বুধবার ● ৭ অক্টোবর ২০২৬ ● ২২ আশ্বিন ১৪৩৩
 
শিরোনাম:


দুর্গাপূজায় নিরাপত্তার পাশাপাশি গুজব ঠেকাতে নাগরিক দায়িত্বও জরুরি
প্রকাশ: মঙ্গলবার, ৬ অক্টোবর, ২০২৬, ১১:৩১ পিএম  (ভিজিট : ১৫)
শারদীয় দুর্গাপূজা বাংলাদেশের হিন্দু সম্প্রদায়ের অন্যতম প্রধান ধর্মীয় উৎসব। তবে দেশের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক বাস্তবতায় এ উৎসবের পরিসর ধর্মীয় গণ্ডি ছাড়িয়ে বৃহত্তর সমাজে বিস্তৃত। পূজামণ্ডপে বিভিন্ন ধর্ম ও শ্রেণির মানুষের অংশগ্রহণের কারণে দুর্গাপূজার নিরাপত্তা নিশ্চিত করা শুধু একটি সম্প্রদায়ের নিরাপত্তার বিষয় নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে সামাজিক সম্প্রীতি, নাগরিক নিরাপত্তা ও আইনের শাসন।

অতীতের বিভিন্ন ঘটনায় দেখা গেছে, পূজাকে কেন্দ্র করে গুজব ছড়িয়ে উত্তেজনা সৃষ্টি, মণ্ডপ ও প্রতিমা ভাঙচুরসহ নানা অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটেছে। বাংলাদেশ হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদের তথ্য অনুযায়ী, ২০২১ সালে অন্তত ১১৭টি মন্দির বা পূজামণ্ডপ ভাঙচুর এবং ৩০১টি হিন্দু বাড়ি ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। ওই বছর কুমিল্লার নানুয়া দিঘির পাড়ের একটি পূজামণ্ডপে কোরআন রাখার ঘটনা ছড়িয়ে পড়ার পর দেশের বিভিন্ন স্থানে সহিংসতা ও হামলার ঘটনা ঘটে।

২০২২ সালেও পূজার আগে ১২ থেকে ১৩টি মণ্ডপে হামলা বা ভাঙচুরের ঘটনা ঘটে। ২০২৩ সালে দুর্গাপূজাকে কেন্দ্র করে সারাদেশে অন্তত ১৩২টি অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটার তথ্য পাওয়া যায়। ২০২৪ সালে এ ধরনের ৩৫টি ঘটনার ঘটনায় ১১টি মামলা ও ২৪টি সাধারণ ডায়েরি করা হয় এবং ১৭ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়। ২০২৫ সালেও পুলিশ ৪৯টি অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনার কথা জানিয়েছিল। এসব ঘটনার মধ্যে প্রতিমা ভাঙচুর ও পূজায় বাধা দেওয়ার মতো ঘটনাও ছিল।

এর পাশাপাশি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পুরোনো ছবি ও ভিডিওকে নতুন ঘটনার সঙ্গে যুক্ত করে প্রচার, সম্পাদিত কনটেন্ট এবং যাচাইহীন তথ্য ছড়িয়ে দেওয়ার প্রবণতাও উদ্বেগ তৈরি করছে। একটি মিথ্যা বা বিভ্রান্তিকর তথ্য অল্প সময়ের মধ্যে বহু মানুষের কাছে পৌঁছে গিয়ে স্থানীয় পর্যায়ে উত্তেজনা তৈরি করতে পারে।

এবারের দুর্গাপূজায় সম্ভাব্য ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে প্রতিমা ও মণ্ডপ ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ, চুরি, মাদকাসক্ত বা উচ্ছৃঙ্খল ব্যক্তির হামলা, স্থানীয় ও জমি-সংক্রান্ত বিরোধ, পূজার অর্থ ব্যবস্থাপনা নিয়ে দ্বন্দ্ব, অতিরিক্ত ভিড়, সড়ক দুর্ঘটনা এবং বিসর্জনের সময় বিশৃঙ্খলা। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ডিজিটাল মাধ্যমে গুজব ও উসকানিমূলক তথ্য ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি।

তবে পূজাকেন্দ্রিক প্রতিটি অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনার কারণ এক নয়। কোনো ঘটনায় সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষ, আবার কোনো ঘটনায় রাজনৈতিক বিরোধ, ব্যক্তিগত শত্রুতা, স্থানীয় বিরোধ, জমি-সংক্রান্ত সমস্যা কিংবা সাধারণ অপরাধের বিষয় থাকতে পারে। তাই কোনো ঘটনার পরপরই অনুমাননির্ভর সিদ্ধান্ত না নিয়ে নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত কারণ ও জড়িতদের শনাক্ত করা জরুরি।

সুষ্ঠু ও উৎসবমুখর পরিবেশে দুর্গাপূজা আয়োজনের লক্ষ্যে সরকারও বিভিন্ন উদ্যোগ নিয়েছে। এবার দেশজুড়ে প্রায় ৩৩ হাজার ৮২১টি মণ্ডপে পূজা আয়োজনের কথা রয়েছে। পূজামণ্ডপের সরকারি বরাদ্দও বাড়ানো হয়েছে। নিরাপত্তায় জাতীয়, বিভাগীয়, জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে দায়িত্ব বণ্টনের পাশাপাশি পুলিশ সদর দপ্তর থেকে ২৪ ঘণ্টা নজরদারি এবং দ্রুত তথ্য আদান-প্রদানে ডিজিটাল ব্যবস্থা ব্যবহারের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

প্রতিটি মণ্ডপের স্বেচ্ছাসেবকদের নাম ও ফোন নম্বর স্থানীয় থানায় দেওয়ার ব্যবস্থা, নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ, প্রয়োজন অনুযায়ী জেনারেটর ও রিচার্জেবল আলোর ব্যবস্থা রাখার নির্দেশনাও দেওয়া হয়েছে। প্রতিমা বিসর্জনের সময় বিশেষ সতর্কতা অবলম্বনের পাশাপাশি সরকারি অনুদানের যথাযথ ব্যবহারের বিষয়েও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

তবে শুধু সরকারি নিরাপত্তা ব্যবস্থার ওপর নির্ভর করলেই হবে না। মণ্ডপ কমিটিগুলোকেও নিজেদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সক্রিয় থাকতে হবে। প্রতিটি মণ্ডপে পর্যাপ্ত আলোর ব্যবস্থা, সিসিটিভি, অগ্নিনিরাপত্তা সরঞ্জাম, দায়িত্বপ্রাপ্ত স্বেচ্ছাসেবক এবং রাতে পাহারার ব্যবস্থা রাখা প্রয়োজন। একই সঙ্গে মণ্ডপ কর্তৃপক্ষের সঙ্গে স্থানীয় থানা ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সরাসরি যোগাযোগ থাকা জরুরি।

গুজব প্রতিরোধেও নাগরিকদের দায়িত্ব রয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কোনো হামলা, প্রতিমা ভাঙচুর, ধর্মীয় অবমাননা বা সংঘর্ষের খবর পাওয়া গেলে যাচাই ছাড়া তা শেয়ার করা উচিত নয়। বিশেষ করে পুরোনো ছবি বা ভিডিও নতুন ঘটনার দাবি করে প্রচার করা হচ্ছে কি না, সেটিও যাচাই করতে হবে।

এআই দিয়ে তৈরি বা সম্পাদিত ছবি, ভিডিও কিংবা অডিও সম্পর্কেও সতর্ক থাকা প্রয়োজন। কোনো উসকানিমূলক পোস্টে গালাগালি, হুমকি বা পাল্টা উসকানিমূলক মন্তব্য না করে প্রয়োজনে সংশ্লিষ্ট প্ল্যাটফর্মে তা রিপোর্ট করা এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে জানানো উচিত। তথ্যের ক্ষেত্রে পুলিশ, স্থানীয় প্রশাসন এবং একাধিক নির্ভরযোগ্য সংবাদমাধ্যমকে অগ্রাধিকার দেওয়া প্রয়োজন।

মণ্ডপে উপস্থিত নাগরিকদেরও কিছু বিষয়ে সতর্ক থাকতে হবে। সন্দেহজনক ব্যক্তি, বস্তু বা কর্মকাণ্ড চোখে পড়লে নিজের হাতে আইন তুলে না নিয়ে নিরাপত্তাকর্মী বা পুলিশকে জানাতে হবে। কাউকে শুধু সন্দেহের ভিত্তিতে আটক, মারধর বা হয়রানি করা যাবে না। মাদক, অস্ত্র, মারামারি ও উসকানিমূলক আচরণ থেকেও সবাইকে বিরত থাকতে হবে।

অগ্নিকাণ্ডের ঝুঁকি এড়াতে বৈদ্যুতিক সংযোগ, মোমবাতি, ধূপ, রান্নার চুলা ও জেনারেটর ব্যবহারে সতর্কতা জরুরি। কোনো দুর্ঘটনা ঘটলে দ্রুত ফায়ার সার্ভিস, জরুরি সেবা ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে জানাতে হবে। একই সঙ্গে মণ্ডপে অতিরিক্ত ভিড় নিয়ন্ত্রণে সহযোগিতা এবং শিশু, নারী ও বয়স্কদের নিরাপদ চলাচলের সুযোগ করে দেওয়া প্রয়োজন।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, কোনো বিচ্ছিন্ন অপরাধ বা অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনাকে কেন্দ্র করে কোনো ধর্মীয় সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে সামগ্রিকভাবে উত্তেজনা ছড়ানো যাবে না। স্থানীয় বিরোধ, জমি-সংক্রান্ত সমস্যা কিংবা ব্যক্তিগত শত্রুতাকেও ধর্মীয় পরিচয়ের সঙ্গে যুক্ত করা উচিত নয়।

দুর্গাপূজা কোনো সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে নয়; এটি হিন্দু সম্প্রদায়ের ধর্মীয় উৎসব এবং একই সঙ্গে বাংলাদেশের বহুত্ববাদী সামাজিক সংস্কৃতির একটি অংশ। ধর্মীয় স্বাধীনতা ও নিরাপত্তা প্রত্যেক নাগরিকের অধিকার। সেই অধিকার রক্ষায় রাষ্ট্রের পাশাপাশি সমাজ ও নাগরিকদেরও দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে।

নিরাপদ ও শান্তিপূর্ণ পরিবেশে পূজা উদ্‌যাপনের জন্য প্রয়োজন পারস্পরিক শ্রদ্ধা, সতর্কতা এবং দায়িত্বশীল আচরণ। মণ্ডপে উৎসবের আনন্দ থাকবে, আর গুজব, উসকানি, ভাঙচুর ও সহিংসতার বিরুদ্ধে সম্মিলিতভাবে দাঁড়াবে পুরো সমাজ—এটাই হওয়া উচিত সবার প্রত্যাশা।








আরও খবর


Loading...
Loading...
প্রকাশক: এম এন এইচ বুলু
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : মাহফুজুর রহমান রিমন  |   উপদেষ্টা সম্পাদক : রাজু আলীম  
বিএনএস সংবাদ প্রতিদিন লি. এর পক্ষে প্রকাশক এম এন এইচ বুলু কর্তৃক ৪০ কামাল আতাতুর্ক এভিনিউ, বুলু ওশেন টাওয়ার, (২১ তলা), বনানী, ঢাকা ১২১৩ থেকে প্রকাশিত ও শরীয়তপুর প্রিন্টিং প্রেস, ২৩৪ ফকিরাপুল, ঢাকা থেকে মুদ্রিত।
ফোন:০২৯৮২০০১৯-২০ ফ্যাক্স: ০২-৯৮২০০১৬ ই-মেইল: [email protected]