দীর্ঘ ৬০ বছর পর শৈশবের স্মৃতিবিজড়িত বিদ্যাপীঠে ফিরে আবেগে আপ্লুত হয়ে পড়েন বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর সাবেক কর্মকর্তা ও বিশিষ্ট ব্যক্তিত্ব মেজর জেনারেল মাহবুব হায়দার খান। হেলিকপ্টারযোগে নিজের প্রিয় বিদ্যালয়ের মাঠে অবতরণ করার মুহূর্তটি যেন তাঁর জীবনের এক অনন্য আবেগঘন অধ্যায়ে পরিণত হয়। জীবনের নানা সাফল্য, অর্জন ও গৌরবময় পথচলার পেছনে যে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানটির গুরুত্বপূর্ণ অবদান রয়েছে, সেই বিদ্যাপীঠে ফিরে তিনি যেন হারিয়ে যান শৈশবের সোনালি স্মৃতির ভুবনে।
সোমবার (১৫ জুন) দুপুরে তিনি বাগেরহাটের মোরেলগঞ্জ উপজেলার ঐতিহ্যবাহী অম্বিকাচরণ লাহা পাইলট উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে হেলিকপ্টারযোগে অবতরণ করেন। এ সময় তাঁর সফরসঙ্গী হিসেবে উপস্থিত ছিলেন নেপাল সেনাবাহিনীর একজন মেজর জেনারেল, বিশিষ্ট পাখি বিশেষজ্ঞ কাজী আহমেদ হোসাইন এবং তাঁর পুত্র মানসিব খান।
বিদ্যালয় মাঠে হেলিকপ্টার অবতরণের খবর ছড়িয়ে পড়লে শিক্ষক, শিক্ষার্থী, প্রাক্তন শিক্ষার্থী, স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তি এবং উৎসুক জনতার ভিড় জমে যায়। উষ্ণ অভ্যর্থনা ও ফুলেল শুভেচ্ছার মধ্য দিয়ে তাঁকে বরণ করে নেয় বিদ্যালয় পরিবার।
পরে তিনি বিদ্যালয়ের বিভিন্ন শ্রেণিকক্ষ, খেলার মাঠ, পুরোনো ভবন ও স্মৃতিবিজড়িত স্থানগুলো ঘুরে দেখেন। দীর্ঘ সময় ধরে তিনি তাঁর ছাত্রজীবনের নানা ঘটনা, সহপাঠীদের সঙ্গে কাটানো দিন, শিক্ষকদের স্নেহ ও শিক্ষার স্মৃতি রোমন্থন করেন। প্রতিটি স্থানে দাঁড়িয়ে যেন তিনি ফিরে গিয়েছিলেন ছয় দশক আগের সেই কিশোর বয়সে।
এক আবেগঘন বক্তব্যে মেজর জেনারেল মাহবুব হায়দার খান বলেন, “এই বিদ্যালয় শুধু আমার শিক্ষার ভিত্তি নয়, আমার চরিত্র, মূল্যবোধ ও জীবনবোধ গঠনের অন্যতম প্রধান প্রতিষ্ঠান। ৬০ বছর পর এখানে ফিরে এসে মনে হচ্ছে আমি আবার আমার শৈশবে ফিরে গেছি। এই প্রতিষ্ঠানের প্রতি আমার কৃতজ্ঞতা ও ভালোবাসা আজীবন অটুট থাকবে।”
তিনি বর্তমান শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে বলেন, জীবনে বড় হতে হলে সততা, শৃঙ্খলা, দেশপ্রেম ও মানবিক মূল্যবোধকে ধারণ করতে হবে। কঠোর পরিশ্রম, অধ্যবসায় এবং আত্মবিশ্বাসের মাধ্যমে যেকোনো লক্ষ্য অর্জন করা সম্ভব। তিনি শিক্ষার্থীদের স্বপ্ন দেখতে এবং সেই স্বপ্ন বাস্তবায়নে নিরলস প্রচেষ্টা চালিয়ে যাওয়ার আহ্বান জানান।
অনুষ্ঠানে উপস্থিত শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা তাঁর কর্মময় জীবন, নেতৃত্বগুণ এবং দেশসেবার নানা অভিজ্ঞতার কথা শুনে অনুপ্রাণিত হন। পরে স্মৃতিচারণ, শুভেচ্ছা বিনিময় এবং সম্মাননা প্রদান অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ তাঁর হাতে সম্মাননা স্মারক তুলে দেয়।
বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ জানায়, প্রতিষ্ঠানের একজন কৃতি শিক্ষার্থী হিসেবে মেজর জেনারেল মাহবুব হায়দার খানের এই সফর বর্তমান প্রজন্মের শিক্ষার্থীদের জন্য অনুপ্রেরণার এক উজ্জ্বল উৎস হয়ে থাকবে। তাঁর জীবনসংগ্রাম, সাফল্য ও দেশপ্রেম শিক্ষার্থীদের সামনে সফলতার এক জীবন্ত দৃষ্টান্ত হিসেবে কাজ করবে।
প্রিয় বিদ্যাপীঠের আঙিনায় দাঁড়িয়ে অতীতের স্মৃতি আর বর্তমানের বাস্তবতার এক অনন্য মেলবন্ধন ঘটান মেজর জেনারেল মাহবুব হায়দার খান। তাঁর এই প্রত্যাবর্তন শুধু ব্যক্তিগত আবেগের বহিঃপ্রকাশ নয়, বরং শিক্ষকদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রতি অকৃত্রিম ভালোবাসা এবং শিকড়ের প্রতি অটুট টানের এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হয়ে স্মরণীয় হয়ে থাকবে।