সদ্য সমাপ্ত ফিফা বিশ্বকাপে ম্যাচ দেখার উদ্দেশ্যে কানাডায় গিয়ে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের অন্তত ১৭৫ জন দর্শনার্থী রাজনৈতিক আশ্রয়ের আবেদন করেছেন। দেশটিতে খেলা দেখতে গিয়ে রাজনৈতিক আশ্রয় চাওয়ার এই তালিকায় আছেন ১০ বাংলাদেশিও। তবে সবচেয়ে বেশি আশ্রয় আবেদন করেছেন আফ্রিকার দেশ ঘানার নাগরিকরা। দেশটির অন্তত ২৫ জন নাগরিক ভিজিটর ভিসায় গিয়ে রাজনৈতিক আশ্রয় চেয়ে আবেদন করেছেন।
কানাডার অভিবাসন ও শরণার্থীবিষয়ক সংস্থা ইমিগ্রেশন, রিফ্যুজি অ্যান্ড সিটিজেনশিপ কানাডার (আইআরসিসি) এক পরিসংখ্যানে ওই তথ্য জানানো হয়েছে। গত জুন ও জুলাইয়ে কানাডার টরন্টো এবং ভ্যানকুভারে ফিফা বিশ্বকাপের ১৩টি ম্যাচ অনুষ্ঠিত হয়। ফিফা বিশ্বকাপের এই প্রতিযোগিতা দেখার জন্য বিশ্বের বিভিন্ন দেশের প্রায় ২৬ হাজার নাগরিককে ভিসা দিয়েছিল দেশটি।
বিশ্বকাপের অংশ নেওয়া দলগুলোর কোনো ফুটবলার বা দলের অন্য কোনো স্টাফ শরণার্থী হিসেবে আশ্রয়ের আবেদন করেছেন কি না; সেই বিষয়ে স্পষ্ট করে কিছু জানায়নি আইআরসিসি।
তবে আশ্রয়ের আবেদনকারীর এই সংখ্যা সামনে আরও বাড়তে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। কারণ যেসব বিদেশি নাগরিক ভিসার মেয়াদ পার হয়ে যাওয়ার পরও দেশটিতে অবৈধভাবে অবস্থান করছেন, পরবর্তীতে তারা শরণার্থী মর্যাদার জন্য আবেদন করতে পারেন।
কানাডায় সবচেয়ে বেশি আশ্রয়ের আবেদন করেছেন ঘানার নাগরিকরা। গত ১৭ জুন টরন্টোতে পানামার বিপক্ষে মাঠে নেমেছিল দেশটির জাতীয় দল। আইআরসিসি বলেছে, ভিজিটর ভিসা আবেদনে ‘ফিফা ওয়ার্ল্ড কাপ ২৬’ উল্লেখ করা ঘানার ২৫ জন নাগরিক পরবর্তীতে কানাডায় আশ্রয়ের আবেদন করেছেন।
একইভাবে মিসর থেকে ভিজিটর ভিসা নিয়ে আসা ১৫ জন নাগরিকও রাজনৈতিক আশ্রয়ের আবেদন করেছেন। গত ২১ জুন ভ্যাঙ্কুভারে গ্রুপ পর্বের ম্যাচে নিউজিল্যান্ডের মুখোমুখি হয়েছিল মিসর।
এছাড়া কলম্বিয়ার ১৫ জন নাগরিক দেশটিতে প্রবেশের পর রাজনৈতিক আশ্রয় চেয়েছেন। গত ৭ জুলাই ভ্যানকুভারে সুইজারল্যান্ডের বিপক্ষে ম্যাচ খেলেছিল তাদের জাতীয় ফুটবল দল।
বিশ্বকাপ দেখতে এসে সেনেগালের ১০ জন নাগরিক আশ্রয়ের আবেদন করেছেন। গত ২৬ জুন টরন্টোতে ইরাকের বিপক্ষে গ্রুপ পর্বের শেষ ম্যাচটি খেলেছিল সেনেগাল। ইকুয়েডরের পাঁচজন নাগরিকের পক্ষ থেকে আশ্রয়ের আবেদন পাওয়া গেছে। যদিও তাদের জাতীয় দল বিশ্বকাপের ম্যাচগুলো খেলেছে কানাডার বাইরের ভেন্যুতে।
আবেদনকারীদের মধ্যে অনেকেরই নিজস্ব জাতীয় দল মূল টুর্নামেন্টে অংশ নেয়নি। কিন্তু তারা বিশ্বকাপ দেখতে এসে রাজনৈতিক আশ্রয় দাবি করেছেন। তাদের মধ্যে রয়েছেন কেনিয়ার ১৫ জন, চীনের ১০ জন, বাংলাদেশের ১০ জন, নাইজেরিয়ার ১০ জন এবং বুরুন্ডি, নেপাল ও পাকিস্তানের পাঁচজন করে নাগরিক।
ফ্রান্স, বেলজিয়াম ও নরওয়ের মতো ভিসা-ছাড় পাওয়া দেশগুলোর নাগরিকদের কানাডায় যেতে ভিসার প্রয়োজন হয় না। ২০২৫ সালের নভেম্বরে কাতারের নাগরিকদের ক্ষেত্রে ভিসার প্রয়োজনীয়তা তুলে নেওয়ার পর তারাও বিশেষ ট্রাভেল অথরাইজেশনের মাধ্যমে সেদেশে বিমান ভ্রমণের সুযোগ পাচ্ছেন।
বিশ্বকাপের ম্যাচগুলো উপভোগ করতে কাতার তাদের প্রায় ১ হাজার সমর্থককে সম্পূর্ণ বিনামূল্যে কানাডায় পাঠিয়েছিল। কাতারের সোশ্যাল অ্যান্ড স্পোর্ট কন্ট্রিবিউশন ফান্ড দেশটির ফুটবল ফেডারেশনের সঙ্গে অংশীদারত্ব করে তাদের ফ্লাইট, হোটেল ও স্থানীয় যাতায়াত খরচের ব্যবস্থা করেছিল।
কাতারের আমির শেখ তামিম বিন হামাদ আল থানির চার্টার্ড করা একটি বিমানে চড়ে একদল সমর্থক ভ্যাঙ্কুভারে পৌঁছান। সেখানে কানাডার কাছে ৬-০ গোলে হারের তিক্ত স্বাদ পায় কাতার। ম্যাচটিতে ফরোয়ার্ড জোনাথন ডেভিড এক ঐতিহাসিক হ্যাটট্রিক করেন। এর মধ্য দিয়ে তিনি প্রথম কানাডিয়ান হিসেবে পুরুষদের কোনো একক বিশ্বকাপ ম্যাচে হ্যাটট্রিক গোল করার রেকর্ড অর্জন করেন।
এক বিবৃতিতে আইআরসিসি বলেছে, ‘‘২০২৬ সালের ২০ জুলাই পর্যন্ত তথ্য অনুযায়ী, ফিফা সংশ্লিষ্ট অস্থায়ী বসবাসের আবেদন অনুমোদন পাওয়া ২৬ হাজার ১১১ জন ব্যক্তির মধ্যে ১৭৫ জন পরবর্তীতে আশ্রয়ের আবেদন জমা দিয়েছেন।’’
‘‘তথ্যের এই পরিসংখ্যান কেবল সেই সব আবেদনকারীদের অন্তর্ভুক্ত করে; যারা তাদের অস্থায়ী থাকার আবেদনে ফিফা ওয়ার্ল্ড কাপ ২৬ বলে উল্লেখ করেছিলেন।’’
সস্প্রতি আশ্রয়ের আবেদন বিধিমালার শর্ত অধিক কঠিন করেছে অটোয়া। যেসব বিদেশি নাগরিক এক বছরের বেশি সময় ধরে কানাডায় অবস্থান করছেন, শরণার্থী বিষয়ক স্বাধীন ট্রাইব্যুনালে তাদের শুনানি গ্রহণের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছে।
এর আগে, বিদেশে খেলতে গেলে ফুটবলাররা স্থায়ীভাবে পালিয়ে রাজনৈতিক আশ্রয় চাইতে পারেন আশঙ্কায় পুরুষ ফুটবল দলকে বিশ্বকাপের বাছাইপর্বের ম্যাচ থেকেই প্রত্যাহার করে নিয়েছিল ইরিত্রিয়ার ফুটবল ফেডারেশন।
২০১০ সালের শীতকালীন অলিম্পিকের সময়ে ভ্যাঙ্কুভারে পৌঁছে বিভিন্ন দেশের অন্তত ২২ জন ব্যক্তি কানাডায় রাজনৈতিক আশ্রয় প্রার্থনা করেছিলেন। তাদের মধ্যে সাতজন ছিলেন খোদ অলিম্পিক পরিবার বা অফিশিয়ালদের সদস্য। কানাডার অভিবাসন বিভাগের তথ্য বলছে, ওই কর্মকর্তারা ঘানা, হাঙ্গেরি, মঙ্গোলিয়া, রাশিয়া, ইউক্রেন, জর্জিয়া, মলদোভা, নেপাল ও জাপান; এই ৯টি ভিন্ন দেশ থেকে এসেছিলেন।
একইভাবে ২০১২ সালে লন্ডনে অলিম্পিক গেমসের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের আগেই ক্যামেরুন, ইরিত্রিয়া ও রুয়ান্ডার মতো দেশের প্রতিযোগীসহ ৮২ জন ক্রীড়াবিদ ও কর্মকর্তা যুক্তরাজ্যে রাজনৈতিক আশ্রয় চান।
সূত্র: সিটিভি নিউজ, দ্য গ্লোব অ্যান্ড মেইল।