রিমঝিম শব্দ টিনের চালে। ঘন কালো মেঘের আনাগোনা আকাশজুড়ে। গাছে গাছে কদমের হাসি। আজ পহেলা আষাঢ় , বাংলা ১৪৩৩ সনের বর্ষার প্রথম দিন। প্রকৃতি যেন গ্রীষ্মের ক্লান্তি ঝেড়ে ফেলে নতুন করে শ্বাস নিচ্ছে।
বাংলাদেশের ছয়টি ঋতুর মধ্যে বর্ষার জায়গা সবচেয়ে আলাদা কারণ এই ঋতু শুধু প্রকৃতিকে ভেজায় না, মানুষের মনেও ঢেলে দেয় এক অদ্ভুত অনুভূতি। প্রেম, বিরহ, আনন্দ, উদাসীনতা সব একসঙ্গে মিলেমিশে যায় বৃষ্টির ফোঁটায়।
শত বছর ধরে বাংলা সাহিত্য ও সংগীতে বর্ষা বারবার ফিরে এসেছে নানা রূপে। রবীন্দ্রনাথ থেকে নজরুল, মহাকবি কালিদাস থেকে হুমায়ূন আহমেদ, সবাই বর্ষাকে দেখেছেন নিজের মতো করে, ভালোবেসেছেন অন্তর থেকে।
বাদলের প্রথম কদম ফুল এখনো প্রিয়জনের জন্য সেরা উপহার। প্রেমিক-প্রেমিকার ছাতা ভাগাভাগি এখনো বর্ষার চিরন্তন দৃশ্য। মেঘলা বিকেলে ভেজা খিচুড়ির ঘ্রাণ এখনো বাঙালির নস্টালজিয়ার অংশ।
আষাঢ়ের আগমন মানে গ্রামীণ বাংলায় জীবনের নতুন অধ্যায়ের শুরু। মাঠে মাঠে কৃষকের পদচারণা বাড়ে। নদীতে জল বাড়ে, বাড়ে মাছের আনাগোনা। ভরা বিলে সাদা বকেরা ডুব দেয় । জেলে খাল-বিলে থৈ থৈ পানিতে জাল হাতে নামে।
স্কুল ছুটির পর বৃষ্টিতে কাদায় ফুটবল খেলা, দাওয়ায় বসে গল্প করা, কিংবা ভোরবেলা ছাতা মাথায় পথ চলা এসব দৃশ্য বাংলার গ্রামকে বর্ষায় করে তোলে এক জীবন্ত ছবি।
বনে-বাদাড়ে ফোটে কদম, বকুল, জারুল, পারুল, কৃষ্ণচূড়া। প্রকৃতি রঙিন হয়ে ওঠে, মাটি পায় নতুন প্রাণ। কৃষকের জমিতে বৃষ্টির জল মানে আগামীর ফসলের আশ্বাস।
গ্রামের মাঠে যে বৃষ্টি আনন্দের, শহরের রাস্তায় সেই একই বৃষ্টি হয়ে ওঠে যন্ত্রণার। ঢাকা কিংবা চট্টগ্রাম দুই শহরেই সামান্য বৃষ্টিতেই রাস্তা ডুবে যায়। নর্দমার নোংরা পানি আর বৃষ্টির জল একাকার হয়ে পথচারীর দুর্গতি বাড়িয়ে তোলে কয়েকগুণ।
এর পাশাপাশি বর্ষায় বেড়ে যায় বজ্রপাতের ঘটনা। এই প্রাকৃতিক দুর্যোগে প্রতি বছর অনেক প্রাণহানি ঘটে, যা উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠেছে।
তবে এই দুর্ভোগের দায় আষাঢ়ের নয়, দায় অপরিকল্পিত নগরায়নের, দুর্বল পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থার। প্রকৃতি তার কাজ করে নিয়ম মেনে,আমরা নিজেরাই বিশৃঙ্খলা তৈরি করেছি।
যান্ত্রিক জীবনের ক্লান্তিতে ভোগা নাগরিকের জন্য বর্ষার এক পশলা বৃষ্টি এখনো স্বস্তির। মেঘলা আকাশের দিকে তাকিয়ে এখনো মন উদাস হয়, মনে পড়ে পুরোনো কোনো গান।
আষাঢ় আসে বারবার , কখনো কবিতার পঙক্তিতে, কখনো জানালার কাচে বৃষ্টির আঁচড়ে, কখনো কদম ফুলের সৌরভে। বাঙালির জীবনে এই ঋতু শুধু ক্যালেন্ডারের একটি মাস নয় ,এটি একটি অনুভূতির নাম।
আজ পহেলা আষাঢ়। বর্ষা এসে গেছে।