রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের কৃষ্ণসাগর উপকূলের একটি বিলাসবহুল বাসভবনের নিরাপত্তায় মোতায়েন রুশ এস-৪০০ আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থায় ড্রোন হামলা চালিয়েছে ইউক্রেন। দক্ষিণ রাশিয়ার গেলেনঝিকের কাছে ওই হামলা চালানো হয়।
হামলার লক্ষ্য হওয়া এস-৪০০ ‘ট্রায়াম্ফ’ ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণকারীটি পুতিনের বিশাল বাসভবন থেকে প্রায় ১২ মাইল দূরে ছিল বলে প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে। এস-৪০০ ব্যবস্থা বিমান, ড্রোন ও ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র ঠেকানোর জন্য তৈরি করা হয়েছে। ইউক্রেনের মানববিহীন ব্যবস্থা বাহিনীর কমান্ডার মেজর রবার্ট ব্রোভদি দাবি করেছেন, ড্রোন হামলার পর এস-৪০০ উৎক্ষেপণকারীটি প্রায় তিন ঘণ্টা ধরে আগুনে জ্বলেছে এবং সেখান থেকে ধোঁয়া বের হয়েছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, এস-৪০০ ছিল পুতিনের ওই বিশাল বাসভবনকে রক্ষার জন্য তৈরি বড় একটি নিরাপত্তাব্যবস্থার অংশ।
বাসভবনের আশপাশে ইলেকট্রনিক যুদ্ধের সরঞ্জাম এবং মোবাইল ফায়ার টিমও মোতায়েন রয়েছে। পুরো কমপ্লেক্সটি প্রায় ২৭ বর্গমাইলের একটি ‘বাফার জোন’ দিয়ে ঘেরা। ওই এলাকায় স্থায়ীভাবে বিমান চলাচল নিষিদ্ধ। তবে ইউক্রেনের কর্মকর্তা ব্রোভদি দাবি করেছেন, বাসভবন রক্ষার জন্য মোতায়েন করা ওই এস-৪০০ উৎক্ষেপণকারী ইউক্রেনের বিভিন্ন শহরে হামলা চালাতেও ব্যবহার করা হচ্ছিল।
তার দাবি, ৮ আগস্ট ইউক্রেনের দিকে ছোড়া ছয়টি ক্ষেপণাস্ত্রের মধ্যে কয়েকটি এই ব্যবস্থা থেকে উৎক্ষেপণ করা হয়েছিল। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইউক্রেনে হামলা চালাতে রাশিয়া এস-৪০০-এর মতো আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার ওপর আরো বেশি নির্ভর করছে। এর একটি কারণ হলো, রাশিয়ার কাছে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ঠেকানোর সক্ষমতা সীমিত। এ ধরনের ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করতে উন্নত আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা গুরুত্বপূর্ণ। হামলার লক্ষ্য হওয়া এস-৪০০ উৎক্ষেপণকারীটি ‘পুতিনের প্রাসাদ’ নামে পরিচিত ওই বাসভবনের কাছেই ছিল।
কৃষ্ণসাগরের উপকূলে অবস্থিত বিশাল এই কমপ্লেক্সটি ইতালীয় স্থাপত্যের আদলে তৈরি। বিভিন্ন প্রতিবেদনে এর নির্মাণে বিপুল অর্থ ব্যয়ের কথা বলা হয়েছে। প্রয়াত রুশবিরোধী নেতা অ্যালেক্সেই নাভালনির নেতৃত্বাধীন দুর্নীতিবিরোধী ফাউন্ডেশন ২০২১ সালে এই সম্পত্তি নিয়ে একটি বিস্তারিত তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশ করে। ২০২৪ সালে সাইবেরিয়ার একটি কারাগারে নাভালনির মৃত্যু হয়। নাভালনির ফাউন্ডেশনের তদন্তসহ বিভিন্ন প্রতিবেদনে বাসভবনটির বিলাসবহুল নানা সুবিধার কথা তুলে ধরা হয়। এর মধ্যে রয়েছে ক্যাসিনো, আঙুরের বাগান, স্পা, বরফে স্কেটিংয়ের জায়গা, থিয়েটার, নাচের কক্ষ, হুক্কা লাউঞ্জ এবং ‘জলজ ডিসকো’। ছোট রেলগাড়ির জন্য আলাদা একটি কক্ষ থাকার কথাও বলা হয়েছে।
২০২৩ সালে সেখানে একটি প্রার্থনাকক্ষও তৈরি করা হয়েছে বলে জানা যায়। তবে পুতিন এই বাসভবনে খুব কমই যান বলে ধারণা করা হয়। ইউক্রেনের দূরপাল্লার ড্রোন হামলা বাড়তে থাকায় কৃষ্ণসাগরের এই এলাকাটি তার জন্য তুলনামূলক বেশি ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে। এর পরিবর্তে মস্কো থেকে প্রায় ১৮৫ মাইল পূর্বে ভালদাই হ্রদের কাছে থাকা একটি কঠোর নিরাপত্তাবেষ্টিত দাচায় (পল্লীনিবাস বা ভিলা, যা সাধারণত দ্বিতীয় আবাস হিসেবে ব্যবহৃত হয়) পুতিন বেশি সময় কাটান বলে ধারণা করা হয়।
সর্বশেষ হামলার আগে একই অঞ্চলে ইউক্রেনের আরেকটি ড্রোন হামলার ঘটনা ঘটে। ওই হামলার পর একটি সৈকতে ড্রোনের ধ্বংসাবশেষ পড়ে সাতজন নিহত হন বলে জানা গেছে। সোমবার ইউক্রেনের সামরিক গোয়েন্দা সংস্থাও দাবি করেছে, তাদের ড্রোন রাশিয়ার দুটি এস-৪০০ ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণকারী ধ্বংস করেছে। এ ছাড়া দখলকৃত ক্রিমিয়ায় মাঝারি উচ্চতায় উড়তে সক্ষম ‘ওরিয়ন’ ড্রোন নিয়ন্ত্রণে ব্যবহৃত একটি অ্যান্টেনাতেও হামলা চালানো হয়েছে বলে দাবি করেছে কিয়েভ। ইউক্রেনের হিসাব অনুযায়ী, এসব হামলায় রাশিয়ার কয়েক কোটি ডলারের ক্ষতি হতে পারে। এই হামলাগুলো রাশিয়ার সামরিক ও জ্বালানি অবকাঠামো লক্ষ্য করে ইউক্রেনের বড় আকারের ড্রোন অভিযানের অংশ। সাম্প্রতিক সময়ে রাশিয়ার ভেতরে ইউক্রেনের দূরপাল্লার ড্রোন হামলা প্রায় নিয়মিত ঘটনায় পরিণত হয়েছে। ইউক্রেনের এসব হামলা ঠেকাতে রাশিয়াও চাপের মধ্যে রয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
সোমবার রাতে ৪৫০টির বেশি ইউক্রেনীয় ড্রোন রাশিয়ার আকাশসীমায় ঢুকে তাতারস্তানের একটি তেল শোধনাগারে হামলা চালিয়েছে বলে জানা গেছে। ওই হামলায় অন্তত ১৩ জন নিহত হয়েছেন। যুদ্ধ শুরুর পর রাশিয়ার ভূখণ্ডে ইউক্রেনের একক হামলাগুলোর মধ্যে এটি সবচেয়ে প্রাণঘাতী হামলার একটি বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এ ছাড়া সাইবেরিয়ার তিউমেন এলাকাতেও ড্রোনের ধ্বংসাবশেষ পড়ার খবর পাওয়া গেছে। ইউক্রেনের লক্ষ্য হলো রাশিয়ার সামরিক ও অর্থনৈতিক অবকাঠামোর ওপর চাপ বাড়ানো। কিয়েভ মনে করছে, রাশিয়ার ভেতরে নিয়মিত হামলা চালিয়ে যুদ্ধের খরচ বাড়ানো গেলে মস্কো আলোচনায় বসতে আরো চাপ অনুভব করবে।
ইউক্রেন যুদ্ধের অবসান এবং যুদ্ধবিরতির জন্য রাশিয়ার ওপর চাপ বাড়ানোর চেষ্টা করছে। তবে ইউক্রেন যে শর্তে যুদ্ধবিরতি চায়, তা মেনে নেওয়ার বিষয়ে মস্কো এখনো আগ্রহ দেখাচ্ছে না। রাশিয়ার উপপররাষ্ট্রমন্ত্রী মিখাইল গালুজিন সোমবার ইউক্রেনের যুদ্ধবিরতি ও সংঘাত সাময়িকভাবে বন্ধ রাখার দাবি প্রত্যাখ্যান করেন। তিনি বলেন, সংঘাতের মূল কারণগুলোর সমাধান না করে কোনো ধরনের যুদ্ধবিরতি বা সংঘাত স্থগিত করা সম্ভব নয়।