দেশের বর্তমান রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রেক্ষাপটে একটি নির্বাচিত সরকারের প্রয়োজনীয়তা এখন আর কেবল তাত্ত্বিক আলোচনা নয়, বরং এটি অস্তিত্ব রক্ষার প্রশ্নে পরিণত হয়েছে। দীর্ঘস্থায়ী অনিশ্চয়তা আর ছায়া-অন্ধকারের রাজনীতিতে দেশবাসী আজ আক্ষরিক অর্থেই ক্লান্ত এবং অতিষ্ঠ। সাধারণ মানুষের পিঠ দেয়ালে ঠেকে গেছে; তারা এখন চায় না কোনো সংঘাত, চায় না কোনো অন্তহীন অস্থিরতা। জনমানুষের এখনকার একমাত্র দাবি একটি সুষ্ঠু নির্বাচনের মাধ্যমে এমন এক সরকার আসুক, যারা হবে জনগণের প্রকৃত প্রতিনিধি। সে সরকার যে দলই গঠন করুক না কেন, তাদের প্রথম ও প্রধান লক্ষ্য হতে হবে দেশের স্বার্থ। আমাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতির সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডি হলো, বিজিত দল পরাজয় মেনে নিতে চায় না, আর বিজয়ী দল পরাজিতদের শত্রু মনে করে। এই বিষাক্ত বলয় থেকে বের হওয়া আজ সময়ের দাবি। মানুষ আজ একজন প্রকৃত ‘স্টেটসম্যান’ বা যোগ্য প্রধানমন্ত্রী চায় এবং একইসাথে একজন সচল ও সক্রিয় রাষ্ট্রপতি চায়, যিনি সংকটে ও সন্ধিক্ষণে রাষ্ট্রের প্রকৃত অভিভাবক হিসেবে আবির্ভূত হবেন।
একটি রাষ্ট্র তখনই আন্তর্জাতিক মহলে মর্যাদা পায়, যখন তার পেছনে জনম্যান্ডেট থাকে। নির্বাচিত সরকার ছাড়া রাষ্ট্রের নীতি নির্ধারণে দীর্ঘমেয়াদী স্থায়িত্ব আসে না। যখন জনগণের ভোটে কোনো সরকার গঠিত হয়, তখন তাদের কাজের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার একটি নৈতিক বাধ্যবাধকতা থাকে। অগণতান্ত্রিক বা অন্তর্বর্তীকালীন ব্যবস্থায় রাষ্ট্র সাময়িকভাবে চললেও তা টেকসই উন্নয়নের জন্য যথেষ্ট নয়। তাই যে দলই ক্ষমতায় আসুক, একটি অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের মাধ্যমে আসা নির্বাচিত সরকারই পারে দেশের ঝিমিয়ে পড়া অর্থনীতি ও প্রশাসনকে গতিশীল করতে।
আমাদের দেশে প্রথা হয়ে দাঁড়িয়েছে যে, নির্বাচনে হারলে কারচুপির অভিযোগ তুলে মাঠ গরম করা। কিন্তু দেশের স্বার্থে এই সংস্কৃতি বদলাতে হবে। নির্বাচনের পর বিজিত দলকে অবশ্যই সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিতে হবে। বিরোধিতা মানেই উন্নয়নকে বাধাগ্রস্ত করা নয়। বরং সরকারের ভুলগুলো ধরিয়ে দিয়ে সংসদকে প্রাণবন্ত রাখা এবং জাতীয় সংকটে সরকারের পাশে দাঁড়ানোই হলো প্রকৃত দেশপ্রেম। বিরোধী দল যদি ধ্বংসাত্মক পথ পরিহার করে গঠনমূলক ভূমিকা রাখে, তবে দেশ গৃহবিবাদ থেকে মুক্তি পাবে।
ভিশনারি প্রধানমন্ত্রী, এখন সময়ের দাবি। দেশ পরিচালনার জন্য আজ এমন একজন যোগ্য প্রধানমন্ত্রী প্রয়োজন, যার দৃষ্টি থাকবে আগামী ১০০ বছরের ওপর। তিনি কেবল একটি দলের নেতা হবেন না, হবেন পুরো জাতির কাণ্ডারি। সংকটে বিচলিত না হয়ে, অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় যার থাকবে সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা। একজন দক্ষ প্রধানমন্ত্রীই পারেন আমলাতন্ত্রকে নিয়ন্ত্রণ করতে এবং সাধারণ মানুষের নাভিশ্বাস ওঠা বাজার পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে। নেতৃত্বের দৃঢ়তা ও সততাই পারে একটি রাষ্ট্রকে খাদের কিনারা থেকে তুলে আনতে।
চাই সক্রিয় ও অভিভাবকসুলভ রাষ্ট্রপতি। রাষ্ট্রপতি পদটি কেবল আলঙ্কারিক বা স্বাক্ষরের জন্য সীমাবদ্ধ থাকা উচিত নয়। রাষ্ট্র যখন গভীর সংকটে পড়ে বা রাজনৈতিক অচলাবস্থা তৈরি হয়, তখন রাষ্ট্রপতিকে হতে হবে সচল ও সক্রিয়। তিনি হবেন সব দলের কাছে আস্থার প্রতীক। একজন অভিজ্ঞ ও প্রাজ্ঞ রাষ্ট্রপতি রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে সেতুবন্ধন হিসেবে কাজ করতে পারেন। যখন নির্বাহী বিভাগ কোনো ভুল পথে হাঁটে, তখন রাষ্ট্রপতি যেন তার নৈতিক অবস্থান থেকে পরামর্শ ও সতর্কবাণী দিতে পারেন, এমন কাঠামো গড়ে তোলা জরুরি।
এদেশের সাধারণ মানুষ চিরকালই রাজনীতির দাবার ঘুঁটি হয়েছে। হরতাল, জ্বালাও-পোড়াও আর হানাহানিতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয় নিম্নবিত্ত ও মধ্যবিত্ত মানুষ। মানুষ আজ এই সংঘাতময় রাজনীতি থেকে মুক্তি চায়। তারা চায় শান্তিতে ব্যবসা করতে, নিরাপদে সন্তানদের স্কুলে পাঠাতে। রাজনৈতিক দলগুলোকে বুঝতে হবে, জনদুর্ভোগ সৃষ্টি করে ক্ষমতা দখল বা রক্ষা কোনোটাই দীর্ঘমেয়াদে টেকে না। জনমানুষের স্বস্তিই হওয়া উচিত রাজনীতির মূল কেন্দ্রবিন্দু।
বিদেশি বিনিয়োগ ও অর্থনৈতিক নিরাপত্তা জরুরি হয়ে পরেছে। পুঁজি অত্যন্ত লাজুক; যেখানে অস্থিরতা থাকে, সেখানে বিনিয়োগ যায় না। বাংলাদেশের অর্থনীতিকে সমৃদ্ধ করতে হলে সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগ (FDI) বাড়ানো ছাড়া বিকল্প নেই। বিদেশি বিনিয়োগকারীরা দেখেন রাষ্ট্রের স্থিতিশীলতা এবং নীতিমালার ধারাবাহিকতা। যদি প্রতি পাঁচ বছর পর পর রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের সাথে সাথে অর্থনৈতিক নীতি বদলে যায়, তবে কেউ বিনিয়োগ করতে সাহস পাবে না। একটি নির্বাচিত ও স্থিতিশীল সরকারই পারে বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশের গ্যারান্টি দিতে।
আমলাতন্ত্রের সংস্কার ও সুশাসন প্রতিষ্ঠা কি করবে? রাষ্ট্রের চাকা সচল রাখে আমলাতন্ত্র। কিন্তু রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতার সুযোগে প্রশাসন অনেক সময় স্থবির হয়ে পড়ে অথবা দলীয়করণে লিপ্ত হয়। একটি যোগ্য সরকারকেই এই আমলাতন্ত্রকে পেশাদারিত্বের ছাঁচে ঢেলে সাজাতে হবে। সুশাসন নিশ্চিত না হলে উন্নয়নের সুফল সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছায় না। সরকারি সেবা পেতে সাধারণ মানুষকে যেন হয়রানির শিকার হতে না হয়, সেটি নিশ্চিত করাই হবে আগামীর সরকারের বড় চ্যালেঞ্জ।
সংসদকে কেন্দ্রবিন্দুতে রূপান্তর করতে হবে। রাজনৈতিক সমাধান রাজপথে নয়, হতে হবে জাতীয় সংসদে। আমাদের দেশে সংসদ কার্যকর না হওয়ায় রাজপথের আন্দোলন সহিংস রূপ নেয়। সরকারি দলকে যেমন উদার হয়ে বিরোধী দলকে কথা বলার সুযোগ দিতে হবে, তেমনি বিরোধী দলকেও সংসদ বর্জন করার সংস্কৃতি ত্যাগ করতে হবে। যখন সব রাজনৈতিক আলোচনা ও বিতর্ক সংসদে হবে, তখন রাষ্ট্রের স্থিতিশীলতা বহুগুণ বেড়ে যাবে।
আইনের শাসন ছাড়া কোনো রাষ্ট্র মাথা তুলে দাঁড়াতে পারে না। বিচার বিভাগকে সম্পূর্ণ প্রভাবমুক্ত রেখে কাজ করতে দিতে হবে। যখন অপরাধী তার রাজনৈতিক পরিচয় ছাপিয়ে কেবল 'অপরাধী' হিসেবে দণ্ডিত হবে, তখনই সমাজে শান্তি ফিরবে। সাধারণ মানুষ যেন আদালতে গিয়ে ন্যায়বিচার পায়, সেই নিশ্চয়তা দিতে হবে নির্বাচিত সরকারকে। আইনের শাসন প্রতিষ্ঠিত হলে সামাজিক অস্থিরতা অনেকাংশেই কমে যাবে।
বাজার সিন্ডিকেট ও অর্থনীতি পুনর্গঠন করতে হবে আগে। বর্তমানে সাধারণ মানুষের নাভিশ্বাসের প্রধান কারণ দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি। অসাধু সিন্ডিকেটের কাছে বাজার ব্যবস্থা জিম্মি হয়ে পড়েছে। একটি শক্তিশালী ও জনগণের কাছে দায়বদ্ধ সরকার ছাড়া এই সিন্ডিকেট ভাঙা সম্ভব নয়। অর্থনীতির রক্তক্ষরণ বন্ধ করতে ব্যাংকিং খাতের সংস্কার এবং খেলাপি ঋণ আদায় করতে হবে। যোগ্য নেতৃত্বের সঠিক অর্থনৈতিক সিদ্ধান্তই পারে মুদ্রাস্ফীতি কমিয়ে মানুষের মুখে হাসি ফোটাতে।
তরুণ প্রজন্মের কর্মসংস্থান ও মেধা মূল্যায়ন চাই। আমাদের ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড বা তরুণ জনশক্তিকে কাজে লাগাতে হলে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা অনিবার্য। রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে উদ্যোক্তারা নতুন কলকারখানা খুলতে ভয় পায়, যার প্রভাব পড়ে কর্মসংস্থানে। যোগ্য সরকারকেই মেধার মূল্যায়ন নিশ্চিত করতে হবে যাতে মেধাবী তরুণরা দেশ ছেড়ে চলে না যায়। প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষা ও কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করে তরুণ সমাজকে দেশ গড়ায় সম্পৃক্ত করতে হবে।
পররাষ্ট্রনীতিতে জাতীয় স্বার্থের প্রাধান্য দেওয়া জরুরি। বর্তমান ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশ এক গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে আছে। কোনো নির্দিষ্ট দেশের বলয়ে না থেকে 'সবার সাথে বন্ধুত্ব, কারো সাথে বৈরিতা নয়' এই নীতিতে অটল থাকতে হবে। নির্বাচিত সরকার যখন শক্ত ভিতের ওপর দাঁড়িয়ে থাকে, তখন আন্তর্জাতিক দরকষাকষিতে দেশের পাল্লা ভারী হয়। দেশের সার্বভৌমত্ব ও অর্থনৈতিক স্বার্থ রক্ষা করে বৈশ্বিক পরাশক্তিগুলোর সাথে ভারসাম্য রক্ষা করাই হবে আগামীর দূরদর্শী নেতৃত্বের কাজ।
পরিশেষে বলতে চাই, সময় আর কারো জন্য অপেক্ষা করবে না। বিশ্ব যখন দ্রুতগতিতে এগিয়ে যাচ্ছে, আমরা তখন অভ্যন্তরীণ কোন্দল আর ক্ষমতার লড়াইয়ে পিছিয়ে থাকতে পারি না। একটি সুন্দর নির্বাচনের মাধ্যমে গঠিত সরকার, একটি শক্তিশালী বিরোধী দল এবং যোগ্য নেতৃত্বের সমন্বয়ই পারে বাংলাদেশকে সমৃদ্ধির পথে নিতে। দেশের মানুষ আর আশ্বাস চায় না, তারা চায় বাস্তব প্রয়োগ। আমরা এমন এক বাংলাদেশ চাই যেখানে ক্ষমতা নয়, সেবাই হবে রাজনীতির মূলমন্ত্র। আসুন, দলমতের ঊর্ধ্বে উঠে দেশের স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেই। তবেই দেশ এগোবে, অর্থনীতি সমৃদ্ধ হবে এবং আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্ম একটি বাসযোগ্য রাষ্ট্র পাবে।
লেখক: মীর আব্দুল আলীম
সাংবাদিক, সমাজ গবেষক
সোনারগাঁও ইউনিভার্সিটির বোর্ড অব ট্রাস্টিজের উপদেষ্টা।