১৬ বছর পর আবার বিশ্বমঞ্চে ফিরল নিউজিল্যান্ড। ফুটবল বিশ্বে নিউজিল্যান্ডের বিখ্যাত রাগবি দল অল ব্ল্যাকসের মতো ততোটা বিখ্যাত ও সফল না হলেও, তারা ওশেনিয়া কনফেডারেশনের সীমিত প্রতিযোগিতার সুবিধা নিয়ে বেশ সহজ একটি বাছাইপর্ব পার করে উত্তর আমেরিকায় এসে পৌঁছেছে।
গ্রুপ পর্ব সহজেই পার করার পর, নিউজিল্যান্ড ফুটবল দল সেমিফাইনালে ফিজিকে ৭-০ গোলে উড়িয়ে দেয়। এরপর ফাইনালে নিউ ক্যালেডোনিয়াকে ৩-০ ব্যবধানে হারিয়ে তারা ইতিহাসের তৃতীয়বারের মতো বিশ্বকাপে নিজেদের জায়গা নিশ্চিত করে।
গ্রুপ 'জি'-তে বেলজিয়াম, মিশর ও ইরানের সঙ্গে ড্র হওয়ায় গ্রুপ পর্বে নিউজিল্যান্ডের সামনে একটি কঠিন চ্যালেঞ্জ অপেক্ষা করছে।
প্রথম দেখায় নিউজিল্যান্ডের পরবর্তী রাউন্ডে যাওয়ার সম্ভাবনা অত্যন্ত ক্ষীণ মনে হতেই পারে। তবে, বর্ধিত এই টুর্নামেন্ট তাদের জন্য একটি সম্ভাব্য লাইফলাইন বা সুযোগ এনে দিয়েছে। কারণ এবার শুধু প্রতিটি গ্রুপের শীর্ষ দুটি দলই পরের রাউন্ডে যাবে না, বরং ১২টি গ্রুপের মধ্যে সেরা আটটি তৃতীয় স্থান অধিকারী দলও নকআউট পর্বে যাওয়ার সুযোগ পাবে।
অল হোয়াইটরা যদি কয়েকটি ড্র বের করতে পারে এবং বড় ব্যবধানে হেরে যাওয়া এড়াতে পারে, তবে বাস্তবিকভাবেই তারা সেই অতিরিক্ত জায়গাগুলোর একটির জন্য লড়াইয়ে থাকতে পারবে। আর সেটি করতে পারলে নিউজিল্যান্ড তাদের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপের নকআউট পর্বে পৌঁছানোর গৌরব অর্জন করবে।
নিউজিল্যান্ড কোচ: ড্যারেন বেজলি
টুর্নামেন্টে থাকা মাত্র দুজন ইংলিশ কোচের একজন হলেন ড্যারেন বেজলি। গত তিন বছর ধরে এই দলের দায়িত্বে আছেন।
বিশ্বজুড়ে বিভিন্ন দেশের ফুটবল ফেডারেশনগুলো যখন জাতীয় দলের কোচ খোঁজে, তখন ইউরোপীয় ম্যানেজারদের অভিজ্ঞতাকে একটি বড় সম্পদ হিসেবে দেখা হয়। নিউজিল্যান্ডও এর ব্যতিক্রম নয়।
অল হোয়াইটসদের দায়িত্বে থাকা বেজলি সাবেক ডিফেন্ডার। ২০০৫ সালে ইংল্যান্ড ছাড়ার পর ওশেনিয়াতে চলে আসেন। ইংল্যান্ডে থাকার সময় তিনি উলভস, ওয়াটফোর্ড এবং ওয়ালসালের মতো ক্লাবের হয়ে খেলেছেন।
২০২৩ সালে সিনিয়র দলের দায়িত্ব নেওয়ার আগে বেজলি নিউজিল্যান্ডের যুব জাতীয় দলের প্রতিটি স্তরে কোচিং করিয়েছেন। এক বছর পর, তিনি প্যারিস অলিম্পিকে অলিম্পিক দলকে নেতৃত্ব দেন এবং পরবর্তীতে সিনিয়র জাতীয় দলে নিজের ভূমিকায় ফিরে এসে তাদের বিশ্বকাপের টিকিট এনে দেন।
নিউজিল্যান্ডের ২০২৬ বিশ্বকাপ সূচি
১৫ জুন: ইরান বনাম নিউজিল্যান্ড — লস অ্যাঞ্জেলেস স্টেডিয়াম
২১ জুন: নিউজিল্যান্ড বনাম মিশর — বিসি প্লেস ভ্যাঙ্কুভার
২৬ জুন: নিউজিল্যান্ড বনাম বেলজিয়াম — বিসি প্লেস ভ্যাঙ্কুভার
নিউজিল্যান্ডের বিশ্বকাপ ইতিহাস
কনফেডারেশন: ওএফসি
সেরা বিশ্বকাপ সাফল্য: গ্রুপ পর্ব (১৯৮২, ২০১০)
সর্বশেষ বিশ্বকাপ: দক্ষিণ আফ্রিকা ২০১০ (গ্রুপ পর্ব)
প্রথম বিশ্বকাপ: স্পেন ১৯৮২
বিশ্বকাপে অংশগ্রহণ: ৩ বার (১৯৮২, ২০১০, ২০২৬)
বিশ্বকাপের সামগ্রিক রেকর্ড: ম্যাচ- ৬, জয়- ০, ড্র- ৩, হার- ৩, গোল দিয়েছে- ৪, গোল খেয়েছে- ১৪
নিউজিল্যান্ডের সর্বশেষ বিশ্বকাপ
দক্ষিণ আফ্রিকার সেই স্মরণীয় টুর্নামেন্টে নিউজিল্যান্ড দল কোনো ম্যাচ না হেরেই গ্রুপ পর্ব থেকে বিদায় নেওয়ার এক বিরল কীর্তি গড়েছিল। শুধু তাই নয়, গ্রুপ 'এফ'-এ তারা তৎকালীন বিশ্বচ্যাম্পিয়ন ইতালির ওপরে থেকে টুর্নামেন্ট শেষ করতে পেরেছিল।
স্লোভাকিয়ার বিপক্ষে উদ্বোধনী ম্যাচে ইউরোপীয় দলটি বিশ্বকাপে তাদের প্রথম গোলটি পায়। তবে ম্যাচের ৯৩ মিনিটে উইনস্টন রিডের একটি নাটকীয় গোল রবার্ট ভিটেকের ৫০ মিনিটের উদ্বোধনী গোলটিকে নষ্ট করে দেয় এবং অল হোয়াইটসরা বিশ্বকাপে তাদের প্রথম পয়েন্ট পায়।
এরপর সবার নজর চলে যায় নেলস্প্রুটের দিকে, যেখানে নিউজিল্যান্ডের তৎকালীন সর্বকালের সর্বোচ্চ গোলদাতা শেন স্মেল্টজ ম্যাচের সপ্তম মিনিটে ইতালির বিপক্ষে একটি দুর্দান্ত গোল করে দলকে এগিয়ে নেন। তবে বর্তমান চ্যাম্পিয়নরা ম্যাচের আধঘণ্টা হওয়ার ঠিক আগ মুহূর্তে ভিনসেঞ্জো ইয়াকুইন্তার পেনাল্টি গোলের সৌজন্যে কোনোমতে এক পয়েন্ট নিয়ে মাঠ ছাড়ে।
গ্রুপ পর্বের শেষ ম্যাচটি প্যারাগুয়ের বিপক্ষে গোলশূন্য ড্রতে শেষ হয়, যার পেছনে বড় অবদান ছিল গোলরক্ষক মার্ক পাস্টনের করা বেশ কিছু চমৎকার সেভের। এই অদম্য আন্ডারডগ দলটি অপরাজিত থাকার গৌরব, আত্মসম্মান ও সবার প্রশংসা কুড়িয়ে টুর্নামেন্ট থেকে বিদায় নেয়।
নিউজিল্যান্ডের প্রথম বিশ্বকাপ
টানা তিনটি ব্যর্থ বাছাইপর্বের পর অবশেষে ১৯৮২ সালে নিউজিল্যান্ড ফুটবলের মূল মঞ্চে জায়গা করে নেয়। এশিয়া ও ওশেনিয়ার মতো বিশাল অঞ্চলের জন্য মাত্র দুটি জায়গা বরাদ্দ থাকায়, অল হোয়াইটসের জন্য কেবল যোগ্যতা অর্জন করাটাই ছিল এক মহাকাব্যিক সাফল্য। বাছাইপর্বের এক পর্যায়ে দলটিকে মাত্র ১৩ দিনে চারটি ম্যাচ খেলতে হয়েছিল, যার সবগুলোই ছিল প্রতিপক্ষের মাঠে—ফিজি, চাইনিজ তাইপে, ইন্দোনেশিয়া ও অস্ট্রেলিয়ায়। এরপর নিরপেক্ষ ভেন্যু সিঙ্গাপুরে ৬০,০০০ দর্শকের সামনে প্লে-অফ ম্যাচে চায়না পিআর-কে ২-১ ব্যবধানে হারিয়ে তারা মূল আসরের টিকিট কাটে।
মূল টুর্নামেন্টের লড়াইটাও ছিল সমান কঠিন। নিজেদের প্রথম বিশ্বকাপ ম্যাচেই স্কটল্যান্ডের কাছে ৫-২ ব্যবধানে হেরে যায় নিউজিল্যান্ড। তবে এই ম্যাচে প্রয়াত স্টিভ সামনার ওশেনিয়া অঞ্চলের প্রথম খেলোয়াড় হিসেবে বিশ্বকাপের মূল মঞ্চে গোল করার গৌরব অর্জন করেন, যখন তিনি দ্বিতীয়ার্ধের শুরুতে গোলটি করেন। এর ঠিক দশ মিনিট পর দ্বিতীয় খেলোয়াড় হিসেবে জালের দেখা পান স্টিভ উডিন।
পরের ম্যাচে সোভিয়েত ইউনিয়নের কাছে ৩-০ গোলে পরাজয়ের পর, জিকো-অনুপ্রাণিত ব্রাজিলের কাছে ৪-০ ব্যবধানে হেরে নিউজিল্যান্ড তাদের প্রথম বিশ্বকাপ অভিযান শেষ করে।
বিশ্বকাপে নিউজিল্যান্ডের সর্বোচ্চ গোলদাতা
দুই 'স্টিভ'—সামনার এবং উডিনের পাশাপাশি নিউজিল্যান্ডের হয়ে বিশ্বকাপে গোল করতে পেরেছেন মাত্র আর দুজন খেলোয়াড়। এই দুটি গোলই এসেছিল দেশটির দ্বিতীয় বিশ্বকাপ অভিযানে (২০১০)। যার একটি ছিল দলের প্রথম পয়েন্ট এনে দেওয়া উইনস্টন রিডের সেই ঐতিহাসিক গোল এবং অন্যটি ছিল দক্ষিণ আফ্রিকা ২০১০-এ ইতালির বিপদ্ধে শেন স্মেল্টজের ম্যাচের শুরুর দিকের সেই গোলটি।
বিশ্বকাপে নিউজিল্যান্ডের হয়ে সর্বোচ্চ ম্যাচ খেলা খেলোয়াড়েরা
১৯৮২ সালের স্পেন বিশ্বকাপে নিউজিল্যান্ডের খেলা তিনটি গ্রুপ ম্যাচেই অংশ নিয়েছিলেন গোলরক্ষক ফ্রাঙ্ক ভ্যান হাটুম, সামনার, উডিন ও কিংবদন্তি উইন্টন রুফারসহ মোট দশজন খেলোয়াড়।
দক্ষিণ আফ্রিকাতেও ক্রিস উড (যিনি এখনও খেলছেন) সহ আরও ১২ জন খেলোয়াড় দলের তিনটি ম্যাচেই অংশ নেন। মানে নিউজিল্যান্ডের মোট ২২ জন খেলোয়াড় যৌথভাবে দেশের হয়ে বিশ্বকাপে সর্বোচ্চ ৩টি করে ম্যাচ খেলার রেকর্ডের মালিক।
নিউজিল্যান্ডের বিশ্বকাপ স্কোয়াড
গোলকিপার: ম্যাক্স ক্রোকম্ব, অ্যালেক্স পলসেন, মাইকেল উড
ডিফেন্ডার: টাইলার বিন্ডন, মাইকেল বক্সঅল, লিবারাতো কাকাচে, ফ্রান্সিস দে ভ্রিস, ক্যালান এলিয়ট, টিম পেইন, ন্যান্ডো পাইনাকার, টমি স্মিথ, ফিন সারম্যান
মিডফিল্ডার: ল্যাচলান বেইলিস, জো বেল, ম্যাট গারবেট, এলি জাস্ট, ক্যালাম ম্যাককাওয়াট, বেন ওল্ড, অ্যালেক্স রুফার, মার্কো স্ট্যামেনিচ, স্যারপ্রিত সিং, রায়ান থমাস
ফরোয়ার্ড: কোস্টা বারবারোসেস, জেসি র্যান্ডাল, বেন ওয়েইন, ক্রিস উড।