বাংলাদেশে নিজস্ব জাতীয় ‘টেকসই ভবন লেবেলিং ব্যবস্থা’ প্রবর্তনের লক্ষ্যে আজ ২১ জুলাই (রবিবার) একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। ‘এইচবিআরআই-দেশ’-এর বাস্তবায়ন বিষয়ক অংশীজনদের পরামর্শ কর্মশালায় যোগ দিতে সরকার, জাতিসংঘ সংস্থা, আর্থিক প্রতিষ্ঠান, শিক্ষাঙ্গন, পেশাজীবী সংগঠন এবং বেসরকারি খাতের ঊর্ধ্বতন প্রতিনিধিরা ঢাকায় সমবেত হয়েছিলেন।
জার্মান ফেডারেল মিনিস্ট্রি ফর ইকোনমিক কো-অপারেশন অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট-এর অর্থায়নে এবং ‘বাংলাদেশে টেকসই উপকরণের মাধ্যমে নির্মিত পরিবেশের রূপান্তর’ শীর্ষক প্রকল্পের আওতায় এই কর্মশালাটি আয়োজিত হয়। গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের অধীনস্থ ‘হাউজিং অ্যান্ড বিল্ডিং রিসার্চ ইনস্টিটিউট’ জাতিসংঘ মানব বসতি কর্মসূচি, জাতিসংঘ পরিবেশ কর্মসূচি এবং জাতিসংঘ প্রকল্প সেবা কার্যালয়-এর সহযোগিতায় এই কর্মশালাটি পরিচালনা করে।
আলোচনাটি এইচবিআরআই-দেশ এবং এর ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম ‘DESHboard’-এর বাস্তবায়নের ওপর কেন্দ্র করে পরিচালিত হয়; এই দুটি ব্যবস্থা যৌথভাবে টেকসই, সাশ্রয়ী ও জলবায়ু-সহনশীল ভবনের জন্য বাংলাদেশের নিজস্ব উদ্ভাবিত লেবেলিং ব্যবস্থা হিসেবে কাজ করবে।
উদ্বোধনী অধিবেশনে উপস্থিত ছিলেন জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান ও অতিরিক্ত সচিব মোসাম্মৎ ফেরদৌসী বেগম; স্থাপত্য অধিদপ্তরের প্রধান স্থপতি জনাব আসিফুর রহমান ভূঁইয়া; এবং এইচবিআরআই-এর মহাপরিচালক ড. গিয়াসউদ্দিন হায়দার। এই পদ্ধতির সম্প্রসারণের জন্য প্রয়োজনীয় নীতিমালা, সমন্বয় ও অর্থায়ন নিয়ে আলোচনার লক্ষ্যে 'বাংলাদেশে টেকসই ভবন নির্মাণে অগ্রগতি: এইচবিআরআই-দেশ বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে নীতিমালা, প্রাতিষ্ঠানিক পথ ও অর্থায়ন' শীর্ষক একটি উচ্চ-পর্যায়ের প্যানেল আলোচনার আয়োজন করা হয়। এতে গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়, রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক), জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) এবং ঢাকা পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেড (ডিপিডিসি)-এর ঊর্ধ্বতন প্রতিনিধিরা—যাদের মধ্যে গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের উপ-সচিব মো. আব্দুল আউয়াল এবং রাজউকের প্রধান নগর পরিকল্পনাবিদ মো. আশরাফুল ইসলাম অন্যতম—অংশ নেন।
এই চ্যালেঞ্জের ব্যাপকতা পরিস্থিতির জরুরি অবস্থাকেই তুলে ধরে। ইউএনইপি ও গ্লোবাল এবিসি-এর ‘গ্লোবাল স্ট্যাটাস রিপোর্ট ২০২৫-২০২৬’ অনুযায়ী, বিশ্বজুড়ে শক্তি-সম্পর্কিত কার্বন ডাই-অক্সাইড নিঃসরণের প্রায় ৩৭ শতাংশ এবং কাঁচামাল আহরণের প্রায় অর্ধেকই আসে ভবন ও নির্মাণ খাত থেকে। বিশ্বের দ্রুততম নগরায়নশীল দেশগুলোর মধ্যে অন্যতম বাংলাদেশে গত দুই দশকে শহরের জনসংখ্যা প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে; ইন্টারন্যাশনাল ফাইন্যান্স কর্পোরেশন (আইএফসি)-এর প্রাক্কলন অনুযায়ী, ২০৩৭ সালের মধ্যে দেশটির জনসংখ্যার অর্ধেকেরও বেশি মানুষ শহরে বসবাস করবে এবং ২০৩০ সাল নাগাদ আবাসন চাহিদা ১ কোটি ৫ লক্ষ ইউনিটে পৌঁছাবে।
অংশগ্রহণকারীরা বিভিন্ন অংশীজন বা স্টেকহোল্ডারদের একটি বিস্তৃত প্রতিনিধিত্বমূলক গোষ্ঠীর অন্তর্ভুক্ত ছিলেন: সরকারি মন্ত্রণালয় ও সংস্থা, বাংলাদেশ ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান, উন্নয়ন সহযোগী, বিশ্ববিদ্যালয় ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান, পেশাজীবী সংগঠন (যেমন—ইনস্টিটিউট অফ আর্কিটেক্টস বাংলাদেশ বা আইএবি এবং ইনস্টিটিউশন অফ ইঞ্জিনিয়ার্স, বাংলাদেশ বা আইইবি), স্থাপত্য পরামর্শক প্রতিষ্ঠান, আবাসন নির্মাতা (রিয়েল এস্টেট ডেভেলপার), নির্মাণ শিল্পের প্রতিনিধি, পরিবেশ বিশেষজ্ঞ এবং সুশীল সমাজের সংগঠন।
এইচবিআরআই-দেশ কেবল একটি কারিগরি কাঠামোই নয়—এটি জাতীয় মালিকানাধীন এমন একটি উদ্যোগ যা টেকসই নগর উন্নয়নের বিষয়ে বাংলাদেশের প্রতিশ্রুতিকে বাস্তব পদক্ষেপে রূপান্তর করতে সহায়তা করবে। সরকার, বেসরকারি খাত এবং উন্নয়ন সহযোগীদের মধ্যে জোরালো সহযোগিতার মাধ্যমে আমরা এমন একটি নির্ভরযোগ্য ও স্বচ্ছ ব্যবস্থা গড়ে তুলতে পারি, যা সারা দেশে টেকসই, সাশ্রয়ী ও জলবায়ু-সহনশীল ভবন নির্মাণকে উৎসাহিত করবে," বলেছেন জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান ও অতিরিক্ত সচিব মোস্ত. ফেরদৌসী বেগম।
এই পরামর্শ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে শাসনব্যবস্থা, প্রাতিষ্ঠানিক সমন্বয়, অর্থায়ন ব্যবস্থা, সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং ডিজিটাল পদ্ধতির বিষয়ে বিভিন্ন সুপারিশ উঠে এসেছে। এই সুপারিশগুলো সরাসরি এইচবিআরআই-দেশ-এর বাস্তবায়ন নির্দেশিকা এবং পর্যায়ক্রমিক জাতীয় পর্যায়ে বাস্তবায়নের (যার মধ্যে পাইলট উদ্যোগ ও অংশীদারিত্ব অন্তর্ভুক্ত) রূপরেখা প্রণয়নে সহায়তা করবে, যাতে এর ব্যাপক প্রচলন ও ব্যবহারকে উৎসাহিত করা যায়।
এই উদ্যোগটি বাংলাদেশের ‘জাতীয়ভাবে নির্ধারিত অবদান’ এবং টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা ১১, ১২ ও ১৩ অর্জনের পথে অগ্রগতিকে সহায়তা করে; এটি স্বল্প-কার্বন নিঃসরণকারী, সম্পদ-সাশ্রয়ী ও জলবায়ু-সহনশীল নির্মাণ-কাঠামো গড়ে তোলার ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক।