:০২ পিএম  (ভিজিট : ১২)
বঙ্গোপসাগরে সৃষ্ট গভীর লঘুচাপ ও সক্রিয় মৌসুমি বায়ুর প্রভাবে বিশ্ব ঐতিহ্য সুন্দরবন-সংলগ্ন বাগেরহাটসহ দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের উপকূলীয় এলাকায় তীব্র বৈরী আবহাওয়া বিরাজ করছে। টানা চার দিন সূর্যের দেখা না মেলায় জনজীবন প্রায় স্থবির হয়ে পড়েছে। ভারী বর্ষণ, দমকা হাওয়া ও জলাবদ্ধতায় চরম দুর্ভোগে পড়েছেন সাধারণ মানুষ। সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়েছেন দিনমজুর, শ্রমিক, রিকশা-ভ্যানচালক ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা। একই সঙ্গে দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম মোংলা সমুদ্রবন্দরে পণ্য খালাস ও বোঝাই কার্যক্রমও ব্যাহত হচ্ছে।

রবিবার থেকে বুধবার (৮ জুলাই) পর্যন্ত আকাশ ঘন কালো মেঘে আচ্ছন্ন রয়েছে। দিনভর মাঝারি থেকে ভারী বৃষ্টিপাত এবং ঝোড়ো হাওয়া অব্যাহত থাকায় বাগেরহাট, মোরেলগঞ্জ, মোংলাসহ সুন্দরবন-সংলগ্ন চিলা, বুড়িরডাঙ্গা, চাঁদপাই ও মিঠাখালী ইউনিয়নের বিস্তীর্ণ এলাকায় স্বাভাবিক জীবনযাত্রা বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। জরুরি প্রয়োজন ছাড়া মানুষ ঘর থেকে বের হচ্ছেন না। অনেক এলাকায় রাস্তাঘাট প্রায় জনশূন্য।

টানা বৃষ্টিতে জেলার বিভিন্ন নিম্নাঞ্চলে জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়েছে। বাগেরহাট ও মোরেলগঞ্জ পৌর শহরের বিভিন্ন সড়ক, বসতভিটা, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান এবং নিম্নাঞ্চলের ঘরবাড়িতে পানি ঢুকে পড়েছে। এতে চরম দুর্ভোগে পড়েছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।

দিনমজুর ও ভ্যানচালক মো. জব্বার হাওলাদার বলেন, “বৃষ্টির কারণে কোনো কাজ নেই। আয়-রোজগার পুরোপুরি বন্ধ। এভাবে চলতে থাকলে সংসার চালানো কঠিন হয়ে পড়বে।”

ফল ব্যবসায়ী লাল মিয়া বলেন, “সামান্য বৃষ্টিতেই শহরে পানি জমে যায়। ক্রেতা নেই, বিক্রিও নেই। মহাজনের টাকা কীভাবে পরিশোধ করব, সেটাই চিন্তা।”

মোরেলগঞ্জ উপজেলার বারইখালী এলাকার বাসিন্দা সৈয়দ মোস্তাফিজুর রহমান নান্নু বলেন, “রাস্তাঘাট ও বাড়ির উঠানে হাঁটুর নিচ পর্যন্ত পানি জমেছে। রান্নাঘরে পানি ওঠায় কয়েক দিন ধরে অন্যের বাড়ি থেকে রান্না করে আনতে হচ্ছে।”

একই এলাকার মোর্শেদা বেগম বলেন, “ঘরে পানি উঠেছে। জোয়ার-ভাটার সময় দেখে রান্না করতে হচ্ছে। ছেলে-মেয়েদের নিয়ে খুব কষ্টে দিন কাটছে।”

স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, জেলার প্রায় ৩০টি গ্রামের বিভিন্ন এলাকায় জলাবদ্ধতা দেখা দিয়েছে। অন্যদিকে দীর্ঘদিন ধরে পানগুছি নদীর ভাঙনে ফসলি জমি, বসতবাড়ি ও গাছপালা নদীগর্ভে বিলীন হয়ে শত শত পরিবার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। মোরেলগঞ্জ উপজেলার বদনীভাঙ্গা, সানকিভাঙ্গা, পাঠামারা ও খাউলিয়া এলাকার বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এবং গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা নদীভাঙনের হুমকির মুখে রয়েছে।

মোরেলগঞ্জ পৌর শহরের কাপুড়িয়া পট্টি কাঁচাবাজার, কলেজ রোড, কেজি স্কুল সড়ক ও উপজেলা প্রশাসনিক চত্বরসহ বিভিন্ন এলাকা প্রতিদিন কয়েক ঘণ্টা পানির নিচে তলিয়ে থাকছে। ফলে ব্যবসা-বাণিজ্যে নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে।

ফল ব্যবসায়ী মিজান শেখ, কসমেটিকস ব্যবসায়ী হারুন মোল্লা এবং গার্মেন্টস ব্যবসায়ী পলাশ শিকদার বলেন, “দুপুরের পর থেকেই রাস্তায় পানি জমে দোকানে ঢুকে পড়ে। কয়েক ঘণ্টা ব্যবসা বন্ধ রাখতে হয়। গ্রামের ক্রেতারাও দ্রুত ফিরে যান। দীর্ঘদিন ধরে এ ভোগান্তি চললেও স্থায়ী সমাধান হচ্ছে না।”

অন্যদিকে বৈরী আবহাওয়ার সরাসরি প্রভাব পড়েছে মোংলা সমুদ্রবন্দরে। বন্দরে অবস্থানরত দেশি-বিদেশি বাণিজ্যিক জাহাজ থেকে পণ্য খালাস ও বোঝাই কার্যক্রম ধীরগতিতে চলছে।

বন্দর সূত্রে জানা গেছে, বর্তমানে ক্লিংকার, সার, কয়লা ও খাদ্যশস্যবাহী একাধিক বিদেশি জাহাজ মোংলা বন্দরে অবস্থান করছে। ভারী বৃষ্টির কারণে চাল ও সারের মতো খোলা পণ্য খালাসের কাজ বারবার বন্ধ রাখতে হচ্ছে। তবে কন্টেইনার ও কিছু যান্ত্রিক পণ্য সীমিত পরিসরে খালাস করা হচ্ছে। এতে জাহাজের অবস্থানকাল বৃদ্ধি এবং বাণিজ্যিক ব্যয় বাড়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।

টানা বর্ষণ ও দমকা হাওয়ার কারণে পশুর নদীসহ উপকূলীয় নদ-নদীর পানির উচ্চতা স্বাভাবিক জোয়ারের তুলনায় ১ থেকে ২ ফুট বৃদ্ধি পেয়েছে। ফলে নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।

সুন্দরবন পূর্ব বন বিভাগ জানিয়েছে, বৈরী আবহাওয়ার কারণে বনাঞ্চলের সব ক্যাম্প, ফাঁড়ি ও টহল দলকে সতর্ক অবস্থানে থাকতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। বনের অভ্যন্তরের নদী ও খালে নৌযান চলাচলের ক্ষেত্রেও সতর্কতা জারি করা হয়েছে।

মোংলা আবহাওয়া অফিস জানিয়েছে, মোংলা সমুদ্রবন্দরসহ উপকূলীয় বন্দরগুলোতে ৩ নম্বর স্থানীয় সতর্ক সংকেত বহাল রয়েছে। উত্তর বঙ্গোপসাগর ও গভীর সাগরে অবস্থানরত মাছ ধরার নৌকা ও ট্রলারগুলোকে পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত উপকূলের কাছাকাছি থেকে সাবধানে চলাচল করতে বলা হয়েছে।

মোরেলগঞ্জ উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা রণজিৎ কুমার বলেন, “টানা বৃষ্টি অব্যাহত থাকলে কিছু চিংড়ি ঘের প্লাবিত হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে। ঘের মালিকদের পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা রাখতে পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। তবে এখন পর্যন্ত বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতির কোনো খবর পাওয়া যায়নি।”

বাগেরহাট পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী জানান, রামপাল-মোংলা হয়ে ঘষিয়াখালী পর্যন্ত প্রায় ৯৫ কিলোমিটার বেড়িবাঁধ নির্মাণের সম্ভাব্যতা সমীক্ষা মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। পাশাপাশি পানগুছি নদীর ভাঙন রোধ এবং বিষখালী নদী পুনঃখনন প্রকল্পের কাজ চলমান রয়েছে। এসব প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে উপকূলীয় এলাকার জলাবদ্ধতা ও নদীভাঙন সমস্যার স্থায়ী সমাধান হবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।

আবহাওয়াবিদদের পূর্বাভাস অনুযায়ী, আগামী আরও দুই থেকে তিন দিন উপকূলীয় এলাকায় বৃষ্টি ও বৈরী আবহাওয়া অব্যাহত থাকতে পারে। তাই স্থানীয় বাসিন্দাদের প্রয়োজন ছাড়া বাইরে না যাওয়ার এবং সতর্ক থাকার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।








আরও খবর


Loading...
Loading...
প্রকাশক: এম এন এইচ বুলু
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : মাহফুজুর রহমান রিমন  |   উপদেষ্টা সম্পাদক : রাজু আলীম  
বিএনএস সংবাদ প্রতিদিন লি. এর পক্ষে প্রকাশক এম এন এইচ বুলু কর্তৃক ৪০ কামাল আতাতুর্ক এভিনিউ, বুলু ওশেন টাওয়ার, (২১ তলা), বনানী, ঢাকা ১২১৩ থেকে প্রকাশিত ও শরীয়তপুর প্রিন্টিং প্রেস, ২৩৪ ফকিরাপুল, ঢাকা থেকে মুদ্রিত।
ফোন:০২৯৮২০০১৯-২০ ফ্যাক্স: ০২-৯৮২০০১৬ ই-মেইল: [email protected]