ইসলাম ধর্মে পবিত্র রমজান মাসকে রহমত, মাগফিরাত ও নাজাতের মাস হিসেবে বিবেচনা করা হয়। এই বরকতময় মাসের শেষ দশকের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও ফজিলতপূর্ণ রাত হলো শবে কদর বা লাইলাতুল কদর। পবিত্র কোরআন ও রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের অসংখ্য হাদিসে এই রাতের মর্যাদা ও গুরুত্ব সম্পর্কে বিশেষভাবে বর্ণনা করা হয়েছে। মুসলিম উম্মাহর জন্য এই রাত আল্লাহর অশেষ রহমত, ক্ষমা ও বরকত লাভের এক মহামূল্যবান সুযোগ।
পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তাআলা লাইলাতুল কদরের মর্যাদা বর্ণনা করে বলেন,“নিশ্চয়ই আমি কোরআন অবতীর্ণ করেছি লাইলাতুল কদরের রাতে। আর তুমি কি জানো লাইলাতুল কদর কী? লাইলাতুল কদর হাজার মাসের চেয়েও উত্তম।” (সূরা আল-কদর: ১–৩)
আরও বলা হয়েছে,“সে রাতে ফেরেশতাগণ ও রূহ (জিবরাইল) তাদের প্রতিপালকের অনুমতিক্রমে প্রত্যেক বিষয়ে অবতীর্ণ হন। তা শান্তিময়, ফজর উদয় হওয়া পর্যন্ত।” (সূরা আল-কদর: ৪–৫)
ইসলামি পণ্ডিতদের মতে, এই আয়াতগুলো থেকে স্পষ্টভাবে বোঝা যায় যে, লাইলাতুল কদর এমন একটি রাত যার মর্যাদা হাজার মাসের চেয়েও বেশি। অর্থাৎ একজন মুসলমান যদি এই রাতে আন্তরিকতার সাথে ইবাদত করেন, তবে তিনি দীর্ঘ সময়ের ইবাদতের সমপরিমাণ সওয়াব লাভ করতে পারেন।
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এই রাতের ফজিলত সম্পর্কে বহু হাদিসে উম্মতকে সচেতন করেছেন। সহিহ বুখারি ও সহিহ মুসলিমে বর্ণিত এক হাদিসে তিনি বলেন,“যে ব্যক্তি ঈমানের সাথে এবং সওয়াবের আশায় লাইলাতুল কদরের রাতে ইবাদত করবে, তার পূর্বের গুনাহসমূহ ক্ষমা করে দেওয়া হবে।” (সহিহ বুখারি: ১৯০১, সহিহ মুসলিম: ৭৬০)
আরেক হাদিসে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,“তোমরা রমজানের শেষ দশকের বেজোড় রাতগুলোতে লাইলাতুল কদর অনুসন্ধান কর।” (সহিহ বুখারি: ২০১৭)
এই হাদিসের আলোকে মুসলমানরা রমজানের শেষ দশকের ২১, ২৩, ২৫, ২৭ ও ২৯তম রাতে বিশেষভাবে ইবাদতের মাধ্যমে শবে কদর অনুসন্ধান করেন। যদিও অনেক আলেমের মতে শেষ দশকের প্রতি রাতেই লাইলাতুল কদর সন্ধান করা উচিত।
হাদিসে আরও বর্ণিত হয়েছে, রমজানের শেষ দশক শুরু হলে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইবাদতে অধিক মনোযোগ দিতেন। হযরত আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত একটি হাদিসে বলা হয়েছে,“রমজানের শেষ দশক এলে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সারারাত ইবাদত করতেন, পরিবারকে জাগিয়ে দিতেন এবং ইবাদতে সর্বোচ্চ চেষ্টা করতেন।” (সহিহ বুখারি: ২০২৪, সহিহ মুসলিম)
আরেকটি হাদিসে হযরত আয়েশা (রা.) রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে জিজ্ঞেস করেছিলেন, যদি তিনি লাইলাতুল কদর পেয়ে যান তাহলে কী দোয়া পড়বেন। উত্তরে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,“বলবে— আল্লাহুম্মা ইন্নাকা আফুউন তুহিব্বুল আফওয়া ফা’ফু আন্নি।”অর্থাৎ “হে আল্লাহ! আপনি ক্ষমাশীল, ক্ষমা করতে ভালোবাসেন, তাই আমাকে ক্ষমা করুন।” (তিরমিজি)
ইসলামি স্কলারদের মতে, শবে কদর এমন একটি মহিমান্বিত রাত, যে রাতে আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে মানুষের ভাগ্য নির্ধারণ সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়সমূহ ফেরেশতাদের মাধ্যমে নির্ধারিত হয়। এই রাতে অসংখ্য ফেরেশতা পৃথিবীতে অবতীর্ণ হন এবং আল্লাহর বিশেষ রহমত বর্ষিত হয়।
এই রাত আত্মশুদ্ধি, তওবা, দোয়া ও ইবাদতের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাই মুসলিম উম্মাহর উচিত রমজানের শেষ দশকে বেশি বেশি নফল নামাজ, কোরআন তিলাওয়াত, দোয়া, জিকির ও ইস্তিগফারের মাধ্যমে এই বরকতময় রাত লাভের চেষ্টা করা।
বিশেষজ্ঞরা বলেন, একজন মুমিনের জন্য শবে কদর শুধু একটি রাত নয়, বরং এটি আত্মসমালোচনা, আত্মশুদ্ধি এবং আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনার এক মহামূল্যবান সময়। তাই প্রত্যেক মুসলমানের উচিত এই রাতের গুরুত্ব উপলব্ধি করে আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য আন্তরিকভাবে ইবাদতে মনোনিবেশ করা।