
সংগৃহীত ছবি
ন্যূনতম মজুরি ৩০ হাজার টাকা নির্ধারণ, শ্রমিকদের ‘ব্ল্যাকলিস্টিং’ বন্ধ এবং ছাঁটাই হওয়া শ্রমিকদের পুনর্বাসনসহ বিভিন্ন দাবিতে গাজীপুরের পাশাপাশি সাভারের আশুলিয়া শিল্পাঞ্চলেও বিক্ষোভ শুরু করেছেন পোশাকশ্রমিকরা। শনিবার সকাল থেকে চলা আন্দোলনের একপর্যায়ে শ্রমিকদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষ ও ধাওয়া-পাল্টাধাওয়ার ঘটনা ঘটে। এতে শিল্প পুলিশের সদস্যসহ বেশ কয়েকজন আহত হয়েছেন।
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে এবং কারখানায় ভাঙচুর ও অপ্রীতিকর ঘটনা এড়াতে আশুলিয়ার কাঠগড়া, জিরাব, নরসিংহপুর, আমতলাসহ আশপাশের এলাকার ২৫টি তৈরি পোশাক কারখানায় ছুটি ঘোষণা করেছে কর্তৃপক্ষ।
এদিকে সংঘর্ষের মধ্যে দুপুরে বাইপাইল-আবদুল্লাহপুর সড়কের নিশ্চিন্তপুর এলাকায় অবস্থিত নিউ এইজ কারখানার সামনে থেকে হাতবোমাসদৃশ তিনটি বস্তু উদ্ধার করা হয়েছে।
শিল্প পুলিশ-১-এর অতিরিক্ত পুলিশ সুপার সৈয়দ ফয়সল ইসলাম জানান, শ্রমিকদের আন্দোলনের মধ্যে হাতবোমাসদৃশ বস্তুগুলো উদ্ধার করা হয়। কে বা কারা সেগুলো সেখানে রেখে গেছে, তা তাৎক্ষণিকভাবে নিশ্চিত হওয়া যায়নি। বিষয়টি আশুলিয়া থানাকে জানানো হয়েছে। পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেবে।
তিনি আরও বলেন, সংঘর্ষে শিল্প পুলিশের সদস্যসহ বেশ কয়েকজন আহত হয়েছেন।
প্রত্যক্ষদর্শী, শ্রমিক ও শিল্প পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, শনিবার সকাল থেকেই আশুলিয়ার কাঠগড়া বাজার, নয়াপাড়া, জিরাব ও নিশ্চিন্তপুর এলাকার বিভিন্ন পোশাক কারখানায় উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। শ্রমিকরা কারখানার ভেতরে কাজ বন্ধ করে বাইরে বেরিয়ে বিক্ষোভ শুরু করেন।
এ সময় কন্টিনেন্টাল, এআর জিন্স ও সিডব্লিউএসহ কয়েকটি কারখানায় ইটপাটকেল নিক্ষেপ ও ভাঙচুরের ঘটনা ঘটে। বিশেষ করে এআর জিন্স ও কন্টিনেন্টাল কারখানার বিভিন্ন কাচ ভাঙচুর করা হয়। পরে পরিস্থিতি বিবেচনায় সংশ্লিষ্ট কারখানাগুলোতে সাধারণ ছুটি ঘোষণা করা হয়।
দুপুরের দিকে বিক্ষুব্ধ শ্রমিকরা নিশ্চিন্তপুর এলাকায় আবদুল্লাহপুর-বাইপাইল সড়কে অবস্থান নিয়ে অবরোধ ও বিক্ষোভ শুরু করেন। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে এবং সড়ক ও শিল্পাঞ্চলে শৃঙ্খলা বজায় রাখতে পুলিশ ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা তাঁদের সরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেন। এ সময় উভয় পক্ষের মধ্যে ধাওয়া-পাল্টাধাওয়ার ঘটনা ঘটে।
একপর্যায়ে পুলিশ কাঁদানে গ্যাস ও সাউন্ড গ্রেনেড নিক্ষেপ করে। এতে পুলিশ সদস্য, শ্রমিক ও পথচারীসহ বেশ কয়েকজন আহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে।
আন্দোলনরত শ্রমিকদের দাবি, বর্তমান মূল্যস্ফীতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে ন্যূনতম মজুরি ৩০ হাজার টাকা নির্ধারণ করতে হবে। পাশাপাশি অন্যায়ভাবে তৈরি করা ‘ব্ল্যাকলিস্ট’ বাতিল, নিরাপদ কর্মপরিবেশ নিশ্চিত এবং কারণ ছাড়া শ্রমিক ছাঁটাই বন্ধ করতে হবে।
শ্রমিকদের অভিযোগ, কোনো যৌক্তিক কারণ ছাড়াই অনেক অভিজ্ঞ শ্রমিককে ছাঁটাই করা হচ্ছে। বিভিন্ন কারখানার মালিকপক্ষ যৌথভাবে তাঁদের কালো তালিকাভুক্ত করছে। ফলে একবার কোনো শ্রমিক ছাঁটাই হলে অন্য কারখানায় চাকরি পেতেও সমস্যায় পড়ছেন। এ পরিস্থিতিতে ক্ষুব্ধ শ্রমিকরা আন্দোলনে নেমেছেন।
শিল্প পুলিশ-১-এর পরিদর্শক আবুল কালাম আজাদ সাংবাদিকদের বলেন, শ্রমিক অসন্তোষের কারণে বেশ কয়েকটি কারখানার কর্তৃপক্ষ ছুটি ঘোষণা করেছে। শিল্পাঞ্চলে অতিরিক্ত আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী মোতায়েন রয়েছে এবং পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। আহত হওয়ার খবর পাওয়া গেলেও প্রাথমিকভাবে বিস্তারিত তথ্য জানা যায়নি।
বাংলাদেশ গার্মেন্টস ও সোয়েটার্স শ্রমিক ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্রের আইনবিষয়ক সম্পাদক খাইরুল মামুন মিন্টু বলেন, দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি, বাড়িভাড়া, চিকিৎসা ও পারিবারিক ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় বর্তমান ন্যূনতম মজুরি দিয়ে শ্রমিকদের সংসার চালানো কঠিন হয়ে পড়েছে।
তিনি বলেন, বর্তমানে একজন পোশাকশ্রমিকের ন্যূনতম মজুরি ১২ হাজার ৫০০ টাকা। এই আয় দিয়ে পরিবারের ব্যয় মেটানো সম্ভব হচ্ছে না। এ কারণে শ্রমিকরা ন্যূনতম মজুরি ৩০ হাজার টাকা করার দাবি জানাচ্ছেন।
খাইরুল মামুন মিন্টুর ভাষ্য, কারখানা কর্তৃপক্ষ শ্রমিকদের দাবি না মানায় তাঁরা সকালে কাজে যোগ না দিয়ে বিক্ষোভ শুরু করেন। একপর্যায়ে অন্য কারখানার শ্রমিকদেরও আন্দোলনে যুক্ত করতে কয়েকটি কারখানায় ইটপাটকেল নিক্ষেপের ঘটনা ঘটে।
তিনি আরও বলেন, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে নিশ্চিন্তপুর এলাকায় পুলিশ শ্রমিকদের লক্ষ্য করে কাঁদানে গ্যাস নিক্ষেপ করে। পরিস্থিতির অবনতি হওয়ায় জিরাব, নরসিংহপুর ও কাঠগড়া রোডের অধিকাংশ কারখানায় এক দিনের ছুটি ঘোষণা করা হয়। এসব এলাকায় উত্তেজনাপূর্ণ পরিস্থিতি বিরাজ করছে। আতঙ্কে কয়েকটি সড়কে যানবাহন চলাচলও বন্ধ হয়ে যায়।
শিল্প পুলিশ-১-এর পুলিশ সুপার মোহাম্মদ মমিনুল ইসলাম জানান, শ্রমিকদের আন্দোলনের মুখে ২৫টি কারখানায় ছুটি ঘোষণা করা হয়েছে। বর্তমানে শিল্পাঞ্চলের পরিস্থিতি স্বাভাবিক রয়েছে।
এদিকে গাজীপুরেও বেতন বৃদ্ধির দাবিতে ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ করেছেন পোশাকশ্রমিকরা। এতে ওই সড়কে যান চলাচল বন্ধ হয়ে যাত্রী ও চালকদের ভোগান্তি তৈরি হয়।
শনিবার দুপুরে কালিয়াকৈরের চন্দ্রা পল্লী বিদ্যুৎ এলাকায় শ্রমিকরা মহাসড়কে অবস্থান নেন। বিকেল সাড়ে ৪টা পর্যন্ত অবরোধ চলছিল বলে জানান কালিয়াকৈর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) শহিদুল ইসলাম।
গত কয়েক দিন ধরে গাজীপুরের বিভিন্ন শিল্পাঞ্চলে বেতন বৃদ্ধির দাবিতে পোশাকশ্রমিকদের বিক্ষোভ চলছে। মহাসড়ক অবরোধ, মিছিল ও কারখানায় ভাঙচুরের মতো ঘটনা ঘটেছে। এর ধারাবাহিকতায় এবার পাশের আশুলিয়া শিল্পাঞ্চলেও শ্রমিক অসন্তোষ ছড়িয়ে পড়েছে।