কোরবানির ঈদের পর ঢাকার বড় কাঁচাবাজার, মাছ ও ফলের আড়তে নেই তেমন কোনো বেচাকেনা। ঈদের ছুটিতে ফাঁকা রাজধানীর প্রভাব পড়েছে নিত্যপণ্যের আড়তেও। ঈদের পরদিন প্রয়োজনীয় সবজি, মাছ ও ফলের বেশ কিছু দোকান খোলা পাওয়া গেছে। প্রয়োজন অনুপাতে জিনিসপত্রের দামও কম-বেশি।
শুক্রবার (২৯ মে) রাজধানীর যাত্রাবাড়ীর বিভিন্ন বাজার ঘুরে এমন চিত্র দেখা গেছে। সবজি, ফল ও মাছের কোনো আমদানি নেই। সবজি, মাছ ও ফলের দোকানদাররা দোকান খুলে বসলেও পুরো আড়তই ফাঁকা।
ঈদের ছুটির প্রভাব কাঁচাবাজারের সবজি, ফল ও অন্যান্য পণ্যের ওপরেও পড়েছে। বাজারে শসা ও ঢ্যাঁড়সের দাম কমেছে, টমেটোর দাম স্থির রয়েছে, বেড়েছে কাকরোলের। এদিকে, ইলিশ মাছের দাম তুলনামূলক একটু কমেছে, বেড়েছে রুই, পাবদা, চিংড়ি ও টেংরা মাছের দাম।
যদিও আড়তদার ও মাছ বিক্রেতাদের দাবি, আগামীকাল থেকে ইলিশসহ অন্যান্য মাছের দাম বাড়তে পারে। কারণ আজকে বাজারে কোনো মানুষ নেই। লোকজনের সমাগম ঘটলে বাড়বে মাছের দাম।
অন্যান্য সবজির মধ্যে ঈদের আগে কম দামে পাওয়া যাচ্ছে মিষ্টি কুমড়া ৪০ টাকা কেজি, লাউ ৪০-৫০ টাকায়।
যাত্রাবাড়ী আড়ত থেকে সবজি ও লিচু কিনে কেরানীগঞ্জের নড়াইল বাজারে যাওয়ার জন্য সিএনজিচালিত অটোরিকশায় উঠছেন দুজন। টমেটো, শসা, বেগুন, পটল, করলা, কচুর লতি, মিষ্টি কুমড়া, লাউ, ঢ্যাঁড়স এবং লিচুসহ বিভিন্ন পণ্য গাড়িতে তুলছিলেন তারা।
পলাশ নামে তাদের একজন বলেন, ঈদের আগে লিচুর খাঁচি ছিল ২২০০ টাকা। সেটা বেড়ে হয়েছে ৩৬০০ টাকা। কিন্তু হিমসাগর আম ৭০-৮০ টাকা কেজি। নিম্নমানের আম ৫০-৬০ টাকাতেও মিলছে। কাঁচা আম বড়-ছোট আকার অনুযায়ী ১৪০-১৮০ থেকে ২০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
এই খুচরা বিক্রেতা জানিয়েছেন, বাজারে এখনো সবজির সরবরাহ শুরু হয়নি। নতুন চালান আসতে আরও সময় লাগতে পারে। এই সময়ের মধ্যে অনেক বিক্রেতা তাদের আগের মজুত করা পণ্য দ্রুত বিক্রি করে দেওয়ার জন্য কিছু জিনিসপত্রের দাম কমিয়েছে।
বাজারের খুচরা বিক্রেতা কামরুল জানান, ঈদের পর সবজির দামে উল্লেখযোগ্য পতন ঘটেছে। ঈদের আগে যে কাঁচা মরিচ প্রতি কেজি ৮০ থেকে ১১০ টাকায় বিক্রি হয়েছে, এখন তা ৭৫ থেকে ৮০ টাকায় নেমে এসেছে।
একইভাবে টমেটোর দাম কেজিপ্রতি আগেও যা ছিল, এখনো ৯০-১০০ টাকা। শুধু শসার দাম কেজিতে ৪০ টাকা কমে ৫০-৬০ টাকায় দাঁড়িয়েছে। পটল ৪০ টাকা, বেগুন ৮০ টাকা থেকে কমে ৪০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। করলার দামও কেজিপ্রতি ১০০-১২০ টাকা থেকে কমে ৮০ টাকায় নেমেছে। ঢ্যাঁড়স ৫০-৬০ টাকা থেকে কমে ৩০ টাকা, পাইকারিতে ২০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। লেবু আগে ২০-২৫ টাকা হালি বিক্রি হলেও এখন তা ১৫-২০ টাকায় পাওয়া যাচ্ছে।
তার মতে, বাজারে পণ্যের সরবরাহ পর্যাপ্ত থাকলেও ক্রেতার সংখ্যা খুবই কম, যা দাম কমার অন্যতম প্রধান কারণ। আবার কিছু পণ্যের দাম বাড়ার কারণ হিসেবে বলেন, যেগুলো মানুষ কম টানছে, ওই সব পণ্যের দাম একটু কমছে।
ঈদের ঠিক আগে রাজধানীর বিভিন্ন বাজারে মধু ফল লিচুর দাম ৫০০, সাড়ে ৪০০, ৪০০, সাড়ে ৩০০, ৩০০, ২৫০ থেকে ২০০ টাকা পর্যন্ত ছিল। তবে আজ পাইকারি ও খুচরা বাজার ঘুরে দেখা গেছে, বর্তমানে ২০০ টাকার লিচু ৩০০ টাকা, আর ৩০০ টাকারগুলো ৪০০ এবং ৫০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
যাত্রাবাড়ী বাজারের আম বিক্রেতা শরিফুল ইসলাম বলেন, কোরবানির ঈদের পরের দিন গরু-ছাগল কাটাকাটির কাজ করে শরীরে ধকল গেছে। সেটার প্রভাব এখনো শেষ হয়নি। তাই বাজারে ক্রেতা কম, পণ্যের চাহিদাও কম। কিন্তু আমদানি না থাকায় দাম কমেনি। দাম আগের মতোই।
মাছের বাজারেও ক্রেতার খরা। সাধারণত ঈদের সময় মাংসের চাহিদা বেশি থাকায় মাছের চাহিদা কমে যায়। তবে ইলিশ ও চিংড়ির চাহিদা বরাবরই থাকে। ঈদের সময় এই দুই ধরনের মাছের দাম কেজিতে ২৫০ থেকে ৩০০ টাকা পর্যন্ত বেড়েছিল। তবে বর্তমানে ইলিশের দাম কমলেও চিংড়ির দাম অপরিবর্তিত রয়েছে।
স্বপন চন্দ্র দাস নামে একজন বিক্রেতা বলেন, ঈদের দুদিন আগে বাজারে এক কেজি ওজনের ইলিশ ২২০০ থেকে ২৩০০ টাকায় বিক্রি হয়েছে, যা এখন ১৬০০ থেকে ১৮০০ টাকায় নেমেছে। ৪০০ গ্রামের ইলিশ পাওয়া যাচ্ছে সাড়ে ৯০০ টাকায়। একটু বড় ৬০০ গ্রামের ইলিশ ১০০০ টাকা, সাতশ গ্রামের ইলিশ ১২০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
তবে গলদা চিংড়ির দাম আগের মতোই কেজিপ্রতি ১১০০ থেকে ১২০০ টাকায় স্থির রয়েছে। বড় সাইজের এক কেজি গলদা চিংড়ির দাম ১৬০০ টাকা হাঁকছেন। দরদামে সর্বশেষ ১৫০০ টাকায় ঠেকেছে। বাগদা চিংড়ি সাড়ে ৮০০, ৮০০, সাড়ে ৭০০ এবং ৭০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
আড়তের পাবদা মাছ বিক্রেতা জুয়েল বলেন, ঈদের আগে মাছের আমদানি ছিল বেশি। ক্রেতাও ছিল বেশি, তাই দামও ছিল কম। কিন্তু এখন কাস্টমার কম, আবার মাছের আমদানিও কম। তাই পাবদা মাছ ৩৫০ টাকা কেজি। ঈদের আগে ছিল ৩২০ টাকা কেজি।
তিনি বলেন, আমরা পাইকারি বিক্রি করি। এখন যেহেতু কাস্টমার কম, তাই খুচরাও বিক্রি করছি।
আরেক মাছ বিক্রেতা বলেন, ঈদের আগে রুই মাছের আমদানি ছিল ব্যাপক, দামও ছিল কম। এখন কাস্টমার কম, কিন্তু বাজারে রুই-কাতলা নেই। কিছু রুই আমদানি হয়েছে, তাও দাম বেশি। আকারে বড় তিন থেকে সাড়ে তিন কেজি ওজনের রুই মাছ ৪৮০ টাকা, ছোট সাইজ ৩৮০ টাকা, সাড়ে ৩০০ টাকা। টেংরা বড় সাইজ সাড়ে ৬০০ টাকা আর মাঝারি আকৃতির টেংরা ৫৫০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে। যদিও ঈদের আগে আরও কম দাম ছিল। মাঝারি সাইজের তেলাপিয়া মাছের দাম ২২০ টাকা।
যাত্রাবাড়ী বাজারের নিত্যপণ্য বিক্রেতা আজিজুল ইসলাম জানান, বর্তমানে মূলত যারা ঢাকার স্থানীয় বাসিন্দা এবং যাদের রেস্তোরাঁ খোলা, তারাই বাজারে কেনাকাটা করতে আসছেন।
বাজার করতে আসা দিদারুল আলম চৌধুরী জানান, ঈদের পর অতিথি আসবে বলে প্রয়োজনীয় কেনাকাটা করতে এসেছেন। তিনি বলেন, ঈদের আগে অনেক পণ্যের দাম চড়া থাকলেও এখন তা অনেকটাই কমেছে। তবে আলু, পেঁয়াজ, আদা ও রসুনের দামে হেরফের হয়নি।