মঙ্গলবার ২১ জুলাই ২০২৬ ৬ শ্রাবণ ১৪৩৩
 
শিরোনাম:


সেই জুলাইতেই উত্তাল ভারত
প্রকাশ: সোমবার, ২০ জুলাই, ২০২৬, ৪:০৮ পিএম  (ভিজিট : ৩৩)
ঠিক দুই বছর আগে জুলাই মাসে বাংলাদেশের সরকারি পরীক্ষায় কোটা পদ্ধতি সংস্কারের দাবিতে শুরু হওয়া আন্দোলন রূপ নিয়েছিল গণ-অভ্যুত্থানে। যার জেরে পতন ঘটে দীর্ঘ প্রায় ১৬ বছর ধরে ক্ষমতায় থাকা শেখ হাসিনা সরকার। এবার দুই বছর পর জুলাইতেই ‘ককরোচ জনতা পার্টির’ (সিজেপির) নেতৃত্বে সরকারি চাকরির প্রশ্নপত্র ফাঁসের বিরুদ্ধে ও শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগের দাবিতে বিক্ষোভে উত্তাল হয়ে উঠেছে ভারত।

গত প্রায় এক মাস ধরে দিল্লির ঐতিহাসিক যন্তর মন্তরে সিজেপি সদস্য ও সাধারণ শিক্ষার্থীরা আন্দোলন চালিয়ে আসছিলেন। রোববার (১৯ জুলাই) দেশটির পার্লামেন্টের বর্ষাকালীন অধিবেশন শুরুর দিনে সংসদ অভিমুখে পদযাত্রার (লং মার্চ টু পার্লামেন্ট) ডাক দেয় সংগঠনটি। সোমবার (২০ জুলাই) সকালে হাজার হাজার শিক্ষার্থী ও তরুণের অংশগ্রহণে জনসমুদ্রে পরিণত হয় এই পদযাত্রা।

পরিস্থিতি মোকাবিলায় ও বিক্ষোভকারীরা যাতে পার্লামেন্ট ভবনে ঢুকতে না পারে সেজন্য এদিন যন্তর মন্তর ও আশপাশের এলাকায় শত শত পুলিশ ও আধাসামরিক বাহিনীর সদস্য মোতায়েন করে ভারত সরকার।

তবে বিক্ষোভকারীরা মিছিল নিয়ে তারা পার্লামেন্টের দিকে এগোতে চাইলে ও একাধিক স্থানে বসানো নিরাপত্তা ব্যারিকেড ভেঙে ফেলার চেষ্টা করলে পুলিশের সঙ্গে ধস্তাধস্তি শুরু হয়। এতে বেশ কয়েকজন আন্দোলনকারী ও পুলিশ সদস্য সামান্য আহত হয়েছেন। এ সময় এক তরুণকে রক্তাক্ত অবস্থায় দেখা যায়।

পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে মধ্য দিল্লির বেশকিছু এলাকায় সাময়িকভাবে মোবাইল ইন্টারনেট পরিষেবা বন্ধ করে দেওয়া হয়।

পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে উঠলে ককরোচ জনতা পার্টির পক্ষ থেকে এক জরুরি বার্তায় সমর্থকদের শান্ত ও অহিংস থাকার আকুল আবেদন জানানো হয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দলটির পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, আপনাদের যদি বিভিন্ন পয়েন্টে আটকে দেওয়া হয়, তবুও শান্ত থাকুন ও শান্তি বজায় রাখুন। আমরা কেবল শান্তি ও ভালোবাসার পথেই জয়ী হতে পারবো।

এর মধ্যেই ককরোচ জনতা পার্টির (সিজেপি) পক্ষ থেকে তাদের এক্স (সাবেক টুইটার) হ্যান্ডেলে জানানো হয়েছে, দলের প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দীপকেকে যন্তর মন্তর থেকে তুলে নিয়ে গেছে পুলিশ।

বিক্ষোভের সূচনা
অভিজিৎ দীপকে নামের এক তরুণের হাত ধরে গত মে মাসে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পরীক্ষা সংক্রান্ত জালিয়াতি ও প্রশ্নফাঁসের বিরুদ্ধে একটি ব্যঙ্গাত্মক আন্দোলন হিসেবে এই ‘ককরোচ জনতা পার্টি’র যাত্রা শুরু হয়েছিল। অল্প সময়ের মধ্যেই এটি সাধারণ শিক্ষার্থী ও তরুণদের মাঝে বিপুল জনপ্রিয়তা লাভ করে।

৩০০ বছরের প্রাচীন মানমন্দির যন্তর মন্তরে সোমবার (২০ জুলাই) ভোর থেকেই উৎসাহ-উদ্দীপনায় ভরা এক পরিবেশ তৈরি হয়। আন্দোলনকারীরা সরকারবিরোধী ও শিক্ষা সংস্কারের পক্ষে টানা স্লোগান দিচ্ছেন এবং বিভিন্ন বক্তা বক্তব্য রাখছেন। বিক্ষোভকারীদের অনেকের হাতে রয়েছে ভারতের জাতীয় পতাকা, আবার অনেকেই শান্তির প্রতীক হিসেবে হাতে প্লাস্টিকের গোলাপ বহন করছেন।

সোমবারের লং মার্চ সামনে রেখে রোববার (১৯ জুলাই) রাতে পুরো যন্তর মন্তর এলাকা যেন এক অস্থায়ী ক্যাম্পিং গ্রাউন্ডে পরিণত হয়েছিল। ভারতের বিভিন্ন রাজ্য থেকে রাতভর সফর করে আসা শিক্ষার্থীরা যন্তর মন্তরে পৌঁছে ত্রিপলের নিচে সাধারণ ম্যাট ও পাতলা কম্বল বিছিয়ে রাত কাটান। অনেকেই না ঘুমিয়ে গান গেয়ে, আড্ডা দিয়ে কিংবা সোমবারের মার্চের জন্য প্ল্যাকার্ড এঁকে রাত পার করেন।

সকালের সূর্য ওঠার সঙ্গে সঙ্গেই স্বেচ্ছাসেবকরা আন্দোলনকারীদের মাঝে চা ও প্রাতরাশ বিতরণ শুরু করেন। নতুন করে আসা দূর-দূরান্তের শিক্ষার্থীদের পিঠের ব্যাগ ও স্লিপিং ব্যাগের ভিড়ে থাকার জায়গা করে দিতেও সাহায্য করেন তারা। বারবার স্থান ত্যাগ করার জন্য পুলিশের পক্ষ থেকে মাইকিং করা সত্ত্বেও কোনো আন্দোলনকারী যন্তর মন্তর ছাড়েননি। অনেকেই জানান, পদযাত্রা শুরু হলে তারা সবার সামনে থাকতে চান বলেই রাতে সেখানে অবস্থান নিয়েছেন।

রক্তক্ষয়ী সংগ্রাম নয়, সুসংগঠিত প্রস্তুতি
বিশাল এই লং মার্চকে ঘিরে গত ২৪ ঘণ্টা ধরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শিক্ষার্থীদের প্রস্তুতি ছিল চোখে পড়ার মতো। কোনো রাজনৈতিক সংঘাতের চেয়ে মিউজিক ফেস্টিভ্যালের প্রস্তুতির সঙ্গে এর মিল ছিল বেশি। ফেসবুক, হোয়াটসঅ্যাপ ও টেলিগ্রাম গ্রুপের মাধ্যমে স্বেচ্ছাসেবকরা জরুরি নির্দেশনা ও নিরাপত্তা টিপস শেয়ার করেছেন।

অংশগ্রহণকারীদের সঙ্গে পানির বোতল, ওআরএস স্যালাইন, শুকনো খাবার, পাওয়ার ব্যাংক, ক্যাপ, রেইনকোট, আরামদায়ক জুতো ও জরুরি ফোন নম্বর রাখার পরামর্শ দেওয়া হয়। কোথায় কোথায় জমা হতে হবে তার মানচিত্র, আইনি সহায়তা পাওয়ার হেল্পলাইন নম্বর ও পুলিশ আটক করলে করণীয় সম্পর্কিত নির্দেশিকাও ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল।

ককরোচ জনতা পার্টির পক্ষ থেকে অংশগ্রহণকারীদের জন্য একটি নিয়মাবলি প্রকাশ করা হয়। সেখানে মিছিল সম্পূর্ণ শান্ত রাখার, শুধু ভারতের জাতীয় পতাকা বহন করার এবং পুলিশের সাথে কোনো প্রকার হাতাহাতি বা তর্কে না জড়ানোর অনুরোধ জানানো হয়। অনেক শিক্ষার্থী খাবার ও প্রয়োজনীয় সামগ্রী ভর্তি ব্যাকপ্যাক নিয়ে দীর্ঘ লড়াইয়ের জন্য পুরোপুরি প্রস্তুত হয়েই পদযাত্রায় শামিল হয়েছেন।

কী চলছে ভারতীয় পার্লামেন্টে?
বিক্ষোভকারীরা যখন মাত্র দুই কিলোমিটার দূরে রাস্তায় নেমে লড়াই করছেন, ঠিক তখনই ভারতের লোকসভায় (সংসদের নিম্নকক্ষ) চরম হট্টগোল দেখা গেছে। গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় ইস্যুতে আলোচনার দাবিতে বিরোধী দলীয় আইনপ্রণেতারা স্লোগান দেওয়া শুরু করলে অধিবেশন দুপুর পর্যন্ত স্থগিত ঘোষণা করা হয়।

এর আগে অধিবেশন শুরুর মুখে সংসদ ভবনের বাইরে গণমাধ্যমের মুখোমুখি হন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। তিনি তার বক্তব্যে গত শনিবার ভারতের এক বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের প্রথম কক্ষপথীয় রকেট উৎক্ষেপণের প্রশংসার পাশাপাশি দেশের নতুন তেল শোধনাগার, সেমিকন্ডাক্টর প্ল্যান্ট ও হাইড্রোজেন ট্রেনের অগ্রগতির কথা তুলে ধরেন। তিনি সংসদ সদস্যদের গঠনমূলক আলোচনায় অংশ নেওয়ার আহ্বান জানান।

তবে প্রধানমন্ত্রী মোদীর দীর্ঘ বক্তব্যে পার্লামেন্ট থেকে ঢিল ছোড়ার দূরত্বে যন্তর মন্তরে হাজার হাজার শিক্ষার্থীর এই আন্দোলন বা অবস্থান নিয়ে কোনো উল্লেখ ছিল না।

সূত্র: বিবিসি, এনডিটিভি, দ্য হিন্দু 








আরও খবর


Loading...
Loading...
প্রকাশক: এম এন এইচ বুলু
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : মাহফুজুর রহমান রিমন  |   উপদেষ্টা সম্পাদক : রাজু আলীম  
বিএনএস সংবাদ প্রতিদিন লি. এর পক্ষে প্রকাশক এম এন এইচ বুলু কর্তৃক ৪০ কামাল আতাতুর্ক এভিনিউ, বুলু ওশেন টাওয়ার, (২১ তলা), বনানী, ঢাকা ১২১৩ থেকে প্রকাশিত ও শরীয়তপুর প্রিন্টিং প্রেস, ২৩৪ ফকিরাপুল, ঢাকা থেকে মুদ্রিত।
ফোন:০২৯৮২০০১৯-২০ ফ্যাক্স: ০২-৯৮২০০১৬ ই-মেইল: [email protected]